হানাফী আলেম আব্দুল মতিন সাহেব লিখিত ‘দলিলসহ নামাযের মাসায়েল’ (প্রকাশক : মাকতাবাতুল আযহার, ঢাকা-এপ্রিল’২০১১) এর জবাব নিচে দেয়া হল। পর্ব-০২

‘দলিলসহ নামাযের মাসায়েল’-এর জবাব -২

দলিল

হানাফী আলেম আব্দুল মতিন সাহেব লিখিত দলিলসহ নামাযের মাসায়েল (প্রকাশক : মাকতাবাতুল আযহার, ঢাকাএপ্রিল২০১১) এর জবাব নিচে দেয়া হল। তাঁর উপস্থাপিত দলিল ও আলোচনা লেখক শিরোনামে এবং আমাদের জবাব বিশ্লেষণ শিরোনামে উল্লেখ করা হল। আমরা ইতঃপূর্বে প্রথম অধ্যায়ে ইক্বামাতের বাক্য সম্পর্কে লেখকের উপস্থাপিত দলিল ও মন্তব্যগুলো ১ থেকে ২০টি শিরোনামে উল্লেখ করেছি। এখন ২১তম থেকে সালাতে হাত বাঁধার পদ্ধতি নিয়ে লেখকের উপস্থাপনা ও তার বিশ্লেষণ উল্লেখ করব, ইনঁশাআল্লাহ।

দ্বিতীয় অধ্যায় : সালাতে হাত বাঁধার পদ্ধতি (পৃ: ১৩২০)

লেখক ২১ (পৃ: ২১) : নামাযে কব্জির উপর হাত বেঁধে নাভির নীচে রাখা সুন্নত :-
নামাযে বাম কব্জির উপর ডান হাত রেখে দু’আঙ্গুল দ্বারা চেপে ধরা সুন্নাত। একাধিক সহীহ হাদীস দ্বারা এ আমল প্রমাণিত।
বিশ্লেষণ ২১ : প্রকৃতপক্ষে হানাফী মাযহাবে ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠের উপর রাখে ও দুই আঙ্গুল দ্বারা কব্জি চেপে ধরে। কখনই বাম হাতের কব্জির উপর তারা ডান হাতটি রাখে না। লেখক যে শব্দে হাত বাঁধা সুন্নাত বলেছেন ঐ শব্দে বা বাক্যে একটি হাদীসও তিনি উপস্থাপন্ করতে পারেন নি।

লেখক ২২ (পৃ: ২১) : চার মাযহাবের সকল ইমাম ও আলিম এটাকেই সুন্নত পদ্ধতি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বিশ্লেষণ ২২ : এটি সুস্পষ্ট মিথ্যাচার। আসুন হানাফী আলেম তাক্বী উসমানী (রহ) থেকে জেনে নিই চার ইমামের কে কি বলেন :
دوسرا مسئلہ یہ ہی کہ ہاتھوں کو کس جگہ باندھا جائے؟ حنفیہ اور سفیان ثوری [رح] اسحاق ابن راہویہ اور شافعیہ میں سے ابو اسحاق مروزی کے نزدیک ہاتھوں کو ناف کے نیچے باندھنا مسنون ہے ؛ امام شافعی [رح] کے نزدیک ایک روایت میں تحت الصدر اور دوسری روایت میں علی الصدر ہاتھ باندھنا مسنون ہے ؛ امام احمد [رح] سے تین روایتیں منقول ہیں ؛ ایک امام ابو حنیفہ [رح] کے مطابق؛ ایک امام شافعی [رح] کے مطابق؛ اور ایک یہ کہ دونوں طریقوں میں اختیار ہے ؛
“দ্বিতীয় মাসআলা হল, এই হাত কোথায় বাঁধতে হবে? ইমাম আবূ হানিফা ও সুফিয়ান সওরী (রহ), ইসহাক্ব ইবনে রাহওয়াইহ ও শাফেঈদের মধ্যে থেকে আবূ ইসহাক্ব মারুযীর (রহ) কাছে হাত নাভির নীচে বাঁধাটা সুন্নাত। ইমাম শাফেঈর একটি বর্ণনানুযায়ী বুকের নিচে এবং অপর বর্ণনানুযায়ী বুকের উপর হাত বাঁধাটা সুন্নাত। ইমাম আহমাদ (রহ) থেকে তিনটি উক্তি বর্ণিত হয়েছে। এর একটি ইমাম আবূ হানিফার মত, একটি ইমাম শাফেঈর মত এবং অপর একটি মতে উভয়টিকেই গ্রহণ করেছেন।” (দারসে তিরমিযী ২/১৯)

বুঝা গেল ইমাম শাফেঈর মূল মতামত হল, বুকের উপর বা কাছে রাখা সুন্নাত। তাকী উসমানী (হাফি) বুকের ‘নীচে’ বলেছেন। অবশ্য হাদীসে ‘বুকের উপরে’ শব্দটির সাথে সাথে বুকের কাছে (عند الصدر) শব্দটি রয়েছে । ইমাম হাম্বলের (রহ) একাধিক মত রয়েছে। কিন্তু তাঁর পক্ষ থেকে আবূ দাউদে বর্ণিত নাভীর নিচে হাত বাঁধার হাদীসটি যঈফ হিসাবে উল্লিখিত হয়েছে। তাছাড়া ইমামদের ঐ কথাই গ্রহনযোগ্য যা সহীহ হাদীস মোতাবেক। সুতরাং বিভিন্ন মতামত থাকলে আমরা সবচাইতে সহীহ সনদের হাদীসটিকেই (বুকের উপর হাত বাঁধা) তাঁর অনুসরণীয় মতামত হিসাবে গণ্য করব। এ পর্যায়ে সত্য গোপন করার কারণে লেখকের নিজের বক্তব্যটি যঈফ, সহীহ নয় – এটাই প্রমাণিত হল।

লেখক ২৩ (পৃ: ২১) : পক্ষান্তরে কনুই পর্যন্ত হাত রাখার পক্ষে কোন হাদীস নেই। বুখারী শরীফের যে হাদীসকে এর প্রমাণ স্বরূপ পেশ করা হয় সেটির সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা একটু পরে উল্লেখ করছি।
বিশ্লেষণ – ২৩ : আমরাও একটু পরে জানতে পারব স্বয়ং লেখক কিভাবে সহীহ হাদীসের শব্দ ও অর্থ বিকৃত করে হাতকে তালু ও কব্জি শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার অপচেষ্টা করেছেন। অথচ তালু ও কব্জি হাতের অংশবিশেষ। সালাত সম্পর্কিত হাদীসগুলোতে হাতকে যেভাবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাগ করা হয়েছে, একত্রিতভাবে হাতের এত ব্যাখ্যা সম্পর্কিত ভাগ সালাতের বাইরের ক্ষেত্রে দেখা যায় না বললে – বেশী বলা হয় না। যেমন –
ক) আবূ হুমায়েদ সাঈদী (রা) বর্ণনা করেন :
ثم سجد فأمكن أنفه وجبهته الأرض ونحى يديه عن جنبيه ووضع كفيه حذو منكبيه
“রসূলুল্লাহ (স) যখন সাজদা করতেন তখন তার নাক ও কপাল দৃঢ়ভাবে মাটিতে রাখতেন এবং তিনি তাঁর দুই হাতকে দুই পার্শ্ব থেকে দূরে রাখতেন। আর তিনি (হাতের) দুই পাতাকে দুই কাঁধ বরাবর রাখতেন।” [আবূ দাউদ, দারেমী, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মিশকাত ২/৭৪৫, হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী সহীহ বলেছেন]
হাদীসটিতে দেখা যাচ্ছে হাতের পাতাকে হাত থেকে পৃথক ও সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সিজদাবস্থায় হাতের যে অংশটি শরীরের থেকে দূরে রাখার কথা বলা হয়েছে তা কব্জির পরবর্তী অংশ থেকে হাতের কনুই পর্যন্ত অংশ।
পূর্বোক্ত হাদীসটির পরবর্তী অংশে তাশাহহুদের সময় রানের উপর হাতের কোন অংশটি থাকবে সে সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে। নবী (স) বলেছেন :
وَوَضَعَ كَفَّهُ الْيُمْنَى عَلَى رُكْبَتِهِ الْيُمْنَى وَكَفَّهُ الْيُسْرَى عَلَى رُكْبَتِهِ الْيُسْرَى وَأَشَارَ بِأُصْبُعِهِ
“ডান তালুকে বাম জানুর উপর এবং বাম তালুকে বাম জানুর উপরে রাখলেন এবং শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করলেন।”
এখানে বুঝা যাচ্ছে সম্পূর্ণ হাত নয় বরং হাতের তালু রানের উপর থাকবে।
খ) সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মালেক বলেছেন :
إذا سجد فرج بين يديه حتى يبدو بياض إبطيه
“যখন নবী (স) সাজদা করতেন তখন হাতকে (পেট থেকে) পৃথক রাখতেন। এমনকি তার বগলের শুভ্রতা প্রকাশ পেত।”[সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত ২/৮৩১]
এই হাদীসটিতেও হাত বলতে কব্জির পরবর্তী অংশ থেকে কনুই পর্যন্ত অংশকে বুঝান হয়েছে। বুঝা গেল হাত বলতে কনুই পর্যন্ত অংশকে গণ্য করা হয়।
আবার কখনো তালু থেকে শুরু করে কনুই পর্যন্ত সম্পূর্ণ অংশকেও হাত বলা হয়েছে। যেমন রুকু‘ করা সম্পর্কিত বর্ণনাতে এসেছে :
গ) আবূ হুমায়েদ সাঈদী (রা) বলেন :
ثم ركع فوضع يديه على ركبتيه كأنه قابض عليهما ووتر يديه فنحاهما عن جنبيه
“নবী (স) রুকু‘ করলেন এবং দুই হাত দুই জানুর উপর রাখলেন যেন দু’টিকে আঁকড়ে ধরলেন, তিনি দুই হাতকে কিছুটা বাঁকা করে পার্শ্বদেশ থেকে পৃথক রাখলেন।” (আবূ দাউদ, মিশকাত ২/৭৪৫ নং)
হাটুর উপর হাতের তালু ছিল, আর হাতের যে অংশটিকে বাঁকা করা হয়েছে সেখানে তালু ছিল না। কিন্তু কনুই ও বাহুর অন্যান্য অংশ ছিল।

উপরের আলোচনাতে বুঝা গেল, হাতের তালু ও কব্জিকে হাত থেকে ক্ষেত্রবিশেষে পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার হাতের অংশ হিসাবেও বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু কেবল হাতের তালু বা কব্জির নির্দিষ্ট ব্যবহার থাকলে সেখানে ব্যাপক অর্থে হাত শব্দটি অর্থ করার সুযোগ নেই। কেননা সেখানে كف (তালু) শব্দ ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। তাই সেটা يد বা হাত নয় বরং তার অংশবিশেষ।

উল্লেখ্য হাত বলতে চোরের হাত কাটা, মুসাফাহ করার সময় হাত ধরা প্রভৃতি শব্দের ব্যাখ্যাগুলো সালাতের বাইরের অবস্থার সাথে সম্পর্কিত । অথচ পূর্বোক্ত হাদীসগুলো সালাতের সাথে সম্পৃক্ত। যা সালাতের মধ্যে হাত ও তালুর বিভিন্ন অবস্থার খাস বা সুনির্দিষ্ট বর্ণনা। সালাতের সুনির্দিষ্ট বর্ণনার উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য ক্ষেত্রে আম বা সাধারণভাবে ব্যবহৃত হাতের ব্যাখ্যা এখানে প্রযোজ্য নয়। কেননা খাস দলিল মজুদ থাকতে আম দলিল উপস্থাপন অর্থহীন।

লেখক ২৪ (পৃ: ২১) : এমনিভাবে নাভির নীচে হাত রাখা সুন্নাত। ইমাম আবূ হানীফা র. ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল র. দুজনেই এটাকে সুন্নাত বলেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে. ইমাম আহমদ ছিলেন ইমাম শাফেয়ীর র. এর ভক্ত ছাত্র। ইমাম শাফেয়ী বুকের নীচে হাত বাঁধাকে উত্তম বলেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ইমাম আহমদ সেই মতকে পরিহার করে নাভির নীচে হাত বাঁধাকে উত্তম আখ্যা দিয়েছেন। তিনি কি হাদীস ছাড়া এটা করেছেন? তিনি তো হাদীসের হাফেজ ছিলেন।
বিশ্লেষণ ২৪ : একটু পরে আমরা লেখকের উপস্থাপিত নাভীর নিচে হাত বাঁধার হাদীস সম্পর্কে ইমাম আহমাদের (রহ) মন্তব্য জানতে পারব। তিনি উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারীকে মুনকার (প্রত্যাখ্যাত) বলেছেন। তাছাড়া তাক্বী উসমানী হানাফী (হাফি.) থেকে আমরা জেনেছি বুকের উপর হাত বাঁধার পক্ষেও ইমাম আহমাদের রায় আছে। যা লেখক অস্বীকার করে নিজের বক্তব্য অসত্য হওয়াটা নিশ্চিত করেছেন। ইমাম শাফেঈ (রহ) বুকের উপর ও নিকট হাত বাঁধার মতামত পেশ করেছেন। যার মূল দাবী একই। ইমাম নববী (রহ) থেকে বুকের নীচে নাভীর উপরে বলে যে বক্তব্য এসেছে তা ইমাম শাফেঈ বা সমগ্র শাফেঈ মাযহাবের নয়। এটা ইমাম নববী (রহ)এর ব্যক্তিগত ইজতিহাদ। তাছাড়া পরবর্তীতে আমরা জানব ইমাম নববী (রহ) তাঁর উক্ত ইজতিহাদের সমর্থনে বুকের উপর হাত বাঁধার দলিলটি পেশ করেছেন (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৩৭’) । অর্থাৎ মূল ভাবের দিক থেকে ইমাম নববী (রহ)এর কাছেও বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসটিও তাঁর ইজতিহাদী মতটির সমার্থক।

লেখক ২৫ (পৃ: ২১) : যাাহোক বুকের উপর হাত বাঁধাকে চার ইমামের কেউই সুন্নাত বলেননি। এ সম্পর্কে যে হাদীসটি পেশ করা হয় সেটিও সহীহ নয়। এখানে প্রথমত হাত বাঁধার পদ্ধতি সম্পর্কিত সহীহ হাদীসগুরো পেশ করবো। পরে নাভির নীচের রাখা সম্পর্কে সহীহ হাদীসসমূহ উল্লেখ করবো্
বিশ্লেষণ ২৫ : লেখক যে চার ইমামের মধ্যে দুই ইমাম তথা ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদ (রহ) সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন – তা সুস্পষ্ট করেছি। পরবর্তীতে লেখকের উপস্থাপিত দলিল ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও আমরা একই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করব। আমরা দেখব তিনি কিভাবে সহীহ হাদীসকে যঈফ বলেছেন এবং তার বিকৃত অর্থ করেছেন। আবার কিভাবে যঈফ হাদীসকে সহীহ আখ্যা দিয়েছেন।
সালাতে হাত বাঁধা সম্পর্কে আসুন উদারপন্থী হানাফী আলেমদের বিশ্লেষণ জেনে নিই। জাতীয় মাসজিদ বায়তুল মুকাররমের সাবেক খতীব ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক হেড মাওলানা মুফতি আমীমুল ইহসান (রহ) তাঁর ‘ফিক্বহুস সুনানি ওয়াল আসারে’ বলেন :
“আবূ তাইয়িব (রহ) ইমাম তিরমিযীর ব্যাখ্যায় বলেন, যতদূর মনে হয়, আল্লাহই ভাল জানেন, দুই হাত নাভীর নীচে রাখা ও বুকের উপর রাখা সবই সহীহ। অপরদিকে নীমবী বলেন যে, ‘বাম হাতের উপর ডানহাত রাখা’ এতটুকুই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। হাত দুইটি রাখার স্থানের বিষয়ে কিছুই প্রমাণিত নয়। বুকের উপর, নাভির উপর বা নাভির নীচে রাখার সকল বর্ণনা দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য। গ্রন্থকার (আমীমুল ইহসান) বলেন, আমার মতে আবূ তাইয়িবের অভিমতই গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ নাভির নীচে, উপরে বা বুকে হাত রাখা সবই সহীহ। তবে উপরের ব্যাখ্যা অনুসারে পুরুষদের জন্য নীচে ও মহিলাদের জন্য উপরে রাখা উত্তম। আল্লাহই সর্বোত্তম জ্ঞাতা।”
[মুফতী সাইয়েদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান, আসারুস সুনানি ওয়াল আসার, অনুবাদ : ড. খোন্দকার আ.ন.ম. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ১ম খণ্ড (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন) পৃ: ১৭০]

সুস্পষ্ট হল, হানাফী আলেমদের কাছেও বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীস সঠিক। হানাফী আলেম তাক্বী উসমানী (হাফি.) নাভির নীচে ও বুকের উপর হাত রাখা সম্পর্কিত উভয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে লিখেছেন :
شیخ ابن ہمام فتح القدیر میں فرماتے ہے کہ روایات کے تعارض کے وقت ہم نے قیاس کی طرف رجوع کیا تو وہ حنفیہ کی تائید کرتا ہے ؛ کینکہ ناف پر ہاتھ باندھنا تعظیم کے زیادہ لائق ہی ؛ البتہ عورتوں کے لئے سینہ پر ہاتھ باندھنے کو اس لئے ترجیح دی گئی کہ اس میں ستر زیادہ ہے ؛ واللہ اعلام؛
“শায়েখ ইবনুল হুমাম ‘ফতহুল ক্বাদীর’-এ বলেছেন : “বর্ণনাগুলো সংঘর্ষের ক্ষেত্রে আমরা ক্বিয়াসের প্রতি মনোনিবেশ করি। যা হানাফীদের পক্ষালম্বন করে। কেননা নাভীর পরে হাত বাঁধা তা’যিম (সম্মান) প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বেশী পরিপূরক। অবশ্য মহিলাদের বুকের উপর হাত বাঁধা প্রাধান্য পায়। কেননা এতে বেশী সতর (ঢাকা) হয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।”[তাক্বী উসমানী, দারসে তিরমিযী (উর্দূ) ২য় খণ্ড পৃ: ২৪]
সুস্পষ্ট হল, হানাফীদের কাছেও বুকে হাত বাঁধার হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা আছে। তবে সেটা নিজেদের ক্বিয়াস অনুযায়ী। হাদীসের শব্দ ও দাবী অনুযায়ী তারা আমল করেন না। যা তাঁদের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য।

লেখক ২৬ (পৃ: ২১) : হাত বাঁধার নিয়ম সম্পর্কিত হাদীস :-
১. হযরত সাহল ইবনে সা’দ রা. বলেন,
كَانَ النَّاسُ يُؤْمَرُونَ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ الْيَدَ الْيُمْنَى عَلَى ذِرَاعِهِ الْيُسْرَى فِي الصَّلَاةِ.صحيح البخاري (٧٤٠)
অর্থ : মানুষকে এই আদেশ দেওয়া হতো যে, তারা যেন নামাযে ডান হাত বাম হাতের বাহুর উপর রাখে। বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৭৪০।
বিশ্লেষণ ২৬ : হাদীসটিতে ডান হাত ও বাম (হাতের) যেরা শব্দ দু’টি ব্যবহৃত হয়েছে। উল্লেখ্য যেরা‘ কখনই কব্জি নয়। । অবশ্য কব্জি যেরা‘র অংশ।
الذراع (যেরা‘) : প্রত্যেক প্রাণীর হাত। গরু, ছাগলের যেরা‘ পায়ের গোছা থেকে উপরের অংশ পর্যন্ত। মানুষের যেরা‘ হাতের কুনইয়ের মাথা থেকে মধ্য আঙুলের মাথা পর্যন্ত। [কামুসুল ওয়াহিদ]
সহীহ মুসলিমে সালাতে হাত বাঁধা সম্পর্কিত হাদীসটি নিম্নরূপ। সাহাবী ওয়ায়িল ইবনে হুজর (রা) বলেন
اِنَّه‘ رَأَي النَّبِيُّ r رَفَعَ يَدَيْهِ حِيْنَ دَخَلَ فِي الصَّلاَةِ كَبَّرَ ثُمَّ الْتَحَفَ بِثَوْبِه ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْني عَلَي الْيُسْري ـ
“তিনি নবী (স) কে দেখেছেন, তিনি (স) সালাতের শুরুতে দু’টি হাত উঠালেন। এরপর উভয় হাত কাপড়ে ঢাকলেন। অতঃপর ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখলেন।” [সহীহ মুসলিম- কিতাবুস সালাত]
আরবিতে اليد বা হাত অর্থ : من اعضاء الجسد ، وهى من الْمنكب إلى أطراف الأصابع – “শরীরের একটি অংশ, সেটা হল কাঁধ থেকে আঙ্গুল পর্যন্ত । (মু‘জামুল ওয়াসিত্ব)
কিন্তু এভাবে শাব্দিক তরজমা অনুযায়ী কেউ হাত বাঁধেন না। হাতের অর্থ এভাবে করা হলে, একটি হাতকে অপর একটি হাতের উপর পূর্ণাঙ্গভাবে রাখা যায় না। তবে হাতের ঐ সম্পূর্ণ অংশকে জড়িয়ে রাখা যায়।
প্রকৃতপক্ষে সহীহ মুসলিমের হাদীসটিতে যাকে বাম হাত বলা হয়েছে, সহীহ বুখারীর হাদীসে তাকেই বাম যেরা‘ (কনুই হতে আঙুলের মাথা পর্যন্ত অংশ)-কে বুঝানো হয়েছে। এথেকে সুস্পষ্ট হল, হাত বলতে কেবল যেরা‘কেও বুঝায়। হাত বলতে যখন যেরা‘ বুঝায়, তখন হাতের উপর হাত রাখার অর্থ যেরা‘র উপর যেরা‘র রাখা। নিচের হাদীসগুলোতে হাত শব্দটির ব্যবহার কনুই থেকে হাতের পাতা বা আঙুল পর্যন্ত অংশ।
ইবনে উমার (রা) বলেন :
رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم اِذَا قَامَ فِي الصَّلاَةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتّي يَكُوْنَا حَذْوَ مَنْكَبَيْهِ
“আমি রসূলুল্লাহ (স)কে দেখেছি, যখন তিনি সালাতে দাড়াতেন তখন তাঁর হাত দু’টিকে কাঁধ (مَنْكَبَ) পর্যন্ত উঠালেন।” (সহীহ বুখারী- কিতাবুস সালাত)
সাহাবী মালিক ইবনে হুয়াইরিস (রা) বলেন :
كَانَ إِذَا كَبَّرَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِىَ بِهِمَا أُذُنَيْهِ وَإِذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِىَ بِهِمَا أُذُنَيْهِ … وفى رواية : حَتَّى يُحَاذِىَ بِهِمَا فُرُوعَ أُذُنَيْهِ
“রসূলুল্লাহ (স) যখন তাকবীর দিতেন তখন দুই হাত উঠাতেন – এমনকি উভয়কে হাতকে কান বরাবর করতেন। … অন্য বর্ণনায়, এমনকি দুই দুত দুই কানের লতি বরাবর উঠাতেন।” [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ২/৭৩৯ নং]
এই হাদীসটিতে رَفَعَ يَدَيْهِ ‘তাঁর দুই হাত তুলতেন’ বলতে হাতের কনুই থেকে আঙুল পর্যন্ত অংশকে বুঝানো হয়েছে। যা পূর্বে বর্ণিত হাত = যেরা‘র দাবী প্রমাণ করে।
অপর একটি যঈফ হাদীসে কাঁধ ও কান পর্যন্ত উভয় বর্ণনা এসেছে। হাদীসটি নিম্নরূপ :
ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা) থেকে বর্ণিত :
أَنَّهُ أَبْصَرَ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- حِينَ قَامَ إِلَى الصَّلاَةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى كَانَتَا بِحِيَالِ مَنْكِبَيْهِ وَحَاذَى بِإِبْهَامَيْهِ أُذُنَيْهِ ثُمَّ كَبَّرَ
“তিনি নবী (স)কে দেখেছেন যখন তিনি সালাতের জন্য দাঁড়ালেন, দুই হাত উঠালেন যেন উভয় হাত কাঁধ বরাবর হয়ে গেল এবং বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় কান বরাবর করলেন, অতঃপর তাকবীর বললেন।” [আবূ দাউদ, মিশকাত ২/৭৪৬; এর সনদে বিচ্ছিন্নতা আছে। কিন্তু মূল মর্মে পূর্বোক্ত সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের দু’টি বর্ণনা রয়েছে]
হাদীসটি থেকে বুঝা যাচ্ছে, হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কান পর্যন্ত ছিল তথা হাতের পাতা ও আঙ্গুল কাঁধের উপরে কান পর্যন্ত থাকত। আবার বলা হয়েছে, হাত কাঁধ বরাবর হত – অর্থাৎ হাতের পাতা ও আঙ্গুল ছাড়া হাতের বাকী অংশ। সুষ্পষ্ট হল, সহীহ মুসলিমে বর্ণিত ডান হাতটি বাম হাতের উপর রাখা বলতে সহীহ বুখারীর ডান হাতটি বাম যেরা‘র উপর রাখা। তথা ডান হাতের যেরা‘ বাম হাতের যেরা‘র উপর রাখার অর্থ সহীহ।

লেখক ২৭ (পৃ: ২১২২) :
২. হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. বলেন,
قُلْتُ لأَنْظُرَنَّ إِلَى صَلاَةِ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- كَيْفَ يُصَلِّى فنظرت إليه فَقَامَ فَكَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى حَاذَتَا بأُذُنَيْهِ ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى كَفِّهِ الْيُسْرَى وَالرُّسْغِ وَالسَّاعِدِ. أخرجه أبو داود (٧٢٧-٧٢٦) والنسائي (٨٨٩) واللفظ له وأحمد ٤/٣١٨ وابن خزيمة (٤٨٠) بإسناد صحيح. وفي رواية لأبي داود: ثم أخذ شماله بيمينه.
অর্থ: আমি (মনে মনে) বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে নামায পড়েন তা আমি লক্ষ্য করবো। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি দাঁড়িয়ে তাকবীর বললেন এবং উভয় হাত কান বরাবর রাখলেন। অতঃপর তাঁর ডান হাত বাম হাতের পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখলেন।
আবূ দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৭২৬,৭২৭; নাসাঈ শরীফ, হাদীস নং ৮৮৯; মুসনাদে আহমদ ৪খ, ৩১৮পৃ; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস নং ৪৮০।
আবূ দাউদ শরীফের আরেক বর্ণনায় আছে, ثم أخذ شماله بيمينه অর্থাৎ অতঃপর তিনি ডান হাত দ্বারা বাম হাত ধরলেন। এ হাদীসটি সহীহ।
ইবনে খুযায়মা র. উক্ত হাদীসের উপর শিরোনাম দিয়েছেন, باب وضع بطن الكف اليمنى على الكف اليسرى অর্থাৎ ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠ কব্জি ও বাহুর উপর রাখবে।
বিশ্লেষণ ২৭ : উক্ত হাদীসে সম্পূর্ণ ডান হাতটি বাম হাতের সম্পূর্ণ অংশ তথা তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার বর্ণনা এসেছে। যা পূর্ববর্তী সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনার অপর একটি ব্যাখ্যামূলক বর্ণনা। অথচ হানাফীগণ কেবল বাম হাতের পাতার পিঠের উপর ডান হাতের পাতা রাখেন এবং কেবল দু’টি আঙ্গুল দিয়ে কব্জিকে ধরেন। এ কারণে উক্ত হাদীসগুলোর সাথে হানাফীদের আমলের সম্পর্কও নেই।
ইবনে খুযায়মার অনুচ্ছেদে ডান হাতের তালু শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু আবূ দাউদ-নাসঈ-সহীহ হিব্বানের হাদীসে ঐ স্থানে হাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যদি সহীহ হাদীস দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে হাতের তালু শব্দটির প্রয়োগ ভুল। আর যদি যঈফ ও মুনকার হাদীস দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে উক্ত অনুচ্ছেদের লিখিত ‘তালু’ শব্দটি ঐ যঈফ দলিলের কারণেই অগ্রহণযোগ্য হয়। লেখকের আরবি উদ্ধৃতিতে ‘তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর শব্দগুলো বাদ পড়েছে। পূর্ণাঙ্গ অনুচ্ছেদটি লক্ষ্য করুন :
باب وضع بطن الكف اليمنى على كف اليسرى والرسغ والساعد جميعا
“অনুচ্ছেদ : ডান হাতের তালুর পেট বাম হাতের তালু, কব্জি ও বাহুর উপর একত্রিত থাকা।”
উক্ত অনুচ্ছেদটির আলোকে ডান হাতটি সম্পূর্ণ বাম যেরা‘র উপর থাকে। হানাফীদের মত আংশিক বাহু নয়, বরং جميعا শব্দের দ্বারা পূর্ণাঙ্গভাবে হাতের ঐ অংশগুলোকে বুঝায়। সুস্পস্ট হল, অনুচ্ছেদটি হানাফীদের আমলের বিরোধিতা করে। উপরোক্ত বক্তব্যে বাহুর আংশিক ব্যবহারের সুযোগ নেই। তাছাড়া পূর্বোক্ত সহীহ হাদীসে ‘হাত’ শব্দটি থাকায় – সে অনুযায়ী ব্যাখ্যা করলে যেটুকু দ্বন্দ্ব থাকে তা-ও নিরসণ হয়। আর এক্ষেত্রে অনুচ্ছেদের শব্দের চেয়ে হাদীসে ব্যবহৃত শব্দই অগ্রগণ্য ও দলিল।

লেখক ২৮ (পৃ: ২২) :
وعند الدارمي ١/٢٨٣ بإسناد صحيح في حديث وَائِلٍ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ يَضَعُ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى قَرِيباً مِنَ الرُّصْغِ .
অর্থাৎ দারিমী র. এক বর্ণনায় সহীহ সনদে ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান হাত বাম হাতের কব্জির কাছে রাখতে দেখেছি। সুনানে দারিমী, ১খ, ২৮৩পৃ।
বিশ্লেষণ ২৮ : উক্ত হাদীসটি থেকে বুঝা যায়, সম্পূর্ণ ডান হাতটি কব্জির উপর ছিল। হাতের তালু নয়। তাছাড়া পূর্বের হাদীসগুলোতে উল্লিখিত যেরা/বাহু শব্দগুলোকে ব্যাখ্যা হিসাবে নিতে হবে। যদি বলা হত, ডান হাতের আঙ্গুলগুলো বাম হাতের কব্জির কাছে ছিল, তাহলে হানাফীদের পক্ষে হাদীসটি দলিল হত। অর্থাৎ এ হাদীসটিতেও হানাফীদের দাবী ‘সালাতে বাম কব্জির উপর ডান হাতের তালু রেখে দু’আঙ্গুল দ্বারা চেপে ধরা সুন্নাত’ – শব্দ ও মর্ম পাওয়া গেল না। কেননা উক্ত শব্দ ও মর্মে কোন সহীহ হাদীস বর্ণিত হয় নি।

ওয়ায়েল (রা)এর আলোচ্য হাদীসে কেবল কব্জির বর্ণনা এসেছে। কিন্তু লেখকের পূর্ববর্তী বর্ণিত ২ নং হাদীসে উক্ত ওয়াইল (রা) থেকেই হাতের পাতা, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে (দ্র: ‘লেখক-২৭’)। যার সমর্থনে সহীহ বুখারী’র যেরা‘র উপর হাত রাখার বর্ণনাও রয়েছে। সুতরাং এ পর্যায়ে দারেমীর আলোচ্য হাদীসটি সংক্ষিপ্ত ও অন্যান্য সহীহ হাদীসের ব্যাখ্যা সাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য।

লেখক ২৯ (পৃ: ২২) :
৩. হযরত হুলব আততাঈ রা. বলেন,
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يؤمنا فيأخذ شماله بيمينه. أخرجه الترمذي (٢٥٢) وابن ماجه (٨٠٩) وابن أبي شيبة (٣٩٥٥) والدارقطني ١/٢٨٥
অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ইমাম হতেন। তিনি ডান হাত দ্বারা বাম হাত চেপে ধরতেন। তিরমিযী শরীফ,হাদীস নং ২৫২; মুসনাদে আহমদের বর্ণনায় আছে, ডান হাত দ্বারা বাম হাতের ধরার বিবরণ দিতে গিয়ে ইয়াহইয়া র. ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রেখেছেন।
বিশ্লেষণ ২৯ : এই হাদীসটিতেও সম্পূর্ণ ডান হাত দ্বারা সম্পূর্ণ বাম হাতকে চেপে ধরার কথা উল্লিখিত হয়েছে। যা বাম যেরা`র উপর ডান যেরা` রাখার পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতেও বাম কব্জির উপর সম্পূর্ণ ডান হাতটি রাখা যায়। যা লেখকের ২ নং-এ উল্লিখিত নাসাঈর বর্ণনাটিতে বিস্তারিত বিবরণে এসেছে (দ্র: ‘লেখক-২৭’)। অথচ হানাফীদের ব্যবহৃত শব্দ তথা ‘আঙ্গুল’, ‘হাতের পাতা/তালূ’র ব্যবহার আলোচ্য হাদীসে নেই। তাই এই হাদীসটিও হানাফীদের পক্ষের দলিল নয়। যদি ডান হাত না বলে ডান হাতের তালুটি বাম হাতের কব্জির উপর রাখার কথা বলা হত, তাহলে তা হানাফীদের সমর্থন করত। কিন্তু এমন কোন সহীহ বর্ণনা নবী (স) থেকে নেই।
লেখকের উল্লিখিত মুসনাদে আহমাদের বর্ণনাটি নিম্নরূপ :
عَنْ قَبِيصَةَ بْنِ هُلْبٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْصَرِفُ عَنْ يَمِينِهِ وَعَنْ يَسَارِهِ وَرَأَيْتُهُ قَالَ يَضَعُ هَذِهِ عَلَى صَدْرِهِ وَصَفَّ يَحْيَى الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى فَوْقَ الْمِفْصَلِ
“ক্বাবীযাহ বিন হুলব তাঁর পিতাা (হুলব আততাঈ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি (রা) বলেন : আমি নবী (স)কে (সালামে) ডান ও বাম দিকে ফিরতে দেখেছি। আর আমি দেখেছি. (বর্ণনাকারী) বলেন : আমি নবী (স)-কে এটি বুকের উপর রাখতে দেখেছি। ইয়াহইয়া বিবরণ দেন : ডান (হাত) বামের সংযোগ স্থলের উপর থাকবে।”
মুহাদ্দিস আব্দুল হক্ব দেহলভী হানাফী (রহ) লিখেছেন :
وھمچنیں روایت کرد ترمذی از قبیضہ بن ھلب ازپدرش کہ گفت دیدم رسول خدا ﷺ کہ می نھاد دست خود را دابر سینہ خود
“ইমাম তিরমিযী ক্ববীযাহ বিন হুলবের মধ্যস্থতায় সাহাবী হুলব তাঈ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি নবী (স)কে দেখেছেন যে, তিনি (স) নিজের হাত বুকের উপর রেখেছিলেন।” (শরহে সফরুস সাআদাত পৃ: ৪৪)
বুঝা গেল, লেখক মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত বুকের উপর রাখার কথাটি গোপন করেছেন। আর ডান হাতটি যখন বাম হাতের কব্জি বা সংযোগ স্থলে থাকে তখন তা স্বাভাবিক ভাবে বুকের উপর বা নিকটে থাকে। এটাও বুঝা গেল, মুহাদ্দিসগণ তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদের বর্ণনাটি পরস্পরের ব্যাখ্যা হিসাবে গণ্য করেছেন। আবার এটার সম্ভাবনাও রয়েছে যে, তাঁরা তিরমিযীর কোন কোন সংস্করণে ‘বুকের উপর’ কথাটি দেখেছেন। যেভাবে মুহাদ্দিস আব্দুল হক্ব দেহলভী বলেছেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
উল্লেখ্য বর্ণনাকারী কাবীযাহ বিন হুলব কিছু মুহাদ্দিসগণের কাছে অপরিচিত হওয়ায় তাঁরা তাঁকে মাজহুল গণ্য করে হাদীসটিকে যঈফ বলেছেন। অথচ ইমাম ইজলী (রহ) তাঁকে সিক্বাহ বলেছেন। ইমাম হিব্বান তাঁর ‘সিক্বাতে’ উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর হাদীস সহীহ গণ্য করেছেন। (মীযানুল ই‘তিদাল ৫/৪৬৬ পৃ:)

লেখক ৩০ (পৃ: ২৩) :
৪. হযরত শাদ্দাদ ইবনে শুরাহবীল রা. বলেন,
رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم قائما يده اليمنى على يده اليسرى قابضا عليها يعني في الصلاة . رواه البزار والطبراني .ذكره الهيثمي في مجمع الزوائد ٢/٢٢٥ وقال: وفيه عباس بن يونس ولم أجد من ذكره ،
অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দন্ডায়মান দেখলাম। তার ডান হাতটি বাম হাতের উপর, তিনি সেটাকে চেপে ধরে আছেন। বাযযার ও তাবারানী এটি উদ্ধৃত করেছেন। (দ্র, মাজমাউয যাওয়াইদ, ২খ, ২২৫ পৃ)
বিশ্লেষণ ৩০ এই হাদীসটির দাবী পূর্বের ‘বিশ্লেষণ -২৭, ২৮ ও ২৯’ এর মত। এখানে ডান হাতের আঙ্গুল বা পাতাকে বাম হাতের কব্জির উপর রাখতে বলা হয় নি। তাই এই হাদীসটিও হানাফীদের বিরুদ্ধে যায়। কেননা তারা আমল করছেন খাস ভাবে ‘আঙ্গুল’ ও ‘তালু’ শব্দের প্রতি। অথচ দলিলটিতে আছে ‘আমভাবে ব্যবহৃত ‘হাত’ শব্দটি। আমরা সালাতের এই সুনির্দিষ্ট অবস্থা ক্ষেত্রে ‘হাতে’র প্রকৃত ব্যাখ্যা হাদীস থেকে পূর্বে উল্লেখ করেছি।
লেখকের উল্লিখিত ‘চেপে ধরে’ বাক্যটির মূল আরবি শব্দ قابض (আঁকড়ে ধরা)। যার দাবী হল, হাতের সম্পূর্ণ মুঠো দ্বারা ধরা। যেমন – আরবি অভিধানে আছে- القبضة – অর্থ : মুঠো, মুঠোভরা বস্তু, মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা (কামূসুল ওয়াহিদ)। যার দাবী পাঁচটি আঙ্গুলসহ হাতের তালুর ব্যবহার। পক্ষান্তরে হানাফীগণ উক্ত কব্জা বা আঁকড়ে থাকার আমলটি করে থাকে দু’টি আঙ্গুল দ্বারা কব্জিকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে। যা কখনই মজবুতভাবে আঁকড়ে থাকার অর্থে প্রয়োগযোগ্য নয়। বরং শব্দটি সম্পূর্ণ পাঁচ আঙ্গুল দ্বারা আঁকড়ে থাকার দাবী করে।
যখন হাতের অর্থ যেরা‘ বা বাহু। তখন ডান হাত বাম হাতের উপর রাখার অর্থ হবে – ডান হাতের বাহুকে বাম হাতের বাহু দ্বারা আকড়ে থাকা। এমতাবস্থায় উক্ত কব্জা করা তথা হাতকে চেপে ধরার দাবী পূরণ হবে। যেমন রুকু’তে হাত দ্বারা হাটু কব্জা তথা আঁকড়ে থাকার কথা বর্ণিত হয়েছে।
ثم ركع فوضع يديه على ركبتيه كأنه قابض عليهما ووتر يديه فنحاهما عن جنبيه
“নবী (স) রুকু‘ করলেন এবং দুই হাত দুই জানুর উপর রাখলেন যেন দু’টিকে কব্জা করলেন (আঁকড়ে ধরলেন), তিনি দুই হাতকে কিছুটা বাঁকা করে পার্শ্বদেশ থেকে পৃথক রাখলেন।” (আবূ দাউদ, মিশকাত ২/৭৪৫ নং)
এখানে হাত বলতে, হাতের তালু থেকে কনুই পর্যন্ত অংশ। বুঝা গেল কব্জা করে হাত ধরার মধ্যে হানাফীদের পক্ষে কোন দলিল নেই। কেননা তাদের আমল হল দুই আঙ্গুল দিয়ে কব্জি ধরা। অথচ আলোচ্য হাদীসে সম্পূর্ণ বাম হাতকে কব্জা বা আঁকড়ে ধরতে বলা হয়েছে।

লেখক ৩১ (পৃ: ২৩) :
৫. হযরত জারীর আদ্দাব্বী বলেন,
كان علي إذا قام في الصلاة وضع يمينه على رسغه .أخرجه ابن أبي شيبة (٣٩٦١) موصولا والبخاري قبل حديث رقم ١١٩٨ تعليقا. كتاب العمل في الصلاة ، باب إستعانة اليد في الصلاة الخ
অর্থ: হযরত আলী রা. যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন তার ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রাখতেন।
মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৩৯৬১; বুখারী শরীফ, ১১৯৮নং হাদীসের এর পূর্বে। এ হাদীসটির সনদ সহীহ।
বিশ্লেষণ ৩১ : এই হাদীসটির দাবী পূর্বের ‘বিশ্লেষণ -২৭, ২৮ ও ২৯’ এর মত। উল্লেখ্য যে, হাদীসটি থেকে ডান হাত বলতে ডান হাতের তালুকে সুনির্দিষ্ট করার কোন প্রমাণ নেই। তাছাড়া প্রথমে উল্লিখিত সহীহ বুখারী ও আবূদাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে খুযায়মা’র বিস্তারিত বিবরণ তথা ডান হাতটি বাম হাতের যেরা কিংবা হাতের তালুর পিঠ, কব্জি, বাহুর উপর রাখার বর্ণনা সুস্পষ্ট। এ কারণে আলোচ্য বর্ণনাটি সংক্ষিপ্ত তথা কেবল কব্জির বর্ণনা বিশিষ্ট। এ পর্যায়ে হাদীসটি বিস্তারিত হাদীসের ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী এবং বর্ণনাটি হানাফীদের বিরোধী।

লেখক ৩২ (পৃ: ২৩) :
এসব হাদীসের কোন কোনটি থেকে বুঝা যায়, রসূলুল্লাহ (স) বাম হাতের উপর ডান হাত রাখতেন। আর কোন কোনটি থেকে বুঝা যায়, তিনি ডান হাত দ্বারা বাম হাত চেপে ধরতেন। বাম হাতের কোন জায়গা চেপে ধরতেন? অধিকাংশ হাদীসই প্রমাণ করে, বাম হাতের কব্জি চেপে ধরতেন।
বিশ্লেষণ ৩২ : আমরা জেনেছি সহীহ মুসলিমে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখার কথা এসেছে। সহীহ বুখারীতে ডান হাতটি বাম হাতের যেরা‘ তথা কনুই থেকে আঙ্গুল পর্যন্ত অংশের উপর রাখার বর্ণনা এসেছে। তাছাড়া হাদীসে কেবল হাত বলতেও যেরা‘র অংশটিকে গণ্য করা হয়েছে। সহীহ আবূদাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে খুযায়মা’র হাদীসটিতে ডান হাতটি বাম হাতের পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার কথা বর্ণিত হয়েছে। যার প্রতিটিতে হাত রাখার ধরণ সুস্পষ্ট। লেখক ঐ শব্দগুলো বর্ণনা করা সত্ত্বেও তা এখন আলোচনা প্রসঙ্গে উপেক্ষা করলেন।
পক্ষান্তরে কেবল কব্জি’র বর্ণনাগুলো পূর্বোক্ত সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, ও আবূদাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে খুযায়মা’র বর্ণনাগুলো থেকে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত। লেখক কেবল ঐ সংক্ষিপ্ত কব্জি সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোর কথা উল্লেখ করলেন। যা মূলত পূর্বোক্ত বর্ণনাগুলোর ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী।

লেখক ৩৩ (পৃ: ২৩) :
এসব হাদীসের মধ্যে সমন্বয় করে চার মাযহাবের আলিমগণ সেই পদ্ধতিকেই অবলম্বন করেছেন যেভাবে হানাফী মাযহাবের অনুসারীগণ আমল করে থাকেন।
বিশ্লেষণ ৩৩ : অথচ হানাফী মাযহাবে সম্পূর্ণ ডান হাত বা বাহুর (যেরা‘র) ব্যবহার হয় না। বরং ডান হাতের অংশবিশেষ তথা তালু ও আঙ্গুল শব্দগুলোর ব্যবহার ও আমল সর্বাধিক। হানাফীদেরে এই শব্দগুলো পূর্বোক্ত হাদীসগুলোতে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। তাছাড়া পূর্বোক্ত প্রতিটি হাদীসে ডান হাতটিকে আংশিকভাবে উপস্থাপন করা হয় নি। যেমন বলা হয় নি – ডান হাতের তালু, আঙ্গুল প্রভৃতি শব্দ । অথচ লেখকের পরবর্তী মাযহাবী আলেমদের উদ্ধৃতিগুলোর কয়েকটিতে ডান হাতের তালু ও আঙ্গুলের ব্যবহার পাওয়া যাবে। যা সহীহ হাদীসের মধ্যে যঈফ ও মুনকার হাদীসের ব্যাখ্যার মাধ্যমে অতিরিক্ত সংযোজন। তাছাড়া পূর্বোক্ত সহীহ হাদীসগুলোর বিরোধী বিধায় পূর্ণাঙ্গ ডান হাতের ব্যাখ্যার বিকৃতিই বটে। কেননা ডান হাতটি হাদীসে আংশিকভাবে উপস্থাপিত হয় নি। আমরা ইতঃপূর্বে সালাতের মধ্যে হাতের ব্যাখ্যা কি হবে, তা নবী (স)এর হাদীস থেকে প্রমাণ করেছি। সুতরাং নবী (স)এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার মোকাবেলায় অন্যদের ব্যাখ্যা বিকৃত ও মনগড়া হওয়ায় পরিত্যাজ্য। তাছাড়া লেখকের দেয়া পরবর্তী ছয়টি উদ্ধৃতির মধ্যে শেষ তিন’টি (ইমাম নববী, হাফেয ইবনে হাজার ও ইমাম শওকানী রহ.এর ) উদ্ধৃতি হুবহু আমাদের উপস্থাপনাকে সমর্থন করে এবং লেখকের দাবীকে খণ্ডন করে। তাছাড়া আমাদের পক্ষাবলম্বনকারী উদ্ধৃতি তিন’টিতে উক্ত ইমামগণ কর্তৃক নিজের পক্ষ থেকে কোন কিছু সংযোজন করা হয় নি। বরং হুবহু পূর্বোক্ত হাদীসগুলোর শাব্দিক দাবীকেই প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

লেখক ৩৪ (পৃ: ২৩২৪) :
হালবী র. মুনয়াতুল মুসল্লী এর ভাষাগ্রন্থে লিখেছেন,
السنة أن يجمع بين الوضع والقبض جمعا بين ما ورد فى الأحاديث المذكورة إذ في بعضها ذكر الأخذ وفي بعضها ذكر وضع اليد وفي البعض وضع اليد على الذراع فكيفية الْجمع أن يضع الكف اليمينى على الكف اليسرى ويحلق الإبْهام والخنصر على الرسغ ويبسط الأصابع الثلاث على الذراع فيصدق أنه وضع اليد على اليد وعلى الذراغ وأنه أخذ شماله بيمينه اهـــــــ
অর্থাৎ উল্লিখিত হাদীসগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনকল্পে সুন্নত হলো হাত রাখা ও বাঁধা দু’টির উপরই একসঙ্গে আমল করা। কারণ কিছু হাদীসে চেপে ধরার কথা এসেছে। কিছু হাদীসে হাতকে হাতের উপর রাখার কথা এসেছে। এগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের পদ্ধতি হলো, ডান হাতের তালু বাম হাতের পিঠের উপর রাখবে, বৃদ্ধাঙ্গুলি ও কনিষ্ঠা আঙ্গুলি দ্বারা কব্জি চেপে ধরবে, আর বাকি তিন আঙ্গুল বাহুর উপর বিছিয়ে দিবে। তাহলে হাতের উপর হাত রাখা, বাহুর উপর হাত রাখা এবং ডান হাত দ্বারা বাম হাত চেপে ধরা, সবগুলো হাসিল হবে।
বিশ্লেষণ ৩৪ : সম্মানিত পাঠক! লক্ষ্য করুন।
ক) হাদীসে হাতের উপর হাত রাখা ও হাত আঁকড়ে থাকার বর্ণনা এসেছে। অর্থাৎ দু’ভাবেই বৈধ। অথচ উক্ত উদ্ধৃতিটিতে সমন্বয়ের নামে নবী (স) ও সাহাবীদের থেকে প্রাপ্ত উন্মুক্ত শব্দগুলোকে নিজস্ব চিন্তাতে সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
খ) পূর্বোক্ত হাদীসগুলোতে আঙ্গুল শব্দের কোন ব্যবহার নেই। উক্ত উদ্ধৃতিটিতে আঙ্গুল ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নবী (স) ও সাহাবীদের (রা) থেকে আসে নি। সুতরাং তা বিদ‘আত। (দেখুন : শায়েখ আলবানী’র, ‘সিফাতে সালাত’- হাত বাঁধা সম্পর্কিত অনুচ্ছেদ]
গ) দু’টি আঙ্গুল দ্বারা কব্জি চেপে ধরা ও বাকী তিনটি আঙ্গুল হাতের যেরা‘র বা বাহুর উপর রাখার বিষয়টি প্রকারান্তরে খাস বা সুনির্দিষ্ট বিধান। অথচ উসূল হল খাস আমলের জন্য খাস দলিল প্রয়োজন। অথচ লেখকের পূর্বের বা পরের কোন হাদীসেই দু’টি ও তিনটি আঙ্গুলের স্বতন্ত্র কোন ব্যবহার পাওয়া যাবে না। ফলে দলিলহীনতার কারণে উক্ত আমলটি বাতিল।
) হানাফীদের মূল বিধান সম্বলিত আবূ দাউদের হাদীসটি যঈফ। যার দাবী হল وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ তালুর উপরে তালু বিছিয়ে দেয়া। যদি আপনি সঠিক পন্থায় তালুর উপর তালু রাখেন তাহলে বৃদ্ধা ও কনিষ্ঠা আঙ্গুল দ্বারা কব্জি ধরতে পারবেন না। পক্ষান্তরে দুটি আঙ্গুল দ্বারা কব্জি ধরতে গেলে আপনার ডান হাতের তালুটি বাম হাতের তালুর পিঠের অংশটির প্রায় অর্ধেক অগ্রসর হবে । সুতরাং তালুর উপর তালু রাখার সঠিক আমলটিও সম্ভব হয় না।
ঙ) আমরা পূর্বে প্রমাণ করেছি, সালাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘যেরা’ ও ‘হাত’ পরিপূরক শব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ পন্থায় একটি হাত বা হাতের যেরা‘ অপর হাত বা হাতের যেরা‘র উপর রাখলে হাতের পাতা, কব্জি ও যেরা বা বাহুর উপর হাত রাখা এবং পাঁচ আঙ্গুল দিয়ে কব্জা করা বা আঁকড়েও ধরা যায়। হাতকে হাতের উপর রাখার বা ধরার ব্যাপার আঙ্গুল সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকাই যে কয়টি আঙ্গুল মানুষের থাকা স্বাভাবিক সেই কয়টি আঙ্গুল অপর হাতের উপর থাকবে বা অপর হাতকে চেপে ধরবে। কব্জা করে ধরা বা আঁকড়ে ধরার উদাহরণ সালাতের ভিতর অপর একটি স্থানের বর্ণনা থেকে সুস্পষ্ট হয়। বর্ণনাটি নিম্নরূপ :
আবূ হুমায়েদ সাঈদী (রা) বলেন :
ثم ركع فوضع يديه على ركبتيه كأنه قابض عليهما ووتر يديه فنحاهما عن جنبيه
“নবী (স) রুকু‘ করলেন এবং দুই হাত দুই জানুর উপর রাখলেন যেন দু’টিকে আঁকড়ে ধরলেন, তিনি দুই হাতকে কিছুটা বাঁকা করে পার্শ্বদেশ থেকে পৃথক রাখলেন।” (আবূ দাউদ, মিশকাত ২/৭৪৫ নং)
এখন লেখকের উল্লিখিত হাত চেপে ধারা ৪ নং হাদীসটি পুণরায় পড়ুন :
رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم قائما يده اليمنى على يده اليسرى قابضاعليها يعني في الصلاة . رواه البزار والطبراني .ذكره الهيثمي في مجمع الزوائد ٢/٢٢٥ وقال: وفيه عباس بن يونس ولم أجد من ذكره ،
অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দন্ডায়মান দেখলাম। তার ডান হাতটি বাম হাতের উপর, তিনি সেটাকে চেপে ধরে আছেন। বাযযার ও তাবারানী এটি উদ্ধৃত করেছেন। (দ্র, মাজমাউয যাওয়াইদ, ২খ, ২২৫ পৃ)
বুঝা গেল চেপে ধরার বিষয়টি দুই আঙ্গুলে দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যায় না। কেননা এখানে চেপে ধরা বা কব্জা করার প্রক্রিয়াটি উন্মুক্ত। অর্থাৎ ডান হাতটি বাম হাতটিকে চেপে ধরতে সম্পূর্ণ আঙ্গুলগুলোর ব্যবহার উন্মুক্ত। যা যেরা‘ আঁকড়ে ধরার চিত্রকে সামনে রাখলে বাস্তব রূপ লাভ করে।
আসলে হানাফী মাযহাবে হাদীস থেকে হাদীস ব্যাখ্যা না নিয়ে নিজেদের ইচ্ছামত সমন্বয় করা হয়েছে। ফলে নিজেদের তালুর উপর তালু রাখার হাদীসের উপর আমল করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। বরং তালুর পিঠের খানিকটা বাদ দিয়ে তালুর হাদীসের উপর অপসমন্বয় করে আমল করা হয়েছে। কেননা দুই আঙ্গুল দিয়ে কব্জি ধরলে ডান হাতের তালুটি হুবহু বাম হাতের তালুর উপর রাখা হয় না। বরং অনেক খানিক সামনে অগ্রসর হয়।

লেখক ৩৫ (পৃ: ২৪) :
লক্ষ্য করুন, হানাফী আলিমগণ কিভাবে হাদীসগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে সবগুলো অনুসারে আমল করতে বলেছেন? একেই বলে হাদীসের অনুসরণ! এঁরাই প্রকৃত আহলে হাদীস। যারা একটি হাদীস নিয়ে অন্যগুলো উপেক্ষা করে তারা আহলে হাদীস হতে পারেনা।
বিশ্লেষণ ৩৫ পূর্বের বিশ্লেষণে আমরা প্রমাণ করেছি হানাফীগণ হাদীসগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে পারেন নি। বরং যঈফ ও মুনকার হাদীস এবং নিজেদের চিন্তার দ্বারা সমন্বয়ের নামে সহীহ হাদীসের বিকৃতি করেছেন।

লেখক ৩৬ (পৃ: ২৪) :
ইমাম মালিক র. এর প্রসিদ্ধ মত হলো ফরজ নামাযে হাত বাঁধবেনা, ছেড়ে রাখবে। সুন্নাত ও নফল নামাযে হাত বাঁধবে। হাত বাঁধলে কিভাবে বাঁধবে? আল্লামা উব্বী মালেকী র. মুসলিম শরীফের ভাষ্যগ্রন্থে লিখেছেন,
واختار شيوحنا أن يقبض بكف اليمنى على رُسْغ اليسرى ، واختار بعضهم مع ذلك ان بكون السبابة والوسطى ممتدين على الذراع
অর্থাৎ আমাদের শায়েখগন বলেছেন, ডান হাত দ্বারা বাম হাতের কব্জি চেপে ধরবে। কেউ কেউ একথাও যোগ করেছেন, শাহাদত ও মধ্যমা আঙ্গুলি যেন বাহুর উপর থাকে। (২খ, ২৭৮ পৃ:)
বিশ্লেষণ ৩৬ : ইমাম মালেকের ‘মুয়াত্তা’-এ সহীহ বুখারীর যেরা‘ শব্দযুক্ত হাত বাঁধার হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া অধিকাংশ মালেকীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য আমলটি হল হাত বাঁধা। (আল-ফিক্বহুল ইসলামি ও আদিল্লাতাহু ২/৬৩ পৃ:)
লেখকের শেষোক্ত উদ্ধৃতিটি মেনে নিলেও এটাই বলতে হয় – উক্ত শব্দে কোন হাদীস বর্ণিত না হওয়ায় উক্ত মন্তব্যটি সঠিক নয়। যার জবাব পূর্বের বিশ্লেষণটির মত। তাছাড়া সহীহ হাদীসগুলো সুস্পষ্টভাবে ডান হাতটি বাম হাতের যেরা‘ তথা তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার কথা বলা হয়েছে। এখন ডান হাতটি ‘আম শব্দে ব্যবহৃত হওয়ায় যেভাবে সেটি রাখলে বাম হাতের যেরা‘ তথা তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখা হবে –সেটিই হল হাদীসের প্রতি আমল। এখানে অন্যকারো সমন্বয়ের মুখাপেক্ষী হওয়ার মত অস্পষ্টতা নেই। আর যে কোন মানুষের থেকে নবী (স) স্পষ্টভাবে আমাদেরকে কাছে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর (স) কথার মধ্যে কোন সমস্যা বা জটিলতা নেই।

লেখক ৩৭ (পৃ: ২৪২৫) :
শাফেয়ী মাযহাব সম্পর্কে ইমাম নববী র. তার ‘আররাওজাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন,
السنة ووضع اليمنى على اليسرى، فيقبض بكفه اليمنى، كوع اليسرى، وبعض رسغها، وساعدها ۱\۳۳۹
অর্থাৎ সুন্নাত হলো ডান হাত বাম হাতের উপর এভাবে রাখবে যে, ডান হাতের তালু দ্বারা বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির গোড়ার হাড়, কব্জির কিছু অংশ এবং বাহু চেপে ধরবে। (২খ, ৩৩৯ পৃষ্ঠা)
বিশ্লেষণ ৩৭ : লেখক এই উদ্ধৃতিটি কিছুটা সংক্ষিপ্ত করে উল্লেখ করেছেন। এ কারণে السنة শব্দের পরে …. রাখা উচিত ছিল। প্রকৃত বাক্যটি হবে :
السنة بعد التكبير، حط اليدين، ووضع اليمنى على اليسرى، فيقبض بكفه اليمنى، كوع اليسرى، وبعض رسغها، وساعدها
“তাকবীরের পরে সুন্নাত : দুই হাত নামাতে হবে। আর ডান হাত …..(লেখকের উল্লিখিত অংশ)।”
অতঃপর ইমাম নববী (রহ) অপর একজন ইমামের উদ্ধৃতি দ্বারা উক্ত বক্তব্যটি ব্যাখ্যা করার পরে লিখেছেন :
ثم يضع يديه كما ذكرنا تحت صدره، وفوق سرته، على الصحيح. وعلى الشاذ تحت سرته
“অতঃপর হাত দু’টি সেভাবে রাখতে হবে যেভাবে আমার উল্লেখ করেছি বুকের নিচে ও নাভীর উপরে রাখা সহীহ। আর নাভীর নিচে রাখা শায (সহীহর বিরোধী) ।”
পাঠক লক্ষ্য করুন, ইমাম নববী (রহ) ডান হাতের তালু ব্যবহার করেছেন। অথচ সহীহ একটি হাদীসেও ডান হাতের তালু শব্দটি ব্যবহৃত হয় নি। কিন্তু বাম হাতের যে অংশগুলো তিনি (রহ) উল্লেখ করেছেন – তা হুবহু সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এই মর্মে বর্ণিত সহীহ হাদীসটির অপর একটি সাক্ষ্য সহীহ বুখারীর বর্ণনা। যেখারে ডান হাতটি বাম যেরা‘র উপর রাখার কথা বর্ণিত হয়েছে। উভয় হাদীস সামনে রাখলে ইমাম নববী কর্তৃক ডান হাত না বলে ডান হাতের তালু বলাটা হাদীস বহির্ভূত শব্দ বিধায় পরিত্যাজ্য। তাছাড়া নাভীর নিচে হাত বাঁধার হাদীসকে শায বলার মাধ্যমে ইমাম নববী হানাফীদের নিয়মটিকে বাতিল করেছেন।
সুস্পষ্ট হল, ইমাম নববীর বক্তব্যের মধ্যে হানাফীদের পদ্ধতির কোন সমর্থন নেই। তাছাড়া ইমাম নববী (রহ)-এর নিকট বুকের নিচে, নাভীর উপরে এবং বুকের উপরে একই অর্থবোধক। যেমন – তিনি সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যা গ্রন্থে লিখেছেন :
وفي المسألة أحاديث كثيرة ودليل وضعهما فوق السرة حديث وائل بن حجر قال: (صليت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم ووضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره”. رواه ابن خزيمة في صحيحه. وأما حديث علي رضي الله عنه أنه قال: (من السنة في الصلاة وضع الأكف على الأكف تحت السرة” ضعيف متفق على تضعيفه، رواه الدارقطني والبيهقي من رواية أبي شيبة عبد الرحمن بن إسحاق الواسطي وهو ضعيف بالاتفاق
“এই মাসআলাটিতে অসংখ্য হাদীস ও দলিল রয়েছে যে, নাভির উপরে (হাত) বাঁধতে হবে। ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা) বলেন : ‘আমি রসূলুল্লাহ (স)এর সাথে সালাত পড়েছি। তিনি ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর রাখলেন।’ হাদীসটি ইবনে খুযায়মাহ তাঁর ‘সহীহ’তে বর্ণনা করেছেন। পক্ষান্তরে আলী (রা) থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন : ‘সালাতে সুন্নাত হল, তালু রাখবে তালুর উপরে নাভির নিচে।’ হাদীসটি ঐকমত্যে যঈফ হাদীসটির দুর্বলতার কারণে। এটি বর্ণনা করেছেন দারা কুতনী। আর বায়হাক্বী বর্ণনা করেছেন আবী শায়বাহ থেকে (বর্ণনাকারী) আব্দুর রহমান বিন ইসহাক্ব ওয়াসিতী’র মাধ্যমে। আর তিনি ঐকমত্যে যঈফ।” [শরহে মুসলিম নববী –কিতাবুস সালাত باب وضع يده اليمنى على اليسرى بعد تكبيرة الإحرام تحت صدره فوق سرته، ….. (অনুচ্ছেদ : তাকবীরে তাহরীমার পরে ডান হাত বাম হাতের উপর থাকবে বুকের নিচে নাভীর উপরে…..)]

সম্মানিত পাঠক! উপরের প্রতিটি বাক্য ভালভাবে পড়ুন। যা থেকে বুঝা যাচ্ছে – ইমাম নববী (রহ)এর কাছে বুকের উপর হাত রাখার দলিলটিই বুকের নিচে ও নাভীর উপরে হাত রাখা। আরো লক্ষ্য করুন! যখন ডান হাতটি বাম হাতের যেরা‘র উপর সমান্তরালভাবে রাখা হয় তখন দু’টি হাতের কনুই বরাবর তা সমান্তরাল হয়। যা সহীহ বুখারীর হাদীসটির মূলদাবী। আর এভাবে হাত বাঁধা হলে ঐ হাত বাঁধাকে বুকের উপর, বুকের নিচে ও নাভীর উপর সবরকম অর্থ ও ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে। অর্থাৎ ইমাম নববী (রহ)এর দেখানো পদ্ধতিটি হানাফীদেরকে খণ্ডন করে এবং এর সূক্ষ্ম পর্যালোচনা বুকের উপর বা নিকটে হাত বাঁধার অবস্থাকে সমর্থন করে। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক্ব দিন।

লেখক ৩৮ (পৃ: ২৫) :
হাম্বলী মাযহাব সম্পর্কে ইবনে মানসূর আল হাম্বালী র. আররাওযুল মুরবি গ্রন্থে লিখেছেন,
ثم يقبض كوع يسراه ويجعلهما تحت سرته اﻫـــــ ۱\۱٦۵ وكذا في الإنصاف للمرداوى ۲\٤۵ والفروع لابن مفلح ۱\۳۲۱
“অর্থাৎ অতঃপর বাম হাতের কব্জি ডান হাত দ্বারা চেপে ধরবে। এবং নাভির নীচে রাখবে। (১খ, ১৬৫ পৃ:); মারদাবী র. আল ইনসাফ গ্রন্থে (২/৪৫) ও ইবনে মুফলিহ র. আল ফুরু’ গ্রন্থে (১/৩৬১) একই কথা বলেছেন।

বিশ্লেষণ ৩৮ উক্তিটি কেবল কব্জি ব্যবহার সম্পর্কিত সংক্ষেপে বর্ণিত হাদীসের অনুসরণ। উক্ত উদ্ধৃতির মাধ্যমে যেরা‘র বর্ণনাযুক্ত সহীহ বুখারীর বর্ণনার উপর আমল বাদ পড়ছে। আবূদাউদ-নাসাঈ- ইবনে খুযায়মাহতে ব্যবহৃত বাম হাতের পাতার পিঠ-কব্জি-বাহুর উপর ডান হাতটি স্থাপন করার হাদীসটির উপর আমল করাও সম্ভব হচ্ছে না। আলী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে : فِى الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ “সালাতে তালুর উপরে তালু বিছিয়ে দেয়া, নাভীর নীচে।” কিছুক্ষণ আগে ইমাম নববী কর্তৃক বর্ণনাটিকে সর্বসম্মতভাবে যঈফ বলা হয়েছে। সুতরাং আলোচ্য উদ্ধৃতির কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই।

লেখক ৩৯ (পৃ: ২৫) :
লক্ষ্য করুন, পৃথিবীর অধিকাংশ আলিম-ওলামার মত কি, আর লা-মাযহাবী ভাইয়েরা কি করেন?
বিশ্লেষণ ৩৯ : লেখক যেসব উদ্ধৃতি দিয়েছেন তার অধিকাংশই সহীহ হাদীসের বিরোধী। অথচ লেখক তাকে হাদীসের মধ্যে সমন্বয় হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম নববী (রহ)এর উদ্ধৃতিটি লেখকের বিপক্ষে যায়। এটাই আমরা লক্ষ্য করলাম।
লা-মাযহাব অর্থ লা-দ্বীন। অর্থাৎ যার কোন দ্বীন নেই। অথচ আমরা কুরআন ও সহীহ হাদীস মানছি – আর এটাই দ্বীনুল ইসলাম। পক্ষান্তরে মাযহাবী হিসাবে পরিচিতরা কুরআন ও সহীহ হাদীসকে বিকৃত করে নিজেদের মনগড়া সমন্বয়কে দ্বীন হিসাবে মেনে থাকে। মূলত এটাই তাদেরকে দ্বীন ইসলাম থেকে দূরে রাখছে।

লেখক ৪০ (পৃ: ২৫) :
যে হাদীসটির কারণে তারা বাম হাতের কনুই পর্যন্ত ডান হাত বিস্তার করে দেন সেটি বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হয়েছে। এখানে ১নং দলিলে সেটি আমরা উল্লেখ করেছি। ঐ হাদীসটি সম্পর্কে বুখারী শরীফের বিখ্যাত ভাষ্যকার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী র. ফতহুল বারী গ্রন্থে বলেছেন,
أبهم موضعه من الذراع وفي حديث وائل عند أبي داود والنسائي ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد وصححه بن خزيمة وغيره وسيأتي أثر على نحوه في أواخر الصلاة
অর্থাৎ বাহুর কোন জায়গায় রাখতেন সেটা এই হাদীসে অস্পষ্ট। আবূ দাউদ ও নাসাঈ বর্ণিত ওয়াইল রা. এর হাদীসে বলা হয়েছে : অতঃপর তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখলেন। ইবনে খুযায়মা র. প্রমুখ এটিকে সহীহ বলেছেন। সালাত অধ্যায়ের শেষ দিকে হযরত আলী রা. এর অনুরূপ আছার (হাদীস) এর উল্লেখ আসছে। (২খ, ২৭৫ পৃ:)
বিশ্লেষণ ৪০ : লেখকের দেয়া উদ্ধৃতি থেকে বুঝা যাচ্ছে, ইবনে হাজার (রহ) সহীহ বুখারীর যেরা‘র বা বাহুর অর্থটির চাইতে বামে হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখাকে বেশী স্পষ্ট ও ব্যাখ্যা হিসাবে গ্রহণ করেছেন। কেননা কেবল ‘বাহু’ বললে প্রশ্ন থেকে যায় এটা বাহুর পিঠ হবে না পেট হবে!? ফলে যখন ‘বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহু’ কথাটি ব্যাখ্যা হিসাবে আসে তখন বুঝা যায় যেরা‘র পিঠ হবে পেট হবে না।
এখন আমরা জানব কনুই পর্যন্ত অর্থটি গ্রহণযোগ্য কি না? যা আমরা হাদীস থেকে হাদীসের ব্যাখ্যা দ্বারা বুঝতে পারব। নিচের হাদীস থেকে প্রমাণিত হবে, যেরা এবং হাত একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
ক) বারা ইবনে আযেব (রা) বলেন, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :
إِذَا سَجَدْتَ فَضَعْ كَفَّيْكَ وَارْفَعْ مِرْفَقَيْكَ
“যখন তুমি সাজদা করবে তোমার তালু জমিনে রাখবে এবং উভয় কুনই উঠিয়ে রাখবে।” [সহীহ মুসলিম, মিশকাত ২/৮২৯ নং]
খ) আনাস (রা) বলেন : রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :
اعْتَدِلُوا فِي السُّجُودِ وَلَا يَبْسُطْ أَحَدُكُمْ ذِرَاعَيْهِ انْبِسَاطَ الْكَلْبِ
“সাজদা ঠিকভাবে করবে এবং তোমাদের কেউ যেন (সাজদাতে) কুকুরের ন্যায় যেরা‘ (বাহু) বিছিয়ে না দেয়।” [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত ২/৮২৮, অনুরূপ আয়েশা (রাা) থেকে ২/৭৩৫]
বুঝা গেল কনুইয়ের সাথে যেরা‘র সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া পূর্বে প্রমাণ করেছি হাত ও যেরা‘ শব্দটি পরিপূরক হিসাবে সালাতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং হাতের উপর হাত রাখা বলতে যেরা‘র উপর যেরা রাখা অর্থ সহীহ ও গ্রহণযোগ্য। যার মধ্যে হাতের কনুই, তালুর পিঠ ও কব্জিও অন্তর্ভুক্ত। এখন যেরা‘র উপর হাত রাখার পদ্ধতি কেমন হবে – সেটা যদি কারো বুঝে না আসে বা অস্পষ্ট থাকে। তাহলে সেটা তার নিজস্ব অক্ষমতা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
এখন আমরা জানব লেখক ‘ফতহুল বারী’র উদ্ধৃতিটিতে কি কি গোপন করলেন। পূর্ণাঙ্গ উদ্ধৃতিটি নিম্নরূপ :
أبهم موضعه من الذراع وفي حديث وائل عند أبي داود والنسائي ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد وصححه بن خزيمة وغيره وأصله في صحيح مسلم بدون الزيادة والرسغ بضم الراء وسكون السين المهملة بعدها معجمة هو المفصل بين الساعد والكف وسيأتي أثر على نحوه في أواخر الصلاة ولم يذكر أيضا محلهما من الجسد وقد روى بن خزيمة من حديث وائل أنه وضعهما على صدره والبزار عند صدره وعند أحمد في حديث هلب الطائي نحوه وهلب بضم إلها وسكون اللام بعدها موحدة وفي زيادات المسند من حديث على أنه وضعهما تحت السرة وإسناده ضعيف
“বাহুর কোন জায়গায় রাখতেন সেটা এই হাদীসে অস্পষ্ট। আবূ দাউদ ও নাসাঈ বর্ণিত ওয়াইল রা. এর হাদীসে বলা হয়েছে : অতঃপর তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখলেন। ইবনে খুযায়মা র. প্রমুখ এটিকে সহীহ বলেছেন। এর মূল বর্ণনাটি সহীহ মুসলিমে আছে তবে বাহু কথাটি ছাড়া। الرسغ-এর ‘রা’ এ পেশ, সিনে সাকিন, শেষে হরকতবিহীন। এটা বাহু ও হাতের পাতার সযোগস্থল (তথা কব্জি) । সালাত অধ্যায়ের শেষ দিকে হযরত আলী রা. এর অনুরূপ আছার (হাদীস) এর উল্লেখ আসছে। এখানে এটাও উল্লিখিত হয় নি যে, শরীরের কোথায় হাতটি থাকবে। তবে ইবনে খুযায়মাহ ওয়ায়েল (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন বুকের উপর থাকবে। বাযযর বর্ণনা করেছেন বুকের নিকট। আর আহমাদ বর্ণনা করেছেন হুলব তাঈ থেকে, এখানে হুলবের ‘হা’-এ পেশ, ‘লাম’-এ সাকিন ও শেষে তানবীন। মুসনাদে আহমাদে অতিরিক্ত আছে আলী (রা)এর হাদীস। তিনি তাঁর দু’টি হাত নাভীর নিচে রাখতেন। এর সনদ যঈফ।” (ফতহুল বারী)
বুঝা গেল, ইবনে হাজার (রহ) যা সংশয় সৃষ্টি হতে পারে সেটাকে আরো সুস্পষ্ট করতে চেয়েছেন। তিনি বুকের উপর বা বুকের নিকটে হাত রাখার বর্ণনা দ্বারা এবং যেরা’র অধিকতর স্পষ্টতার জন্য এরই বিভিন্ন অংশগুলোকে ভাগ করে দেখানো বর্ণনাগুলোর মাধ্যমে যে কোন সংশয়ের মূলোৎপাটন করেছেন। সাথে সাথে এটাও বলেছেন, নাভীর নিচে হাত বাঁধার হাদীস যঈফ। সুস্পষ্ট হল, ইবনে হাজার (রহ)এর বক্তব্য আমাদেরকে সমর্থন করে এবং লেখকের দাবী ও উদ্দেশ্যকে খণ্ডন করে। অথচ লেখক সংক্ষেপে উদ্ধৃতি দিয়ে পাঠককে বিভ্রান্ত করেছেন।

লেখক ৪১ (পৃ: ২৬) :
আল্লামা শওকানীও (যিনি কোন মাযহাবের অনুসারী ছিলেননা) নায়লুল আওতার গ্রন্থে বলেছেন,
قوله (على ذراعه اليسرى) ابهم هنا موضعه من الذراع وقد بينته رواية احمد وأبى داود فى الحديث الذى قبل هذا. وقال تحت الحديث الذى قبله : والمراد أنه وضع يده اليمنى على كف يده اليسرى ورسغها وساعدها. ولفظ الطبرانى : (وضع يده اليمنى على ظهر اليسرى في الصلاة قريبا من الرسغ) ۲\۱٨۷
অর্থাৎ হাদীস শরীফে যে বলা হয়েছে “বাম বাহুর উপরে’ বাহুর কোন জায়গায় তা এখানে অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। আহমাদ ও আবূ দাউদ শরীফে বর্ণিত পূর্বের হাদীসটিতে তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

আহমাদ ও আবূ দাউদ বর্ণিত পূর্বের হাদীসটি আলোচনা প্রসঙ্গে আল্লামা শওকানী বলেছেন, এর মর্ম হলো তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রেখেছেন। তাবারানী র. এর বর্ণনায় এসেছে: তিনি নামাযে তাঁর ডান হাত বাম হাতের পিঠের উপর কব্জির কাছে রেখেছেন। (২খ, ১৮৭ পৃ)
এসব থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, লা-মাযহাবী ভাইয়েরা হাদীসটির ভুল অর্থ বুঝে কনুই পর্যন্ত হাত বিস্তার করে থাকেন।
বিশ্লেষণ ৪১ : লেখক উদ্ধৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে ইমাম শওকানী (রহ)এর পূর্বের বর্ণনা পরে এবং পরের বর্ণনা পূর্বে উল্লেখ করেছেন। যা বাংলা ভাষায় দু’টি প্যারাতে বিভক্ত। ইমাম শওকানী (রহ) নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীস সম্পর্কে ইমাম আবূ দাউদ, ইমাম আহমাদ, ইমাম বুখারী ও ইমাম নববীর সূত্রে যথাক্রমে যঈফ, আপত্তিযুক্ত ও সবসর্মত যঈফ হিসোবে চিহ্নিত করেছেন। অতঃপর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদটি শেষ করেছেন নিম্নোক্তভাবে :
واحتجت الشافعية ـ لما ذهبت إليه بما أخرجه ابن خزيمة في صحيحه وصححه من حديث وائل بن حجر قال : ( صليت مع رسول اللَّه صلى اللَّه عليه وآله وسلم فوضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره) وهذا الحديث لا يدل على ما ذهبوا إليه لأنهم قالوا إن الوضع يكون تحت الصدر كما تقدم والحديث صريح بأن الوضع على الصدر وكذلك حديث طاوس المتقدم ولا شيء في الباب أصح من حديث وائل المذكور…..
“শাফেঈরা এ ব্যাপারে দলিল হিসেবে যা গ্রহণ করেছেন তা ইবনে খুযায়মাহ (রহ) তাঁর সহীহতে বর্ণনা করেছেন ও তিনি তাকে সহীহ বলেছেন, যার মধ্যে ওয়ায়িল বিন হুজরের হাদীস রয়েছে। তিনি (রা) বলেন : ‘আমি রসূলুল্লাহ (স)এর সাথে সালাত পড়েছিলাম তিনি ডান হাতটি বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর রাখলেন।’ এই হাদীসটি সে দিকে যায় না যেভাবে তারা দলিল নিয়েছেন। কেননা তারা বলেছেন, হাতটি রাখতে হবে বুকের নীচে, যেভাবে পুর্বে (ইমাম নববী’র) বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি স্পষ্ট যে, বুকের উপর রাখতে হবে। অনুরূপ তাউস থেকে পূর্বে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে সবচেয়ে সহীহ হাদীসটি হল ওয়ায়েল (রা)এর বর্ণনা।…..” (নায়লুল আওতার- অনুচেছদ : باب ما جاء في وضع اليمين على الشمال)
সামগ্রিকভাবে ইমাম শওকানী (রহ)এর বক্তব্য হানাফী মাযহাবের বিরোধিতা করে। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে যেরা‘ শব্দের দাবী : ‘কনুই পর্যন্ত হাত’- এ সম্পর্কে কোন বিরোধিতা নেই। তিনিও ইবনে হাজার (রহ)এর মত যিরা‘ শব্দযুক্ত হাদীসের দাবী হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহু’র ব্যাখ্যা সমৃদ্ধ হাদীস দ্বারা গ্রহণ করেছেন। সুতরং আমরা –
ক) সহীহ মুসলিমের বর্ণনা : ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা।
খ) সহীহ বুখারীর বর্ণনা : ডান হাম বাম যেরা‘র উপর রাখা। এবং
গ) আবূ দাউদ, নাসাঈ ও সহীহ ইবনে খুযায়মাহ’র বর্ণনা : ডান হাত বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহু’র উপর রাখার মধ্যে কোন পার্থক্য দেখি নি। বরং সহীহ হাদীসে হাত অর্থ : যেরা‘ প্রমাণিত। একটি হাদীসে সিজদাতে যেরা‘ বিছাতে নিষেধ করা হয়েছে। অপর হাদীসে হাতের কনুই উঠিয়ে রাখতে বলা হয়েছে। সর্বোপরি হাতের এই অংশটির ব্যাখ্যা হাদীস থেকে হাদীসের ব্যাখ্যা হিসেবে নিশ্চিত হয়। ইমাম নববী, হাফেয ইবনে হাজার ও ইমাম শওকানী (রহ) থেকে এ পদ্ধতির কোন বিরোধিতা লেখক উপস্থাপন করেন নি। তাঁরা যেরা‘র হাদীসের ব্যাখ্যা হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহু’র দ্বারা গ্রহণ করেছেন। ডান হাতটি বাম হাতের কনুই পর্যন্ত রাখলে সেই দাবী পরিপূর্ণভাবে পূর্বোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যাসহ পূরণ হয়। পক্ষান্তরে এই তিন ইমামের বক্তব্য ও বিশ্লেষণে হানাফীদের পদ্ধতি খণ্ডন হয়।
উল্লেখ্য ইমাম শওকানী (রহ) কর্তৃক ইমাম নববী’র উপস্থাপনাতে বুকের নীচে হাত বাঁধার আমলটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি কেবল বুকের উপর হাত বাধাকে সবচেয়ে সহীহ বলেছেন।
আমাদের কাছে সবগুলোর মর্মই এক। যেভাবে হাত, যেরা‘ পরিপূরক হিসাবে এবং কেবল কব্জির ব্যবহার একই বিষয়ের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঠিক একই ভাবে বুকের উপর (ইবনে খুযায়মাহ, আহমাদ) , বুকের নিকট (বাযযার) , নাভীর উপর (فَوْقَ السُّرَّةِ -আবূ দাউদ) শব্দগুলো ব্যবহার হওয়ায় কেউ কেউ অনুরূপভাবে সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন। আমাদের কাছে সহীহ সূত্রে ও পরিপূরক সমস্ত বর্ণনা গ্রহণযোগ্য –যখন পরস্পরকে ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করা যায়। কেননা শব্দগুলোর মধ্যে সমন্বিত আমল সম্ভব। আর এ কারণে ডান হাতটি বাম হাতের কনুই-এর উপর রাখলে বা ধরলে সবগুলো সহীহ বা হাসান সনদের হাদীসের উপর আমল হয়। এ পযায়ে উক্ত শব্দগুলোর প্রয়োগ যুক্তিসিদ্ধ হয়। বাতিল কেবল তালুর পিঠের উপর তালু রেখে নাভীর নীচে হাত বাঁধা।

লেখক ৪২ (পৃ: ২৬২৭) :
নাভির নীচে হাত রাখা
১. হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. বলেন,
رأيت النبي صلى الله عليه وسلم وضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة. أخرجه ابن أبي شيبة قال: حدثنا وكيع عن موسى بن عمير عن علقمة بن وائل عن أبيه وإسناده صحيح. قال الحافظ قاسم بن قطلوبغا في تخريج أحاديث الاختيار شرح المختار : هذا سند جيد وقال الشيخ أبو الطيب السندي في شرحه على الترمذي : هذا حديث قوي من حيث السند وقال الشيخ عابد السندي في طوالع الأنوار: رجاله كلهم ثقات أثبات اهـ
অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নীচে রাখতে দেখেছি। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৩৯৫৯। এর সনদ সহীহ।
হাফেজ কাসিম ইবনে কুতলূবুগা র., তিরমিযী শরীফের ভাষ্যকার আবুত্ তায়্যিব সিন্ধী র. ও আল্লামা আবেদ সিন্ধী র. প্রমুখ হাদীসটিকে মজবুত ও শক্তিশালী বলেছেন। এর সনদ এরূপ: ইবনে আবী শায়বা র. ওয়াকী’ থেকে, তিনি মূসা ইবনে উমায়ের থেকে, তিনি আলকামার সূত্রে হযরত ওয়াইল রা. থেকে। এই সনদে কোন দুর্বল রাবী নেই।
বিশ্লেষণ ৪২ : লেখক উক্ত হাদীসটির সনদ নিয়ে আলোচনা করেছেন। মতনে উল্লিখিত শব্দ تحت السرة (নাভীর নীচে) শব্দটি নিয়ে আলোচনা করেন নি। অথচ স্বয়ং হানাফীদের কাছে উক্ত শব্দটির গ্রহণযোগ্যতা সন্দেহযুক্ত।
ক) তাক্বী উসমানী হানাফী (হাফি) লিখেছেন :
لیکن احقر کی نظر میں اس روایت سے استدلال کمزور یے؛ اول تو اس لئے کہ اس روایت میں ” تَحت السرة ” کے الفظ مصنف ابن ابی شیبہ مطبوعہ نسخوں میں نہیں ملے؛ اگرچہ علامہ نمیوی [رح] “آثار السنن” کے متعدد نسخوں کا حوالہ دیا ہے؛ کہ ان میں یہ زیادتی مذکور ہے؛ تب بھی اس زیادتی بعض نسخوں میں ہونا اور بعض میں نہ ہونا اس کو مشکوک ضروت بنا دیتا ہی؛ نیز حضرت وائل بن حجر [رض] کی روایت مضطرب المتن ہے؛ کیونکہ بعض میں ” على صدره ” ۔۔۔۔ بعض میں ” عند صدره ” اور بعض میں ” تَحت السرة “کے الفاظ مروی ہے؛ اور اس شدید اضطرب کی صورت میں اس سے استدلال نہ کرنا چاہئے
“এই অধমের (লেখক তাক্বী উসমানী) নযরে (বিশ্লেষণে ) এই র্বণনাটি দ্বারা দলিল গ্রহণে দুর্বলতা আছে। প্রথমত, এর কারণ হল – تَحت السرة (নাভির নীচে) শব্দগুলো মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা’র প্রকাশিত সংস্করণগুলোতে পাওয়া যায় না। যদিওবা আল্লামা নিমবী (রহ) ‘আসারুস সূনান’-এ ‘মুসান্নাফ’-এর কয়েকটি সংস্করণের উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে, সেগুলোতে এই অতিরিক্ত অংশ আছে। এরপরেও এই অতিরিক্ত অংশ কিছু সংস্করণে থাকা এবং কিছু সংস্করণে না থাকাটা অবশ্যই সন্দেহের উদ্রেক করে। তাছাড়া ওয়ায়েল (রা)এর কোন বর্ণনাতে على صدره (বুকের উপর) …. কোন বর্ণনাতে عند صدره (বুকের নিকট) আবার কোন বর্ণনাতে تَحت السرة (নাভির নীচে) শব্দে বর্ণিত হয়েছে। এত অধিক ইযতারাবের (স্ববিরোধী বর্ণনার) কারণে কারো জন্যে এটা দ্বারা দলিল গ্রহণকরা উচিত নয় ।” (দারসে তিরমিযী ২/২৩ পষ্ঠা)
পাঠক লক্ষ্য করুন! على صدره (বুকের উপর) কোন বর্ণনাতে عند صدره (বুকের নিকট) পরস্পরের ব্যাখ্যা হিসাবে গণ্য করা যায়। কিন্তু تَحت السرة (নাভির নীচে)-কে على صدره (বুকের উপর) ও عند صدره (বুকের নিকট) এর ব্যাখ্যা হিসাবে গ্রহণ করা যায় না। এ কারণে على صدره (বুকের উপর) কোন বর্ণনাতে عند صدره (বুকের নিকট) শব্দগুলো পরস্পরের সাক্ষ্য হিসেবে মাহফুয (সংরক্ষিত) হওয়ায় কমপক্ষে হাসান হাসীসের মর্যাদা পায়। পক্ষান্তরে تَحت السرة (নাভির নীচে) শব্দটি বিরোধী (ইযতারাব) বিধায় শায ও বাতিল।

খ) শায়েখ হায়াত সিন্ধী ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’র বর্ণনা সম্পর্কে বলেন :
“تَحت السرة (নাভির নীচে) এই অতিরিক্ত অংশটুকুর অস্তিত্ব সম্পর্কে আপত্তি রয়েছে; বরং এটা ভুল, যার উৎস হলো অনিচ্ছাকৃত ভ্রম। কারণ আমি গ্রন্থকারের কৃত বিশুদ্ধ নোসখা খুঁজে দেখেছি এবং তাতে এই সনদে এবং লফযে এ হাদীস পেয়েছি; কিন্তু তাতে تَحت السرة (নাভির নীচে) কথাটি নেই। তাতে শেষ (ইবরাহীম নাখয়ীর বর্ণনার) অংশে فِي الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ (সালাতে নাভীর নীচে) রয়েছে। ফলে হয়ত কাতিবের নযর একস্থান হতে অন্যস্থানে সরে গিয়েছে। আর তিনি মাওকুফের শব্দটি মারফু‘-এর অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছেন।” [ইলা‘উস সূনান (ইফা) ৩/২৩৮]
গ) ‘ইলা‘উস সুনানের’ লেখক যাফার আহমাদ উসমানী (রহ) উক্ত বক্তব্য খণ্ডনে ইমাম নিমবী হানাফী (রহ)এর সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছেন। যার জবাব অপর হানাফী মুহাদ্দিস আনওয়ারশাহ কাশ্মিরী (রহ)’র বর্ণনাতে আছে। তিনি (রহ) শায়েখ হায়াত সিন্ধির (রহ) সমর্থনে বলেন :
ولا عجبَ أن يكون كذلك، فإِني راجعت ثلاث نَسُخ «للمصنف»، فما وجدته في واحدةٍ منها
“এটা হওয়া কোন আজব বিষয় নয় যেভাবে হায়াত সিন্ধি বলেছেন। আমি নিজে ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’র তিনটি সংস্করণ দেখেছি, তার কোন একটিতেই সেটি [تَحْتَ السُّرَّةِ (নাভির নীচে)] নেই।।” [ফয়যুলবারী শরহে সহীহ বুখারী ২/২৬৭পৃ:]
তাছাড়া ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’র প্রসিদ্ধ সংস্করণে ঐক্যসমৃদ্ধ বর্ণনাটুকু হলো : وَضَعَ يَمِينَهُ عَلَى شِمَالِهِ فِي الصَّلاَةِ
“তাঁর ডানকে বামের উপর রাখতেন সালাতে।”
বঝা গেল হাদীসটিতে উল্লিখিত تَحْتَ السُّرَّةِ (নাভির নীচে)-শব্দটি বিতর্কিত। বরং নির্ভরযোগ্য সংস্করণগুলোতে শব্দটি অস্তিত্বহীন। কমপক্ষে তাক্বী উসমানী’র (হাফি) কথা গ্রহণ করলেও, এই হাদীসটি দ্বারা দলিল গ্রহণ করা উচিত নয়। নীচে ইবনে আবী শায়বাহ’র বিভিন্ন সংস্করণের ছবি প্রমাণ হিসাবে তুলে ধরা হল :

P1 P2 P3 P4 P5

ঘ) এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, আলকামাহ বিন ওয়ায়েল বিন হুজর থেকে। কিন্তু এখানে يد বা হাত শব্দটির ব্যবহার নেই। পক্ষান্তরে সহীহ মুসলিমে উক্ত আলকামাহ বিন ওয়ায়েল ও তার মাওলা (দাস) একত্রে সাহাবী ওয়ায়েল বিন হুজর (রা) থেকে নিম্নোক্ত শব্দে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন : : وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْني عَلَي الْيُسْري “নবী (স) তাঁর ডান হাতকে বামের উপর রাখতেন।” হাদীসটিতে يد বা হাত শব্দটির ব্যবহার আছে এবং নাভির নীচে বাক্যটি নেই। এখন সহীহ বুখারীতে বর্ণিত ডান হাত বাম যেরা‘র হাদীসটি দ্বারা ব্যাখ্যা নিলে উভয় হাতকে কখনই নাভীর নীচে রাখা সম্ভব নয়। সুতরাং আবী শায়বাহ’তে উল্লিখিত বাক্য وضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة ‘ডানটি বামটির উপর নাভির নীচে রাখতেন’ বাক্যটির অগ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হয়। পক্ষান্তরে যদি ডান তালু বাম তালুর উপরে রাখার যঈফ হাদীসটিকে ব্যাখ্যা হিসাবে গ্রহণ করি তাহলে সেটা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শব্দের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় বাতিল হয়।

লেখক ৪৩ (পৃ: ২৭) :
২. হযরত আলী রা. বলেন,
السُّنَّةُ وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ فِى الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ. أخرجه أبو داود (في رواية ابن الأعرابي وابن داسة) ٧٥٦ وأحمد ١/١١٠ (٨٧٥) وابن أبي شيبة (٣٩٦٦) والدارقطني ١/٢٨٦ والضياء في المختارة ٢/٧٧٢ وفيه عبد الرحمن بن إسحاق الواسطي وهو ضعيف. ولكن يشهد له الحديث السابق.
অর্থ: সুন্নত হলো তালু তালুর উপর রেখে নাভির নীচে রাখা । আবূ দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৭৫৬; মুসনাদে আহমদ ১খ, ১১০ পৃ, হাদীস নং ৮৭৫; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৩৯৬৬; দারাকুতনী, ১খ, ২৮৬পৃ; যিয়া ফিল মুখতারা, ২খ, ৭৭২পৃ। এর সনদে আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক রয়েছেন। তিনি দুর্বল। তবে প্রথম হাদীসটি এর সমর্থন করছে।
বিশ্লেষণ ৪৩ : লেখক হাদীসটির দুর্বলতা খুব হালকাভাবে দেখেছেন। ফলে পূর্বে উল্লিখিত মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’র হাদীসটির সাক্ষ্য হিসাবে শেষোক্ত যঈফ হাদীসটিকে উল্লেখ করেছেন। অথচ শেষোক্ত হাদীসটির বর্ণনাকারী আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাকের প্রতি মুহাদ্দিসগণের আপত্তি অত্যন্ত কঠোর। কেননা ইমাম আহমাদ (রহ) তাকে যঈফ ও মুনকারুল হাদীস বলেছেন। ইমাম আবূ যারআ (রহ) তাকে ‘মুনকারুল হাদীস’ বলেছেন। ইমাম ইবনে খুযায়মাহ (রহ) তার হাদীসকে দলিল হিসাবে গ্রহণ করেন নি। ইমাম যাহাবী (রহ) ও ইবনে হাজার (রহ) তাকে যঈফ গণ্য করেছেন। [তাহযীবুত তাহযীব ৬/১৩৭, মীযানুল ইতিদাল ২/৪৮, তারীখে কাবীর ৩/২৫৯, তাক্বরীব পৃ: ১৯৮]
হাদীসটির সনদের অপর বর্ণনাকারী ‘যিয়াদ বিন যায়েদ’ মাজহুল (অজ্ঞাত) রাবী। [মুফতি আমীমুল ইহসান, ফিক্বহুস সুনানি ওয়াল আসার (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ১/১৭১ পৃ:]
শেষোক্ত ও পূর্বোক্ত হাদীস দু’টির অপর একটি দুর্বলতা হল, উভয় হাদীসে সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও আবূ দাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে হিব্বানের হাত ও বাহু শব্দের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যাসহ হাদীসগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক ও অসম্পূর্ণ বাক্যযুক্ত। যার তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:

43p1

লেখক ৪৪ (পৃ: ২৭) :
৩. হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেছেন,
أَخْذُ الأَكُفِّ عَلَى الأَكُفِّ فِى الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ. أخرجه أبو داود (٧٥٨) وفيه عبد الرحمن المذكور.
অর্থ: হাতের তালু অপর তালুর উপর রেখে নাভির নীচে রাখতে হবে। আবূ দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৭৫৮। এতেও পূর্বোক্ত আব্দুর রহমান রয়েছেন।
বিশ্লেষণ ৪৪ ‘আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক-কে ইমাম আহমাদ ও ইমাম বুখারী (রহ) ‘মুনকারুল হাদীস’ বলেছেন। (ইমাম বুখারীর ‘আযযুয়াফা ২০৩, তারিখুল কাবীর, ৫/২৫৯)
সুতরাং হাদীসটি বাতিল।

লেখক ৪৫ (পৃ: ২৭) :
৪. হযরত আনাস রা. বলেছেন,
ثلاث من أخلاق النبوة تعجيل الإفطار وتأخير السحور ووضع البد اليمنى على اليسرى في الصلاة تحت السرة. أخرجه ابن حزم في المحلى تعليقا ٣/٣٠
অর্থ: তিনটি বিষয় নবীস্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। ইফতারে বিলম্ব না করা, সাহরী শেষ সময়ে খাওয়া, এবং নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নীচে রাখা। ইবনে হাযম, আল মুহাল্লা, ৩খ, ৩০পৃ। তিনি এর সনদ উল্লেখ করেননি।
বিশ্লেষণ ৪৫ : লেখক হাদীসটিকে সনদহীন হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। সুতরাং দলিল হিসাবে এর কোন গ্রহণযোগ্যতাই নেই।

লেখক ৪৬ (পৃ: ২৮) :
৫. হাজ্জাজ ইবনে হাসসান র. বলেন,
سمعت أبا مجلز أو سألته قال : قلت كيف يصنع قال : يضع باطن كف يمينه على ظاهر كف شماله ويجعلها أسفل من السرة . أخرجه ابن أبي شيبة في مصنفه).٣٩٦٣(
অর্থ: আমি আবূ মিজলায র. (বিশিষ্ট তাবেয়ী)কে বলতে শুনেছি, অথবা হাজ্জাজ বলেছেন, আমি আবূ মিজলায র.কে জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে হাত বাঁধবো? তিনি বললেন, ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠে রেখে নাভির নীচে বাঁধবে। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৩৯৬৩। এর সনদ সহীহ।
বিশ্লেষণ – ৪৬ : ক) এটি তাবেঈর ফাৎওয়া, যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উল্লিখিত নবী (স)এর সহীহ হাদীসের বিরোধী। সুতরাং শরী‘আতের দলিল হিসাবে উক্ত ফাৎওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
খ) হানাফীগণ ডান হাতের বৃদ্ধা ও অনামিকা আঙ্গুল দ্বারা বাম হাতের কব্জি ধরেন। অথচ ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠ বরাবর হুবহু রাখলে এই দু’টি আঙ্গুল দ্বারা কব্জিকে ধরে নাভীর নিচে হাতে ঝুলিয়ে রাখা যায় না। সুতরাং দলিলটি অনুযায়ী হানাফীদের হুবহু আমল নেই।
গ) বর্ণনাটিতে নারী ও পুরুষের পার্থক্য নেই। অথচ হানাফীগণ নারীদেরকে বুকের উপর হাত বাঁধার বিধান দিয়ে থাকেন। সুতরাং বর্ণনাটি হানাফীদের নারীদের বিধানের বিরোধী। অথচ বুকের হাত বাঁধার বিধানটি নবী (স)এর আমল হিসেবে প্রমাণিত।

লেখক ৪৭ (পৃ: ২৮) : 
৬. ইবরাহীম নাখায়ী র. (যিনি তাবেয়ী ছিলেন) বলেন,
يضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة . أخرجه ابن أبي شيبة ٣٩٦٠
অর্থ: নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নীচে বাঁধবে। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৩৯৬০ । এর সনদ হাসান।
বিশ্লেষণ ৪৭ : এটি তাবেঈর ফাৎওয়া, যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উল্লিখিত নবী (স)এর সহীহ হাদীসের বিরোধী। সুতরাং শরী‘আতের দলিল হিসাবে উক্ত ফাৎওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
খ) এর সনদে রাবী‘ (বিন সুবীহ) আছেন। তিনি ত্রুটিযুক্ত হাফেয (তাক্বরীব পৃ: ১০১)। ইমাম নাসাঈ ও ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন তাকে যঈফ বলেছেন। (তাহযীবুল কামাল, নং: ১৮৬৫)

লেখক ৪৮(পৃ: ২৮) :
আল্লামা ইবনুল মুনযির র. তার আল আওসাত গ্রন্থে লিখেছেন, -وقال إسحاق: تحت السرة أقوى في الحديث وأقرب إلى التواضع.
অর্থাৎ ইসহাক (যিনি বুখারী র. এর উস্তাদ ছিলেন) বলেছেন, নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীস অধিক শক্তিশালী এবং বিনয়ের নিকটতর। ( ৩খ,২৪৩পৃ)
বিশ্লেষণ ৪৮ : ক) নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীসটি দুর্বল হওয়ার বিষয়টি লেখক নিজেই পূর্বে উল্লেখ করেছেন (দ্র: ‘লেখক-৪৩ ,৪৪’)। অর্থাৎ লেখকের উপস্থাপনাই স্ববিরোধী। তাছাড়া উক্ত বক্তব্যটি কেবলই দাবী, কোন দলিল বা প্রমাণ নয়। আবার নাভির নীচের হাত বাঁধলে হাত ঝুলানো অবস্থায় ধরা হয়। হাতের উপর হাত রাখার মৌলিক দাবী পূরণ হয় না। এ কারণেও নাভির নীচে হাত বাঁধাটা অধিকাংশ সহীহ হাদীসে বর্ণিত বক্তব্যের বিরোধী।
আমরা যখন সালাতে দাঁড়িয়ে থাকি তখন আল্লাহর কাছে আন্তরিকতার সাথে চাইতে থাকি। আর রুকু‘ ও সাজদাহ’র মাধ্যমে নত হয়ে বিনয়ের চরম অবস্থা প্রকাশ করে সেখানেও চাইতে থাকি। কিন্তু তখন আমাদের হাতটি বাঁধা থাকে না। কেউ কারো কাছে ক্ষমা চাইলেও নিজের হাত দু’টি বুকে বাঁধে না। বরং হাত দু’টি একত্রিত করে ক্ষমার ভঙ্গি প্রকাশ করে, অন্যের হাত-পা ধরে। পক্ষান্তরে আমরা যখন আন্তরিকতা প্রকাশ করি তখন বুকের দিকে ইঙ্গিত করি, বুকে বুক মিলায় বা কোলাকুলি করি। এমনকি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে চাওয়ার বিষয়টিও বুকের সাথে সম্পর্কিত। এটি নাভীর সাথে সম্পর্ক রাখে না। এ কারণে সূরা ফাতিহা পাঠের সময় চাওয়াটা ক্বলবের সাথে হওয়ায় বাঞ্ছনীয় –যা একটি পবিত্রস্থান। কিন্তু নাভির নীচের অংশটি পবিত্র নয়, বরং লজ্জাস্থান। সুতরাং সালাতে খুশু-খুযু‘ ও আন্তরিকতার প্রকাশ বুকে হাত বাঁধার সাথেই বেশী সামঞ্জস্যশীল, কখনই নাভীর নীচে হাত বাঁধাটা ইবাদাতে আন্তরিকতা প্রমাণ করে না।

লেখক ৪৯(পৃ: ২৮২৯) :
একটি খারাপ অভ্যাস :
লা-মাযহাবী আলেমদের একটি খারাপ অভ্যাস হলো – অন্যদের দলিল-প্রমাণের খুব খবর নেন। নিজেদের দলিল-প্রমাণ সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকেন। অনেক সময় সাধারণ মানুষ এতে ধোঁকায় পড়ে যান। আরেকটি কাজ তারা করেন। একটি হাদীস যদি পাঁচটি কিতাবে এসে থাকে- যদিও তার সনদ একটিই হয়ে থাকে – তারা এটিকে পাঁচটি হাদীস হিসেবে দেখিয়ে থাকেন। বুখারী শরীফের বাংলা অনুবাদের টীকায় তারা বুকে হাত বাঁধার হাদীসকে পাঁচটি নম্বরে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষণ ৪৯ : কোন প্রকাশনীর প্রকাশনা কোন গোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ চিন্তা প্রকাশ করে না। সুতরাং লেখকের অভিযোগটি এক তরফা। তাছাড়া তিনি কোন প্রকাশনী সম্পর্কে অভিযোগটি করলেন সেটাও আমাদেরকে জানান নি। জানালে তদন্ত করে বিষয়টি সম্পর্কে আলোচনা করা যেত। তবে আমরা পরবর্তীতে দেখব লেখক মোট পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন বুকের উপর হাত বাঁধার বর্ণনা এনেছেন এবং সেগুলো বাতিল করার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ স্বয়ং লেখকের উপস্থাপনা থেকে পাঁচটি বুকে হাত বাঁধার ভিন্ন ভিন্ন হাদীস উল্লিখিত হয়েছে।

লেখক – ৫০ (পৃ: – ২৯) :
আবার মুরসাল হাদীসকে তারা প্রামাণ্য মনে করেননা। কিন্তু প্রয়োজনে মুরসালকেও প্রমাণ-স্বরূপ পেশ করেন।
বিশ্লেষণ – ৫০ : বুকের উপর হাত বাঁধার মুরসাল হাদীসটি উপস্থাপনের কারণ হল, হানাফীদের নিকট মুরসাল হাদীস গ্রহণযোগ্য। তাছাড়া আলোচনার শুরুতে হানাফী আলেম তাক্বী উসমানী (হাফি) ও ইবনুল হুমাম (রহ) থেকে জেনেছি – তাঁরা বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসকে মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য করেছেন। এসব কারণেই যা দলিল হিসাবে হানাফীদের কাছে গ্রহণযোগ্য সেটা হানাফীদের সামনে উপস্থাপন করাটা খুবই সঙ্গত। তাছাড়া হানাফীদের মুহাক্বেক্বগণ বিষয়টি লেখকের ন্যায় বিরোধী পক্ষের কোন দোষ হিসেবে দেখেন নি। বরং যেহেতু হানাফীদের কাছে মুরসাল হাদীস গ্রহণযোগ্য এজন্যে তারা সেটার ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। হানাফী আলেম জাফার আহমাদ উসমানী (রহ) ‘ই‘লাউস সুনানে’ লিখেছেন :
“… হাদীসটি মুরসাল, যা আমাদের নিকট হুজ্জাত ও প্রমাণ। কিন্তু সাধারণ মুহাদ্দিসগণের নিকট এবং শাফেঈ (রহ)-এর নিকট তা হুজ্জাত নয়। সুতরাং এ হাদীস দ্বারা তাদের প্রমাণ গ্রহণ সঠিক হবে না। তদুপরি এটা তাদের মাযহাবের অনুরূপ নয়, যেমন ইতঃপূর্বে বলা হয়েছে। তবে এই মুরসালকে যদি ওয়াইল-এর উল্লিখিত (বুকে হাত বাঁধার) হাদীসের সাথে ‍যুক্ত করা হয় তাহলে সম্মিলিত হাদীস থেকে আলাদা শক্তি অর্জিত হবে।” [ই‘লাউস সুনান (ইফা) ২/২৩৬ পৃ:]
মন্তব্য : প্রকৃতপক্ষে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর মুরসাল বর্ণনার সমর্থনে সহীহ বা হাসান হাদীস থাকলে মুহাদ্দিসগণ ও শাফেঈ মাযহাবে সাক্ষ্য হিসাবে বর্ণনাটি উল্লেখ করা হয়। তাছাড়া হানাফীদের কাছে মুরসাল গ্রহণযোগ্য হওয়ায় তাদের সমর্থন আদায়ে এই সাক্ষ্যমূলক হাদীসকে উপস্থাপন করা হয়। কেননা তাদের মহিলাদের এই হাদীসের উপর আমলের বিষয়টিতো রয়েছেই। সুতরাং উক্ত মুরসাল বর্ণনাটির উপস্থাপনা সম্পূর্ণ সঠিক।
অতঃপর জাফার আহমাদ উসমানী (রহ) লিখেছেন :
“তবে আমাদের নিকট মুরসাল হাদীস যেহেতু প্রমাণযোগ্য, সেহেতু আমাদেরকে এর জবাব পেশ করতে হবে কিংবা এর উপর আমল করতে হবে। তাই আমরা বলি আমাদের মতে ‘আলী (রা) এর হাদীস এটির তুলনায় অগ্রাধিকার যোগ্য। কেননা তাতে স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে যে, নাভীর নীচে হাত রাখা সুন্নাত-এর অন্তর্ভুক্ত। …. সুতরাং নাভীর নীচে হাত বাঁধার হাদীসের উপর ‘আমল অধিক উত্তম। আর অপর (বুকের উপর হাত বাঁধার) হাদীসটি আমাদের মতে বৈধতা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে প্রযুক্ত।” [ই‘লাউস সুনান (ইফা) ৩/২৩৬-৩৭ পৃ:, আরো দ্র: ‘বিশ্লেষণ – ৫২’]
সুস্পষ্ট হল, হানাফীদের কাছে বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীস জায়েয। সুতরাং লেখকের আপত্তিগুলো অহেতুক।
জা‘ফার আহমাদ উসমানী (রহ)এর নিকট আবূ দাউদে বর্ণিত ‘বুকে হাত বাঁধার’ মুরসাল হাদীসটির থেকে ‘নাভির নীচে’ বাঁধার যঈফ ও মুনকার হাদীসটি প্রাধান্যপ্রাপ্ত। অবশ্য এর একটু পূর্বে তিনিই বুকে হাত বাঁধার মুরসাল হাদীসটি ‘সহীহ ইবনে খুযায়মাহ’-তে ওয়ায়েল (রা)এর হাদীসটির সমর্থনে শক্তিশালী হয় বলে উল্লেখ করেছেন (দ্র: ‘বিশ্লেষণ – ৫০’)। এ পর্যায়ে আমরা আবূ দাউদের ‘নাভির নীচে’ ও সহীহ ইবনে খুযায়মাহ’র বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করব। এই দু’টি হাদীসের সমালোচিত দুই রাবী আব্দুর রহমান বিন ইসহাক ও মুয়াম্মাল বিন ইসমাঈলের পর্যালোচনা দ্বারা বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে :

উক্ত বিশ্লেষণ থেকে প্রমাণিত হয়, বুকে হাত বাঁধার মুরসাল হাদীসের সমার্থক আলোচ্য বুকে হাত বাঁধার হাদীসটি অনেক বেশী শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য। তাছাড়া বুকের হাত বাঁধার সমর্থিত আরো বর্ণনা সামনে আসছে। এ পর্যায়ে মুরসাল হাদীসটিও গ্রহণযোগ্যতা পায়।

লেখক ৫১ (পৃ: ২৯) :
যাহোক, এখানে তাদের দলিলগুলোর অবস্থা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করছি। এক কথায় আমরা মনে রাখতে পারি, বুকের উপর হাত বাঁধা সম্পর্কে কোন সহীহ হাদীস নেই।।
বিশ্লেষণ ৫১ : পূর্বে গ্রহণযোগ্য হানাফী আলেমদের থেকে বুকে হাত বাঁধার বিষয়টি বৈধতা বরং মহিলাদের ক্ষেত্রে বিধান হিসাবে স্বীকৃতির বক্তব্য আমরা উল্লেখ করেছি। তাদের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়, তাঁরা বুকের হাত বাঁধার হাদীসকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এমনকি এ সম্পর্কিত মুরসাল হাদীসটিকেও তারা বৈধতার দলিল হিসাবে গণ্য করেছেন। (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-২৫, ৫০’)
লক্ষণীয় : নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীসে يد বা হাত শব্দটির ব্যবহার নেই। সেখানে হাতের তালু বা পাতার (الْكَفِّ) কথা বর্ণিত হয়েছে। যা সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাত ও সহীহ বুখারী বর্ণিত যেরা‘ শব্দ বিশিষ্ট হাদীসের বিরোধী। তাছাড়া সিজদা সম্পর্কিত হাদীসে হাত ও এর তালুকে পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেভাবে পূর্বে প্রমাণ করেছি। সেখানে হাত বলতে যেরাকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ পর্যায়ে হাতের উপর হাত বা যেরা উপর হাত রাখা সম্পর্কে যে বর্ণনাটিই গ্রহণ করি না কেন – সেটা কখনই নাভির নীচের বর্ণনা ও হাতের তালুর উপর তালু রাখার বর্ণনাকে সমর্থন করে না। অথচ বুকের নিকট বা বুকের উপর রাখার বর্ণনাগুলোতে কোন বিরোধিতা হয় না। কেননা সেখানে يد বা হাত শব্দটিও রয়েছে। একারণে বুকের নিকট বা বুকের উপর বর্ণনাগুলো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনাগুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা হওয়ায় সেগুলো গ্রহণযোগ্য। পক্ষান্তরে নাভীর নীচে তালুর উপর তালু রাখার বর্ণনা শায হওয়ার দোষে দুষ্ট। এছাড়াও সনদগত বিশ্লেষণে নাভীর নীচে হাত বাঁধার হাদীসের থেকে বুকের উপরে হাত বাঁধার হাদীসগুলোর সমালোচনা করার সুযোগ কম। কেননা যাদের প্রতি আপত্তি করা হয়েছে, তাদের কেউ সহীহ বুখারী, কেউ সহীহ মুসলিমের বর্ণনাকরী। এজন্যে আপত্তিগুলো অগ্রহণযোগ্য।

লেখক ৫২ (পৃ: ২৯) :
হযরত ওয়াইল রা. এর হাদীস (সহীহ ইবনে খুযায়মা, ১/১৪৩), এটি সহীহ নয়। এর সনদে মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈল আছেন। তিনি সুফইয়ান ছাওরী থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। মুয়াম্মালকে ইমাম বুখারী মুনকারুল হাদীস বলেছেন। তিনি একথাও বলেছেন, আমি যাকে মুনকারুল হাদীস বলবো, তার সূত্রে বর্ণনা করা বৈধ হবে না।
বিশ্লেষণ ৫২ : হাদীসটির ব্যাপারে মূল অভিযোগ মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈল বর্ণনাকারীর উপর। এর জবাব নিম্নরূপ :
১) ইমাম বুখারী (রহ)এর কিতাব থেকে মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈল বর্ণনাকারীর ‘মুনকার’ হওয়া প্রমাণিত নয়। যাকে ইমাম বুখারী ‘মুনকার’ বলেছেন তিনি হলেন : মুয়াম্মাল ইবনে সাঈদ। (দ্র: তারিখুল কাবীর ৮/৪৯)
২) রিজালশাস্ত্রবীদদের মধ্যে হাফিয মিযী ও ইবনে হাজার (রহ) সূত্রবিহীনভাবে ইমাম বুখারীর (রহ) থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে, তিনি মুয়াম্মাল বিন ইসমাঈলকে ‘মুনকারুল হাদীস’ বলেছেন। অথচ ইমাম বুখারী (রহ) –এর কোন কিতাবেই তাঁর প্রতি আপত্তি করা হয় নি। এমনকি ইমাম বুখারীর (রহ) ‘আয-যুআফা’-তেও তাঁর কথা উল্লেখ করা হয় নি। তিনি ‘তারিখুল কাবীরে’ তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন অথচ কোন আপত্তি করেন নি। শায়েখ আলবানী (রহ) ও অন্যান্যরা যাচায়-বাছায় ছাড়াই উক্ত রিজালশাস্ত্রবীদদের থেকে উদ্ধৃতি দেয়াতে মুয়াম্মাল সম্পর্কে ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের আহলেহাদীসদের মধ্যে শায়েখ আলবানী (রহ) তাক্বলীদের কারণে একই ভুল উদ্ধৃতি দেয়া হচ্ছে (দ্র: জাল হাদীসের কবলে রসূলুল্লাহ (স)এর সালাত, পৃ: 223)।
৩. ইমাম বুখারী (রহ)এর কাছে মুনকারুল হাদীসের থেকে হাদীস গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। যেমন : ইমাম যাহাবী (রহ) একজন ‘মুনকারুল হাদীস’ আবান ইবনে জুবলাহ সম্পর্কে লিখেছেন : أن البخاري قال : كل من قلت فيه منكر الحديث فلا تحل الرواية عنه
“নিশ্চয় ইমাম বুখারী বলেছেন : আমি যাদেরকে মুনকারুল হাদীস বলি, তাদের থেকে বর্ণনা উল্লেখ করা হালাল নয়।” (মীযানুল ই‘তিদাল ১/১১৯ পৃ:)
হাফেয ইবনে হাজার (রহ) এই বিষয়টি ‘আল-লিসানে’ (৩/১ পৃ:) নিম্নোক্তভাবে ব্যক্ত করেছেন :
وهذا القول مروي بإسناد صحيح عن عبد السلام بن أحمد الخفاف عن البخاري
“এই উক্তিটি আব্দুস সালাম বিন আহমাদ আলখফফাফ (রহ) ইমাম বুখারী (রহ) থেকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন।”
অথচ ইমাম বুখারী (রহ) ‘সহীহ বুখারী’র ‘সন্ধি অধ্যায়ের’ তরজমাতুল বাবে (بَاب الصُّلْحِ مَعَ الْمُشْرِكِينَ –অনুচ্ছেদ : মুশরিকদের রিকদের সাথে সন্ধি …) পূর্ণাঙ্গ সনদসহ একটি হাদীস উল্লেখ করার পর, মুয়াম্মাল থেকে ঐ হাদীসের অপর একটি বর্ণনার মতনগত পার্থক্য উল্লেখ করেছেন। ইবনে হাজার ফতহুল বারীতে (৫ম খণ্ড) ২৭০০ নং হাদীস হিসাবে এটি উল্লেখ করেছেন। যা নিম্নরূপ :
۲۷۰۰ – وَقَالَ مُوسَى بْنُ مَسْعُودٍ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ سَعِيدٍ عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ عَنْ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ صَالَحَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُشْرِكِينَ يَوْمَ الْحُدَيْبِيَةِ عَلَى ثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ عَلَى أَنَّ مَنْ أَتَاهُ مِنْ الْمُشْرِكِينَ رَدَّهُ إِلَيْهِمْ وَمَنْ أَتَاهُمْ مِنْ الْمُسْلِمِينَ لَمْ يَرُدُّوهُ وَعَلَى أَنْ يَدْخُلَهَا مِنْ قَابِلٍ وَيُقِيمَ بِهَا ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَلَا يَدْخُلَهَا إِلَّا بِجُلُبَّانِ السِّلَاحِ السَّيْفِ وَالْقَوْسِ وَنَحْوِهِ فَجَاءَ أَبُو جَنْدَلٍ يَحْجُلُ فِي قُيُودِهِ فَرَدَّهُ إِلَيْهِمْ قَالَ أَبُو عَبْد اللَّهِ لَمْ يَذْكُرْ مُؤَمَّلٌ عَنْ سُفْيَانَ أَبَا جَنْدَلٍ وَقَالَ إِلَّا بِجُلُبِّ السِّلَاحِ
“(হা/২৭০০) : মূসা ইবন মাসউদ (রহ) বলেছেন, আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করেছেন সুফিয়ান বিন সাঈদ, তিনি আবী ইসহাক্ব থেকে, তিনি সাহাবী বারা বিন আযিব (রা) থেকে। তিনি বলেন : নবী (স) হুদায়বিয়ার দিন মুশরিকদের সাথে তিনটি বিষয়ে সন্ধি করেছিলেন। তা হল– মুশরিকরা কেউ (মুসলিম) হয়ে তাঁর কাছে এলে তিনি তাকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন। মুসলিমদের কেউ (মুরতাদ হয়ে) তাদের কাছে গেলে তারা তাকে ফিরিয়ে দেবে না। আর তিনি আগামী বছর মক্কায় প্রবেশ করবেন এবং সেখানে তিন দিন অবস্থান করবেন। কোষবদ্ধ অস্ত্র, তরবারী ও ধনুক ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে প্রবেশ করবেন না। ইত্যবসরে আবূ জান্দাল (রা) শৃঙ্ঙলিত অবস্থায় লাফিয়ে লাফিয়ে তাঁর কাছে এল। তাকে তিনি তাদের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। আবূ আব্দুল্লাহ (ইমাম বুখারী রহ.) বলেন : মুয়াম্মাল (রহ) সুফিয়ান (রহ) থেকে বর্ণিত হাদীসে আবূ জান্দালের কথা উল্লেখ করেন নি। তিনি “কেবল কোষবদ্ধ তরবারীসহ” এটুকু উল্লেখ করেছেন।” [সহীহ বুখারী-সন্ধি অধ্যায় بَاب الصُّلْحِ مَعَ الْمُشْرِكِينَ (মুশরিকদের সাথে সন্ধি), ফতহুল বারী ৫/২৭০০ নং হাদীস]
ইবনে হাজার (রহ) হাদীসটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন :
يعني أن مؤملا وهو بن إسماعيل تابع أبا حذيفة في رواية هذا الحديث عن سفيان وهو الثوري
“এখানে মুয়াম্মাল হলেন ইবনে ইসমাঈল, তিনি সুফিয়ান (যিনি) সওরী থেকে আবূ হুযায়ফাহর অনুসরণে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন।” [ফতহুল বারী – আলোচ্য অনুচ্ছেদ দ্র:]
‘উমদাতুল ক্বারী’তে বদরুদ্দীন আইনী হানাফী (রহ) আলোচ্য অংশটি সম্পর্কে লিখেছেন :
أبو عبد الله هو البخاري نفسه أراد أن مؤمل بن إسماعيل تابع موسى بن مسعود في رواية هذا الحديث عن سفيان الثوري
“এখানে আবূ আব্দুল্লাহ বলতে ইমাম বুখারী (রহ) স্বয়ং উদ্দেশ্য। নিশ্চয় মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈল মূসা বিন মাসউদের অনুসরণে এই হাদীসটি সুফিয়ান সওরী (রহ) থেকে বর্ণনা করেছেন।” [‘উমদাতুল ক্বারী – আলোচ্য অনুচ্ছেদ দ্র:]
সুস্পষ্ট হল, মূসা বিন মাসউদের হাদীসটির ন্যায় মুয়াম্মাল বিন ইসমাঈল (রহ) অপর একটি সনদের সুফিয়ান সওরী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য কোন একটি পূর্ণাঙ্গ সহীহ হাদীস বর্ণনার পর অপর একটি সংক্ষিপ্ত সনদের সহীহ হাদীসের প্রতি ইঙ্গিতের উদাহরণ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে।
মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈল থেকে ইমাম বুখারী (রহ) অপর একটি স্থানে পূর্ণাঙ্গ সনদসহ বর্ণনা করেছেন। দেখুন : ‘সহীহ বুখারী – কিতাবুল ফিতান بَاب إِذَا الْتَقَى الْمُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا (অনুচ্ছেদ : দু’জন মুসলিম তরবারী নিয়ে পরস্পরের মারমূখী হলে) হা/৭০৮৩।
উক্ত অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যাতে ‘মুয়াম্মাল’ সম্পর্কে ইবনে হাজার (রহ) লিখেছেন : وهو بن إسماعيل أبو عبد الرحمن البصري “তিনি ইবনে ইসমাঈল আবূ আব্দুর রহমান বসরী (রহ)।” [ফতহুল বারী ১৩ খণ্ড, আলোচ্য হাদীসের আলোচনা দ্র:]
সহীহ বুখারীর আলোচ্য বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, মুয়াম্মাল বিন ইসমাঈল (রহ) ইমাম বুখারীর (রহ)এর কাছে ‘মুনকারুল হাদীস’ হলে তিনি সহীহ বুখারীতে তাঁর বর্ণনা উল্লেখ করতেন না। তাছাড়া ইমাম বুখারীর কিতাবগুলোতে তাঁর প্রতি কোন আপত্তি পাওয়া যায় না। এজন্যে যারা তাঁকে ইমাম বুখারী থেকে ‘মুনকার’ সাব্যস্ত করেছেন, তারা মূলত মুহাম্মাদ বিন সাঈদের প্রতি ইমাম বুখারীর ‘মুনকারুল হাদীস’ সম্বোধনকে ভুলভাবে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈলের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। তাছাড়া রিজালশাস্ত্রে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈলের প্রতি ইমাম বুখারীর আপত্তি সনদহীন হিসাবে বর্ণিত হয়েছে। যা সরাসরি তাঁর থেকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

লেখক ৫৩ (পৃ: ২৯) :
তাছাড়া ইবনে সা’দ, আবূ যুরআ রাযী, আবূ হাতেম রাযী ও দারাকতুনী প্রমুখ তাকে ‘অত্যধিক ভুলের শিকার’ আখ্যা দিয়েছেন। ইবনে মাঈন এক বর্ণনায় বলেছেন, সুফয়ানের ক্ষেত্রে তিনি প্রমাণযোগ্য হওয়ার উপযুক্ত নন। মুহাম্মাদ ইবনে নসর বলেছেন, তিনি কোন বর্ণনার ক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ হলে ভেবে চিন্তে দেখতে হবে, কেননা তিনি প্রচুর ভুলের শিকার ছিলেন। ইবনে হাজার আসকালানীও ফাতহুল বারী গ্রন্থে বলেছেন, সুফইয়ান হতে মুয়াম্মালের বর্ণনাতে দুর্বলতা আছে। (দ্র: ৯খ, ২৮৮ পৃ, ৫১৭২ হাদীসের অধীনে)
বিশ্লেষণ ৫৩ : উক্ত বর্ণনাগুলো থেকে বুঝা যায়, মুয়াম্মাল বাতিল বা প্রত্যাখ্যাত নন। বরং তাঁর ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ কারণে তাঁর একক বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে অন্যদের সাক্ষ্য থাকলে তাঁর বর্ণনা ভেবে-চিন্তে নেয়ার সুযোগ আছে।
লেখক তাঁর প্রতি আপত্তিকারীদের মন্তব্যগুলো তুলে ধরেছেন। আসুন আমরা জেনে নিই মুহাদ্দিসগণের মধ্যে কারা তাঁকে মেনে নিয়েছেন। ক) ইয়াহইয়া ইবনে মু‘য়ীন তাঁকে সিক্বাহ বলেছেন (জারাহ ওয়াত তা’দিল ৮/৩৭৪)। খ) ইমাম বুখারী তাঁর থেকে সুফিয়ানের বর্ণনা ‘সহীহ বুখারী’তে উল্লেখ করেছেন (সূত্র : গত হয়েছে)। সুতরাং ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন কর্তৃক সুফিয়ানের বর্ণনার প্রতি আপত্তি শক্তিশালী হল না। গ) ইবনে হিব্বান নিজের ‘সিক্বাতে’ বর্ণনা করেছন, বলেছেন ত্রুটিযুক্ত। অর্থাৎ সিক্বাহ বর্ণনাকারী, কিন্তু ভুল হত। গ) দারা কুতনী তাকে তাঁর সূনানে (২/১৮৬ হা/২২৬১) সহীহ বলেছেন। অর্থাৎ তাঁর থেকে দু’ রকম বর্ণনা আছে। ঘ) হাকিম তাঁর মুস্তাদরাকে (১/৩৮৪) সহীহ বলেছেন। ঙ) যাহাবী তাঁকে বসরাবাসী সিক্বাহদের অর্ন্তভুক্ত করেছেন (العبر ١/٣٥٠)। চ) তিরমিযী তাঁর সূনানে (হা/৬৭২) সহীহ বলেছেন। ছ) ইবনে কাসির তাঁর তাফসীরে (৪/৪২৩) শক্তিশালী বলেছেন।
ইবনে হাজার (রহ) আবূ হাতিম থেকে সংক্ষেপে লিখেছেন : وهو صدوق كثيْر الخطأ قاله أبو حاتم الرازي
“তিনি সত্যবাদী, ব্যাপক ত্রুটি করতেন – যেভাবে আবূ হাতিম রাযী বলেছেন।” [ফতহুল বারী, ঐ]
ইবনে আবূ হাতিমের বিস্তারিত বর্ণনাটি প্রকৃতপক্ষে নিম্নরূপ : صدوق ، شديد فى السنة كثيْر الْخطأ ، يكتب حديثه
“তিনি সত্যবাদী, সুন্নাতের প্রতি দৃঢ়, অনেক ত্রুটি করতেন, তাঁর হাদীস লেখা হয়।” [কিতাবুল জারাহ ওয়াত তা’দিল ৮/৩৭৪]
মূলত এই উদ্ধৃতিটিতে মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈলে প্রতি আপত্তির সাথে সাথে গ্রহণযোগ্যতার দিকে ইঙ্গিত মেলে। কেননা এটা উসূলের হাদীসে সুস্পষ্ট যে, সিক্বাহ রাবী যখন ভুল করেন – তখন এমন রাবীর অধিকাংশের কাছে সিক্বাহ হলে, তার প্রমাণিত ত্রুটি বর্জন করে বাকী বর্ণনাগুলো হাসানুল হাদীস, সহীহুল হাদীস হয়ে থাকে। [বিস্তারিত ক্বওয়ায়িদ ফী উলূমুল হাদীস (পৃ: ২৭৫]
এরকম সিক্বাহ বর্ণনাকারী যাদের ভুলের কারণে শর্ত সাপেক্ষে গ্রহণ করা হয়, তাদের মধ্যে ইবনে লিহইয়াহ অন্যতম। অথচ তাঁর বর্ণনা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর বর্ণনার ক্ষেত্রে একাধিক সাক্ষ্য প্রমাণ মজুদ থাকার কারণেই তাঁরা তার থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন, অন্যথায় নয়। সহীহ বুখারীতে বাম হাতের যেরা‘র উপর রাখার বর্ণনা এবং সহীহ মুসলিমে বাম হাতের উপর বর্ণনাকে ব্যাখ্যা ধরলে উভয় হাত বা যেরা‘ একটি অপরটির উপর রাখা হয়। তখন মুয়াম্মাল (রহ) থেকে সহীহ ইবনে খুযায়মাহ’র على صدره (বুকের উপর) এবং বাযযারে উল্লিখিত عند صدره (বুকের নিকট) শব্দগুলো পরস্পরের পরিপূরক হয়। ফলে মুয়াম্মালের বর্ণনাকে কমপক্ষে হাসান হাদীসের মর্যাদা দেয়াটা ইনসাফের ও যুক্তিযুক্ত। কেননা সুফিয়ানে থেকে মুয়াম্মালের বর্ণনা স্বয়ং ইমাম বুখারী (রহ) ‘সহীহ বুখারী’-তে এনেছেন। তাছাড়া পরবর্তীতে লেখক কর্তৃক কয়েকটি সহীহ হাদীসও বর্ণনাটির সাক্ষ্য ও সমর্থক, যদিওবা লেখক সেগুলোর বাতিল করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।

লেখক ৫৪ (পৃ: ২৯) :
২. তাউসের বর্ণনাটি আবূ দাউদ (৭৫৯) শরীফে আছে, এটি মুরসাল। আর মুরসাল (সূত্র বিচ্ছিন্ন)কে তারা প্রামাণ্য মনে করেননা। তদুপরি এতে সুলায়মান ইবনে মূসা নামের একজন বর্ণনাকারী আছেন। তার সম্পর্কে ইমাম বুখারী র. বলেছেন, عند مناكير তার বর্ণনায় অনেক আপত্তিকর বিষয় আছে। ইমাম নাসাঈ বলেছেন, ليس بالقوى তিনি মজবুত রাবী নন। (দ্র: যাহাবীর আল কাশিফ)
বিশ্লেষণ ৫৪ ইতঃপূর্বে ৫০ নং বিশ্লেষণে আমরা জেনেছি, জাফার আহমাদ উসমানী (রহ) তাঁর বিখ্যাত হানাফী হাদীস কোষ ‘ই‘লাউস সুনানে’ হাদীসটি মুরসাল হওয়া সত্ত্বেও দলিল হিসাবে ব্যবহার বৈধ করেছেন। কেননা হানাফীগণ মহিলাদের সালাতে বুকে হাত বাঁধার বিধান হিসাবে দলিলটি গ্রহণ করেন। তাছাড়া ইমাম আবূ দাউদ বলেছেন :
وأما المراسيل فقد كان يحتج بها العلماء فيما مضى مثل سفيان الثوري ومالك بن أنس والأوزاعي حتى جاء الشافعي فتكلم فيها وتابعه على ذلك أحمد بن حنبل وغيره رضوان الله عليهم فإذا لم يكن مسند غير المراسيل ولم يوجد المسند فالمرسل يحتج به ….
“পূর্ববতী আলেম যেমন – সুফিয়ান সওরী, মালিক বিন আনাস ও আওযাঈ (রহ) মুরসাল হাদীসকে দলিল গণ্য করতেন। কিন্তু যখন ইমাম শাফেঈ (রহ) আসলেন তখন তিনি এতে আপত্তি করলেন। এ ব্যাপারে তাঁর অনুসরণ করলেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও অন্যান্যরা(রহ) । তবে যদি মুরসাল ছাড়া মুসনাদ (সূত্রযুক্ত) হাদীস না পাওয়া যায়, তাহলে মুরসালকে দলিল গণ্য করা হয়।” (রিসালাহ আবী দাউদ ইলা আহলে মাক্কাহ পৃ:২৫]
এ পর্যায়ে পূর্ববর্তী সাহাবী ওয়ায়েল (রা) ও সামনে আগত সাহাবী হুলব (রা)’এর মুসনাদ হাদীসগুলো উক্ত মুরসাল হাদীসের সাক্ষ্য। তাছাড়া সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসের সাথেও কোন সংঘর্ষ হয় না, বরং ব্যাখ্যা করে। সুতরাং এরূপ মুরসাল হাদীস গ্রহণ করাতে কোনই আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীস ঠিক এর বিপরীত।
ইমাম বুখারী (রহ)-এর কাছে সুলায়মান বিন মূসা মুনকার। এর জবাব হল, তিনি সহীহ মুসলিমের রাবী। সুতরাং তিনি সিক্বাহ। সুতরাং তাঁর থেকে প্রমাণিত ভুলটিই কেবল মুনকার। অথচ তাঁর আলোচ্য বর্ণনার সমর্থনে আরো সাক্ষ্যমূলক বর্ণনা রয়েছে। সুতরাং এক্ষেত্রে তাঁর বর্ণনাটি মুনকার বলার সুযোগ থাকছে না। তাছাড়া তাঁকে ব্যাপক সংখ্যক মুহাদ্দিস সিক্বাহ গণ্য করেছেন। যেমন –
قال ابن عدى : ثبت صدوق قال يحيى بن معين : سليمان بن موسى ثقة وحديثه صحيح عندنا قال دحيم : ثقه
“ইবনে আদী (রহ) বলেছেন : সে প্রমাণিত সত্যবাদী। ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন বলেছেন : সুলায়মান বিন মূসা সিক্বাহ, তাঁর হাদীস আমাদের কাছে সহীহ। দাহীম বলেছেন : সে সিক্বাহ।” (তাহযীবুত তাহযীব ৪/১৯৮ পৃ:]
قال ابة حاتم : سليمان بن موسى محله صدوق وفى حديثه بعض الاضطراب
“আবূ হাতিম বলেছেন : সে সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত, তাঁর হাদীসে কিছু ইযতিরাব থাকে।” (জারাহ ওয়াত তা’দিল ৩/৪২ পৃ:)
ذكره ابن حبان فى الثقاة
“ইবনে হিব্বান তাঁকে সিক্বাতে এনেছেন।” (মীযানুল ই‘তিদান ৩/৩১৯)
সস্পষ্ট হল, সুলায়মান বিন মূসা সিক্বাহ বর্ণনাকারী হওয়ায় তাঁর ঐ বর্ণনাই বাতিল হবে যে ভুলটি প্রমাণিত। কিন্তু এক্ষেত্রে তাঁর বর্ণনাটির পক্ষে আরো সাক্ষ্য প্রমাণ আছে। সুতরাং বর্ণনাটি মুনকার হওয়ার কোন সম্ভবনাই নেই। বরং অন্যান্য সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কমপক্ষে হাসানুল হাদীস। তাঁর মৃত্যুর পূর্বে স্মরণ শক্তি লোপের কারণে ভুল হওয়ার সম্ভাবনার ব্যাপারে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু অন্যান্য বর্ণনাতে তার ব্যবহৃত শব্দ থাকায় উক্ত আপত্তিও বাতিল হল।
ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন ও ইমাম নাসাঈকে হাদীস সমালোচক হিসাবে কঠোর গণ্য করা হয়। কিন্তু ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন তাঁকে সিক্বাহ গণ্য করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম নাসায়ী সুলায়মান ইবনে মূসার প্রতি আপত্তি করেছেন। এমতাবস্থায় তিনি হাসানুল হাদীস। উল্লেখ্য তিনি সহীহ মুসলিমেরও রাবী। এ পর্যায়ে মুরসাল হাদীস হওয়ায় এটি অন্যান্য সহীহ হাদীসের সাক্ষ্যমূলক হাদীস হিসাবে গ্রহণযোগ্য। মূল হিসাবে নয়।

লেখক ৫৫ (পৃ: ২৯) :
৩. হযরত ইবনে আব্বাস রা. এর হাদীসটি বায়হাকীতে আছে। এটির সনদে রাওহ্ ইবনুল মুসায়্যাব আছে, তিনি চরম দুর্বল রাবী। ইবনে হিব্বান তার সম্পর্কে বলেছেন, তিনি বিশ্বস্ত লোকদের সূত্রে জাল হাদীস বর্ণনা করতেন, তার থেকে হাদীস নেওয়া বৈধ হবেনা। ইবনে আদী বলেছেন, احاديث غير محفوظ তার হাদীস সঠিক নয়। (তাহযীবুত তাহযীব)
বিশ্লেষণ ৫৫ লেখক কেবল আপত্তিগুলো উল্লেখ করেছেন। তবে তার উল্লিখিত সূত্রে পেলাম না। কথাগুলো আমরা পেয়েছে ‘লিসানুল মীযানে (১৮৮৬)’। সেখানে আরো আছে : ইবনে মুঈন বলেছেন : সে صويلح …. আবূ হাতিম বলেছেন : সালেহ কিন্তু শক্তিশালী নয়। … বাযযার তাঁর মুসনাদে বলেছেন : … রাওহ বিন মুসায়্যাব আলকালবী সিক্বাহ ….।
আলোচ্য হাদীসটির পূর্ণাঙ্গ বর্ণনাটি হল :
قَوْلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ( فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ) قَالَ : وَضْعُ الْيَمِينِ عَلَى الشِّمَالِ فِى الصَّلاَةِ عِنْدَ النَّحْرِ
“আল্লাহ তা‘আলার বাণী : فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ “সুতরাং আপনার রবের জন্য সালাত পড়ুন ও নহর করুন” (সূরা কাওসার : ৩)। ইবনে আব্বাস (রা) এর ব্যাখ্যায় বলেন : সালাতে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা নহরের কাছে।” (সুনানে বায়হাক্বী হা/২৪৩৩)
হাদীসটির দুর্বলতা মেনে নিলেও নহর শব্দটির সাথে বুকের সম্পর্ক রয়েছে। ইমাম রাযী (রহ) লিখেছেন :
قال الواحدى واصل هذه الاقوال كلها من النحر الذى هو الصدر
“ওয়াহিদী বলেছেন : এই সমস্ত (ইবনে আব্বাস, আনাস ও আলী রা.-এর) উক্তিগুলোর প্রত্যেকটির মধ্যে নহর আছে। যা মূলে সদর বা বুক।” (তাফসীরে কাবীর ২/১৩৫)
আরবি ভাষার বিখ্যাত অভিধান ‘আল-মুনজিদে’ النحر والنحور এর অর্থ على الصدر – বুকের উপর। অপর একটি আরবি অভিধান ‘ফিক্বহুল লিসানে’ النحر الصدر والنحور الصدور (পৃ: ৩৪)। মুজামুল ওয়াসিতে’ আছে : اعلى الصدر النحر অর্থাৎ নহর হল – বুক বা বুকের উপরের অংশ।

এ থেকে সুস্পষ্ট হয়, আরবি ভাষার সাধারণ দাবী অনুযায়ী উক্ত তাফসীর সহীহ।

লেখক ৫৬ (পৃ: ২৯৩০) :
৪. হযরত আলী রা. এর হাদীসটি বুখারী র. এর তারীখে কাবীরে আছে। এই হাদীসটির ব্যাপারে তিনটি আপত্তি আছে:
এক, হযরত আলী রা, থেকে যিনি এটি বর্ণনা করেছেন, তার নাম নিয়ে বর্ণনাকারীগণ বিভিন্ন কথা বলেছেন। ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদ ইবনে আবুল জা’দ তার নাম বলেছেন উকবা ইবনে যুহায়র (عقبة بن ظهير). হাম্মাদ ইবনে সালামা তার নাম বলেছেন উকবা ইবনে যাবয়ান (عقبة بن ظبيان), আর আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী র. বলেছেন উকবা ইবনে সাহবান (عقبة بن صهبان)। আবার উকবা থেকে এটি কে বর্ণনা করেছেন তা নিয়েও দ্বিমত আছে। ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদ বলেছেন আসিম আল জাহদারীর নাম। কিন্তু হাম্মাদ ইবনে সালামা বলেছেন আসিমের পিতার নাম। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় এটাকে সনদের এযতেরাব বলা হয়, যা একটি হাদীস দুর্বল প্রমাণিত হওয়ার অন্যতম কারণ। দ্র: ইলালে দারাকুতনী, ৪ক, ৯৯ পৃ; আল জারহু ওয়াত তা’দীর লি ইবনি আবী হাতিম, ৬খ, ৩১৩ পৃ।
বিশ্লেষণ ৫৬ লেখক মুযতারাবের কারণে হাদীসটিকে যঈফ বলতে চেয়েছেন। আসুন প্রথমে জেনে নিই মুযতারাব হাদীস কী? ইমাম ইবনে সিলাহ মুযতারাব হাদীস সম্পর্কে বলেছেন :
المضطرب من الحديث : هو الذي تختلف الرواية فيه فيرويه بعضهم على وجه وبعضهم على وجه آخر مخالف له وإنما نسميه مضطربا إذا تساوت الروايتان أما إذا ترجحت إحداهما بحيث لا تقاومها الأخرى : بأن يكون راويها أحفظ أو أكثر صحبة للمروي عنه أو غير ذلك من وجوه الترجيحات المعتمدة فالحكم للراجحة ولا يطلق عليه حينئذ وصف المضطرب
“মুযতারাব হাদীস হল, বর্ণনাতে পার্থক্য থাকা, এতে বর্ণনাকারীদের কেউ একভাবে বর্ণনা করে আর কেউ তার বিরোধী বর্ণনা করে। একে তখনই মুযতারাব নাম দেয়া হয়, যখন বর্ণনা দু’টি সমস্তরের হয়। তাদের মধ্যে একটিকে অপরটির চেয়ে প্রাধান্য দেয়া সম্ভব হয় না। পক্ষান্তরে কোন বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি বেশী হওয়া, বা বর্ণনাকারীর সঙ্গ তার সাথে বেশী হওয়ার মর্যাদা অর্জিত হওয়া। কিংবা প্রাধান্য দান পদ্ধতির কোন একটি অর্জিত হওয়া। সেক্ষেত্রে হুকুম হল, প্রাধান্য দান করা এবং এ ধরনের অবস্থার জন্য (বর্ণনাকে) মুযতারাব গণ্য করা যাবে না।” (মুক্বাদ্দামাহ ইবনে সিলাহ)
ইমাম ইবনে সিলাহ’র আলোচ্য উল্লিখিত সঙ্গার আলোকে আলী (রা)এর তাফসীরটির মুযতারাবের অবস্থা আমরা জানতে পারব।
আসিম ইবনুল আজ্জাজ আলজাহদারী নিজের শায়েখের নাম কখনো নসবহীন উক্ববাহ, কখনো উক্ববাহ বিন সাহবান, কখনো উক্ববাহ বিন যাবয়ান, আবার কখনো উক্ববাহ বিন যুহায়র উল্লেখ করেছেন। ইমাম বুখারী ও ইমাম আবূ হাতিম (রহ)এর নিকট আসিমের শায়েখের নাম উক্ববাহ বিন যাবয়ান। অথচ তাঁরাই তাঁকে উক্ববাহ বিন যুহায়র হিসাবেও চিহ্নিত করেছেন। কোন ব্যক্তিকে একাধিকভাবে সম্বোধন বিবেক ও দলিল কোন দিক থেকেই অবাস্তব নয়। ঈসা (আ)-কে নসবহীনভাবেও ডাকা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন : إِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَىٰ إِنِّي مُتَوَفِّيكَ “আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বলবেন, হে ঈসা! আমি তোমাকে নিয়ে নেবো” (সূরা আলে ইমরান : ৫৫)। আবার তাঁর মা মারইয়ামের সাথে নসব উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন : وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ “আর যখন আল্লাহ বললেন, ইয়া ঈসা ইবনে মারইয়াম!” (সূরা মায়িদা : ১১৬)। আবার তাঁকে মাসীহ উপাধিসহও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন : لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ “তারা কাফের, যারা বলে যে, মরিময়-তনয় মসীহ-ই আল্লাহ” (সূরা মায়িদা : ৭২) ।
সুস্পষ্ট হল, বিভিন্নভাবে একই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করাটা কোন ভুল বা স্ববিরোধী বিষয় নয়। এ কারণে এই বিষয়টিতে ইযতিরাবের দোষটি প্রযোজ্য হয় না।
অতঃপর লেখক উক্ববা’র পরবর্তী বর্ণনাকারীদের নাম নিয়ে বিতর্কের কথা বলেছেন। নিচের দু’টি সনদ লক্ষ্য করুন :
ক) সুনানে বায়হাক্বী (২/৪০৬/২৪২৫) :
وَرَوَاهُ الْبُخَارِىُّ فِى التَّارِيخِ فِى تَرْجَمَةِ عُقْبَةَ بْنِ ظَبْيَانَ عَنْ مُوسَى بْنِ إِسْمَاعِيلَ عَنْ حَمَّادِ بْنِ سَلَمَةَ سَمِعَ عَاصِمً الْجَحْدَرِىَّ عَنْ أَبِيهِ عَنْ عُقْبَةَ بْنِ ظَبْيَانَ عَنْ عَلِىٍّ (فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ) وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى وَسْطِ سَاعِدِهِ عَلَى صَدْرِهِ. أَخْبَرَنَاهُ أَبُو بَكْرٍ الْفَارِسِىُّ أَخْبَرَنَا أَبُو إِسْحَاقَ الأَصْبَهَانِىُّ أَخْبَرَنَا أَبُو أَحْمَدَ بْنُ فَارِسٍ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ الْبُخَارِىُّ رَحِمَهُ اللَّهُ قَالَ أَخْبَرَنَا مُوسَى حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ فَذَكَرَهُ.
খ) সুনানে বায়হাক্বী (২/৪১৩/২৪৩১) :
أَخْبَرَنَا أَبُو بَكْرٍ : أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدُ بْنِ الْحَارِثِ الْفَقِيهُ أَخْبَرَنَا أَبُو مُحَمَّدِ بْنُ حَيَّانَ أَبُو الشَّيْخِ حَدَّثَنَا أَبُو الْحَرِيشِ الْكِلاَبِىُّ حَدَّثَنَا شَيْبَانُ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ حَدَّثَنَا عَاصِمٌ الْجَحْدَرِىُّ عَنْ أَبِيهِ عَنْ عُقْبَةَ بْنِ صُهْبَانَ كَذَا قَالَ إِنَّ عَلِيًّا رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ فِى هَذِهِ الآيَةِ (فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ) قَالَ : وَضْعُ يَدِهِ الْيُمْنَى عَلَى وَسْطِ يَدَهِ الْيُسْرَى ، ثُمَّ وَضْعُهُمَا عَلَى صَدْرِهِ.
‘খ’ নং সনদের বর্ণনাটি থেকে প্রমাণিত হয়, ‘ক’ নং সনদটির মূসা বিন ইসামঈলের (রহ) বর্ণনা মাহফুয। পক্ষান্তরে ইয়াযীদের বর্ণনাটি শায ও মারদুদ। কেননা মূসা বিন ইসমাঈলের মুতাবিয়াত (সমর্থক) শেষোক্ত শায়বান (বিন ফারুখ) রয়েছে। উল্লেখ্য শায়বান বিন ফারুখ সহীহ মুসলিমের রাবী। তাছাড়া হাম্মাদ বিন সালামাহ থেকে মূসা বিন ইসমাঈলের শোনাটাও প্রমাণিত। যেভাবে যাহাবী (রহ) বলেছেন : وسمع من حماد بن سلمة تصانفه (তাযকিরাতুল হুফফায ১/৩৯৪)। তাছাড়া মূসা বিন ইসমাঈলও সহীহ মুসলিমের রাবী। এ পর্যায়ে আলী (রা)এর বর্ণনাটি মাহফুয হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা পেল। তাছাড়া বুকে হাত বাঁধার বর্ণনাগুলো পরস্পরকে সমর্থন করে বিধায় এগুলো গ্রহণযোগ্য। শায়েখ আলবানী (রহ) লিখেছেন :
وهذا إسناد مرسل جيد ، رجاله كلهم موثقون ، وينبغي أن يكون حجة عند الجميع ؛ لأنه – وإن كان مرسلا ؛ فإنه – قد جاء موصولا من أوجه أخرى
“হাদীসটি মুরসাল জাইয়েদ। এর সমস্ত বর্ণনাকারী সিক্বাহ। সবারই উচিত এটিকে দলিল হিসাবে গ্রহণ করা। কেননা যদিও এটি মুরসাল কিন্তু এর অন্যান্য মাওসুল (অবিচ্ছিন্ন সূত্রের) বর্ণনাও আছে।” [আসলি সিফাতুস সালাত পৃ: ২১৪]
অতঃপর তিনি ইবনে আব্বাস (রা) ও আলী (রা) থেকে দু’টি হাসান মাওসূল সূত্রের বর্ণনাকে পূর্বোক্ত হাদীস দু’টির সা্ক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

লেখক ৫৭ (পৃ: ৩০) :
দুই, হযরত আলী রা, থেকে এহাদীসটি একই সনদে ইবনে আবী হাতেম আল জারহু ওয়াত তা’দীল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সেখানে নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখার কথা আছে, ‘বুকের উপর’ (على الصدر) কথাটি নেই। একইভাবে ইবনে আবী শায়বা র, ও মুসান্নাফে এটি উল্লেখ করেছেন সেখানেও বুকের উপর কথাটি নেই। দ্র: হাদীস নয় ৩৯৬২।
বিশ্লেষণ ৫৭ পূর্বের বিশ্লেষণে একাধিক সনদে ‘বুকের উপর’ হাত রাখার বর্ণনা মাহফুয বা সুরক্ষিত হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ পর্যায়ে ইবনে আবী হাতিমের বর্ণনাটি সংক্ষিপ্ত। তাছাড়া তাতে নাভির নীচে হাত রাখার কথাও বর্ণিত হয় নি। অথচ নাভির নীচে হাত রাখার বর্ণনাগুলো সহীহ বুখারী’র যেরা (বাহু)এর বর্ণনা, আবূ দাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে হিব্বানের বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার বর্ণনাগুলোর বিরোধী বিধায় শায হওয়ার কারণে যঈফ। যেমন মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’র বর্ণনাটির বিশ্লেষণ পূর্বে গত হয়েছে (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৪২’)। আর আবূ দাউদের বর্ণনাটি সনদগত দিক থেকে যঈফ ও মুনকার। সুতরাংইবনে আবী হাতেমের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে হানাফীদের খুশী হওয়ার কিছু নেই।

লেখক ৫৮ (পৃ: ৩০) :
তিন, ইমাম বুখারী র, তার আততারীখুল কাবীর গ্রন্থে উক্ত হাদীসকে সমর্থন করেননি, বরং সেটি উল্লেখ করার পর বলেছেন,
وقال قتيبة عن حميد بن عبج الرحمن عن يزيد بن أبى الجعد عن عاصم الجحدري عن عقبة من أصحاب على عن على رضـ وضعها على الكرسوع. ٦ظ٤٣٧
অর্থাৎ কুতায়বা র. হুমায়দ ইবনে আব্দুর রহমানের সূত্রে ইয়াযীদ ইবনে আবুল জা’দ থেকে, তিনি আসিম জাহদারীর সূত্রে হযরত আলী রা, এর ছাত্র উকবা থেকে, তিনি হযরত আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তনি তার হাত কব্জির উপর রাখলেন।
বিশ্লেষণ ৫৮ : ইমাম বুখারী (রহ)এর পূর্ণাঙ্গ বর্ণনাটি নিম্নরূপ :
قال موسى حدثنا حماد بن سلمة سمع عاصم الجحدري عن أبيه عن عقبة بن ظبيان عن علي رضى الله تعالى عنه فصل لربك وانحر وضع يده اليمني على وسط ساعده على صدره وقال قتيبة عن حميد بن عبد الرحمن عن يزيد بن أبي الجعد عن عاصم الجحدري عن عقبة من أصحاب علي عن علي رضى الله تعالى عنه وضعها على الكرسوع
“মূসা বলেন : আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ বিন সালামহ, তিনি (হাদীস) শুনেছেন আসিম আলজাহদারী থেকে তিনি তার পিতা থেকে তিনি উক্ববাহ বিন যাবয়ান থেকে তিনি আলী (রা) থেকে ‘ফাসল্লিলি রব্বিকা ওয়ানহার’ – (অর্থ) ডান হাতটি বাম বাহুর মধ্যে রেখে বুকের উপর রাখতেন। আর কুতায়বাহ বলেছেন : তিনি হুমায়দ বিন আব্দুর রহমান থেকে, তিনি ইয়াযীদ আবুল জা’দ থেকে, তিনি আসিম আলজাহদারী থেকে, তিনি আলী (রা)এর সাথীদের মধ্যে উক্ববাহ থেকে, তিনি আলী (রা) থেকে, তিনি তাঁর হাত কব্জির উপর রাখলেন।” (তারীকুল কাবীর ৬/৪৩৭ পৃ: ‘আসিম বিন উক্ববা’র আলোচনা দ্র:)
লক্ষণীয়, একটি বর্ণনাতের وسط ساعده (বাহুর মাঝে) অপর বর্ণনাটিতে على الكرسوع (কব্জির উপর)। উভয় বর্ণনাটিতে একত্রে এভাবে আমল করা যায় যে, ডান হাতটি বাম হাতের উপর এমনভাবে থাকবে যেন ডান হাতটি বামহাতটির কব্জি ও বাহুর মাঝামাঝি অবস্থাতে থাকবে। সহীহ বুখারী’র যেরা (বাহু)এর বর্ণনা, আবূ দাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে হিব্বানের বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার বর্ণনাগুলো একত্রে ব্যাখ্যা নিলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়। আমরা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে হাদীসে ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছি। অথচ হানাফীরা নিজের পক্ষ থেকে শব্দ যুক্ত করে মনগড়া সমন্বয় করেছে।
লেখক বলতে চেয়েছেন ইমাম বুখারী (রহ) ‘বুকের উপর’ কথাটিকে সমর্থন করেন নি। অথচ ইমাম বুখারী (রহ)এর পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যটি পাঠ করে এমন কোন অসমর্থন আমরা দেখছি না। বরং বলা যায়, ইমাম বুখারী (রহ) একটি বিস্তারিত বর্ণনা এনেছেন যেখানে বাহুর উপর ও বুকের উপর উভয় শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। পরের বর্ণনাটিতে কব্জির উপর বর্ণনা করা হয়েছে। আমাদের কাছে এখানে একটি অপরটির ব্যাখ্যা। তাছাড়া বিস্তারিত বর্ণনাটির প্রমাণে সাক্ষ্য প্রমাণ বেশী বিধায় সেটা মাহফুয। পক্ষান্তরে প্রথমটিকে পরেরটিকে বিরোধী গণ্য করলে প্রকারান্তরে পরেরটিই বাতিল হয়। কেননা তা সংক্ষিপ্ত। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক্ব দিন।
লেখকের উপস্থাপনাতে কুরআনের আয়াতের তাফসীর হিসাবে ‘সালাতে হাত বাঁধার’ বক্তব্যকে গ্রহণ করার ব্যাপারে কোন আপত্তি করা হয় নি। আপত্তি করা হয়েছে, ‘বুকের উপর’ শব্দটি নিয়ে। অর্থাৎ লেখক প্রকারান্তরে হাদীসটির আংশিক তাফসীর মেনে নিয়েছেন। আমরা কিছু পূর্বে দেখিয়েছি ‘নহর’-এর শাব্দিক বিশ্লেষণে উক্ত তাফসীরের প্রয়োগটিও গ্রহণযোগ্য। উল্লেখ্য ‘নহর’ বলতে ‘কুরবানী’ এর অর্থ করা এর সাথে কোন বিরোধ নয়। বরং সেটিও আয়াতটির অপর একটি দাবী।

লেখক ৫৯ (পৃ: ৩০) : এসব কারণে আল্লামা ইবনে কাছীর র. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে সূরা কাওছারের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ হাদীসটি সহীহ নয়।
বিশ্লেষণ ৫৯ : ইমাম ইবনে কাসিরের উক্তিটি আলী (রা)এর হাদীসটির ব্যাপারে। উক্ত হাদীসটির সমর্থনে একাধিক সাক্ষ্য প্রমাণ থাকাই হাদীসটি গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করা যায়। যেভাবে শায়েখ আলবানী (রহ)এর বিশ্লেষণ উল্লেখ করেছি। তেমনি ইমাম হাকিম (রহ) লিখেছেন : إنه أحسن ما روي في تأويل الآية “নিশ্চয় আয়াতের ব্যাখ্যা হিসাবে এটি একটি উত্তম বর্ণনা।” [নায়লুল আওতার, অনুচ্ছেদ : সালাতে হাত বাঁধা]

লেখক ৬০ (পৃ: ৩১) : 
৫. হযরত হুলব রা, এর হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে (৬/২২৬) আছে। সুফইয়ান হতে শুধ ইয়াহয়াই বুকের উপর হাত বাঁধার কথাটি উল্লেখ করেছেন। মুসনাদের আহমদে ওয়াকী র., দারাকুতনীতে ওয়াকী ও আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী র. দুজন সুফইয়ান থেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তাদের বর্ণনায় বুকের উপর হাত বাঁধার কথা নেই। তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও মুসনাদের আহমদের সুফয়ানের সঙ্গী আবুল আহওয়াস একই উস্তাদ ‘সিমাক’ থেকে এটি র্বণনা করেছেন। তাদের কারো বর্ণনাতেই বুকের উপর হাত বাঁধার কথা নেই্। সুতরাং এটি শায হাদীস, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্লেষণ ৬০ : কেবল মুসনাদে আহমাদে নয় বরং ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ) নিজস্ব সনদে সুফিয়ান সওরী (রহ) থেকে ‘বুকের উপর’ শব্দসহ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সনদসহ বর্ণনাটি নিম্নরূপ :
أَخْبَرَنَا ابْنُ الْحُصَيْنِ، قَالَ: أَنْبَأَنَا ابْنُ الْمُذْهِبِ، قَالَ: أَنْبَأَنَا أَحْمَدُ بْنُ جَعْفَرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَحْمَدَ، قَالَ: حَدَّثَنِي أَبِي، قَالَ: حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ: حَدَّثَنِي سِمَاكٌ، عَنْ قَبِيصَةَ بْنِ هُلْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: ” رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ $ يَضَعُ هَذِهِ عَلَى هَذِهِ عَلَى صَدْرِهِ “، وَوَضَعَ يَحْيَى الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى فَوْقَ الْمِفْصَلِ [التحقيق لابن جوزى ج۱ صـ ۳۳٨]
তাছাড়া সহীহ ইবনে খুযায়মাতেও মুআম্মাল (রহ) সুফিয়ান সওরী থেকেই বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীস বর্ণনা করেছেন। এছাড়া পূর্ববর্তী সাক্ষ্যমূলক বর্ণনাগুলোতো রয়েছেই।
হাদীসটিতে নাভির নীচে হাত বাঁধার কথাও নেই। যদি হাতের উপর হাত রাখার বর্ণনার কারণে বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীস শায হয়, তবে নাভির নীচে বর্ণনাটি কেন শায নয়? এখানে সে আলোচনা কেন করা হল না?! অথচ বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসের সাক্ষ্য প্রমাণ অনেক বেশী। তাছাড়া সহীহ মুসলিমের ডান হাতটি বাম হাতের উপর বর্ণনাটিকে সহীহ বুখারী’র যেরার বর্ণনা এবং আবূ দাউদ- নাসাঈ-ইবনে হিব্বানের হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার বর্ণনাগুলো পরস্পরের ব্যাখ্যা গণ্য করা যায়। আলোচ্য বর্ণনাটির অবস্থাও একই। কিন্তু হানাফীদের মূল বর্ণনা কব্জির উপর কব্জি রেখে নাভির নীচে রাখার বর্ণনার সাথে ঐ বর্ণনাগুলোর সমন্বয় অকল্পনীয়। অথচ হাতের হাত রাখার বর্ণনাগুলো বুকের উপর হাত বাঁধার বিরোধিতা করে না। সুতরাং বর্ণনাটি শায নয়।
ইমাম তিরমিযী (রহ)-ও বর্ণনাটি আলোচ্য সনদে বর্ণনা করেছেন। যা তিরমিযী কোন কোন সংস্করণে আহমাদে বর্ণিত বুকের উপর রাখার বক্তব্য রয়েছে। যেমন মুহাদ্দিস আব্দুর হক্ব হানাফী (রহ) লিখেছেন :
وھمچنیں روایت کرد ترمذی از قبضہ بن ھلب ازپدرش کہ گفت دیدم رسول خدا $ کہ می نھاد دست خود را دابر سینہ خود
“ইমাম তিরমিযী (রহ) ক্ববীযাহ বিন হুলবের মধ্যস্থতায় হুলব তাঈ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি নবী (স)-ক ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকে বাঁধতে দেখেছেন।” (শরহে সফরুস সাআদাত পৃ: ৪৪)
এই হাদীসটির অপর বর্ণনাকারী সিমাক ইবনে হরব। তিনি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের রাবী। সুতরাং তার প্রতি আপত্তিও প্রত্যাখ্যাত।

লেখক ৬১ (পৃ: ৩১) : 
আল্লামা নিমাবী র. আছারুস সুনান গ্রন্থে লিখেছেন,
ويقع فى قلبى ان هذا تصحيف من ااتب واالصحيح يضع هذه على هذه فينا سبه قوله وصف يحيى اليمنى على اليسرى قرق المفصل صـ ٨٧ ويوافقه سائر الروايات
অর্থাৎ আমার মনে হয়, অনুলেখকের ভুলের কারণে এমনটি হয়েছে। সঠিক হবে على الصدره (বুকের উপর) এর স্থলে هذه على هذه (এই হাতের উপর)।[এ হিসেবে হাদীসটি অর্থ দাঁড়ায় – এই হাতটি ‍এই হাতের উপর রেখেছেন-অনুবাদক]। এতে এটি পরের কথার সঙ্গেও মিলে যায়। কারণ পরে বলা হয়েছে, ইয়াহইয়া ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রেখে দেখিয়েছেন, আর এটি তখন অন্যান্য বর্ণনাকারীদের বর্ণনার সাত্রে সংগতিপূর্ণ হয়। (দ্র. পৃ ৮৭)
বিশ্লেষণ ৬১ : আল্লামা নিমবী’র উক্তি থেকেই প্রমাণিত হয়, বক্তব্যটি তাঁর ধারণা। অর্থাৎ তিনি এটিকে প্রমাণ হিসাবে উল্লেখ করেন নি। মুসনাদে আহমাদ ছাড়া ইবনে জাওযী (রহ) থেকেও তাঁর নিজস্ব সনদে ‘বুকের উপর’ শব্দসহ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৬০’)। এছাড়া সহীহ হাদীসসমূহে হাত বাঁধার অধিকাংশ বিবরণ থেকে বুকের উপর বা নিকট শব্দগুলোর পরিপূরক বর্ণনা এসেছে। সুতরাং বিভিন্ন সাক্ষ্যে প্রমাণিত বুকের উপর হাত রাখার বিষয়টি কারো মাযহাবী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাতিল করার মনোভাব নিতান্তই মানসিক বিকৃতি। আর কব্জির উপর হাত রাখার দ্বারা ‘বুকের উপর’ হাত রাখার কোন বিরোধিতা হয় না। কেননা এখানে কব্জির উপর হাতের তালুকে রাখতে বলা হয় নি। এ পর্যায়ে নাসাঈ-আবূ দাউদ-সহীহ ইবনে হিব্বানে বর্ণিত বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর বর্ণনার সাথে সহীহ বুখারী বাম যেরা‘র বর্ণনাটি ব্যাখ্যা হিসাবে গণ্য হয়। এমতাবস্থায় হাতটি বুকের উপর বা কাছে উভয় অবস্থায় রাখা যায়। সুতরাং সংক্ষিপ্ত বর্ণনাগুলো বিস্তারিত বর্ণণা দ্বারা ব্যাখ্যা নিলে কোন দ্বন্দ্ব থাকে না। তাছাড়া হানাফীদের মহিলারা কব্জির উপর থেকে বুকের উপর হাত বেঁধে থাকে। যা উক্ত হাদীসটির মাধ্যমে বুকের উপর হাত রেখে আমল করার ব্যাখ্যা স্বয়ং হানাফীদের পক্ষ থেকেই রয়েছে।

লেখক ৬২ (পৃ: ৩১) :
এ হিসেবে এই হাদীসটি হানাফীদের দলিল হয়ে যায়। এখানে লক্ষ্য করুন, একটি দলিলও তাদের সহীহ নেই। পক্ষান্তরে আমাদের ১ ও ৫ নং হাদীস দুটি সহীহ। ৬ নং হাদীসটি হাসান।
বিশ্লেষণ ৬২ বরং হানাফীদের পুরুষদের আমলের বিরোধী হয়। কেননা হানাফীদের আমলের সাথে মৌলিকভাবে যে দলিলটি সাদৃশ্যপূর্ণ হয় সেটি হল, সাহাবী আলী ও আবূ হুরায়রা (রা)এর বর্ণিত আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক্বের যঈফ ও মুনকার হাদীস। সেখানে বলা হয়েছে তালুর উপর তালু নাভির নীচে রাখা। অথচ আমরা পূর্বে প্রমাণ করেছি সালাতের হাদীসগুলোতে হাত ও তালুকে বিশেষভাবে পৃথক করে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-২৩, ২৬’)
উক্ত ১ নং বর্ণনাটির উপর স্বয়ং হানাফীদের আপত্তির বিবরণ পূর্বে উল্লেখ করেছি (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৪২’)। ৫ নংটি তাবেঈর উক্তি। যা নবী (স) ও সাহাবীদের ব্যাপক সংখ্যক বর্ণনার বিরোধী বিধায় পরিত্যাজ্য।

লেখক ৬৩ (পৃ: ৩১৩২) : 
তিরিমযিী র. এর যুগে ও তাঁর পূর্বে বুকে হাত বাঁধার প্রচলন ছিলনা
ইমাম তিরমিযী র. হযরত হুলব রা. এর হাদীস উল্লেখ করে বলেছেন,
والعمل على هذا عند أهل العلم من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم والتابعين ومن بعدهم، يرون أن يضع الرجل يمينه على شماله في الصلاة، ورأى بعضهم أن يضعهما فوق السرة، ورأى بعضهم أن يضعهما تحت السرة، وكل ذلك واسع عندهم.
অর্থাৎ সাহাবী, তাবেয়ী ও পরবর্তী যুগের আলেমগণের আমল ছিল এ হাদীসের উপর। তাঁরা মনে করতেন, নাভির উপরে রাখবে, আর কেউ কেউ মনে করতেন নাভির নীচে রাখবে। তাঁদের দৃষ্টিতে প্রত্যেকটিরই অবকাশ আছে।
বিশ্লেষণ ৬৩ : ইমাম তিরমিযী (রহ)’র পূর্বে ইমাম শাফেঈ (রহ) বুকের উপর হাত বাঁধার উপর হাদীস বর্ণনা ও আমল করেছেন। অনুরূপ বর্ণনা ইমাম আহমাদ (রহ) থেকেও বুকের উপর হাত বাঁধা প্রমাণিত।
আমরা ইমাম নববী (রহ)এর উদ্ধৃতি থেকে দেখেছি তিনি বলেছেন ‘হাত বাঁধতে হবে নাভির উপরে বুকের নিচে’। অথচ দলিল উপস্থাপন করেছেন সহীহ ইবনে খুযায়মাহ থেকে ‘বুকের উপর হাত রাখার’ হাদীসটিকে (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৩৭’)। অর্থাৎ পূর্ববর্তী মুহাদ্দিসগণ ক্ষেত্র বিশেষে সমস্ত হাদীসের মধ্যে সমন্বয়ের প্রেক্ষিতে বুকের উপর, বুকের নিকট ও নাভির উপর বর্ণনাগুলোকে পরিপূরক ও ব্যাখ্যা গণ্য করেছেন। আর হাতের উপর হাত রাখার মৌলিক সহীহ বর্ণনার সাথে সালাতের মধ্যে ‘হাত’ শব্দের বিভিন্ন ব্যবহার থেকে এই উপস্থাপনাকে গ্রহণ করা যায়। পক্ষান্তরে নাভির নীচের বর্ণনা সর্বসম্মত যঈফ এবং অগ্রহণযোগ্য। এ পর্যায়ে ইমাম তিরমিযী’র উপস্থাপনার সত্যতা অন্যান্য ইমামদের ব্যাখ্যা ও সাক্ষ্যের মুখাপেক্ষী। অর্থাৎ তাঁর থেকে উপস্থাপিত আলেমদের মতামত ‘নাভীর উপরে’র বর্ণনাটি ‘বুকের উপর বা নিকট’ বর্ণনাগুলোর পরিপূরক বিধায় সহীহ ও গ্রহণযোগ্য। এই সহীহ হাদীসের উপর আমল হানাফীদের মহিলাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত আছে। পক্ষান্তরে ঐ আলেমদের মতামত প্রত্যাখ্যাত যারা যঈফ ও মুনকার হাদীস দ্বারা নাভির নীচে হাত বাঁধার মতামত ব্যক্ত করেছেন।
উক্ত বিশ্লেষণ থেকে লেখকের উক্তি ‘তিরিমযিী র. এর যুগে ও তাঁর পূর্বে বুকে হাত বাঁধার প্রচলন ছিলনা’ বাতিল প্রমাণিত হল। তাছাড়া লেখক বুকের উপর হাত বাঁধার ব্যাপারে যতটা বিদ্বেষ পোষণ করেছেন, পূর্ববর্তী হানাফী আলেমদের মধ্যে আমরা সেটা দেখি নি। বরং এ যামানার হানাফী দেওবন্দীদের নিকট শায়খুল ইসলাম খ্যাত তাক্বী উসমানীর সূত্রে ইমাম ইবনুল হুমাম হানাফী থেকে জানতে পেরেছি। তারা বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসকে ক্বিয়াসের দ্বারা মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য করেছেন। যদিওবা হাদীসের উপস্থাপনাতে যাদের সালাতের বিবরণ রয়েছে তারা সবাই পুরুষ। আমরা লেখকের বুকের উপর হাত বাঁধার বিদ্বেষ নিরসণের জন্য এ সম্পর্কে উদারপন্থী হানাফী আলেমদের সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছি (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-২৫’)।
আরো দেখুন, ইমাম বদরুদ্দীন আয়নী (রহ) তাঁর সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘উমদাতুল ক্বারী’ (৫/২৭৯ পৃ:)-তে বলেন :
واحتج الشافعي بحديث وائل بن حجر أخرجه ابن خزيمة في صحيحه قال صليت مع رسول الله فوضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره ولم يذكر النووي غيره في الخلاصة وكذلك الشيخ تقي الدين في الإمام واحتج صاحب الهداية لأصحابنا في ذلك بقوله إن من السنة وضع اليمنى على الشمال تحت السرة ( قلت ) هذا قول علي بن أبي طالب وإسناده إلى النبي غير صحيح …. فيه مقال لأن في سنده عبد الرحمن بن اسحق الكوفي قال أحمد ليس بشيء منكر الحديث ….
“শাফেঈদের দলিল হল ওয়ায়েল ইবনে হুজরের (রা) হাদীস। যা ইবনে খুযায়মাহ তাঁর ‘সহীহ’-তে বর্ণনা করেছেন। সাহাবী ওয়ায়েল (রা) বলেন : আমি রসূলুল্লাহ (স)এর সাথে সালাত পড়েছিলাম। তিনি ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর রাখলেন। নববী তাঁর ‘খুলাসাতে’ এছাড়া অন্যকিছু বর্ণনা করেন নি। অনুরূপ তাক্বী উদ্দীন তাঁর ‘الإمام’-এ উল্লেখ করেছেন। আমাদের (হানাফীদের) সাথীদের মধ্যে ‘হিদায়ার’ লেখক যা দলিল হিসাবে উল্লেখ করেছেন তা হল : সুন্নাত হল, ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নীচে বাঁধা। (আমি বলছি) এটা আলী ইবনে আবী তালেবের উক্তি এবং নবী (স) পর্যন্ত এর সনদ সহীহ নয়। …. এতে আপত্তি আছে। কেননা এর সনদে আব্দুর রহমান বিন ইসহাক্ব কুফী আছে। ইমাম আহমাদ বলেছেন : সে কিছুই নয়, মনুকারুল হাদীস….।”
বুঝা গেল, বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসটির উপর বদরুদ্দীন আয়নী হানাফী (রহ)এর আপত্তি ছিল না। তাঁর আপত্তি ছিল নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীস সম্পর্কে। যদিও তিনি আলোচনা শেষ করেছেন আমাদের আলোচ্য লেখক কর্তৃক উল্লিখিত ইমাম তিরমিযী (রহ)এর উদ্ধৃতির মাধ্যমে। অর্থাৎ সহীহ হাদীস ত্যাগ করে উলামাদের উক্তি দ্বারা মাযহাব রক্ষার শেষ অস্ত্রটি তিনিও ব্যবহার করেছেন। আমারা ‘বিশ্লেষণ-২৫ ও ৫০’-এ উদারপন্থী হানাফী আলেমদের ‘বুকের উপর হাত বাঁধার’ হাদীসকে গ্রহণের মতামত উল্লেখ করেছি।

লেখক ৬৪ (পৃ: ৩২) : 
লক্ষ্য করুন, সাহাবী, তাবেয়ী ও তিরমিযী র.এর যুগ পযন্ত আলেমগণকে তিনি দুভাগ করেছেন। এক ভাগের মত ছিল নাভির নীচে হাত বাঁধা, আরেক ভাগের মত ছিল নাভির উপরে হাত বাঁধা। বুকের উপর হাত বাঁধার আমল কোথায়? তিরমিযী র.ও কি আহলে হাদীস ছিলেন না? একইভাবে ইবনুল মুনযির র.ও তাঁর আল আওসাত গ্রন্থে উপরোক্ত দুধরণের আমল ও মতের কথাই উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষণ ৬৪ লক্ষণীয়, যেখানে সহীহ সনদসহ নবী (স) ও সাহাবীদের (রা) থেকে বুকের উপর হাত বাঁধার বর্ণনা রয়েছে। যেখানে ইমাম তিরমিযী ও ইবনুল মুনযির (রহ)এর কেবল ব্যক্তিগত বিশ্লেষণকে হাদীসের সিদ্ধান্ত হিসাবে গণ্য করাটা সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করার নামান্তর। তাছাড়া আমরা প্রমাণ করেছি আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত থাকলেও ঐ আলেমদের কাছেই নাভীর উপর এবং বুকের উপর বা নিকটে রাখা একই অর্থবোধক। যদি এই ব্যাখ্যা গ্রহণ না করা হয়, তবে উক্ত ইমামদ্বয়ের পূর্বে আগত ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদের ‘বুকের উপর’ হাত বাঁধার সত্যতাকে অস্বীকার করা হয়। অথচ তা প্রমাণিত সত্য। এ পর্যায়ে ইমাম তিরমিযী ও ইবনুল মুনযির (রহ)এর বক্তব্য অসম্পূর্ণ তথ্য সমৃদ্ধ হিসাবে গণ্য হবে। কিংবা নাভির উপরে হাত বাঁধা বলতে আমাদের পূর্বোক্ত ব্যাখ্যা তথা –বুকের উপর, বুকের নিকট ও নাভীর উপর একই অর্থবোধক বিবেচনা করতে হবে। যেভাবে ইমাম নববী (রহ) থেকে প্রমাণিত আছে। আর এই ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করলে ইমাম তিরমিযী ও ইবনে মুনযিরকে অসম্পূর্ণ তথ্য প্রদানের অপবাদ থেকে রক্ষা করা যায়। পক্ষান্তরে নাভির নীচে হাত বাঁধা সর্বসম্মত যঈফ। যেভাবে ইমাম নববী (রহ)’র উদ্ধৃতি পূর্বে গত হয়েছে।

লেখক ৬৫ (পৃ: ৩২) :
উল্লেখ্য, হাত বাঁধার যে সহীহ নিয়ম পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি, সে নিয়মে হাত বাঁধলে বুকের উপর রাখা প্রায় অসম্ভব।
বিশ্লেষণ ৬৬ বরং নাভির নীচেই অসম্ভব এবং বুকের উপরই সম্ভব। লেখক মোট ছয় জন ইমামের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে তিনজন সমস্ত হাদীসগুলোর উপর সমন্বয়ের পরিবর্তে নিজেদের চিন্তার সমন্বয় করেছেন। পক্ষান্তরে অপর তিনজনের ইমামের উপস্থাপনা আমাদের উপস্থাপিত পদ্ধতিকে সমর্থন করেন। ঐ তিনজন ইমাম হলেন, ইমাম নববী, হাফেয ইবনে হাজার ও ইমাম শওকানী (রহ)। (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৩৪-৩৯’)
হাতের উপর হাত বলতে যেরা বা বাহুর উপর যেরা বা বাহু রাখার অর্থ সহীহ। এভাবে হাতটি বাঁধলে তাকে বুকের উপর, বুকের নিকট ও নাভীর উপর সব কয়টি অর্থেই আমল করা যায়। পক্ষান্তরে এভাবে কখনই নাভির নীচে হাত বাঁধা সম্ভব নয়।

লেখক – ৬৬ (পৃ: – ৩২) :
আরেকটি কথা, লা-মাযহাবী ভাইয়েরা যেভাবে হাত বাঁধেন, তাতে বুকের উপর বাঁধা হয়না, হয় বুকের নীচে। আমি তাদের একজনকে বিষয়টি বলেছিলাম। তিনি আমার সামনে হাত বেঁধে বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। শেষে বললেন, এটাতো কখনোই চিন্তা করিনি। আমি বললাম, এবার চিন্তা করুন। হাদীস বলবেন বুকের উপর হাত বাঁধার, আর আমল করবেন বুকের নীচে হাত বাঁধার, তা হয়না।
বিশ্লেষণ -৬৬ : আসলে লেখক এবং কথিত ব্যক্তি সহীহ বর্ণনাগুলোর শব্দ সম্পর্কে ধারণা না রাখার কারণে উক্ত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। কেননা সহীহ সনদে ‘বুকের উপর’, ‘বুকের নিকট’ ও ‘নাভীর উপর’ শব্দগুলো ব্যবহার হয়েছে। যেরা’র উপর যেরা‘ বরাবর রাখলে ও অন্যান্য সহীহ হাদীসগুলো দাবী পূরণ করলে সবগুলো বর্ণনার উপর আমল করা সম্ভব হয়। যদি কারো শব্দগুলো জানা না থাকে তাহলে কিভাবে সেটার সমাধান তার চিন্তাতে আসবে? আমাদের কাছে সহীহ হিসাবে বর্ণিত সবগুলোর বর্ণনা ও পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য। পক্ষান্তরে নাভির নীচে হাত বাঁধাটা সহীহ হাদীসগুলোর সম্পূর্ণ বিরোধী। এ সম্পর্কে পূর্বে তুলনামূলক বিশ্লেষণ উল্লেখ করেছি। এখন স্মরণার্থে আবার পড়ুন :

সুস্পষ্ট হল, হাতের উপর হাত রাখার প্রকৃত দাবী – যেরার উপর যেরা রাখা। এ পদ্ধতিতে বুকের উপর, বুকের নিকট ও নাভীর উপর – প্রতিটি হাদীসের উপর সমন্বিত আমল করা যায়। পক্ষান্তরে নাভীর নীচে হাত বাঁধাটা সহীহ হাদীসের উল্লিখিত ব্যাখ্যানুসারে অসম্ভব। (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৩৪’)
উল্লেখ্য হানাফী মাযহাবেও বুকের উপর এবং বুকের নীচে শব্দ দুটি পরিপূরক হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। যেমন যাফার আহমাদ উসমানী (রহ) তাঁর বিখ্যাত লাউস সুনানে বলেছেন :
আর দুররুল মুখতার কিতাবে (: ১ পৃ: ৫০৮) রয়েছে। স্ত্রীলোক এবং হিজড়া তাদের বুকের নীচে হাত রাখবে। আর রাদ্দুল মুহতার কিতাবে রয়েছে, এর কতিপয় নোসখায় এমনই রয়েছে; আর কতিপয় নোসখায় রয়েছে বুকের উপর..[লাউস সুনান (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, জুন ২০০৮/১৪২৯) /২৩৯ পৃ:]
সুস্পষ্ট হল, হানাফীদের কাছেও বুকের উপর ও বুকের নীচে উভয়টি পরিপূরক আমলযোগ্য বিষয়। এ পর্যায়ে আশা করি লেখক ও কথিত ব্যক্তির ভুল বুঝের অবসান হবে এবং তারা সহীহ হাদীস অনুযায়ী বুকের উপর, বুকের কাছে/নীচে, নাভীর উপর প্রভৃতির মর্ম উদ্ধার করতে পারবেন। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক্ব দিন। আমীন!!

Advertisements

এই সাইডটি ভিজিট করার সময় আপনি যাদি কোন অশ্লীল এডভাটাইজমেন্ট দেখেন তাহলে একটু হোমপেজের পাশে “এডভাটাইজমেন্ট মুক্ত ব্রাউজিং করুন” পাতাটি দেখুন।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s