হানাফী আলেম আব্দুল মতিন সাহেব লিখিত ‘দলিলসহ নামাযের মাসায়েল’ (প্রকাশক : মাকতাবাতুল আযহার, ঢাকা-এপ্রিল’২০১১) এর জবাব নিচে দেয়া হল। পর্ব-০৩

দলিল

হানাফী আলেম আব্দুল মতিন সাহেব লিখিত দলিলসহ নামাযের মাসায়েল’ (প্রকাশক : মাকতাবাতুল আযহার, ঢাকাএপ্রিল২০১১) এর জবাব নিচে দেয়া হল। তাঁর উপস্থাপিত দলিল আলোচনা লেখকশিরোনামে এবং আমাদের জবাব বিশ্লেষণশিরোনামে উল্লেখ করা হল। আমরা ইতঃপূর্বে প্রথম অধ্যায়ে ইক্বামাতের বাক্যএবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে :সালাতে হাত বাঁধার পদ্ধতিসম্পর্কে লেখকের উপস্থাপিত দলিল ও মন্তব্যগুলো ১ থেকে ৬৬টি শিরোনামে উল্লেখ করেছি। এখন ৬৭তম থেকে সানা পড়ানিয়ে লেখকের উপস্থাপনা ও তার বিশ্লেষণ উল্লেখ করব, ইনঁশাআল্লাহ।

 

তৃতীয় অধ্যায় : সানা পড়া (পৃ: ৩৩৩৬)

বি: দ্র: সানা হিসেবে হানাফীগণ যে দু‘আটি পড়েন, তা বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। তাই এক্ষেত্রে তাদের আমলটি গ্রহণযোগ্য। এরপরেও লেখকের উপস্থাপনার বিশ্লেষণ নিচে উল্লেখ করা হল। কেননা লেখক যঈফ বর্ণনাগুলো ব্যাপকভাবে উল্লেখ করেছেন। আমরা মনে করি, জনগণের সমানে সেগুলোর চেহারা উন্মোচন করা জরুরি।

লেখক ৬৭ (পৃ: ৩৩) :

প্রসঙ্গ: ছানা পড়া

ইমাম আবূ হানীফা র. ও ইমাম আহমাদ র. দুজনেরই মত হলো – নামাযে তাকবীর (আল্লাহু আকবার ) বলার পর এভাবে ছানা পড়া উত্তম:

سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك

বিশ্লেষন ৬৭ : সালাতের তাকবীরে তাহরীমার পর সানা পাঠ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। নবী (স)এর মত এর প্রত্যেকটির উপর আমল করাই হল সর্বোক্তম। এক্ষেত্রে মাযহাবী কোন যুক্তি দেখিয়ে কোনটিকে কম উত্তম বলার অবকাশ নেই। আবার একটিকে উত্তম বলে অন্য আমলগুলো অধম বলার দিকে ইঙ্গিত করাটা নিতান্তই বাড়াবাড়ি। কেননা মাযহাবের নামে সহীহ হাদীসটির উপর আমল করা থেকে বিরত থাকা হচ্ছে।

যদি হাদীসের মধ্যে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী হাদীসটির উপর আমল করতে হয়, তাহলে এক্ষেত্রে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ঐকমত্যে (মুত্তাফাকুন আলাইহির) বর্ণিত হাদীস নিঃসন্দেহে প্রাধান্যপ্রাপ্ত। যেমন – সাহাবী আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে :

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْكُتُ بَيْنَ التَّكْبِيرِ وَبَيْنَ الْقِرَاءَةِ إِسْكَاتَةً قَالَ أَحْسِبُهُ قَالَ هُنَيَّةً فَقُلْتُ بِأَبِي وَأُمِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ إِسْكَاتُكَ بَيْنَ التَّكْبِيرِ وَالْقِرَاءَةِ مَا تَقُولُ قَالَ أَقُولُ اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ اللَّهُمَّ نَقِّنِي مِنْ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنْ الدَّنَسِ اللَّهُمَّ اغْسِلْ خَطَايَايَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ

“রসূলুল্লাহ (স) তাকবীরে তাহরীমা ও ক্বিরাআতের মধ্যবর্তী সময়ে খানিকটা চুপ থাকতেন। আমি একবার জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রসূলাল্লাহ! আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি কুরবান হোক, আপনি তাকবীর ও ক্বিরাআতের মাঝে সাকতা (চুপ) করেন, তখন কী পড়েন? তিনি (স) বললেন, আমি বলি :

اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ اللَّهُمَّ نَقِّنِي مِنْ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنْ الدَّنَسِ اللَّهُمَّ اغْسِلْ خَطَايَايَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ

“ইয়া আল্লাহ! আপনি মাশরিক (পূর্ব) ও মাগরিবের (পশ্চিমের) মধ্যে যেরূপ দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন, আমার ত্রুটি বিচ্যুতির মধ্যে ঠিক তদ্রুপ দূরত্ব সৃষ্টি করে দিন। ইয়া আল্লাহ! আমাকে সেভাবে পরিষ্কার করুন, যেভাবে পরিষ্কার করা হয় সাদা কাপড় ময়লা হতে। ইয়া আল্লাহ! আপনি আমার গুনাহসমূহকে ধুয়ে ফেলুন পানি, বরফ ও মুষলধার বৃষ্টি দ্বারা।” [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ২/৭৫৬]

এই দু‘আর মাধ্যমে বান্দা তাঁর রবের সামনে নিজের বন্দেগি ও ছোটত্ব প্রকাশ করে। তা ছাড়া সালাত শুরুর দু‘আর মধ্যে সনদের দিক থেকে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী। হাফেয ইবনে হাজার আস্কালানী (রহ) লিখেছেন : وحديث ابى هريرة اصح ماورى فى ذلك “আবূ হুরায়রা (রা)এর হাদীসটি এ সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহীহ।” (ফতহুল বারী ২/১৮৩)

হানাফী মুহাদ্দিস আনওয়ার শাহ কাশমিরী (রহ) লিখেছেন :

واختار الشافعيُّ ما عند البخاريِّ رحمهما الله تعالى: «اللهم باعد»… إلخ، وهو أولى بالنظر إلى قوة الإِسناد. وما اخترناه أحرى بالنظر إلى العمل

“শাফেঈগণ ইমাম বুখারী (রহ)এর বর্ণিত  «اللهم باعد» إلخ (সহীহ বুখারীর বর্ণনাকে) গ্রহণ করেছেন। এটি শক্তিশালী সনদের কারণে প্রাধান্যপ্রাপ্ত। আর আমরা যেটি গ্রহণ করেছি সেটি (চালু থাকা) আমলের দিক থেকে শক্তিশালী।” (ফয়যুল বারী শরহে সহীহ বুখারী ২/২৮৬)

হানাফী ফক্বীহ ইমাম ইবনুল হুমাম (রহ) লিখেছেন :

وَلِمَا ثَبَتَ مِنْ فِعْلِ الصَّحَابَةِ كَعُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَغَيْرِهِ ] الِافْتِتَاحُ بَعْدَهُ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ بِسُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ [ مَعَ الْجَهْرِ بِهِ لِقَصْدِ تَعْلِيمِ النَّاسِ لِيَقْتَدُوا وَيَأْنَسُوا كَانَ دَلِيلًا عَلَى أَنَّهُ الَّذِي كَانَ عَلَيْهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آخِرَ الْأَمْرِ أَوْ أَنَّهُ كَانَ الْأَكْثَرَ مِنْ فِعْلِهِ وَإِنْ كَانَ رَفْعُ غَيْرِهِ أَقْوَى عَلَى طَرِيقِ الْمُحَدِّثِينَ ، أَلَا يَرَى أَنَّهُ رُوِيَ فِي الصَّحِيحَيْنِ مِنْ حَدِيثِ أَبِي هُرَيْرَةَ ] أَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَسْكُتُ هُنَيْهَةً قَبْلَ الْقِرَاءَةِ بَعْدَ التَّكْبِيرِ فَقُلْتُ : بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ ، رَأَيْتُ سُكُوتَكَ بَيْنَ التَّكْبِيرِ وَالْقِرَاءَةِ مَا تَقُولُ ؟ قَالَ أَقُولُ : اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ . اللَّهُمَّ نَقِّنِي مِنْ خَطَايَايَ كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنْ الدَّنَسِ ، اللَّهُمَّ اغْسِلْنِي مِنْ خَطَايَايَ بِالثَّلْجِ وَالْمَاءِ وَالْبَرَدِ [ وَهُوَ أَصَحُّ مِنْ الْكُلِّ لِأَنَّهُ مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ

“(হানাফীদের পঠিত সানাটি সম্পর্কে) সাহাবীদের আমল থেকে প্রমাণ রয়েছে। যেমন উমার (রা) ও অন্যান্যদের আমল। আর তা হল, নবী ‘আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালাম-এর (সালাত) শুরু করার পর ‘সুবহানাকাল্লাহুম্মা’ পড়া। (উমার রা.) জাহরিসহ (আওয়াজ করে) পড়তেন। উদ্দেশ্য হল লোকদেরকে শেখান। যেন তারা অনুসরণ করে এবং ভুলে না যায়। এটি ছিল রসূলুল্লাহ (স)এর শেষ নির্দেশ এবং তাঁর অধিকাংশ আমল এমনটি ছিল। যদিও অন্যটি মারফু‘ সূত্রে মুহাদ্দিসসগণের নিকট বেশী শক্তিশালী। তুমি কি দু’টি সহীহ কিতাবে (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে) আবূ হুরায়রা (রা)এর বর্ণনাটি দেখ নি। … (আবূ হুরায়রা রা. এর পূর্বোক্ত বর্ণনাটি উল্লেখ করা পর ইমাম ইবনুল হুমাম রহ, লিখেছেন 🙂 এটিই সমস্ত বর্ণনার মধ্যে সবচেয়ে সহীহ, কেননা তা মুত্তাফাক্বুন আলাইহি (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ঐকমত্যে বর্ণিত)।” (ফতহুল ক্বাদীর ১/২৫২ পৃ:)

লেখক ৬৮ (পৃ: ৩৩) :

এ মতের পক্ষে প্রমাণগুলো নিম্নে প্রদত্ত হলো:

১.আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, وسبح بحمد ربك حين تقوم অর্থ: যখন তুমি দাঁড়িয়ে যাবে, তখন তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে।(সূরা তূর,৪৮)
যাহহাক র. বলেছেন, উক্ত আয়াতের মর্ম হলো নামাযে এই ছানা পাঠ করা:

 سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك

ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর ৮খ. ৩০পৃ.।

বিশ্লেষন ৬৮ :  ‘যাদুল মাসীরে’ আলোচ্য (সূরা তুর : ৪৮) আয়াতটির ৬টি ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। লেখক তাঁর মধ্যে থেকে তিন নম্বরটি কেবল উল্লেখ করেছেন। প্রথম দু’টি সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে :

أحدها صل لله حين تقوم من منامك قاله ابن عباس  والثاني قل سبحانك اللهم وبحمدك حين تقوم من مجلسك قاله عطاء وسعيد بن جبير ومجاهد في آخرين

“এর প্রথমটি হল, ঘুম থেকে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে দু‘আ করা। এটি সাহাবী ইবনে আব্বাস (রা)এর উক্তি। দ্বিতীয়টি হল, মজলিস থেকে দাঁড়িয়ে سبحانك اللهم وبحمدك বলা। এটি আতা, সাঈদ বিন জুবায়ের ও মুজাহিদের শেষ বক্তব্য।…” (যাদুল মাসীর, ঐ)

উক্ত বর্ণনা দু’টিতে প্রমাণ হয়, দাঁড়ান মাত্রই আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করার কথা বর্ণিত হয়েছে। আয়াতটির বাক্যের দাবীও সেটাই। এ কারণে ইমাম শওকানী (রহ) তাঁর তাফসীর গ্রন্থে যাহহাকের অপর একটি বর্ণনা প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন :

وقال محمد بن كعب ، والضحاك ، والربيع بن أنس : حين تقوم إلى الصلاة . قال الضحاك : يقول : الله أكبر كبيراً ، والحمد لله كثيراً ، وسبحان الله بكرةً وأصيلاً ، وفيه نظر؛ لأن التكبير يكون بعد القيام لا حال القيام ، ويكون التسبيح بعد التكبير ، وهذا غير معنى الآية

“মুহাম্মাদ বিন কা‘ব, যাহহাক ও রবী‘ বিন আনাস (রহ) বলেছেন : যখন সালাতে দাঁড়ান হয়। যাহহাক বলেছেন, এভাবে বলা যে, الله أكبر كبيراً  والحمد لله كثيراً ، وسبحان الله بكرةً وأصيلاًএতে আপত্তি আছে। কেননা তাকবীর বলা হয় ক্বিয়াম তথা দাঁড়ানোর পরে, দাঁড়ানোর সময় বলা হয় না। আর তাসবীহ (সানা) পড়া হয় তাকবীরের পরে। এজন্যে এই উক্তিটি আয়াতের অর্থের পরিপূরক নয়।” (ফতহুল ক্বাদীর, সূরা তূরের ৪৮ নং আয়াতের তাফসীর দ্র:)

যাহহাক থেকে লেখকের দেয়া উদ্ধৃতিটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কেননা সানা পড়া হয়, সালাতে দাঁড়ানোর পর তাকবীর বলার শেষে হাত বাঁধার পর। এখানে অনেকগুলো আমলের পর সানা পড়া হয়। এটাও জানা গেল যে, যাহহাক্ব থেকে সানাটি ভিন্ন শব্দেও বর্ণিত হয়েছে।

হানাফী ফক্বীহ, মুহাদ্দিস ও মুফাসসির সানাউল্লাহ পানিপথী (রহ) লেখকের উদ্ধৃত যাহহাকের বর্ণনাটি সম্পর্কে আলোচ্য আয়াতটির তাফসীরে লিখেছেন : “যাহহাক ও রবী‘ (রহ) বলেন, আয়াতের অর্থ-যখন আপনি সালাতের জন্য দাঁড়াবেন তখন বলবেন,

سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلاَ إِلَهَ غَيْرُكَ

এ হাদীসটি আবূ দাউদ ও তিরমিযী উদ্ধৃত করেন। ইবনে মাজাহ আবূ সাঈদ থেকে বর্ণনা করেন। ইমাম তিরমিযী বলেন, এ হাদীস আমরা কেবল হারিসা সূত্রে অবগত হয়েছি। আর হারিসার স্মরণশক্তি সম্পর্কে বিতর্ক আছে।” [তাফসীরে মাযহারী (ইফা) ১১/৫৩৫ পৃ:, সূরা তূরের ৪৮ নং আয়াতের তাফসীর দ্র:]

তবে লেখকের উল্লিখিত বর্ণনাটির সনদে যাহহাক্ব থেকে জুওয়ায়বার (جويبر بن سعيد الأزدى) নামে একজন বর্ণনাকারী আছেন। (তাফসীরে তাবারী সূরা তূরের ৪৮ নং আয়াতের তাফসীর, মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ ১৩/৪৪০/১৬)।

কিন্তু জুওয়ায়বারকে হাফেয ইবনে হাজার (রহ) ‘যঈফুন যিদ্দান’ বলেছেন (তাক্বরীব, ৯৮৮ নং)। সুতরাং বর্ণনাটি অগ্রহণযোগ্য।

লেখক ৬৯ (পৃ: ৩৩) :

ইমাম তিরমিযী র. লিখেছেন, والعمل على هذا عند أكثر أهل العلم من التابعين وغيرهم অর্থাৎ তাবেয়ীন ও অন্যান্য আলেমগণের অধিকাংশের আমল হলো- এই ছানা পাঠ করা।

বিশ্লেষন ৬৯ :  আবূ সাঈদ (রা)এর এ সম্পর্কিত হাদীসটি উল্লেখ করার পর ইমাম তিরমিযী (রহ) আলোচ্য উক্তিটি করেছেন। এখন আমরা পরবর্তী বাক্যগুলোসহ ইমাম তিরমিযী (রহ)এর পূর্বোক্ত উক্তিটি জেনে নেব্ :

والعمل على هذا عند أكثر أهل العلم من التابعين وغيرهم  وقد تكلم في إسناد حديث أبي سعيد كان يحيى بن سعيد يتكلم في علي بن علي الرفاعي وقال أحمد لا يصح هذا الحديث

“অধিকাংশ আহলে ইলমের মধ্যে তাবেঈগণ ও আলেমদের অন্যান্যরা এর উপর আমল করেছেন। আবূ সাঈদ (রা) বর্ণিত হাদীসটি সম্পর্কে আপত্তি আছে। ইয়াহইয়া বিন সাঈদ (রহ) এই হাদীসের রাবী আলী বিন আলী আর-রিফাঈ-এর সমালোচনা করেছেন। ইমাম আহমাদ (রহ) বলেছেন, এই হাদীসটি সহীহ নয়।” [তিরমিযী – কিতাবুস সালাত باب ما يقول عند افتتاح الصلاة ]

ইমাম তিরমিযী (রহ)এর সম্পূর্ণ উদ্ধৃতিটি থেকে বুঝা যায়, যারা আলোচ্য সানাটি পড়েন তারা সহীহ হাদীস অনুযায়ী আমল করেন না। যদিওবা সেটা অনেকের বরং অধিকাংশের আমল।

লেখক ৭০ (পৃ: ৩৩) :

২. হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেছেন,

كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا افتتح الصلاة قال: سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك، أخرجه النسائي(٨٩٩،٩٠٠ (والترمذي (٢٤٢) وأبو داود (٧٧٥) وابن ماجه(٨٠٤)، كلهم من طريق جعفر بن سليمان عن علي بن علي عن أبي المتوكل عنه.

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায শুরু করার সময় বলতেন, سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك নাসায়ী শরীফ, হাদীস নং ৮৯৯,৯০০; তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ২৪২; আবু দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৭৭৫; ইবনে মাজা শরীফ, হাদীস নং ৮০৪। এ হাদীসটি সহীহ।

বিশ্লেষন ৭০ :  ক) ইমাম তিরমিযী (রহ) হাদীসটি উল্লেখ করার পর ইয়াহইয়া বিন সাঈদ (রহ) থেকে হাদীসটির প্রতি আপত্তি ও ইমাম আহমাদ থেকে হাদীসটি সহীহ নয় বলে উল্লেখ করেছেন। (বিস্তারিত: ‘বিশ্লেষণ-৬৯’)

খ) ইমাম আবূ দাউদ (রহ) হাদীসটি উল্লেখ করার পর লিখেছেন :

هذا الحديث يقولون هو عن علي بن علي عن الحسن مرسلا الوهم من جعفر

“আলী বিন আলী থেকে হাসানের বর্ণনাটি মুরসাল। এই ভুলটি হয়েছে জাফারের থেকে।” (আবূ দাউদ – কিতাবুস সালাত হা/৭৭৫)

গ) সুনানে আবূ দাউদ ও তিরমিযীর বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয়, হাদীসটি রাতের নফল সালাতের সাথে সম্পৃক্ত। বর্ণনাটি লক্ষ্য করুন :

عَنْ أَبِى سَعِيدٍ الْخُدْرِىِّ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- إِذَا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ كَبَّرَ ثُمَّ يَقُولُ « سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلاَ إِلَهَ غَيْرُكَ »

“আবূ সাঈদ (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (স) যখন রাতের সালাতে দাড়াতেন তখন তাকবীর দিতেন। অতঃপর বলতেন : سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلاَ إِلَهَ غَيْرُكَ ।” (তিরমিযী হা/২৪২, আবূ দাউদ হা/৭৭৫)

এ থেকে সুস্পষ্ট হয়, উক্ত সানাটি নফল সালাতের সাথে সম্পৃক্ত।

ঘ) হানাফীগণ উক্ত সানার সাথে আরো অতিরিক্তি শব্দগুলো আমল করা থেকে বিরত থাকেন। আবূ দাউদের (হা/৭৭৫) বর্ণনাটিতে সানাটির পর ক্বিরাআতের পূর্বে অতিরিক্ত তিনবার لا إله إلا الله, তিনবার الله أكبر كبيرا, এবং أعوذ بالله السميع العليم من الشيطان الرجيم من همزه ونفخه ونفثه পড়ার পর ক্বিরাআত শুরু করার কথা বর্ণিত হয়েছে। যা থেকে বুঝা যাচ্ছে হানাফীগণ হাদীসটির পূর্ণাঙ্গ দাবীর উপর আমল করছেন না।

ঙ) উক্ত হাদীসগুলো থেকে বুঝা যায়, রাতের নফল সালাতে নবী (স) উক্ত আমলগুলো শুনিয়ে পাঠ করতেন। পক্ষান্তরে আবূ হুরায়রা (রা) এর বর্ণনাটি থেকে বুঝা যায়, ফরয সালাতে ক্বিরাআতের পূর্বে «اللهم باعد»… إلخ দুআটি তিনি (রা) শুনতে না পাওয়ায় নবী (স)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তিনি সেখানে সাকতা বা চুপ থাকেন কেন? কাজেই হানাফীগণ যে সানাটি চুপে পড়েন, সেটা «اللهم باعد»… إلخ হওয়াটাই উত্তম।

লেখক ৭১ (পৃ: ৩৩-৩৪) :
৩. হযরত আয়েশা রা. বলেন,

كان النبي صلى الله عليه وسلم إذا افتتح الصلاة قال سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك أخرجه الترمذي من طريق أبي معاوية عن حارثة بن أبي الرجال عن عمرة عنها، وحارثة قد تكلم فيه من قبل حفظه قاله الترمذي (٢٤٣) وأخرجه أبو داود من طريق طلق بن غنام عن عبد السلام بن حرب الملائي عن بديل بن ميسرة عن أبي الجوزاء عنها (٧٧٦)

অর্থ: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামায শুরু করতেন তখন বলতেন سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك
তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ২৪৩; আবু দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৭৭৬। আবূ দাউদের সনদ বা সূত্রকে আল্লামা আহমাদ শাকের র. তিরমিযী শরীফের টীকায় সহীহ বলেছেন।

বিশ্লেষন ৭১ :  ক) লেখক উপরোক্ত আরবি উদ্ধৃতির যে অংশটির অনুবাদ করেন নি তা হল,

أخرجه الترمذي من طريق أبي معاوية عن حارثة بن أبي الرجال عن عمرة عنها، وحارثة قد تكلم فيه من قبل حفظه قاله الترمذي

“হাদীসটি তিরমিযী (রহ) আবূ মু‘আবিয়ার সূত্রে হারিসাহ বিন আবী রিজাল থেকে, তিনি ‘আমরাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। হারিসার স্মৃতিশক্তির ব্যাপারে আপত্তি আছে, যেভাবে তিরমিযী (রহ) বলেছেন।”

তাছাড়া ইমাম আহমাদ (রহ) তাকে যঈফ বলেছেন। ইমাম আবূ যারআ বলেছেন : واهى الحديث ، ضعيف ; ইমাম আবূ হাতিম ও ইমাম বুখারী (রহ) বলেছেন : মুনকারুল হাদীস। ইমাম নাসাঈ বলেছেন : মাতরুকুল হাদীস। (তাহযীবুল কামাল)

অর্থাৎ হাদীসটি খুবই দুর্বল।

খ) নবী (স) সালাত শুরু করতেন তাকবীর দ্বারা ও তখন কাঁধ পর্যন্ত হাত উত্তোলন করতেন।

(أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يرفع يديه حذو منكبيه إذا افتتح الصلاة) [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ২/৭৩৭]

অন্য হাদীসে এসেছে : যখন নবী (স) সালাত শুরু করতেন তখন তাকবীর দিতেন। এরপর বলতেন : “ইন্নি ওয়াজ্জাহতু …(শেষ পরর্যন্ত)।” [সহীহ মুসলিম, মিশকাত ২/৭৫৭ নং]

(كان النبي صلى الله عليه وسلم إذا قام إلى الصلاة وفي رواية : كان إذا افتتح الصلاة كبر ثم قال : ” وجهت وجهي… إلخ)

আবার আবূ হুরায়রা (রা) পূর্বোক্ত বর্ণনাটিতে তাকবীর ও ক্বিরাআতের মাঝে সাকতার স্থানে «اللهم باعد»… إلخ দুআটি পাঠের কথা বর্ণিত হয়েছে। [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম]

অথচ লেখকের উল্লিখিত হাদীসটি থেকে বুঝা যায়, সালাত শুরু করতে হবে উক্ত সানাটি দ্বারা। এ পর্যায়ে হাদীসের বাক্যের ব্যবহারের দিকে লক্ষ্য করলে, ‘সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা…” সানাটির চাইতে অন্য সানা দু’টির প্রয়োগের ক্ষেত্রটি সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

অবশ্য যদি আলোচ্য সানাটির ক্বিরাআত উচ্চৈঃস্বরে পাঠের মাধ্যমে শুরু করার ব্যাখ্যা নেয়া হয়, সেক্ষেত্রে সানাটির পাঠের বিষয়টি হাদীসের পারস্পরিক ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। যেমন অপর একটি বর্ণনা থেকে বুঝা যায়,

“নবী (স), আবূ বকর (রা) ও উমার (রা) সালাত শুরু করতেন সূরা ফাতিহা দ্বারা।” [সহীহ মুসলিম, মিশকাত ২/৭৬৭ নং]

(أن النبي صلى الله عليه وسلم وأبا بكر وعمر رضي الله عنهما كانوا يفتتحون الصلاة بالحمد لله رب العالمين)

শেষোক্ত হাদীসটিতে ক্বিরাআতের ইফতিতাহ বা শুরু করার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হানাফী মুহাদ্দিস তাক্বী উসমানী লিখেছেন :

۔۔۔۔ جواب یہ دیا جاتا ہے کہ آپ کی مستدل حدیث میں افتتاح سے مراد افتتاح قراءت جہریہ ہی لیذا قراءت سریہ اس کے منافی نہیں

“…. এর জবাব দেয়া হয় যে, নবী (স)এর এই প্রামাণ্য হাদীসের ইফতিতাহ বা শুরু করার অর্থ হল : জাহরি ক্বিরাআত দ্বারা ইফতিতাহ করা। এজন্যে চুপের ক্বিরাআত এর বিরোধী হয় না।” [দারসে তিরমিযী (করাচী : মাকতাবাহ দারুল উলূম ১৪৩১/২০১০)  ১/৪৯৮, باب ما يقول عند افتتاح الصلاة]

অথচ উমার (রা) আলোচ্য সানাটি জাহরি পড়তেন (সহীহ মুসলিম)। যা এই বইটির লেখক পরবর্তী ৬ নং-এ উল্লেখ করেছেন। এ পর্যায়ে পূর্বে উল্লিখিত রাতের সালাতে সানা পড়ার হাদীসগুলো দ্বারা ব্যাখ্যা নিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হয়। কেননা তখন সূরা ফাতিহার পূর্বে এই সানাটি ছাড়াও ভিন্ন দু‘আ (وجهت وجهي… إلخ) স্বতন্ত্রভাবে পড়ার প্রমাণ আছে।

লক্ষণীয়, রাতের সানা বা দু‘আগুলো পাঠের ক্ষেত্রে বর্ণনাকারী কোন সাহাবী নবী (স)-কে ক্বিরাআতের পূর্বে কী পড়তেন, সেটা জিজ্ঞাসা করেন নি। কেননা তাঁরা তা শুনতে পেতেন। পক্ষান্তরে আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত «اللهم باعد»… إلخ দুআটির ক্ষেত্রে চুপ থাকার মধ্যে সেটা পাঠের বর্ণনা এসেছে। আর এভাবেই সমস্ত হাদীসগুলো নিজ নিজ স্থানে আমল করার সুযোগ রয়েছে।

লেখক ৭২ (পৃ: ৩৪) :

৪. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন,
كان رسول الله يعلمنا إذا استفتحنا الصلاة أن نقول: سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك وكان عمر بن الخطاب يفعل ذلك وكان عمر يعلمنا ويقول كان رسول الله يقوله. أخرجه الطبراني في الأوسط (١٠٢٦)
অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে শিখিয়েছেন, আমরা যখন নামায শুরু করি, তখন যেন বলি,
سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك
উমর ইবনুল খাত্তাব রা.ও এমনটি করতেন। তিনি আমাদেরকে শেখাতেন এবং বলতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এভাবে বলতেন। তাবারানী, আল-আওসাত, হাদীস নং ১০২৬। এর সনদ সহীহ।

বিশ্লেষন ৭২ :  হাদীসটি সম্পর্কে ইমাম হায়সামী (রহ) বলেছেন :

رواه الطبراني في الاوسط وأبو عبيدة لم يسمع من ابن مسعود ، رواه في الكبير باختصار ، وفيه مسعود بن سليمان قال أبو حاتم مجهول

“হাদীসটি তাবারানী তাঁর ‘আওসাতে’ উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাকারী আবূ উবায়দাহ সাহাবী ইবনে মাসউদ (রা) থেকে  শোনেন নি। তাবারনী তাঁর ‘কাবীরে’ সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। এর সনদে মাস‘উদ বিন সুলায়মান বর্ণনাকারী রয়েছেন। তাকে ইমাম আবূ হাতিম মাজহুল বলেছেন।” [মাযমাউয যাওয়ায়েদ ২/১০৬]

অথচ লেখক সূত্রহীনভাবে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

হানাফীগণ অভিযোগ খণ্ডনে বলেছেন : “(আবূ উবায়দাহ তাঁর) পিতার (আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের) মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল সাত বছর। এ বয়সে তো বাইরের মুহাদ্দিসদের থেকেও শ্রবণ অস্বাভাবিক নয়। সুতরাং গৃহে বাসকারী পিতার থেকে শ্রবণ অসম্ভব কী?” [ই’লাউস সুনান (ইফা) ২/২৪২ পৃ:, টীকা দ্র:]

হাফেয ইবনে হাজার (রহ) লিখেছেন :

واختلف في سماعه من أبيه والاكثر على أنه لم يسمع منه وثبت له لقاؤه سماع كلامه فروايته عنه داخلة في التدليس

“তিনি তাঁর পিতার থেকে শোনার বিষয়টি বিতর্কিত। অধিকাংশের নিকট তিনি তাঁর পিতা থেকে (হাদীস) শোনেন নি। তবে তাঁর পিতার সাথে সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা শ্রবণ প্রমাণিত। এ কারণে তাঁর বর্ণনা তাদলীসের অন্তর্ভুক্ত।”[তাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, নং ১১৬]

অন্যত্র ইবনে হাজার (রহ) লিখেছেন :

ثقة …. والراحج أنه لم يصح سماعه من أبيه

“ সিক্বাহ। ….. প্রাধান্যপ্রাপ্ত সিদ্ধান্ত হল, তাঁর পিতার থেকে (হাদীস) শোনাটা সহীহ না।” [আত-তাক্বরীব : ৮২৩১]

এ ছাড়া তিনি মুদাল্লিস এবং উক্ত বর্ণনাটি ‘আন দ্বারা বর্ণিত হওয়ায় তাদলীসের কারণেও হাদীসটি যঈফ।

লেখক ৭৩ (পৃ: ৩৪-৩৫) :

৫. হযরত আনাস রা. বর্ণনা করেন,
عن أنس عن النبي صلى الله عليه و سلم أنه كان إذا كبر رفع يديه حتى يحاذي أذنيه يقول سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك. أخرجه الطبراني في الأوسط (٣٠٣٩) والدارقطني : ١٠/٣٠٠، قال الهيثمي في مجمع الزوائد: رجاله موثوقون. ٢/٢٢٨
অর্থ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন الله أكبر বলতেন তখন উভয় কান বরাবর হাত উঠাতেন। আর বলতেন,
سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك
তাবারানী, আল-আওসাত, হাদীস নং ৩০৩৯।

বিশ্লেষন ৭৩ :  হাদীসটির সনদে আনাস (রা) থেকে বর্ণনাকারী ‘আয়িয বিন শারীহ-কে কেউই সিক্বাহ বলেন নি। বরং ইমাম আবূ হাতিম তাকে যঈফ বলেছেন (আলজারাহ ওয়াত তা‘দীল ৩/১৭ পৃ:, লিসানুল মীযান ৩/২২৬ পৃ:)। পরবর্তী দু’জন বর্ণনাকারী মুখাল্লিদ বিন ইয়াযিদ (صدوق له أوهام) ও আব্দুল আযীয (صدوق ربما وهم) সম্পর্কে ইবনে হাজার (রহ) লিখেছেন : তারা সত্যবাদী তবে সন্দিগ্ধ (তাক্বরীব : ২১৬, ৩৩১ পৃ:)। অবশ্য মুখাল্লিদ সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিমের বর্ণনাকারী। এর পরেও ‘আয়িয বিন শারীহ’র ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ থেকে সিক্বাহ হওয়ার প্রমাণ না থাকায়, ইমাম হায়শামী (রহ) কর্তৃক ‘হাদীসটির বর্ণনাকারীগন সিক্বাহ’ বলাটা গ্রহণযোগ্য নয়।

লেখক ৭৪ (পৃ: ৩৫) :

৬. আবদা র. থেকে বর্ণিত:
أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ كَانَ يَجْهَرُ بِهَؤُلاَءِ الْكَلِمَاتِ يَقُولُ سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ تَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلاَ إِلَهَ غَيْرُكَ. أخرجه مسلم(٣٩٩)
باب حُجَّةِ مَنْ قَالَ لاَ يَجْهَرُ بِالْبَسْمَلَةِ. ورواه الدارقطني وفيه: يسمعنا ذلك ويعلمنا، ١/٣٠١
অর্থ: হযরত উমর রা. এই কালিমাগুলো উচ্চস্বরে পড়তেন
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ و تَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلاَ إِلَهَ غَيْرُكَ
মুসলিম শরীফ, হাদীস নং(৩৯৯)
দারাকুতনী র.ও এটি উদ্ধৃত করেছেন, সেখানে একথাও আছে, তিনি আমাদেরকে শোনাতেন এবং শেখাতেন। ১ খ, ৩০১ পৃ,।

বিশ্লেষন ৭৪ :  উক্ত হাদীসটি উমার (রা)এর আমল হিসেবে সহীহ। এ ভাবে আমল করা যেতে পারে।

লেখক ৭৫ (পৃ: ৩৫) :

ইমাম মাজুদুদ্দীন ইবনে তায়মিয়া র, তার মুনতাকাল আখবার গ্রন্থে লিখেছেন :

وجهر به أحيانا بمحضر من الصحابة ليتعلمه الناس مع أن السنه إخفاؤه وهذا يدل على أنه الأفضال وانه الذى كان النبيى صلى الله عليه وسلم بداوم غالبا

“অর্থাৎ হযরত উমর রা, সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে কখনো কখনো মানুষকে শেখাবার জন্যে উচ্চস্বরে এই ছানা পাঠ করতেন। অথচ সুন্নাত হলো ছানা অনুচ্চস্বরে পড়া। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, নামাযে এই ছানা পড়াই উত্তম। এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় এই ছানা পাঠ করতেন। (২খ, ২১২ পৃ)

বিশ্লেষন ৭৫ :  ‘মুনতাকাল আখবারের’ সঙ্কলক ইমাম মাজুদুদ্দীন ইবনে তায়মিয়া (রহ) সানা সম্পর্কিত আমাদের পূর্বোক্ত তিন রকমের সানা উল্লেখ করার পর উক্ত মন্তব্য করেছেন। আমরা লেখকের দেয়া উক্ত উদ্ধৃতির পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বাক্যসহ সম্পূর্ণ উদ্ধৃতিটি নিচে উল্লেখ করছি :

واختيار هؤلاء – يعنى الصحابة الذىن ذكرهم بهذا الاستفتاح – وجهر به أحيانا بمحضر من الصحابة ليتعلمه الناس مع أن السنه إخفاؤه وهذا يدل على أنه الأفضال وانه الذى كان النبيى صلى الله عليه وسلم بداوم غالبا وإن استفتح بما رواه على أو أبو هريرة فحسن ، لصحته الرواية

“(সানা সম্পর্কিত উদ্ধৃত) সবগুলো বর্ণনাই গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ যা সাহাবীদের থেকে (সালাতের) শুরুর দু‘আ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। উমর রা, সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে মানুষকে শেখাবার জন্যে উচ্চৈঃস্বরে এই ছানা পাঠ করতেন। অথচ সুন্নাত হলো ছানা অনুচ্চস্বরে পড়া। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, এভাবে পড়াই উত্তম। এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় এইভাবে পাঠ করতেন। আর (সালাতের) শুরুতে যা আলী (রা) থেকে (ইন্নী ওয়াজ্জহতু …) ও আবূ হুরায়রা (রা) থেকে (আল্লাহুমা বায়িদ বায়নি…) বর্ণনাগুলো উত্তম। কেননা সেগুলোর বর্ণনা সহীহ।”

পাঠক লক্ষ্য করুন, কিভাবে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য উদ্ধৃতি দেয়ার মধ্যেও কারসাজি করা হয়েছে। আলোচ্য বইটির লেখক সম্পর্কে পূর্বেও এমনটি আমরা প্রমাণ করেছি। সানাটি উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করা সম্পর্কে ‘পর্যালোচনা-৭০’-এ আলোচনা করেছি।

লেখক ৭৬ (পৃ: ৩৫-৩৬) :

৭. ইবনে জুরায়জ র. বলেছেন,

حدثني من أصدق عن أبي بكر ، وعن عمر ،وعن عثمان ، وعن ابن مسعود : أنهم كانوا إذا استفتحوا قالوا: سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك
অর্থ: আবু বকর রা. উমর রা. উছমান রা. ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে এমন এক ব্যক্তি আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, যাকে আমি সত্যবাদী মনে করি।তাঁরা যখন নামায শুরু করতেন, তখন পড়তেন:
سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك
মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ২৫৫৮, তাবারানী, আল-কাবীর, হাদীস নং ৯১৯৮।

বিশ্লেষন ৭৬ :  উক্ত হাদীসটির সনদের ইবনে জুরায়জের ওস্তাদ মুবহাম (উহ্য) রয়েছেন। যেভাবে ইমাম হায়শামী বলেছেন : وفيه من لم يسم “এখানে রাবীর নাম উল্লেখ করা হয় নি।” (মাযমাউয যাওয়ায়েদ ২/২৭৮/২৬১৮)

লেখক নিজেই সনদটি উল্লেখ করেছেন : حدثني من أصدق – যা বর্ণনাকারীর নাম পরিচয়হীন হওয়ার প্রমাণ। সুতরাং বর্ণনাকারী পরিচয় পেশ করুন। অন্যথায় হাদীসটি বাতিল।

ইবনে ‘আদী (রহ) তাঁর ‘কামিলে’ (৫/১৮৩৫) হাদীসটি আবূ উবায়দাহ’র মধ্যস্থতায় বর্ণনা করেছেন। যা লেখকের পূর্ববর্তী ৪ নং উল্লিখিত হয়েছে। আমারা প্রমাণ করেছি হাদীসটির যঈফ। [দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৭২’]

সর্বোপরি সনদগত দিক থেকে সবগুলো বর্ণনাই যঈফ।

লেখক ৭৭ (পৃ: ৩৬) :

আল্লামা শাওকানী র, নায়লুল আওতার গ্রন্থে লিখেছেন : ইমাম সাঈদ ইবনে মানসুর র. তাঁর সুনান গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আবূ বকর সিদ্দীক রা.ও এই ছানা পড়তেন। দারাকুতনী র. হযরত উছমান রা. সম্পর্কে অনুরূপ উল্লেখ করেছেন। (দ্র: ২ খ, ২১১ পৃ)

বিশ্লেষন ৭৭ :  মূলত উদ্ধৃতিটি হল ‘মুনতাকাল আখবারের’ সঙ্কলক ইমাম মাজুদুদ্দীন ইবনে তায়মিয়া (রহ)এর। আর ইমাম শওকানী (রহ)এর ‘নায়লুল আওতার’ হল উক্ত হাদীস গ্রন্থটির ব্যাখ্যা। এ কারণে লেখক উদ্ধৃতি দেয়াতে ব্যক্তির নাম বলাতে ভুল করেছেন।

আমরা ইমাম সাঈদ বিন মানসুর (রহ)এর ‘সুনানে’ আবূ বকর (রা)এর ‘সুবহানাকাল্লাহুম্মা .. ’ সানাটি পেলাম না। যদি কেউ খুঁজে পান তাহল আরবি সনদসহ মতনটি আমাদেরকে জানাবেন। আমরা নিরীক্ষা করে দেখবে হাদীসটি গ্রহণযোগ্য কি না।

দারা কুতনী বর্ণিত উসমান (রা)এর হাদীসটিও যঈফ। কেননা, এর সনদে আবূ বকর আইয়াশ আছেন। হাফেয ইবনে হাজার (রহ) লিখেছেন : لما كبر ساء حفظه “তার বৃদ্ধবয়সে স্মৃতিশক্তিতে বড় ধরনের ত্রুটি হয়েছিল।” (তাক্বরীব, ৩৯৬ পৃ:) ইমাম নাসাঈ লিখেছেন : শেষ বয়সে তিনি গুলিয়ে ফেলতেন।” (নাসবুর রায়াহ ১/৪০৯)

লেখক ৭৮ (পৃ: ৩৬) :

হাফিয ইবনুল কায়্যিম র. ‘যাদুল মাআদ’ গ্রন্থে এই ছানা পাঠ করা উত্তম হওয়ার দশটি কারণ উল্লেখ করেছেন। আগ্রহী পাঠক সেটিও দেখতে পারেন।

বিশ্লেষন ৭৮ :  ইবনে কাইয়েমের (রহ) উল্লিখিত কারণগুলো সানাটির অর্থ ও মর্মের সাথে জড়িত। এই সানাটির সহীহ মুসলিমের বর্ণনাটি সবচেয়ে গ্রহণ যোগ্য, যা মওকুফ হাদীস।

 কিন্তু সনদগত দিক বিবেচনায় সহীহ বুখারী মুসলিমের ঐকমত্যে বর্ণিতে আবূ হুরায়রা (রা)এর মারফু‘ হাদীসই প্রাধান্যপ্রাপ্ত।

অত:পর সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আলী (রা)এর থেকে নবী (স)এর আমলটি।

অতঃপর সহীহ মুসলিমে বর্ণিত উমার (রা)এর নিজের আমলটি।

তাছাড়া শেষোক্ত দু’টির সাথে রাতের সালাতে পাঠ করার বিষয়টিও বিভিন্ন হাদীসের সমর্থনে পাওয়া যায়। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক্ব দিন।

[কোনটি উত্তম – এ সম্পর্কে কয়েকজন হানাফী আলেমের বক্তব্য এই অধ্যায়ের শুরুতে (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৬৭’) উল্লেখ করেছি। আরো দেখুন ‘বিশ্লেষণ-৭১’এর ‘খ’ নং।]

Advertisements

এই সাইডটি ভিজিট করার সময় আপনি যাদি কোন অশ্লীল এডভাটাইজমেন্ট দেখেন তাহলে একটু হোমপেজের পাশে “এডভাটাইজমেন্ট মুক্ত ব্রাউজিং করুন” পাতাটি দেখুন।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s