হাদিসের নামে জালিয়াতি……

Image

অনেকে নিচের এই কথা গুলোকে হাদিস হিসেবে বলে থাকেন তাদের জন্য বলছি…………….

যারা নামায পড়েনা তাদের জন্য আল্লাহ্ পাক পনেরটি আজাব নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন।পনেরটি আজাবের মধ্যে ছয়টি দুনিয়ায়, তিনটি মৃত্যুর সময়, তিনটি কবরের মধ্যে এবং বাকি তিনটি হাশরের মধ্যে দেয়া হইবে।

# দুনিয়াতে ছয়টি আযাবঃ

১. তাহার জীবনে কোনরূপ বরকত পাইবেনা।

২. আল্লাহ্ তার চেহারা হইতে নেক লোকের চিহ্ন উঠাইয়া লইবেন।

৩. যে যাহা কিছু নেক কাজ করবে, তাহার ছওয়াব পাইবেনা।

৪. তাহার দোয়া আল্লাহ্ পাকের নিকট কবুল হইবে না।

৫. আল্লাহ্ পাকের সমস্ত ফেরেশতা তাহার উপর অসন্তুষ্ট থাকবে।

৬. ইসলামের মূল্যবান নেয়ামত সমূহ হইতে বঞ্চিত করা হইবে।

# মৃত্যুর সময় আজাব তিনটিঃ

১. অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত হইয়া মৃতু্যবরণকরিবে।

২. ক্ষুধার্ত অবস্থায় মৃত্যু বরন করিবে।

৩. মৃত্যুকালে তাহার এত পিপাসা পাইবে যে,তাহার ইচ্ছা হইবে দুনিয়ার সমস্ত পানি পান করিয়া ফেলিতে।

# কবরের মধ্যে তিনটি আজাবঃ

১. তাহার কবর এমন সংকীর্ণ হবে যে তাহার এক পাশের হাড় অপর পাশের হাড়ের সংগে মিলিত হইয়া চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া যাইবে।

২. তাহার কবরে, দিনরাত্রি সবসময় আগুন জ্বালাইয়া রাখা হবে।

৩. আল্লাহ্ তাহার কবরে একজন আজাবের ফেরেশ্তা নিযুক্ত করিবেন। তাহার হাতে লোহার মুগুর থাকবে। সে মৃত ব্যক্তিকে বলতে থাকবে যে,দুনিয়ায় কেন নামায পড় নাই। আজ তাহার ফল ভোগ কর। এই বলিয়া ফজর নামায না পড়ার জন্য ফজর হইতে জোহর পর্যন্ত, জোহর নামাযের জন্য জোহর থেকে আছর পর্যন্ত, আছরের নামাযের জন্য আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত, মাগরিবের নামাযের জন্য মাগরিব হইতে এশা পর্যন্ত এবংএশার নামাযের জন্য এশা হইতে ফজর পর্যন্ত লোহার মুগুর দ্বারা আঘাত করতে থাকবে। 

এই কথাগুলো কোন সহিহ হাদিস নয় এটা একটি ভিত্তিহীন জাল হাদিস

ইমাম যাহাবী,ইবনু হাজার আসকালানী, ইমাম সূয়ুতী, ইমাম ইবনু ইরাকি প্রমুখ মুহাদ্দিসগন এ বিয়য়ে আলোচনা করেছেন। (যাহাবী, মিনাযুল ইতিদাল ৬/২৬৪, লাআলী পৃ:৯৯, ইবনু্ ইরাকি তানযীহ ২/১১৩-১১৪, গৃহিত-হাদিসের নামে জালীয়াতী কিতাব থকে)

এই ভিত্তিহীন জাল হাদিসটি “ফাজায়েলে আমাল” গ্রন্থে ফাজায়েলে নামাজ অধ্যায়ে আল্লামা জাকারিয়া (আল্লাহ তাকে জান্নাত দিন) উল্লেখ করেছেন।এবং তিনি হাদিসের শুরুতে বলেছেন “কেউ কেউ বলেছেন, এই কথাটা নাকি হাদিসে আছে” এবং শেষে তিনি বলেছেন, “ইমাম যাহাবী, ইমাম সূয়ুতী প্রমুখ মুহাদ্দিস এই কথাগুলোকে জাল ও বাতিল বলেছেন” এর সনদে জালিয়াতের পরিচয় তারা তুলে ধরেছেন”

আশ্চর্যের বিষয় হলো তিনি আরবিতে তাহকিক দিলেও তার অনুবাদ উর্দুতে করেন নি এবং বাংলায় অনুবাদ করার সময় জনাব সাখাওয়াত সাহেব যে অনুবাদটি করেছেন তাতে তিনিও এই কথাটি অনুবাদ করেন নি। বরং এই জাল হাদিসের ফায়দা উল্লেখ করেছেন

ফলশ্রুতিতে আজ জাল ও ভিত্তিহিন কথা সহিহ হাদিস হিসেবে চালিত হচ্ছে।

তাই আসুন জেনে নিন কেন আপনি এই হাদিস বর্ণনা করা থেকে বীরত থাকবেন যা আপনার ইমানী দায়িত্ব। 

রসুল (সা) বলেছেন, 

তোমরা আমার প্রতি মিথ্যারোপ করোনা, কেননা যে ব্যাক্তি আমার প্রতি মিথ্যারোপ করবে সে জাহান্নামে যাবে

(সহিহ মুসলিম মুকাদ্দমা অনুচ্ছেদঃ২)

রসুল (সা) বলেছেন,

যে ব্যাক্তি জেনে শুনে আমার উপর মিথ্যারোপ করবে, সে যেনো আগুনে তার বাসস্থান করে নেয়

(সহিহ মুসলিম মুকাদ্দমা অনুচ্ছেদঃ২) 

তাই যখনি, রসুল (সা) এর নামে কোন কথা বলবেন তাহলে আগে জানুন কথাটি রসুল (সা) থেকে সহিহ সনদে প্রমানিত।

আল্লাহ আমাদের বোঝার তাওফিক দিন আমিন।

Advertisements

মুন্তাখাব হাদিস গ্রন্থের পর্যালোচনা।

Image

রসূল (সা) এর নামে জাল হাদিস র্ব্ণনা করা কবীরা গুনাহ ও তার স্থান হবে জাহান্নাম এতে কারো সন্দেহ নাই।

(ইমাম নববী,শরহে সহিহ মুসলিম)

আর যঈফ হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে ইমাম মুসলিম যঈফ হাদিস বর্ণনা করা নিষিদ্ধ করেছেন। 
(সহিহ মুসলিম মুকদ্দামা অনুচ্ছেদ দ্রস্টব্য)

কিন্তু অনেকে উক্ত মূলনীতি গ্রহন করতে চান না।

অনেকে বলেন যঈফ হাদিস ফাজায়েলের জন্য বর্ণনা করা যাবে। সেক্ষেত্রে মুহাদ্দিস গন একমত যে যঈফ হাদিস বর্ণনা করলে স্পস্ট ভাবে জনিয়ে দিতে হবে যে হাদিসটি যঈফ। কিন্তু মুন্তাখাব হাদিস সংকলনে হাদিস বর্ণনার পর হাদিস যে যঈফ তা বর্ণনা করা নাই।

যেসকল মুহাদ্দিস যঈফ হাদিস ফাজায়েলের জন্য বর্ণনা করা যাবে বলে মত দেন তারা আবার যঈফ হাদিস বর্ণনা করার কিছু শর্তও দিয়েছেন তার মাঝে একটি হল, 

“যঈফ হাদিস বর্ণনা করার সময় রসুল (সা) এর দিকে সম্মোধন করা যাবে না”
(ইমাম নববী, আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব, মুকাদ্দামা শরহে মুসলিম)

যে হাদিস রসূল (সা) এর দিকে সম্মোধন করা যাবে না তার আর কি প্রয়োজন? তাই এই মুলনীতি আপাত দৃস্টিতে যঈফ হাদিস বর্ণনার জন্য মনে হলেও তা আসলে যঈফ হাদিস বর্জনের একটি মুলনীতি।

মুহাদ্দিস গনের উপরিউক্ত চুরান্ত মূলনীতি প্রমান করে যে যঈফ হাদিস কোন পর্যায়ের। তাই এই মুলনীতি যঈফ হাদিস বর্জনের জন্য যথেস্ট।

নিম্নক্ত মুহাদ্দিস গন দ্ব্যর্থহীন ভাবে যঈফ হাদিস বর্জন করেছেন,

১. ইমাম বুখারী (র)

২. ইমাম মুসলিম (র)

৩. ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাইন (র)

৪. ইমাম ইবনু হিব্বান (র)

৫. ইমাম ইবন হাজার আসক্কালানী (র) আরোও অনেকে।

মুন্তাখাব হাদিস গ্রন্থের পর্যালোচনা।

১ম হাদিস:
“মিসওয়াক করে দুই রাক’আত ছালাত আদায় করা মিসওয়াক বিহীন সত্তর রাক’আত ছালাত পড়ার সমান”
(মুন্তাখাব হাদিস,অনুবাদক: মওলানা মুহাম্মাদ সা’আদ ছাহেব ঢাকা : দারুল কুতুব, দ্বীতিয় প্রকাশ, আগস্ট ২০১০, পৃ: ২৯৯)

তাহক্কীক:
বর্ণনাটি জাল। ইমাম বাযযার বলেন, এর সনদে মু’আবিয়া নামে একজন রাবী রয়েছে। সে ছাড়া আর কেউ এই হাদীস বর্ণনা করেনি। ইবনু হাজার আসক্বালানী তাকে যঈফ বলেছেন। এছাড়া মুহাম্মদ ইবনু ওমর নামে আর একজন রাবী রয়েছে সে মিথ্যুক।
(সিলসিলা ই যঈফা হা/১৫০৩ এর ভাষ্য দ্র: যঈফুল জামে’ আছ-ছাগীর হা/৩১২৭)

২য় হাদিস:
যায়েদ ইবনু খালেদ আল-জুহানী (রা) বলেন, মিসওয়াক না করে রসূল (সা) কোন ছালাতের জন্য বের হতেন না।
(মুন্তাখাব হাদিস, পৃঃ ৩০০)

তাহক্কীক:
বর্ণনাটি যঈফ।
(যঈফ আত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১৪৩)

৩য় হাদিস:
আবু আইয়ুব (রা) বলেন, রসূল (সা) বলেছেন, চারটি বিষয় নবীদের সুন্নত ১.লজ্জা করা, অন্য বর্ণনায় খাতনা করার কথা রয়েছে ২.সুগন্ধি ব্যাবহার করা ৩.মিসওয়াক করা ৪. বিবাহ করা
(মুন্তাখাব হাদিস পৃঃ ২৯৭)

তাহক্কীক:
বর্ণনাটি যঈফ। উক্ত বর্ণনায় কয়েকটি ত্রুটি আছে। আইয়ুব ও মাকহূলের মাছে রাবী বাদ পড়েছে। হাজ্জাজ বিন আরত্বাহ নামক রাবীর দোষ রয়েছে। এছাড়া এর সনদে আবু শিমাল রয়েছে। তাকে আবু যুর’আহ ও ইবনু হাজার আসক্কালানী অপরিচিত বলেছেন।
(মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দিন আলবানী, ইরওয়াউল গালীল ফী তাখরীজে আহাদীছি মানারিস সাবীল, আল মাকতাবাতুল ইসলাম হা/৭৫ ১ম খন্ড পৃঃ ১১৭)

৪র্থ হাদিস:
আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রা) থেকে বর্ণিত, যখন যোহরের আজান দেয়া হল তখন তিনি ওযূ করলেন এবং ছালাত আদায় করলেন। অতঃপর যখন আসরের আজান দেয়া হল তখনো ওযূ করলেন। রাবী বলেন, আমি তাকে এ বিষয়ে জিগ্গেস করলে তিনি বলেন, রসূল (সা) বলেছেন, যে ওযূ অবস্থায় ওযূ করবে, তার জন্য আল্লাহ দশটি নেকি লিপিবদ্ধ করবেন
(মুন্তাখাব হাদিস পৃঃ ২৯৭)

তাহক্কীক:
হাদীসটি যঈফ। ইমাম তিরমিজি, মুনযেরী, ইরাক্বী, নববী, ইবনু হাজার (রহ) প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীছটিকে যঈফ হওয়ার ব্যাপারে একমত। উক্ত হাদীছের সনদে আব্দুর রহমান ইবনু যিয়াদ ইফরীক্বী ও গুত্বাইফ নামক দুইজন দুর্বল ও অপরিচিত রাবী আছেন।
(আলবানী যঈফ আবু দাউদ হা/১০ তাহক্কীক মেশকাত হা/২৯৩)

৫ম হাদিস:
ওসমান (রা) বলেন, আমি রসূল (সা) কে বলতে শুনেছি যে, কোন বান্দা যখন উত্তমরূপে ওযূ করে তখন আল্লাহ তার সামনের ও পিছনের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন।
(মুন্তাখাব হাদিস পৃঃ ২৯২)

তাহক্কীক:
বর্ণনাটি মুনকার বা অস্বীকৃত। 
(সিলসিলা ই যঈফা হা/৫০৩৬)

নোট: 

অনেকে বলতে পারেন একটা বইয়ের কিছু হাদিস জাল/যঈফ হলেই তা পড়া যাবেনা এটা কোথায় আছে?

হ্যা আমি একমত তার সাথে, কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে হাদিসের সংকলনটিতে হাদিস বর্ণনার পর স্পস্ট বলে দেয়া আছে কি না হাদিসটির (সহিহ/যঈফ/জাল) হুকুম। এরখম হুকুম লাগানো নাই মুন্তাখাব হদিসের সংকলনটিতে।

তা নাহলে যেকোন সময় যঈফ/জাল হাদিস নিয়ে আমল শুরু হয়ে যেতে পাড়ে যা আমাদের সমাজে আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি, যা কাম্য নয়।

কারন, ধরেন আপনি বাজার থেকে একবস্তা চাল কিনে আনলেন। এখন বাসায় এসে ভাত খেতে বসে ভাতের প্লেটে দেখলেন সাদ সাদা চালের মতই অনেক পথর। এখন আপনি যদি সেই চাল পরিবর্তন না করে ভাত রান্না করে খেতেই থাকেন তাহলে আাপনার দাত তো ভাংবেই সাথে আপনার পরীবার ও রেহাই পাবেনা।

তাই তাবলীগ জামাতের আমীরদের কাছে আকুল আবেদন।

আপনাদের হাদিসের সংকলন মুন্তাখাব হাদিসের কিতাবটিতে হাদিসের হুকুম লাগিয়ে নতুন সংস্করন ছাপানোর জন্য অনুরোধ রইল। সাথে আপনাদের বহুল প্রচলিত ফাজায়েলে আমাল কিতাবটির মধ্যো যে সকল মিথ্যা কিস্সা কাহিনি/শিরকি আকিদা/জাল/যঈফ হাদিস রয়েছে তার পরিবর্তন করে নতুন সংস্করন ছাপানোর অনুরোধ রইল।

রসূল (সা) বলেন, প্রত্যেক আদম সন্তান ভুলকারী আর উত্তম ভুলকারী সে-ই যে তওবাকারী।
(হাদিস সহিহ, তিরমিযি হা/২৪৯৯)

আল্লাহ আমাদেরকে তওবাকারীদের সাথেই থাকার তাওফীক দিন আ’মিন।