দশ জন সাহাবা (রা) সত্যায়নে রসুল (সা) এর সালাত। আপনার সালাত কি এর সাথে মেলে?

Image

সাধারণত একই হাদীসে সালাতের সকল কর্মগুলো পাওয়া যায় না। তবে এই হাদীসটি দশজন সাহাবা (রা) দেয়া স্বাক্ষ্য হিসেবে মোটামুটি সালাতের বেশিরভাগ কাজ এখানে এসে যায়।

ইমাম আবুদাউদ তার সুনান আবুদাউদে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। যেখানে সেই হাদীসে রসুল (সা) এর দশ জন সম্মানিত সাহাবা (রা) সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, হ্যাঁ এটাই ছিল রসুল (সা) এর সালাত। আসুন দেখি আমার আপনার সালাত কি ঠিক সেরখম কি না। 

কেননা রসুল (সা) বলেছেন “সল্লু কামা রআইতুমুনি উসল্লি” তোমরা ঠিক সেভাবেই সালাত আদায় করো যেভাবে আমাকে দেখেছ (সহীহ বুখারী হা/৬৩১)

=======================================

মুহাম্মাদ ইবনু আমর (রহ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবু হুমায়িদ আস-সাঈদী (রা) কে দশজন সাহাবীর উপস্থিতিতে যাদের মধ্যে আবু ক্বাতাদাহ (রা) ছিলেন-বলতে শুনেছি: রসুলুল্লাহ (সা) এর সালাত সম্পর্কে আমি আপনাদের চেয়ে অধিক অবগত।

তারা বললেন, সেটা আবার কিভাবে? আল্লাহর সপথ! আপনি তো তার অনুসরণ ও সাহচর্যের দিক দিয়ে আমাদের চেয়ে বেশি অগ্রগামী নন। তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর তারা বললেন, এখন আপনি আপনার বক্তব্য পেশ করুন।

তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সা) সালাতে দাড়ানোর সময় নিজের দু হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে আল্লাহু আকবার বলে পূর্ণরুপে সোজা হয়ে দাড়াতেন।

এরপর ক্বিরআত পড়ে তাকবীর বলে রুকুতে গমনকালে স্বীয় দু হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠাতেন।

তারপর রুকুতে গিয়ে দু হাতের তালু দ্বারা হাটুদ্বয় দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতেন।

রুকুতে তার মাথা পিঠের সাথে সমান্তরাল থাকত।

এরপর রুকু হতে মাথা উঠিয়ে “সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ” বলে তিনি স্বীয় দু হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে সোজা হয়ে দাড়াতেন।

তারপর আল্লাহু আকবার বলে তিনি সাজদায় যেতেন, সাজদাহতে বাহুদ্বয় স্বীয় পাঁজরের পাশ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতেন।

তারপর সাজদাহ হতে মাথা উঠিয়ে বাম পা বিছিয়ে তাতে সোজা হয়ে বসতেন এবং সাজদাহকালে স্বীয় পায়ের আংগুলগুলি ফাকা করে রাখতেন।

এর পর আবার সাজদায় যেতেন এবং আল্লাহু আকবার বলে সাজদাহ হতে মাথা উঠিয়ে বাম পা বিছিয়ে তাতে সোজা হয়ে বসতেন, এমনকি প্রতিটি হাড় স্ব স্ব স্থানে ফিরে যেত।

এরপর পরের রাকআতও অনুরুপভাবে আদায় করতেন।

অতঃপর যখন দু’রাকআত শেষে (তৃতীয় রাকআতের জন্য) দাড়াতেন তখন তাকবীর বলে দু হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠাতেন, ঠিক যেমনটি উঠাতেন সালাত আরাম্ভকালে তাকবীর বলে।

অতঃপর এভাবেই তার অবশিষ্ট সালাত আদায় করতেন।

অতঃপর শেষ রাকআতে স্বীয় বাম পা ডান পাশে বের করে বাম পাশের পাছার উপর ভর করে বসতেন।

তখন তারা সকলেই বললেন, হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। রসুলুল্লাহ (সা) এভাবেই সালাত আদায় করতেন।

(হাদীস সহীহ)

(সুনান আবুদাউদ হা/৭৩০, ১ম খন্ড, অনুচ্ছেদ-১১৭: সালাত শুরু করা সম্পর্কে, এছাড়া এই হাদীস পাবেন: ‍তিরমিযী হা/৩০৪,অনুচ্ছেদ: সালাতের বিবরণ, ইবনু মাজাহ হা/১০৬১, সনদ সহীহ, মিশকাত হা/৭৪৫, অনুচ্ছেদ: সালাতের বিবরণ)

Advertisements

ছালাতের ফজিলত সম্পর্কে জঈফ ও জাল হাদিস

Image

ছালাতের ফজিলত সম্পর্কে জঈফ ও জাল হাদিস

ছালাত জান্নাতের চাবি কথাটি সমাজে বহুল প্রচলিত । অনেকে বুখারিতে আছে বলেও চালিয়ে দেয়াই পছন্দ করে। আসলে এর কোন ভিত্তি নাই।

হাদিস নং ১।

জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (ছা) বলেছেন, জান্নাতের চাবি হল ছালাত। আর ছালাতের চাবি হল পবিত্রতা।

(মুসনাদে আহমাদ হা/১৪৭০৩ তিরমিজি হা/৪ মিস্কাত হা/২৪৯ ফাজায়েলে আমাল  ৮৮ পৃ)

তাহকিকঃ

হাদিস এর প্রথম অংশ  জঈফ (জঈফুল জামে হা/৫২৬৫, সিলসিলা ই জঈফা হা/৩৬০৯) দ্বিতীয় অংশ পৃথক সনদ এ ছহিহ সুত্রে বর্ণিত আছে। (আবু দাউদ হা/৬১, তিরমিজি হা/৩)

হাদিসটির প্রথম অংশ জঈফ হবার কারন হল- উক্ত সনদ এ দুইজন দুর্বল রাবি আছে। (ক) সুলাইমান বিন করম ও (খ) আবু ইয়াহিয়া আল-কাত্তাত।

(আলবানি, মিস্কাত হা/২৯৪ এর টিকা দ্রষ্টব্য)

জ্ঞাতব্যঃ

জান্নাতের চাবি সম্পর্কে ইমাম বুখারি (রহ) একটি অনুচ্ছেদের বিষয়বস্তু আলোচনা করতে গিয়ে ওহাব ইবনু মুনাব্ববিহ (রহ) থেকে যে বর্ণনা এসেছে তা হল-

“লা ইলাহা ইল্লাল্লহ” কি জান্নাতের চাবি? তখন তিনি বলেন, হ্যাঁ। তবে প্রত্যেক চাবির দাত রয়েছে। তুমি যদি এমন চাবি নিয়ে আসো যার দাঁত রয়েছে, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত খোলা হবে। অন্যথাই খোলা হবে না।

(বুখারি ১/১৬৫ পৃ হা/১২৩৭ এর পূর্বের আলোচনা দ্রষ্টব্য)

এছারাও আরও অন্নান্য ছহিহ হাদিস দারাও এটা প্রমানিত।

(বুখারি হা/৫৮২৭, মুসলিম হা/২৮৩, )

তাই, “লা ইলাহা ইল্লাল্লহ” হল জান্নাতের চাবি আর শরিয়াতের অন্নান্য আমল-আহাকাম অর্থাৎ ছালাত, সিয়াম, হাজ, যাকাত ইত্যদি ওই চাবির দাঁত।

 

হাদিস নং ২।  

ছালাত হল দিনের খুঁটি। সুতারাং যে ব্যাক্তি ছালাত কায়েম করলো সে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করলো। আর যে ব্যাক্তি ছালাত ছেড়ে দিল সে দ্বীনকে ধ্বংস করল।

(কাশফুল খাফা ২/৩২ পৃ, তাযকিরাতুল  মউজুয়াত পৃ ৩৮, ফাজায়েলে আমাল  ২৯ পৃ)

তাহকিকঃ

সমাজে হাদিসটির সমাধিক প্রসার থাকলেও হাদিসটি গ্রহন যোগ্য নয়। ইমাম নাবাবি (রহ) বলেন, এটি বাতিল ও মুনকার।

(কাশফুল খাফা ২/৩১ পৃ,)

হাদিস নং ৩।  

রসুল (সা) বলেছেন, ছালাত মুমিনের মিরাজ।

(তাফসিরে রাযি ১/২১৮ পৃ, তাফসিরে হাক্কি ৮/৪৫৩ পৃ, মিরকাতুল মাফাতিহ ১/১৩৪ পৃ, “ইমান” অধ্যায়)

তাহকিকঃ

উক্ত বর্ণনার কোন সনদ নাই। এটি ভিত্তিহিন ও বানোয়াট।

হাদিস নং ৪।   

আনাস (রা) বলেন, রসুল (সা) বলেছেন, “ছালাত মুমিনের নুর”

(মুসনাদে আবি ইয়ালা হা/৩৬৫৫, ফাজায়েলে আমাল  ২৯ পৃ)

তাহকিকঃ

বর্ণনাটি জইফ। মুহাদ্দিস হুসাইন সালিম আসাদ (রহ) বলেন, উক্ত হাদিসের সনদ অত্যন্ত দুর্বল।

(তাহকিক মুসনাদে আবি ইয়ালা হা/৩৬৫৫,)

উক্ত হাদিসের সনদে ইসা ইবনু মাইসারা নামে একজন দুর্বল রাবি আছে।

(সিলসিলাই জইফা হা/১৬৬০)

উল্লেখ্য, ছলাত নুর, সাদাকা দলিল মর্মে মুসলিমে যে হাদিস বর্ণিত হয়েছে তা ছহিহ।

(মুসলিম হা/৫৫৬, মিস্কাত হা/২৮১)

হাদিস নং ৫।   

যে বাক্তি জামাতের সাথে ফজরের ছালাত আদায় করে সে যেন আদম (আ) এর সাথে পঞ্চাশ বার হজ করে এবং যে বাক্তি জামাতের সাথে যোহরের ছালাত আদায় করে সে যেন নুহ (আ) এর সাথে চল্লিশ কিংবা ত্রিশ বার হজ করে। এভাবেই অনন্যা ওয়াক্ত সে আদায় করে।

(হাসান ইবনু মুহাম্মাদ আস-ছাগানি, আল-মউজুয়াত হা/৪৮ পৃঃ ৪২)

 তাহকিকঃ

বর্ণনাটি জাল ও মিথ্যা।

(আল-মউজুয়াত হা/৪৮ পৃঃ ৪২)

 

হাদিস নং ৬।   

সালমান ফারসি (রা) বলেন, আমি রাসুল (সা) কে বলতে শুনেছি, যে বাক্তি ভোরে ফজরের ছালাতের দিকে আগিয়ে গেলো সে ইমানের পতাকা নিয়ে গেলো। আর যে বাক্তি ভোরে (ফজরের ছালাত আদায় না কওরে) বাজারের দিকে  আগিয়ে গেলো সে শয়তানের পতাকা নিয়ে গেলো।

(ইবনু মাজাহ হা/২২৩৪, বঙ্গানুবাদ মিস্কাত হা/৫৮৯)

তাহকিকঃ

উক্ত হাদিসের সনদ অত্যন্ত দুর্বল। এর সনদে উবাইস ইবনু মাইমুন নামক রাবি রয়েছে। ইমাম বুখারি (রহ) সহ অন্যান্য মুহাদ্দিছ গন তাকে মুনকার বলে অভিযোগ করেছে। ইবনু হিব্বান (রহ) বলেন, সে নির্ভরশীল বাক্তির নাম দিয়ে ধারনা পূর্বক বহু জাল হাদিস বর্ণনা করেছে।

(আলবানি, জইফ ইবনু মাজাহ হা/২২৩৪, মিস্কাত হা/৬৪০ টিকা দ্রষ্টব্য)

 

হাদিস নং ৭।   

ইমরান ইবনু হুসাইন (রা) বলেন, রাসুল (সা) কে একদা জিজ্ঞাস করা হল, আল্লাহর এই বানি সম্পর্কে-“নিশ্চয়ই ছালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে” তখন তিনি বললেন, যাকে তার ছালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে না “তার ছালাত হয় না”।

(তাফসির ইবনে কাসির; সিলসিলা ই জইফা হা/৯৮৫, ফাজায়েল এ আমাল পৃঃ ১৭২)

তাহকিকঃ

হাদিসটি জইফ। উক্ত বর্ণনার সনদে ইবনু জুনাইদ নামে একজন মিথ্যুক রাবি রয়েছে। মুহাদ্দিসগণ বর্ণনাটিকে মুনকার বলেছেন।

(সিলসিলা ই জইফা হা/৯৮৫৫)

হাদিস নং ৮।   

ইবনু আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা) বলেন, যার ছালাত তকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে না তাকে উহা ইসলাম থেকে দূরে সরে দেয়া ছারা আর কিছুই বৃদ্ধি করে না।

(ফাজায়েল এ আমাল পৃঃ ১৭৩, তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির হা/১০৮৬২)

তাহকিকঃ

বর্ণনাটি বাতিল বা মিথ্যা। এর সনদে লইস ইবনু আবি সালিম নামক ত্রুতিপূর্ণ  রাবি রয়েছে।

(সিলসিলা ই জইফা হা/২)

জ্ঞাতব্যঃ

উক্ত বর্ণনা প্রমান করে ত্রুটিপূর্ণ কোন বাক্তি ছালাত আদায় করলে ছালাত কবুল হয়না। সুতারাং ছালাত আদায় করে কোন লাভ নাই। কিন্তু উক্ত ধারনা সঠিক নয়। বরং ছালাত আদায়ের মাধ্যমে এক সময় সে আল্লাহর অনুগ্রহে পাপ কাজ ছেড়ে দিবে। ছহিহ হাদিসে বর্ণিত হইছে,

আবু হুরাইরা (রা) বলেন, জনৈক বাক্তি রাসুল (সা) এর নিকটে এসে বললেন, অমুক বাক্তি রাতে ছালাত আদায় করে আর সকাল হলে চুরি করে। তিনি উত্তরে বললেন, ছালাত তাকে অচিরেই তা থেকে বিরত রাখবে। 

(আহামাদ হা/৯৭৭৭, মিস্কাত হা/১২৩৭, সনদ ছহিহ)

চলবে……