হানাফী দেওবন্দী হোটেল – ০১

 35.-Hanafi-Deobandi-Hotel-01

 

বিখ্যাত  ইন্দিরা গান্ধী হোটেল
সঙ্কলন ও উপস্থাপনায়ঃ দেওবন্দী হানাফী পণ্ডিত, হানাফী ফিকহের প্রতিষ্ঠা ও পুনর্জাগরণ করার আন্দোলন

সূচনা: এটা হল ছোট্ট একটি প্রবন্ধ যেখানে উদ্ভট ও রহস্যময় হানাফী ফিকহের রূপ দেখানো হয়েছে। এখানে এমন কিছু বিষয় দেখানো হলো যেগুলো হানাফী মাযহাব অনুমোদন করে এবং কোরআন ও হাদীসের কোন দলীল ছাড়াই সেগুলোকে হালাল মনে করে। প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু একজন হানাফী হোটেলের ওয়েটার ও একজন কাস্টমারের কথোপোথনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হলো।

হানাফী ওয়েটার: স্বাগতম স্যার, আমরা এই হোটেল দেওবন্দীদের অত্যন্ত প্রিয় ও পছন্দনীয় আন্টি মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর নামে খুলেছি এবং এটা পাবলিকদের সেবায় সদা নিয়োজিত রয়েছে।

কাস্টমার: কি বললেন ভাই! দেওবন্দীরা তো মুসলিম আর ইন্দিরা গান্ধীতো মুসলিমদের বন্ধু নয়, তিনি তো হিন্দু। তাহলে তার নামে হোটেল কেন?

ওয়েটার: আমাদের দেওবন্দীদের সাথে উনার (ইন্দিরা গান্ধীর) বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে, সে জন্যই দেওবন্দ মাদ্রাসার ১০০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে উনাকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল এবং যথেষ্ট সম্মান, গভীর শ্রদ্ধা ও কবিতার আবৃত্তির মাধ্যমে উনাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানানো হয়েছিল। সেজন্যই হোটেল উনার নামে নাম করণ করা হয়েছে।

কাস্টমার: আপনাদের এখানে রান্না করা মাংস হবে?

ওয়েটার: জ্বী, কেন হবে না? আমাদের এখানে রান্না করা কুকুরের, বিড়ালের, হাতির, বাঘের, চিতাবাঘের, গাঁধার, ঘোড়ার, এমনকি শুকুরের মাংসও পাবেন। ও হ্যা, আমাদের আরো আছে মাংসের কিমা, মিটবলস্‌, রিবস্‌, রোস্ট করা মাংস – যা সবসময়ের জন্যই পাওয়া যায় স্যার। আর এগুলো জবাই করার সময় বিসমিল্লাহ বলে জবাই করা হয়েছে। ফলে সেগুলো খাওয়া হালাল, কারণ আমাদের নির্ভরযোগ্য হানাফী ফিকহের কিতাবে বর্ণিত আছে যে, যে কোন প্রানীই হোক তা খাওয়া হালাল হবে যদি তা জবাই করার সময় বিসমিল্লাহ পড়া হয় এবং যখন চামড়া পাকানো (tanned) হয় এবং উক্ত প্রানী থেকে বিষ্ঠা দূর করার পর জবাই করা হয় তখন সেটা হালাল হয়ে যায়। [হিদায়া, ফাতহুল কাদীর (১/৮৩-৮৪)]

কাস্টমার: এগুলো ব্যাতীত আর কিসের রান্না আছে?

ওয়েটার: আমাদের বিশেষ এক প্রকার ছাগলের মাংসের কাবাব আছে যার মুখটা কুকুরের মতো কিন্তু বাকি শরীর ছাগলের মতো ছিল। যা মূলত, কুকুর ও ছাগলের সঙ্কর প্রানী, যেটি একই সাথে ঘাসও খায় আবার মাংসও খায়, মাঝেমাঝে এটি কুকুরের মতো ডাকে আবার কখনও ছাগলের মতো ডাকে। এবং জবাই করার সময় এর পেটে নাড়িভুঁড়ি ছিল। আর আমাদের হানাফী মাযহাব মতে এমন বৈশিষ্ট্যসম্পণ্ন ছাগলের মাংস খাওয়া হালাল, কিন্তু এর মাথা খাওয়া হারাম। যার ফলে আমরা এরূপ প্রাণীর খুবই সুস্বাদু কাবাব বানিয়েছি, বিশেষ করে হানাফী ভাইদের জন্য। আর ঘাবরাবার কিছু নেই, এগুলো আমাদের হানাফী ফিকহে সুস্পষ্টরূপে বর্ণিত আছে। [ফাতাওয়া কাযী খান (৩/৩৫৭), ফাতাওয়া আলমগীরী (৫/২৯০)]

কাস্টমার: বাদ দেন এসব, আজেবাজে কি রান্না করেছেন?

ওয়েটার: আমাদের ভুল বুঝবেন না স্যার, আমাদের রয়েছে মেষ, যেটি গাঁধা ও শুকরের দুধ খেয়ে বড় হয়েছে, এবং এছাড়া এটি কিছুদিন ধরে ঘাস খেয়েছে। আমাদের হানাফী ফাতাওয়া অনুসারে এগুলোর মাংস খাওয়াতে কোন সমস্যা নেই। [ফাতাওয়া আলমগীরী ৯৫/২৯০]। যার কারণে কিছু চমৎকার কাবাব এগুলো থেকে রান্না করা হয়েছে।

কাস্টমার: আরে ভাই যথেষ্ট হয়েছে, কিছু ভাল খাবারের কথা বলুন।

ওয়েটার: হ্যা হ্যা আছে, সুন্দর একটি খাবার। আমাদের একটি বাছুর থেকে বানানো খাবার রয়েছে যেটি গাভীর জরায়ুতেই ছিল। কসাই বিশেষ কৌশলে গাভীর প্রসবের রাস্তা দিয়ে ছুরিসহ হাত ঢুকিয়ে জবাই করেছে। যেহেতু এটা হালাল (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/২৮৪), তাই এটা দিয়ে খুবই সুস্বাদু একটা ডিশ তৈরি করা হয়েছে।

কাস্টমার: দেখুন! কোন হালাল খাবার কি নাই যেগুলো আমাদের খাওয়ার জন্য দিতে পারেন?

ওয়েটার: কি যে বলেন স্যার! আমাদের সবচেয়ে কালো এবং বজ্জাত পাখি আছে যেটি কাক বলে পরিচিত। আমরা বিশেষ কায়দায় এটা রান্না করেছি। যদিও কিছু লোক এটাকে নিষিদ্ধ মনে করে, কিন্তু আমরা আমাদের বহু ফিকহের কিতাবে এবং অন্যান্য বেশ কিছু কিতাবে এটা খাওয়া হালাল পেয়েছি। এমনকি কয়েক বছর পূর্বেও আমাদের হানাফী স্কলারগণ কাক থেকে তৈরি করা এক ভোজের আয়োজন করেছিলেন এবং তারা এটা সাধারণ লোকদের মাঝেও বিতরণ করেন। [তাজকিরাতুর রাশীদ আহমাদ গাংগুহী দেওবন্দী হানাফী (২/১৭৭)]

কাস্টমার: আপনাদের কি আর কোন পাখির মাংস আছে যেগুলো আমরা খেতে পারি?

ওয়েটার: হ্যা আমাদের সুন্দরভাবে রান্না করা বাদুড় আছে। আমাদের অন্যতম ক্ল্যাসিকাল হানাফী ফিকহের বইতে বলা হয়েছে যে বাদুড় খাওয়া যেতে পারে (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/২৯০)। এমন কি আমরা পেঁচার মাংসও খেতে পারি। বিশ্বাস করুন, এটা খুবই টেস্টি, এটাও আমাদের বিখ্যাত ফিকহের বইয়ে আছে। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/২৯০)

কাস্টমার: আল্লাহ এসব মাংস তোমাদের জন্যই রাখুন! আপনাদের এখানে কোন মাছ হবে?

ওয়েটার: যে সমস্ত প্রানী পানিতে যায় যেমন, কচ্ছপ, ব্যাঙ, কুমির, কাঁকড়া ইত্যাদি সবকিছুই আমাদের এখানে পাওয়া যাবে যা আমরা পাশের হোটেল থেকে অর্ডার দিয়ে নিয়ে আসবো এবং তিনি একজন শাফেয়ী মুকাল্লিদ। সেও যেমন শাফেয়ীর মুকাল্লিদ আমরাও তেমন হানাফী মুকাল্লিদ। আমরা প্ল্যান করেছি যে একটি সামাজিক সী-ফুডের ডিশ প্রস্তুত করব। সুতরাং কোন মাছ যদি কোন নাপাক পানিতে রাখা হয় এবং সেগুলোকে পুষ্ট ও বড় করা হয়, তাহলে হানাফী উলামাদের মতে সেই মাছ খাওয়া হারাম নয়। (আল-ইশবাহ ওয়ান-নাযা’ইর, পৃ: ১৫৯)। আমরা আমাদের হানাফী ভাইদের জন্য এসব স্পেশাল খাবার রান্না করেছি, কারণ হানাফী ভাইদের মধ্যে অনেক ধরণ রয়েছে। আর আমরা এগুলো বানানোর জন্য একারণেই গুরুত্ব দিয়েছি যে, পিছে না আবার এভাবে ডিশ তৈরি না করে আমরা গাইরে মুকাল্লিদ হয়ে যাই!

কাস্টমার: ভাই আপনি তো সৌহার্দ্যমূলক আচরণ করছেন না, এখন পর্যন্ত আমাকে একটা বসার জন্য সিট পর্যন্ত দেখিয়ে দেন নি।

ওয়েটার: এখানে অনেক বসার অনেক সিট ও টেবিল রয়েছে, আপনার পছন্দমত একটিতে বসে যান।

কাস্টমার: দেখেন ব্রাদার, কোথায় আমি বসব? সব চেয়ার টেবিল তো নোংরা, বাজে জিনিসে ঢেকে আছে।

ওয়েটারা: আরে! আপনি মনে হয় আহলে হাদীসদের কুমন্ত্রনা পেয়েছেন? দেখুন আমাদের ফিকহ অনুযায়ী এসব নোংরা জিনিস সকল ক্ষেত্রে হারাম বস্তু নয়।

কাস্টমার: কি বলছেন ভাই? দেখেতো মনে হচ্ছে এই চেয়ারে মহিলাদের মাসিক স্রাবের রক্ত লেগে আছে।

ওয়েটারা: জ্বী আপনি ঠিক ধরেছেন, এক হানাফী দম্পতি এখানে বসেছিলেন। তারা যখন প্রেমালাপে মত্ত ছিল এবং অতিমাত্রায় আবেগপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, তখন মহিলাটির লজ্জাস্থান থেকে রক্তক্ষরণ হয়েছে। আর আমাদের হানাফী ফিকহ অনুসারের এরূপ মাসিকের রক্ত নাপাক নয় বরং পবিত্র। [দুররুল মুখতার, হাশিয়াহ শামী (১/১২৩)]

কাস্টমার: কিছু মনে করবেন না, এই মহিলার মাসিকের রক্ত, এমনকি দেখতে পাচ্ছি টেবিলের উপর কয়েক ফোটা বীর্যও পরে আছে, সেগুলো নিয়ে এখন কি করা উচিত?

ওয়েটার: ঘাবড়ানোর কিছু নেই, শান্ত হোন এবং বসে পরুন। যদি এই পরিমান নাপাক বস্তু কারো বাহুতে বা কাপড়ে লেগে যায় তাহলে তিনবার তা জিহবা দিয়ে চেটে নিলেই পাক হয়ে যায়। [ফাতাওয়া আলমগীরী (১/৪৫), দুররুল মুখতার (১/২২৬)]

কাস্টমার: আমি বিস্মীত না হয়ে পারলাম না কিভাবে এই মাসিকের রক্ত ও বীর্য এখানে আসল? একি! এক লোক দেখি লোকজনের উপস্থিতেই হস্তমৈথুন করছে, ওকে হোটেল থেকে বের করে দেন?

ওয়েটার: কেন আপনি বিস্মিত হচ্ছেন? আমাদের নির্ভরশীল ও বিশ্বাসযোগ্য হানাফী ফিকহে উল্লেখ আছে, যখন মানুষের কামনা অতিমাত্রায় বেড়ে যায় এবং তাঁর যদি কোন বিবি বা দাসী না থাকে, তাহলে সে চরম উত্তেজনা থেকে মুক্তি পেতে হস্তমৈথুন করতে পারে এবং আশা করা যায় এতে তার কোন পাপ হবে না। কিন্তু এই চরম যৌন উত্তেজনার কারণে যদি তার পাপ কাজ (যেমন-যিনা) করার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তাহলে তখন তার জন্য হস্তমৈথুন করা ওয়াজিব হয়ে যায়। [দুররুল মুখতার, হাশিয়াহ শামী (৩/১৭১)] তাহলে কেন আমরা এটা বারণ করতে যাবো যেটা করা বাধ্যতামূলক, কেন তাকে হোটেল থেকে বের করে দিব যখন সেকাজ তার জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়? বরং ইমাম শামী বলেছেন “যদি যিনা করে ফেলার ভয় হয়, তখন সে এই কাজ (হস্তমৈথুন) করার কারণে পুরস্কৃত হবে (অর্থাৎ নেকি পাবে) [মিনহাতাল খালিক্ব, পৃ: ৬১] আর এরূপ বাধ্যতামূলক কাজের জন্যই আমাদের টেবিল ও চেয়ারে এসব নাপাক বস্তু পড়ে যায়। তবে এটা তিন বার জিহ্বা দিয়ে চেটে নিলেই পাক হয়ে যাবে।

চলবে ইনশাআল্লাহ্‌ ! 

সংগ্রহ: সত্যান্বেষী

দশ জন সাহাবা (রা) সত্যায়নে রসুল (সা) এর সালাত। আপনার সালাত কি এর সাথে মেলে?

Image

সাধারণত একই হাদীসে সালাতের সকল কর্মগুলো পাওয়া যায় না। তবে এই হাদীসটি দশজন সাহাবা (রা) দেয়া স্বাক্ষ্য হিসেবে মোটামুটি সালাতের বেশিরভাগ কাজ এখানে এসে যায়।

ইমাম আবুদাউদ তার সুনান আবুদাউদে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। যেখানে সেই হাদীসে রসুল (সা) এর দশ জন সম্মানিত সাহাবা (রা) সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, হ্যাঁ এটাই ছিল রসুল (সা) এর সালাত। আসুন দেখি আমার আপনার সালাত কি ঠিক সেরখম কি না। 

কেননা রসুল (সা) বলেছেন “সল্লু কামা রআইতুমুনি উসল্লি” তোমরা ঠিক সেভাবেই সালাত আদায় করো যেভাবে আমাকে দেখেছ (সহীহ বুখারী হা/৬৩১)

=======================================

মুহাম্মাদ ইবনু আমর (রহ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবু হুমায়িদ আস-সাঈদী (রা) কে দশজন সাহাবীর উপস্থিতিতে যাদের মধ্যে আবু ক্বাতাদাহ (রা) ছিলেন-বলতে শুনেছি: রসুলুল্লাহ (সা) এর সালাত সম্পর্কে আমি আপনাদের চেয়ে অধিক অবগত।

তারা বললেন, সেটা আবার কিভাবে? আল্লাহর সপথ! আপনি তো তার অনুসরণ ও সাহচর্যের দিক দিয়ে আমাদের চেয়ে বেশি অগ্রগামী নন। তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর তারা বললেন, এখন আপনি আপনার বক্তব্য পেশ করুন।

তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সা) সালাতে দাড়ানোর সময় নিজের দু হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে আল্লাহু আকবার বলে পূর্ণরুপে সোজা হয়ে দাড়াতেন।

এরপর ক্বিরআত পড়ে তাকবীর বলে রুকুতে গমনকালে স্বীয় দু হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠাতেন।

তারপর রুকুতে গিয়ে দু হাতের তালু দ্বারা হাটুদ্বয় দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতেন।

রুকুতে তার মাথা পিঠের সাথে সমান্তরাল থাকত।

এরপর রুকু হতে মাথা উঠিয়ে “সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ” বলে তিনি স্বীয় দু হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে সোজা হয়ে দাড়াতেন।

তারপর আল্লাহু আকবার বলে তিনি সাজদায় যেতেন, সাজদাহতে বাহুদ্বয় স্বীয় পাঁজরের পাশ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতেন।

তারপর সাজদাহ হতে মাথা উঠিয়ে বাম পা বিছিয়ে তাতে সোজা হয়ে বসতেন এবং সাজদাহকালে স্বীয় পায়ের আংগুলগুলি ফাকা করে রাখতেন।

এর পর আবার সাজদায় যেতেন এবং আল্লাহু আকবার বলে সাজদাহ হতে মাথা উঠিয়ে বাম পা বিছিয়ে তাতে সোজা হয়ে বসতেন, এমনকি প্রতিটি হাড় স্ব স্ব স্থানে ফিরে যেত।

এরপর পরের রাকআতও অনুরুপভাবে আদায় করতেন।

অতঃপর যখন দু’রাকআত শেষে (তৃতীয় রাকআতের জন্য) দাড়াতেন তখন তাকবীর বলে দু হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠাতেন, ঠিক যেমনটি উঠাতেন সালাত আরাম্ভকালে তাকবীর বলে।

অতঃপর এভাবেই তার অবশিষ্ট সালাত আদায় করতেন।

অতঃপর শেষ রাকআতে স্বীয় বাম পা ডান পাশে বের করে বাম পাশের পাছার উপর ভর করে বসতেন।

তখন তারা সকলেই বললেন, হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। রসুলুল্লাহ (সা) এভাবেই সালাত আদায় করতেন।

(হাদীস সহীহ)

(সুনান আবুদাউদ হা/৭৩০, ১ম খন্ড, অনুচ্ছেদ-১১৭: সালাত শুরু করা সম্পর্কে, এছাড়া এই হাদীস পাবেন: ‍তিরমিযী হা/৩০৪,অনুচ্ছেদ: সালাতের বিবরণ, ইবনু মাজাহ হা/১০৬১, সনদ সহীহ, মিশকাত হা/৭৪৫, অনুচ্ছেদ: সালাতের বিবরণ)

Sykes-Picot চুক্তি যা জানা মুসলিমদের খুব দরকার।

Sykes-Picot  চুক্তি কি আপনারা কি জানেন? পোস্টটি এরিয়ে যাবেন না প্লিজ। হতে পারে এখান থেকে আপনি অনেক কিছু জানবেন যা আপনি যানেন না।

মে-১৯১৬ সালে ব্রিটিশদের মধ্যে Mark Sykes এবং ফ্রান্সের Georges Picot তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধর সময় Ottoman Empire কে একটি মানচিত্রের সামনে দারিয়ে ভাগকরে কে কোন অংশ নিবে।

সিরিয়া,লেবানন,তুরস্ক এই তিন জায়গা ফ্রান্স এবং ফিলিস্তিন,জর্ডান,পার্সিয়ান গালফ এর পাশের জায়গা,বাগদাদ ব্রিটিশরা নেয়ার জন্য গোপন চুক্তি করে।

Image

তারা এই ম্যাপের সামনে দারিয়ে এমন ভাবে চুক্তি করে ঠিক যেন কোন খাবারের থালার সামনে দারিয়ে মানুষ খাবার খাওয়ার জন্য একে অপরকে ডাকতে থাকে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ্যের আগেও মুসলিমদের একটি নিদৃস্ঠ সংঘবদ্ধ দল ছিল যা Ottoman Empire হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ছিল। আর এই মুসলিমদের সংঘবদ্ধ দলকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ্যের সময় ভেঙ্গে দেবার চুরান্ত চক্রান্ত করে এই দুই দল। আর এদের কে সাহয্য করে টি ই লরেন্স নামের এক গুপ্তচর। এই গুপ্তচর Ottoman Empire খলিফাদের নিকট এতই বিশ্বস্ত ছিল যে, টি ই লরেন্স যে গুপ্তচর তা তারা বুঝতেই পারেনি। (মুসলিমরা সদা সর্বদাই অমুসলিমকে বিশ্বাস করে ঠগছে)

Sykes-Picot এই চুক্তির সাথে রসুল (সা) এর বানীর কথা মনে পরে গেল, আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শীঘ্রই মানুষ তোমাদেরকে আক্রমন করার জন্য আহবান করতে থাকবে, যেভাবে মানুষ তাদের সাথে খাবার খাওয়ার জন্য একে-অন্যকে আহবান করে।’

জিজ্ঞেস করা হলো, ‘তখন কিআমরা সংখ্যায় কম হবো?’ তিনি বললেন, ‘না, বরং তোমরা সংখ্যায় হবে অগণিত কিন্তু তোমরা সমুদ্রের ফেনার মতো হবে, যাকে সহজেই সামুদ্রিক স্রোত বয়ে নিয়ে যায় এবং আল্লাহ তোমাদের শত্রুর অন্তর থেকে তোমাদের ভয় দূর করে দিবেন এবং তোমাদের অন্তরে আল-ওয়াহ্হান ঢুকিয়ে দিবেন।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.),আল- ওয়াহ্হান কি?’ তিনি বললেন, ‘দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং ক্বিতালকে অপছন্দ করা।’ (মুসনাদে আহমদ, খন্ডঃ ১৪, হাদিস নম্বরঃ ৮৭১৩, হাইসামী বলেছেনঃ হাদিটির সনদ ভালো, শুয়াইব আল আর নাউতের মতে হাদিসটি হাসান লি গাইরিহি)

সাওবান (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসে এসেছেঃ

حُبُّ الْحَيَاةِ وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ

‘দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা।’ (সুনানে আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমদ, হাদিস হাসান)

Sykes-Picotচুক্তি এরখমই এক খাবার টেবিলে রেখে মানচিত্রকে টুকরো করে ইসলামিক স্টেটকে খাবার মতোই। রসূল (সা) এর কথার বাস্তবতা আজ  আমাদের সামনে স্পস্ট।এই ইতিহাস বেশিদিনের নয় এইতো কিছুদিন আগের কথা।

তাই মুসলিমদের জানা উচিত তাদের আসল ইতিহাস না হলে তারা তাদের পুরানা গৌরব কিভাবে ফিরে আনবে? 

আমি কোন ইতিহাসের ছাত্র নই তাই বিস্তারিত জানতে নিচের লিংকে শায়খ ড ইয়াসির কাদির লেকচার দুটি আপাকে এ সম্মন্ধ্যে বিস্তারিত জানাতে সাহয্য করবে ইনশাআল্লাহ।

শেপিং দা মুসলিম ওয়াল্ড ১৯১৪ বাই ইয়াসির কাদি পার্ট ১

শেপিং দা মুসলিম ওয়াল্ড ১৯১৪ বাই ইয়াসির কাদি পার্ট ২

লেখাটি পড়া হলে শেয়ার করতে ভুলবেন না। সাইডের লিংটা অবশ্যই দিবেন।

রসুল (সা) এর সুন্নতের অনুসরনের গুরুত্ব

ইসলাম ধর্মে যেমন আল্লাহর আনুগত্য করা ফরজ তেমনি রসুল (সা) এর আনুগত্য করা ফরজ যেমন আল্লাহ কোরআনে বলেছেন:

যে লোক রসূলের হুকুম মান্য করবে সে আল্লাহরই হুকুম মান্য করল। আর যে লোক বিমুখতা অবলম্বন করল, আমি আপনাকে (হে মুহাম্মদ), তাদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে পাঠাইনি।   (সুরা নিসা: ৮০)

হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রসূলের (সাঃ) আনুগত্য কর এবং নিজেদের কর্ম বিনষ্ট করো না। (সুরা মোহাম্মদ:৩০)

তাই আমাদেরকে রসুল (সা) এর সহিহ সুন্নতকে নির্ধিদায় মেনে নিতে হবে যেমনটি ইমাম আহমাদ (রহ) বলতেন: ”আমাকে আল্লাহর কিতাব বা রাসুলুল্লার সুন্না থেকে কোন প্রমান দাও তাহলে আমি মেনে নিব”

সাহাবা (রা) দের সুন্না অনুসরনের দৃষ্টান্ত:

সাহাবা (রা) রসুল (সা) এর সমুহ কথা ও কাজকে সম্পুন ভাবে অনুসরন করার চেষ্টা করতেন যেভাবে নবী (সা)কে করতে দেখতেন বা তার কাছে শুনতেন।

১. আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন: একদা রসুল (সা) সাহাবিদের সালাত পড়াচ্ছিলেন তখন সালাত অবস্থায় তিনি জুতা খুলে বামপার্শে রেখে দিলেন। সাহাবারা (রা) যখন দেখলেন তখন তারাও জুতা খুলে ফেললেন। রসুল (সা) সালাত শেষে জিজ্জাসা করলেন; তোমাদের জুতা খুলে ফেললে কেন? তারা বললেন: আমরা আপনাকে জুতা খুলতে দেখেছি বিধায় আমরাও খুলে ফেলেছি। রসুল (সা) বললেন: আমাকেতো জিবরীল (আ) এসে বলে দিলেন যে, আমার জুতায় ময়লা ছিল। অতপর সাহাবিদের (রা) নছিহত করে বললেন: যখন মসজিদে সালাত আদায় করতে আসবে তখন জুতাকে ভাল ভাবে দেখেনিবে। যদি ময়লা থাকে তাহলে তা পরিস্কার করে নিবে তারপর সালাত আদায় করবে। (হাদিসটি সহিহ, সুনানু আবিদাউদ হা/৬০৫)

২. নাফে (রহ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) একদা সংগীত যন্ত্রের স্বর শুনে কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিলেন এবং রাস্তার পার্শে অনেক দুরে চলে গেলেন এবং আমাকে জিজ্জাসা করলেনঃ হে নাফে (রহ) তুমি কি কিছু সুনতে পাও? আমি বললাম না, তখন তিনি আঙ্গুল কান থেকে বের কলেন এবং বললেনঃ আমি রসুল (সা) এর সাথে ছিলাম তিনি এরুপ একটি স্বর সুনে তাই করেছিলেন যা আমি এখন করলাম। নাফে বলেনঃ তখন আমি সল্প বয়সী ছিলাম। (হাদিসটি সহিহ, সুনানু আবিদাউদ হা/৪১১৬)

৩. আবু আইয়ুব আনসারী (রা) বলেনঃ রসুল (সা) এর কাছে যখন খারার নেয়া হত তখন তিনি তা ভক্ষন করার পর আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। একদিন রসুল (সা) খানা না খেয়েই আমার নিকট পাঠিয়ে দিলেন, কেননা তাতে রসুন ছিল।আমি জিজ্জাস করলাম রসুন কি হারাম? তিনি বললেনঃ না, তবে এর গন্ধের কারনে একে পছন্দ করি না। আবু আইয়ুব (রা) বললেনঃ যে বস্তু আপনার কাছে অপছন্দনীয় তা আমার কাছেও অপছন্দনীয়।(মুসলিম হা/২০৫৩)

৪. জাবের (রা) বলেনঃ একদা জুমার দিনে রসুল (সা) খুৎবা দেয়ার জন্য তাশরিফ আনয়ন করলেন এবং বললেন, লোক সকল! বসে যাও। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) যখন সুনলেন তখন তিনি দরজায় বসে গেলেন। রসুল (সা) দেখে বললেনঃ আব্দুল্লাহ! মসজিদের ভিতরে এসে বস। (হাদিসটি সহিহ, সুনানু আবিদাউদ হা/২০৩)

এই ৪ টি হাদিসেই শেষ নয় আরোও অনেক হাদিস আছে যেগুলেতে পাওয়া যায় কিভাবে সাহাবারা (রা) রসুল (সা) কে অনুসরন করতেন। তাই বিস্তারিত জানতে হলে হাদিসের জ্জানভান্ডারে দেখুন ও নিজে অনুসরন করুন অপরকে শিক্ষা দান করুন।

আরোও বিস্তারিত জানতে ইত্তিবায়ে সুন্নাতে রসুল (সা) বইটি পড়ুন

জাজাকাল্লাহু খাইরান।

হানাফি দেওবান্দি হোটেল-৩

43-hanafi-deobandi-hotel-03-800x450

এই পর্বটি পড়ার আগে, অনুগ্রহ করে এর আগের পর্বটি পড়ুন। তা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

কাস্টমার: আপনাদের মতো এমন আজব হোটেলের নাম আমি কখনও দেখেনি এবং শুনেনি।

ওয়েটার: হ্যা বাস্তবিক, আপনি সাড়া পৃথিবীতে এমন হোটেল আর কোথাও খোঁজে পাবেন না। আমরা আমাদের হানাফী ভাইদের জন্য দেওবন্দী ফিকহ অনুসারে হোটেলটা সাজিয়েছি। যাহোক কিছুদিন আগে আমরা আহলে হাদীসদের মর্যাদাহানি ও কলঙ্কিত করার উদ্দেশ্যে একটা পোস্টার ছাপিয়েছি। পোস্টারের নাম “সুবাহ কী নিহারী, না দুখ না বিমারী” অর্থাৎ “সকাল বেলার নেহারী, না থাকবে দু:খ, না থাকবে ব্যাধি”।

এটা আহলে হাদীসদের হোটেল সম্পর্কে লেখা, তাদের অপমান ও মর্যদা নষ্ট করার জন্য। এতে যা কিছু তুলে ধরেছি সব মৌলভী ওয়াহীদুজ্জামান থেকে। আসলে মৌলভী ওয়াহীদুজ্জামানের ফিকহ বইয়ের সোর্স আমাদের দেওবন্দী ফিকহ থেকেই প্রতিষ্ঠিত। মূলত: মৌলভী ওয়াহীদুজ্জামান ছিলেন দেওবন্দী যেমনটা তার জীবনী ‘হায়াত ওয়াহীদুজ্জামান’-এ উল্লেখ করা হয়েছে।

“মৌলভী ওয়াহীদুজ্জামানের শুরুর দিকের জীবনকালে তার পরিবার দেওবন্দী ছিল। জীবনের শুরুতে তিনি দেওবন্দী মাযহাবের দিকে অত্যধিক ঝুকে পড়েছিলেন। সে কারণে তার প্রথম অনুবাদ বই ছিল বিখ্যাত দেওবন্দী ফিকহের কিতাব, শারহ ওয়াকায়াহ। তিনি এটার একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাগ্রন্থও উর্দূতে লিখেছিলেন যেখানে তিনি নন-মুকাল্লিদদের দলীলের (অনুমান ভিত্তিক) জবাব দিয়েছেন এবং দেওবন্দী মাযহাব নির্দিষ্ট দলীল সহকারে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। তিনি ছিলেন একজন মুকাল্লিদ এবং এর গোঁড়া সমর্থক। যাহোক তার রিসার্চ ও অনুসন্ধান দিন দিন বাড়তে থাকে এবং তার তাকলীদের উপর নির্ভরশীলতা কমতে থাকে।”

‘হায়াত ওয়াহীদুজ্জামান’ এর লেখক লিখেছেন যে:

“মাওলানার মন দ্রুত পরিবর্তনের অভ্যাস ছিল, যার কারণে তিনি বেশির ভাগ মুহাদ্দীসদের থেকে ভিন্ন মত পোষন করতেন। আর তার এই মতভিন্নতা অধিক পরিমানে জাগ্রত হয় যখন তিনি ‘হিদায়াতুল মাহদী’ লিখেছিলেন। এবং তখন থেকেই আহলে হাদীসরা তার বিরোধিতা করা শুরু করেছিলেন।” [হায়াত ওয়াহীদুজ্জামান, পৃ: ১০১]

সে কারনে মাওলানা তার এক বন্ধুর নিকট একটি চিঠি লিখেন, সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে:

“আমার এক বন্ধু আমাকে এই বলে চিঠি দিয়েছেন যে আমার ‘হিদায়াতুল মাহদী’ কিতাব লেখার পর থেকেই প্রায় সকল বড় বড় আহলে হাদীস যেমন মৌলভী মুহাম্মাদ হুসাইন লাহোরী, মৌলভী আব্দুল্লাহ গাজীপুরী, মৌলভী ফকীরুল্লাহ পাঞ্জাবী, মাওলানা সানাওল্লাহ অমৃতসারী, আমার ব্যাপারে খুবই হতাশা প্রকাশ করেছেন এবং সাধারণ আহলে হাদীসদের নিকট আমি সম্মান ও আস্থা হারিয়েছি। [হায়াত ওয়াহীদুজ্জামান, পৃ: ১০১]

সুতরাং নির্দিষ্ট একটা সময় যখন আহলে হাদীসদের সাথে তার নামের লেবেল লাগানো হয়, তখন আহলে হাদীসদের অসম্মানিত করার জন্য আমরা ওয়াহীদুজ্জামানের বাজে কথাগুলো তুলে ধরে থাকি, যেহেতু নওয়াব সিদ্দীক খান টাকার বিনিময়ে ওয়াহীদুজ্জামানকে হাদীসের বই অনুবাদ করার কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। আর ওয়াহীদুজ্জামান তার পূর্বপুরুষদের মাযহাব (অর্থাৎ হানাফী) অনুযায়ী তার অনুবাদগুলোতে মাতুরীদী ও রাফেযী বিশ্বাসগুলো টেনে নিয়ে এসেছেন, আর দেওবন্দী লোকগুলো তাকে আহলুল হাদীস মনে করতন।

আরেকটি ব্যাপার এই যে আমাদের অন্যতম দেওবন্দী পাকিস্থানের তার্কিক (মুনাযির) মৌলভী আমীন ওকারভী আহলে হাদীসদের নিয়ে একটা পুস্তিকা ছাপিয়েছে যার নাম “গাইর মুকাল্লিদদের ২০০ ফিকহী মাসআলা”। আহলে হাদীসদের অপমান ও মর্যাদাহানী করার জন্য তারা ওয়াহীদুজ্জামানের বাজে কথাগুলোই তুলে ধরেছে প্রকৃতপক্ষে যা আমাদের দেওবন্দী ফিকহের কিতাবেরই কথা। এটাও সাক্ষ্য দেয় যে ওয়াহীদুজ্জামান দেওবন্দী ফিকহ থেকে এসব গোমরাহী কথাবার্তা আহলে হাদীসদের মাঝে টেনে এনেছেন। আর এটাও গোপন নয় যে রাফেযীয়াত ও শিয়ামতবাদের বহু রোগ ও জীবানু তার লেখার মধ্যে পাওয়া যায়।

সুতরাং আমরা শুধু আহলে হাদীসদের অসম্মান ও অপমান করার লক্ষ্যেই তার কথা গুলো তুলে ধরি, প্রকৃতপক্ষে আমরাও জানি যে আহলে হাদীসদের মাযহাব পূরোটাই কুরআন ও সুন্নাহর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, আর আহলে হাদীসগণ কোরআন-হাদীস বিরোধী কারো ব্যক্তিগত অভিমত গ্রহণ করেনা এবং কোন বিশেষ আলেমকে তাদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবেও প্রচার করে না।

কাস্টমার: আপনার কথা শোনে তো আমার মাথা ঘোরছে এবং আমি অস্বস্থি অনুভব করছি।

হঠাৎ এ সময় কাস্টমারের নাক থেকে রক্তক্ষরণ হতে লাগল। আর ওয়েটার তার রক্ত সংগ্রহ করতে শুরু করলেন।

কাস্টমার: আপনি কি করছেন?

ওয়েটার: আমি এই রক্ত সংগ্রহ করছি যাতে আপনার সমস্যার জন্য সবচেয়ে ভাল প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে পারি। কারো যদি নাক থেকে রক্তক্ষরণ হয় তবে তা আরোগ্যের জন্য রক্ত দিয়ে তার কপালে বা নাকে সুরাহ ফাতিহা লিখা জাযেজ। এমনকি যদি এটি (সুরা ফাতিহাহ) পেসাব দিয়েও লিখা হয় তবুও সেটা জাযেজ। [দুররুল মুখতার, ১/১৫৪]

কাস্টমার: আপনাদের কাজ কারবার পুরো অবিশ্বাসীদের মতো। অবিশ্বাসীরাই কুকুর, বিড়াল, শুকর এবং মৃত বস্তু সহ সকল কিছুই খাওয়া বৈধ মনে করে এবং সেরূপ আপনাদের দেওবন্দী ফিকহও সেগুলোর অনুমোদন দেয়। তাহলে তাদের সাথে আপনাদের পার্থক্য কি রইল? আপনারা অপবিত্র ও মৃত জিনিস খাওয়ার অনুমোদন দেন, আপনারা নোংড়া পানি খাওয়ার অনুমোদন দেন, আপনাদের নিকট বাজে কাজ করা পূন্যের কাজ মনে করা হয়, যেমন (যিনার ভয়ে) হস্তমৈথুন পুণ্যের কাজ, আপনাদের নিকট সমকাম এবং পায়ুপথে সঙ্গম কোন শাস্তিযোগ্য কাজ নয় (তার মানে করা যেতে পারে)। অপরদিকে আপনারা বলেন দেওবন্দী ফিকহ হল কোরআন ও হাদীসের সারাংশ। অথচ কোরআন বলছে এরূপ জিনিস হারাম, আর আপনারা কথা ও কাজে এগুলোকে জায়েজ বানিয়েছেন। এরূপ আচরণ অবিশ্বাসী ও মুশরিকদের আচরণের মতো।

ওয়েটার: এগুলো খাওয়া কিভাবে মুশরিকদের মতো হল, যেগুলো হারাম? (কারণ হারামকে হালাল মনে করা)

কাস্টমার: কোরআন বলছে যে যেসব লোক ইসলামিক হুকুমের বিপরীত কাজ করবে, যেগুলো হারাম তার বিপরীত করবে, তারা এসব নিষিদ্ধ বিষয় নিয়ে লোকজনদের সাথে ঝগড়া করবে, যুদ্ধ করবে তারাই হল মুশরিক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:

“আর যে জন্তু যবাহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়না তা তোমরা আহার করনা। কেননা এটা গর্হিত বস্তু, শাইতানরা নিজেদের সঙ্গী সাথীদের মনে নানা প্রকার সন্দেহ ও প্রশ্ন সৃষ্টি করে, যেন তারা তোমাদের সাথে ঝগড়া ও বিতর্ক করতে পারে। যদি তোমরা তাদের ‘আকীদাহ্ বিশ্বাস ও কাজ কর্মে আনুগত্য কর তাহলে নিঃসন্দেহে তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে।” [সূরা-আল আনআম: সূরা-০৬: আয়াত-১২১]

ওয়েটার: গভীর দু:খের সাথে জানাচ্ছি যে, আমাদের কিছু আলেম ইমাম আবূ হানিফার কিছু ফিকহী অভিমত ত্যাগ করছেন। যেমন:

১. দেওবন্দী ফিকহ অনুসারে অন্ধ ব্যক্তিদের ইমামতি করা নিষিদ্ধ (কদুরী), যাহোক হাদীস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় বহু অন্ধ সালাফ নামাযে ইমামতি করেছেন, যা সুস্পষ্টরূপে দেওবন্দী ফিকহের বিপরীত। তারা গায়ের মুকাল্লিদ হয়ে গেছে।

২. জুমুআর নামায বড় শহরগুলোতে যেখানে কোন শাসক রয়েছেন এবং ইসলামিক শাস্তির বিধান যেখানে বলবতসহ অন্যান্য সুবিধাসমূহ রয়েছে সেখানে পড়া বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব)। কিন্তু ছোট শহর, গ্রাম ও জেলায় জুমুআর নামায পড়া যায়েজ নাই। (দেওবন্দী ফিকহ দেখুন)। আর আমাদের উলামারাই এটার বিরোধী কাজ করছেন।

কাস্টমার: যেসমস্ত লোক তাওরাত অনুসারণ করে কিন্তু তাওরাতে বর্ণিত সকল বিধি বা হুকুম অনুসরণ করে না তাদের ব্যাপারে কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

“যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিল তারপর তারা তা বহন করেনি, তারা গাধার মত! যে বহু কিতাবের বোঝা বহন করে। সে সম্প্রদায়ের উপমা কতইনা নিকৃষ্ট, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।” [সুরা-আল জুমু’আহ: সূরা-৬২: আয়াত-৫]

দেওবন্দীদের আচরণ কি তাদের মতো নয়? ভাই, আমি আপনাদের হোটেলের এসব খাবারের অবস্থা দেখে খুই অস্বস্তি, ঘৃনা ও শত্রুতা অনুভব করছি। আমি চিন্তা করে পারি না কিভাবে এগুলো আপনারা খান বা খাওয়ার কথা বলেন। আপনাদের এমন খাবার, হোটেল এবং মাযহাবের প্রশংসা না করে পারি না!

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, তিনি আমাকে এমন গোমরাহী থেকে হেফাজত করেছেন, আমি তাকলীদ বর্জন করলাম এবং আজ থেকে কোরআন ও হাদীসের স্পষ্ট দলীলের উপর আমাল করার দৃঢ় ইচ্ছা পোষন করলাম। আমার বৈশিষ্ট্য হবে আহলে হাদীসদের বৈশিষ্ট, ইন-শা-আল্লাহ!

সবগুলো  পর্ব  একসাথে  পি.ডি.এফ  আকারে  ডাউনলোড  করতে  এখানে  ক্লিক  করুন।

মূল উৎসঃ  Hanafi Deobandi Restaurant – The Famous Indira Gandhi Hotel

অনুবাদকঃ  সত্যান্বেষী  রিসার্চ  টীম

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না।

হানাফি দেওবান্দি হোটেল-২

39-hanafi-deobandi-hotel-02-560x315

এই পর্বটি পড়ার আগে, অনুগ্রহ করে এর আগের পর্বটি পড়ুন। তা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

কাস্টমার: আরে ভাই ওখানে কি হচ্ছে!!! এটা আমি কি দেখছি!!! ঐ পর্দার পিছনে একজন লোক একজন মহিলার সাথে পায়ুপথে সহবাসে লিপ্ত। আবার ঐদিকে দেখছি দু’জন পুরুষ সমকামিতায় লিপ্ত। এটা কি ধরণের খেলা?

ওয়েটার: আরে ঐ দিকের কামড়াগুলো হলো ফেমিলিদের জন্য। ঐ পুরুষ ও মহিলা হল স্বামী-স্ত্রী। আর তাদের জন্য পায়ুপথে সহবাস করা কোন অদ্ভুত বিষয় না, এটাকে বলে “বিদ্বানদের জন্য ব্যাতিক্রম” যেমনটি আমাদের বড় বড় স্কলারগণ এবিষয়গুলোতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। এটা আমাদের নির্ভরযোগ্য দেওবন্দী ফিকহের কিতাব উল্লেখ আছে, “যদি একজন লোক তার বিবির সাথে অথবা কোন লোক অন্য লোকের সাথে লুত (আ:) এর কওমের লোকদের মতো আচরণ করে (অর্থাৎ সমকাম করে) তাহলে তাদের উপর কোন হদ/শাস্তি জারি হবে না।” [কদুরী, পৃ: ২১৬]

কাস্টমার: এটা কিভাবে স্কলারদের জন্য ব্যাতিক্রম হয় (অর্থাৎ পায়ুপথে সহবাস), যেটা অস্বাভাবিক, ঘৃণ্য এবং অপছন্দনীয় কাজ।

ওয়েটার: এটা যদি খারাপ কাজই হতো তাহলে এটা আমাদের উলেমাদের জন্য জায়েজ হতো না, বরং এটা আমাদের উলাদের নিকট পছন্দনীয় ছিল এবং এমনকি বেহেস্তেও এটা চলবে। [আল ইশবাহ ওয়ান নাযাইর, পৃ: ১৮৯]

এ সময় একজন কাস্টমার হোটেলের ভিতরের অংশে প্রবেশ করল।

ওয়েটার: ও ভাই, কোথায় যাচ্ছেন? স্টোর রুম তো ঐখানে।

কাস্টমার: ঐটা আপনাদের স্টোর রুম? উহহু! ঐ খানে তো মৃত দেহ, শুকর এবং গাঁধার মৃতদেহ (carcasses) রয়েছে! ঐসব কি?

ওয়েটার: আপনি একজন অদ্ভুত লোক। এটা আমাদের কিতাবগুলোতে লিখা রয়েছে যে যদি কাটা মৃতদেহ (carcasses) লবন হয়ে যায়, তাহলে সে লবন পাক এবং হালাল। এটা গাঁধার ব্যাপারেও বলা হয়েছে, “পঞ্চম পাসহ গাধার সবকিছুই পবিত্র এবং হালাল।” [ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৪৩] সে কারণে শুকর বা কোন তরকারি রান্নার সময় যে লবন ব্যবহার করা হয় এবং টেবিলের লবনদানীতে যে লবন সরবরাহ করা হয় তার সবই গাধা থেকে বানানো।

কাস্টমার: ভাই আপনার এখানে খাওয়ার মতো উপযুক্ত কিছু পাচ্ছি না। অন্তত: পানিতো দিতে পারবেন?

ওয়েটার: ঠিক আছে ভাই, এক মিনিট অপেক্ষা করুন। নীচ তলার হাউজ থেকে আপনাকে পানি এন দিচ্ছি।

কাস্টমার: তিনি পানির কন্টেইনারের দিকে তাকালেন এবং নীচ তলার পানির হাউজটি দেখলেন এবং তিনি দেখলেন এক পাশে একটা মৃত কুকুর পরে আছে। ফলে তিনি ওয়েটার কে বললেন ব্যপার কি?

ওয়েটার: মনে হচ্ছে আপনার ফিকহের ব্যপারে কোন জ্ঞান নেই। এই পানির হাউজটা আমরা সঠিক মাপে তৈরি করেছি যেমনটি দেওবন্দে শিক্ষা নিয়েছি এবং এটা বিশেষ সাইজে (১০ X ১০) বিঘত মাপে তৈরি করা হয়েছে। সুতরাং যদি কোন নাপাক বস্তু কোন এক পাশে জমা হয় তবে অপর পাশের পানি নাপাক হয় না, সেটা পরিস্কার ও পবিত্র থাকে। আর এটার জন্য কোন বড় বই দেখার দরকার নেই, বেহেস্তি জেওরয়ে কেউ চোখ বুলালেই দেখতে পাবে।

মাসআলা ১১ : যে জলাধার লম্বায় ও পার্শ্বে ১০ বিঘত এবং এমন গভীর যখন সেখান থেকে পানি তোলা হয় তখন তলদেশ উন্মুক্ত হয় না, এমন জলাধারে যদি নাপাক কিছু পড়ে যায় এবং সেটা যদি প্রস্রাবের মতো দেখা না যায় যেমন রক্ত, এলকোহল, বা অন্যকিছু তাহলে এর সকল পাশ থেকে ওযু করা জায়েজ। [বেহেস্তি জেওর, পৃ: ৫২. পার্ট-১]

কাস্টমার: আপনাদের হোটেলে যদি কেউ রাত কাটাতে চায় তবে তাকে আপনারা কি কি সুবিধা দেন?

ওয়েটার: আমাদের হোটেলে রাত কাটানো কাস্টমাদের আমরা দেওবন্দী ফিকহ অনুসারে সকল ধরণের আনন্দদায়ক সুবিধাগুলো দিয়ে থাকি এবং এটাকে আমরা ধর্মীয় অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব মনে করি। আপনি যদি কোন মেয়ের সাথে আনন্দ করতে চান এবং সেটা টাকার বিনিময়ে হলে তাহলে তার ব্যবস্থা আমরা করব কারণ আমাদের মাযহাবে কেউ যদি টাকার বিনিময়ে কোন মহিলার সাথে যিনা করে তবে তার উপর কোন হদ/শাস্তি নেই। [ফাতাওয়া কাযী খান, ৩/৪৬৮ ; ফাতাওয়া আলমগীরীর হাশিয়া]

কাস্টমার: মদ পরিবেশন করার ব্যপারে আপনাদের কি সুবিধা রয়েছে?

ওয়েটার: স্যার, আমাদের এখানে আঙ্গুর, খেজুর, গম, যব, আপেল এবং আরো অনেক বস্তু থেকে তৈরি মদ রয়েছে। মদ খেতে খেতে যদি আপনি এর বিষাক্ততায় উন্মত্ত হয়ে যান তবে আমাদের মতে, “মদ খাওয়া আপনার জন্য জায়েয।” [ফাতাওয়া আলমগীরী (৫/৪১৪)] আপনি যদি খেজুর থেকে বানানো মদের ৯ গ্লাস খাওয়ার পরেও মাতাল না হন এবং এরপর ১০ম গ্লাস মদ খাওয়ার পর আপনার মধ্যে মাতলামি দেখা দেয়, তাহলে ৯ গ্লাস পর্যন্ত মদ খাওয়া আপনার জন্য জায়েজ, এবং আপনাকে আমরা ৯ গ্লাস পর্যন্ত মদ পরিবেশন করব। [ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৪১৩]

আমরা এর সাথে আবূ ইউসুফী ব্রান্ডের মদ পরিবেশন করি, যেটি বানানোর নিয়ম আমাদের বিখ্যাত ইমাম কাযী আবূ ইউসূফ তার খলীফা হারুনর রশীদের জন্য বাতলিয়েছিলেন, তার ফূর্তি ও সন্তুষ্টির জন্য।

কাস্টমার: বুঝছি, আসলে আপনাদের এখানে খাওয়া ও পান করার মতো হালাল কোন কিছুই নাই। আমার নিজের সাথে কিছু আপেল আছে, সেটাই বরং খাই। দয়া করে আপেল কাটার জন্য আপনি কি একটা ছুরি দিতে পারেন?

ওয়েটার: তিনি ছুরি এনে টেবিলের উপর পরে থাকা নাপাক জিনিসের পাশে রাখলেন।

কাস্টমার: আরে ভাই, আপনি বোকা নাকি? সেই তো ছুরিটা অপবিত্র জিনিসের পাশে রেখে সেটাও নাপাক করে ফেললেন।

ওয়েটার: দেখুন ভাই, আপনাকে তো আমি আগেই বলেছি কোন বস্তুতে নাপাকি ও নাজাসাহ (যেমন-প্রস্রাব, মল) লাগলে তা জিহ্বা দিয়ে তিনবার চেটে নিলেই পাক হয়ে যায়। আর ছুরির ব্যপারে তো সরাসরিই কিতাবে রয়েছে। ফাতাওয়া আলমগীরীতে বলা হয়েছে যে ‘যখন কোন ছুড়িতে এমন কিছু নাপাকি লেগে যায় তাহলে তা জিহ্‌বা দ্বারা চাটলে বা থুথু লাগালে পাক হয়ে যাবে।’ [ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৪৫] সুতরাং ছুরিটা আগে জিহবা দিয়ে চেটে নেন তারপর আপেল কাটেন।

কাস্টমার: ভাই ঐখানে দেখি প্রানীর চামড়া রাখা আছে, এগুলো দিয়ে কি করেন?

ওয়েটার: ওটা কুকুরের চামড়া থেকে পাকানো (tanned) হয়েছে। এটা জায়নামাজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কারন আমাদের ফিকহের কিতাব দুররুল মুখতারে উল্লেখ রয়েছে যে ‘কুকুরের চামড়া জায়নামাজ হিসেবে এবং পানি বহণ করার পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।’ [দুররুল মুখতার, ১/১৫৩] তাই এটা আমাদের দেওবন্দী কাস্টমারদের নামায পড়ার দরকার পড়লে দিয়ে থাকি।

কাস্টমার: মশকটি কিসের এবং এর ভিতরে কি আছে?

ওয়েটার: এটা পানির মশক, আপনাকে এইমাত্র বললাম না যে, আমাদের ফিকহের মত অনুসারে আমরা কুকুরের চামড়া থেকেও পানি রাখার মশক বানাতে পারি। এটার মধ্যে নীচ তলায় অবস্থিত পানির হাউজ থেকে পানি ভরা হয়েছে, যার এক পাশে একটা কুকুর মরে আছে। কিন্তু আমাদের দেওবন্দী ফিকহ মতে অন্যপাশের পানি দিয়ে দেওবন্দী ভাইয়েরা ওযু করতে পারবে।

কাস্টমার: আচ্ছা জায়নামাযের সামনেই একজন মহিলা নগ্নভাবে বসে আছে, আর এমন ভাবে বসে আছে যে তার গোপনাঙ্গ দেখা যাচ্ছে। আবার জায়নামাযের আরেকপাশে ক্যাবিনেটে কোরআন শরীফ রাখা হয়েছে কিন্তু ক্যাবিনেট দেখি তালা মারা।

ওয়েটার: জায়নামাযে নামায পড়ার সময় কোন দেওবন্দী ভাইয়ের যদি যৌন সন্তুষ্টির জন্য মহিলার লজ্জাস্থান দেখার ইচ্ছা জাগে তার জন্য ঐ মহিলাকে নগ্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, কারণ আমাদের ফিকহ অনুযায়ী নামাযের সময় কোন মহিলার লজ্জাস্থান দেখলে নামায বাতিল হয়ে যায় না। [আল ইশবাহ ওয়ান নাযাইর, পৃ: ৪১৮] কিন্তু নামায পড়ার সময় কেউ যদি কোরআন দেখে এবং দেখে দেখে তিলাওয়াত করে তবে তার নামায বাতিল হয়ে যায়। [আল-ইশবাহ ওয়ান-নাযাইর, পৃ: ৪১৮] সেকারণেই ক্যাবিনেটে রাখা কোরআন তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে, যাতে কেউ নামাযের সময় কোরআন দেখে তিলাওয়াত করতে না পারে।

কাস্টমার: ঠিক আছে, তাহলে বলুন ঐ যে লোক নামায পড়ছে (দেওবন্দী লোক), তার পাশে কুকুরের বাচ্চা রাখা হয়েছে কেন?

ওয়েটার: যদি কোন লোক নামায পড়ার সময় কুকুরের বাচ্চা কোলে নিয়ে নামায পড়তে চায় বা বড় কোন কুকুর নামায পড়ার সময় কোলে রাখে তাহলে তার নামায বাতিল হয়ে যাবে না, বড় কুকুরের মাথা অবশ্যই বগলের মধ্যে চেপে রেখে মুখ বন্ধ রাখতে হবে। [দুররুল মুখতার, ১/১৫৩] দেওবন্দী ভাইদের নামাযের মধ্যে জায়েজ এমন সকল সুবিধা রাখা হয়েছে।

চলবে ইনশাআল্লাহ্‌ !

যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের ফাযায়েল ও আমল

যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের ফাযায়েল ও আমল

সঙ্কলন : কামাল আহমাদ

_DSC0379_80_81_tonemapped

আল্লাহ তাআলা সমস্ত বস্তুর একক সৃষ্টিকর্তা এবং একক মালিক। নিজের সৃষ্টির মধ্যে যাকে চান তাকে অন্যের উপর ফযিলত দান করেন। কিছু মানুষকে অন্যদের উপর মর্যাদা দান করেন। কিছু স্থানকে অন্যান্য স্থানের উপর ফযিলত দিয়ে থাকেন। এভাবে কোন যামানা ও সময়কে অন্যান্য যামানা ও সময়ের উপর প্রাধান্যদান ও গুরুত্ব প্রদান করেন।

উক্ত সুন্নাতে ইলাহীর একটি নির্দশন হল, আল্লাহ যিনি মালিকুল মুলক যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনকে বছরের অন্যান্য দিনের মোকাবেলায় সর্বোন্নত, সর্বাধিক ফযিলতপূর্ণ ও সর্বোচ্চ গুরুত্ববহ করেছেন। আল্লাহ তাওফিক্ব দিলে নীচে এই দিনগুলো সম্পর্কে দু’টি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা পেশ করবো, ইনঁশাআল্লাহ :

ক) যিলহজ্জের (প্রথম) দশ দিনের ফযিলত।
খ) যিলহজ্জের (প্রথম) দশ দিনের আমল।

ক) যিলহজ্জের (প্রথম) দশ দিনের ফযিলত

কুরআন ও সুন্নাতে এই দশ দিনের মর্যাদা ও গুরুত্বের ব্যাপারে বেশকিছু সংখ্যক দলিল ও সাক্ষ্য আছে। আল্লাহ কারীমের তাওফিক্ব দিলে এ সম্পর্কিত কয়েক দলিল নীচে পেশ করবো :

আল্লাহ তাআলা বলেন : وَالْفَجْرِـ وَلَيَالٍ عَشْرٍ “ফজরের ক্বসম, এবং দশ রাতের ক্বসম।” [সূরা ফজর : ১:২]

ইমাম বগভী (রহ) লিখেছেন : وَلَيَالٍ عَشْر “দশ রাতের ক্বসম” বলতে যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে। এটা মুজাহিদ, যিহহাক, সুদ্দী ও কালবী (রহ)-এর উক্তি। [তাফসীরে বগভী ৪/১৪৮১, আরো দ্র: যাদুল মাসীর ৯/১০৩]

আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তাআলা ঐ দিনগুলোর ক্বসম করে এদের মর্যাদা ও মহত্ত্ব উল্লেখ করেছেন।

ইমাম ইবনে কাসির (রহ) লিখেছেন :

والليالي العشر: المراد بها عشر ذي الحجة. كما قاله ابن عباس، وابن الزبير، ومجاهد، وغير واحد من السلف والخلف. وقد ثبت في صحيح البخاري، عن ابن عباس مرفوعا: “ما من أيام العمل الصالح أحب إلى الله فيهن من هذه الأيام” -يعني عشر ذي الحجة -قالوا: ولا الجهاد في سبيل الله؟ قال: “ولا الجهاد في سبيل الله، إلا رجلا خرج بنفسه وماله، ثم لم يرجع من ذلك بشيء”

“ والليالي العشر (ক্বসম দশ রাতের) অর্থ : যিলহজ্জের দশ রাতকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। যেভাবে ইবনে আব্বাস (রা), ইবনে যুবায়ের (রা), মুজাহিদ (রহ) ও একাধিক সালাফ ও খালাফের উক্তি রয়েছে। কেননা সহীহ বুখারীতে সাহাবী ইবনে আব্বাস (রা) থেকে মারফু‘ সূত্রে প্রমাণিত [রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন] : “এই দিনগুলো তথা যিলহজ্জের দশ দিনের আমলে সালেহর চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রিয় অন্য কোন দিনের আমল নেই। (সাহাবীগণ) জিজ্ঞাসা করলেন : জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ-ও নয় কি? তিনি (স) বলেন : না, জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ-ও নয়। তবে যে ব্যক্তি নিজের জান ও মাল নিয়ে বের হয়, তারপর আর কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না।” [সহীহ বুখারী – দুই ঈদ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ : আইয়ামে তাশরীকে আমলের ফযিলত]

অতঃপর ইমাম ইবনে কাসির (রহ) উক্ত দশ দিনের ব্যাখ্যার তাফসীর হিসেবে মুহারম মাসের প্রথম দশ দিন ও রমাযানের শেষ দশ দিনের পক্ষে উক্তিগুলো এনে বলেছেন : والصحيح القول الأول “প্রথম উক্তিটিই (যিলহজ্জের প্রথম দশ দিন) সহীহ।” [বিস্তারিত: তাফসীরে ইবনে কাসির, সূরা ফজরের আলোচ্য আয়াতের তাফসীর।]

জ্ঞাতব্য : উপরোক্ত সহীহ হাদীসের ফযিলতের সাথে সাথে অপর একটি হাদীসও এক্ষেত্রে উপস্থাপন করা হয়। যা আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :

ما مِن أيامٍ أحبُّ إلى اللهِ أن يُتَعَبَّدُ لهُ فيها مِن عشرِ ذي الحجَّةِ يعدِلُ صيامُ كلِّ يومٍ منها بصيامِ سنةٍ وقيامِ كلِّ ليلةٍ منها بقيامِ ليلةِ القدرِ

“এমন কোন দিন নাই যে দিনগুলোর (নফল) ইবাদত আল্লাহর কাছে যিলহজ্জের দশ দিনের ইবাদত অপেক্ষা অধিক প্রিয়। এর প্রতিটি দিনের সিয়াম এক বছরের সমতুল্য। এর প্রতিটি রাতের ইবাদত লায়লাতুল ক্বদরের ইবাদতের সমতুল্য।”

[তিরমিযী ” সিয়াম অধ্যায় باب ما جاء فى العمل فى ايام العشر; এই হাদীসটি ভয়ানক যঈফ। ইমাম বুখারী, তিরমিযী, বগভী, মুনযিরী (রহ) প্রমুখ হাদীসটিকে যঈফ বলেছেন। দ্র: যঈফ জামেউস সগীর ৫/১১২, তামামুল মিন্নাহ পৃ: ৩৫৪, সিলসিলাহ যঈফাহ হা/৫১৪২]

২) এই দশ দিনের সাথে হজ্জের মাসের সমাপ্তি ঘটে: আল্লাহ তাআলা বলেন : الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ “হজ্জের মাসগুলো সুপরিচিত।” [সূরা বাক্বারাহ : ১৯৭]

সাহাবী ইবনে উমার (রা) বলেন : “শাওয়াল, যিলক্বদ এবং যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন।”

[সহীহ বুখারী – কিতাবুল হজ্জ, অনুচ্ছেদ : باب قوله تعالى الحج اشهر معلومات… ; তালিকরূপে বর্ণিত।

হাফেয ইবনে হাজার (রহ) লিখেছেন : وروى البيهقي من طريق عبد الله بن نمير عن عبيد الله بن عمر عن نافع عن ابن عمر مثله والإسنادان صحيحان “এটি বায়হাক্বী বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনে নুমায়র থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা) থেকে। (আবার) নাফে থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা) থেকে। এভাবে দুটি সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে।” অতঃপর ইবনে হাজার (রহ) মুয়াত্তা মালেকের সনদটির কথাও উল্লেখ করেছেন (ফতহুল বারী  আলোচ্য অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দ্র:)।

হাফেয ইবনে রজব (রহ) লিখেছেন : “যিলহজ্জের দশ দিনের ফাযায়েলের অন্যতম একটি দিক হল, এটি হজ্জের পরিচিত মাসগুলোর শেষাংশ। যে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন : الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ “হজ্জের মাসগুলো সুপরিচিত।” [সূরা বাক্বারাহ : ১৯৭] যা শাওয়াল, যিলক্বদ ও যিলহজ্জের (প্রথম) দশ দিন।” [لطائف المعارف فيما لمواسم العام من الوظائف صـــ ٤٨١ ]

৩) আল্লাহ তাআলা ঐ দশ দিনকে নির্দিষ্ট করে তাঁর যিকির করার কথা বলেছেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে :

وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ “নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নামের যিকির করো।” [সূরা হজ্জ : ২৮]

ইমাম বুখারী (রহ) বর্ণনা করেছেন : ইবনে আব্বাস (রা) বলেন :

‘নির্দিষ্ট দিনগুলো’ দ্বারা (যিলহজ্জের) দশ দিন বুঝায়।” [সহীহ বুখারী – দুই ঈদ অধ্যায়, باب: فضل العمل في أيام التشريق ]

সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা), ইমাম হাসান, আতা, ইকরামাহ, ক্বাতাদাহ, ও শাফেঈ (রহ) আয়াতটির তাফসীরে এটাই বলেছেন। [বিস্তারিত : যাদুল মাসীর ৫/৪২৫]

রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :

ما مِن أيَّامٍ أعظَمُ عندَ اللَّهِ ولا أحِبُّ إليهِ العملُ فيهنَّ من أيَّامِ عشرِ ذي الحِجَّةِ فأَكثِروا فيهنَّ منَ التَّسبيحِ والتَّكبيرِ والتَّحميدِ والتَّهليلِ

“এই দশ দিনে (নেক) আমল করার চেয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে অধিক প্রিয় ও মহান কোনো আমল নেই। তোমরা এ সময় তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ), তাহমীদ (আলÑহামদুলিল্লাহ) ও তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) বেশী করে আদায় করো।”

[মুসনাদে আহমাদ – ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনাটি যঈফ। কেননা তাতে ইয়াযীদ বিন আবী যিয়াদ আছেন তিনি যঈফ। … উক্ত বর্ণনার সমর্থনে ইবনে উমার (রা), আবূ হুরায়রা (রা) ও আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা)-এর হাদীস উল্লেখ করে শায়েখ আলবানী (রহ) হাদীসটি ‘হাসান’ হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। (ইরওয়াউল গালীল ৩/৩৯৮)]

তবে সাধারণভাবে (সবসময়ের জন্যেই) উক্ত মর্মের বাক্যসম্বলিত যিকিরকে আল্লাহ তাআলার সর্বাধিক প্রিয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন : রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন:

أَحَبُّ الكلامِ إلى اللهِ أربعٌ : سبحان اللهِ ، والحمدُ للهِ ، ولا إله إلا اللهُ ، واللهُ أكبرُ

“আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় বাক্য চারটি : (তা হল) সুবহানাল্লাহি, ওয়াল হামদু লিল্লাহি, ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার।”[আলবানীর সহীহ আত’তারগীব হা/১৫৪৬]

সম্পর্কে সালাফদের আমল নিম্নরূপ :

ক) ইমাম বুখারী (রহ) বর্ণনা করেন :

كان ابن عمر، وأبو هريرة: يخرجان إلى السوق في أيام العشر، يكبران ويكبر الناس بتكبيرهما. وكبر محمد بن علي خلف النافلة

“সাহাবী ইবনে উমার ও আবূ হুরায়রা (রা) এই দশ দিন তাকবীর বলতে বাজারের দিকে যেতেন এবং তাদের তাকবীরের সঙ্গে অন্যরাও তাকবীর বলতো। মুহাম্মাদ ইবনে আলী নফল সালাতের পরেও তাকবীর বলতেন।” [সহীহ বুখারী – দুই ঈদ অধ্যায়, باب: فضل العمل في أيام التشريق ]

খ) ইমাম দারেমী (রহ) বর্ণনা করেন :

وَكَانَ سَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ إِذَا دَخَلَ أَيَّامُ الْعَشْرِ اجْتَهَدَ اجْتِهَاداً شَدِيداً حَتَّى مَا يَكَادُ يَقْدِرُ عَلَيْهِ

“যখন যিলহজ্জের দশ দিন আসতো তখন সাঈদ বিন জুবায়ের (রা) তখন তিনি সর্বোচ্চ পরিশ্রমসহ (আমলের) চেষ্টা করতেন, এমনকি তাঁর সাধ্যাতীত পরিমাণ হয়ে যেতো।” [সুনানে দারেমী – সিয়াম অধ্যায় باب فى فضل العمل فى العشر]

গ) হাফেয ইবনে হাজার (রহ) বলেন :

والذي يظهر أن السبب في امتياز عشر ذي الحجة لمكان اجتماع أمهات العبادة فيه, وهي الصلاة والصيام والصدقة والحج, ولا يتأتى ذلك في غيره

“যিলহজ্জের দশ দিনের বৈশিষ্ট্য থেকে এটা বুঝা যায় যে, এতে মৌলিক ইবাদতগুলো একত্রিত হয়েছে। যেমন Ñ সালাত, সিয়াম, সদক্বা, হজ্জ। অন্য কোন দিনে এমনটি হয় নি।” [ফতহুল বারী ২/৪৬০ পৃ:]

ঘ) এ ছাড়া রসূলুল্লাহ (স) থেকে উল্লিখিত নিম্নক্ত দু’টি দিনের কারণেও উক্ত দশকের ফযিলত সহজেই উপলব্ধি করা যায়। যেমন: রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :

ما من يومٍ أكثرَ من أن يُعتِقَ اللهُ فيهِ عبدًا من النارِ ، من يومِ عرفةَ

“এমন কোন দিন নাই যেদিনে আল্লাহ তাআলা আরাফাহর দিনের থেকে বেশী বান্দাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।”[সহীহ মুসলিম – কিতাবুল হজ্জ باب فى فضل الحج والعمرة ويوم عرفة ]

অন্যত্র নবী (স) বলেছেন :

إِنَّ أَعْظَمَ الْأَيَّامِ عِنْدَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَوْمُ النَّحْرِ ثُمَّ يَوْمُ الْقَرِّ

“দিনগুলোর মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বমহান দিন হলো, নাহরের (কুরবানীর) দিন। এরপর ক্বর্রার* দিন।”

[আবূ দাউদ – হজ্জ অধ্যায়; শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (তাহ: আবূ দাউদ হা/১৭৬৫)। শায়েখ যুবায়ের আলী ঝাই (রহ) হাদীসটির সনদকে সহীহ বলেছেন। অতঃপর বলেন : এটি বর্ণনা করেছেন আহমাদ (৪/৩৪০), সহীহ ইবনে খুযায়মাহ হা/২৮৬৬, ২৯১৭, ২৯৬৬, সহীহ ইবনে হিব্বান হা/১০৫৫, হাকিম ৪/২২১ যাহাবী চুপ থেকেছেন; এবং বায়হাক্বী হাসান বলেছেন (৭/২৮৮)।

* ইয়াওমুল ক্বর্রা : একাদশ যিলহজ্জকে ইয়াওমুল কর্রা বলে। এদিনে (হাজীদের) মীনাতে অবস্থান করতে হয়। (নিহায়াহ ৪/৩৭)

জুমুআর দিনকে خير يوم ‘শ্রেষ্ট দিন’ বলা হয়েছে (সহীহ মুসলিম হা/৮৫৪باب فضل يوم الجمعة )। পক্ষান্তরে উপরোক্ত হাদীসে নহরের দিন বা দশম যিলহজ্জকে أَعْظَمَ الْأَيَّامِ ‘সর্বমহান দিন’ বলা হয়েছে। উভয় হাদীসের মধ্যে এভাবে সমন্বয় করা যায় যে, জুমুআর দিন সাপ্তাহিক দিক থেকে শ্রেষ্ট এবং দশম যিলহজ্জ বা নহরের দিন বাৎসরিক হিসেবে শ্রেষ্ঠ। (আওনুল মা‘বুদ সূত্রে : উর্দূ তাহক্কীক্বকৃত আবূ দাউদ  হা/১৭৬৫এর ব্যাখ্যা)]

) যিলহজ্জের (প্রথম) দশ দিনের আমল

৪) বেশী বেশী তাসবীহ, তাকবীর ও তাহলীল বলা :

যিলহজ্জের চাঁদ দেখা তথা প্রথম দিন থেকেই এই তাসবীহ, তাকবীর ও তাহলীল বলা বিষয়ে পূর্বে প্রমাণ উল্লেখ করেছি। অবশ্য আমাদের দেশে সাধারণভাবে আরাফাহর দিনের ফজরের পর থেকে তাকবীর শুরু করা হয় এবং তের যিলহজ্জের আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয সালাতের পরে তাকবীর বলা হয়। কিন্তু এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (স) থেকে সহীহ কোন বর্ণনা নেই। এ সম্পর্কে যে হাদীসগুলো পেশ করা হয় তা নি¤œরূপ :

ক) মারফু‘ হাদীস :

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَجْهَرُ فِي الْمَكْتُوبَاتِ بِبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ وَكَانَ يَقْنُتُ فِي صَلاةِ الْفَجْرِ ، وَكَانَ يُكَبِّرُ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ صَلاةَ الْغَدَاةِ ، وَيَقْطَعُهَا صَلاةَ الْعَصْرِ آخِرَ أَيَّامِ التَّشْرِيقِ

“নবী (স) ফরয সালাতগুলোতে সরবে বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম পড়তেন, ফজরের সালাতে কুনুত পড়তেন। আর আরাফাহর দিনে ফজরের সালাত থেকে তাকবীর বলতেন এবং আইয়ামে তাশরীকের শেষ দিন (১৩ তারিখে) সালাতুল আসরে শেষ করতেন।”

[মুস্তাদরাকে হাকিম ১/২৯৯, বর্ণনাটি অগ্রহণযোগ্য বরং মাওযু‘ (তানবীরুল আয়নাইন পৃ: ৮৬, ৮৭); এর সনদে আব্দুর রহমান বিন সাঈদ আল-মুয়াযযিন আছেন। ইবনে মুঈন (রহ) তাকে যঈফ বলেছে। অপর বর্ণনাকারী সাঈদ বিন উসমান আলÑখার্রাজ মাজহুল। (বদরুল মুনীর ৫/৯৩) সুনানে দারাকুতনীতে অনুরূপ অর্থে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। যার সনদে উসায়দ বিন যায়েদ আছে। ইবনে মুঈন তাকে কাযযাব বলেছেন। অন্যরা তাকে ত্যাগ (তরক) করেছেন। পরবর্তী বর্ণনাকারী জাবির ও আবূ তুফায়েল সম্পর্কেও একই কথা (মাতরুক)। (বদরুল মুনীর ৫/৯২)]

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكَبِّرُ فِي صَلاةِ الْفَجْرِ يَوْمَ عَرَفَةَ إِلَى صَلاةِ الْعَصْرِ مِنْ آخِرِ أَيَّامِ التَّشْرِيقِ حِينَ يُسَلِّمُ مِنَ الْمَكْتُوبَاتِ

“রসূলুল্লাহ (স) আরাফাহর দিনে ফজরের সালাত থেকে আইয়ামে তাশরীকের শেষ দিনের আসরের ফরয সালাতগুলোর সালামের পর তাকবীর দিতেন।”

[দারা কুতনী ২/৪৯, বায়হাক্বী ‘কুবরা’ ৩/৩১৫; এর সনদে আমর বিন শামর ও জাবির জুফি আছেন। তারা দু’জনেই মাতরুক (তানবীরুল আয়নাইন পৃ: ৮৬)। শায়েখ আলবানী (রহ) হাদীসটিকে মাওযু‘ (জাল) বলেছেন। (সিলসিলাহ যঈফাহ হা/৫৫৭৮)]

খ) সাহাবীদের বর্ণনা :

প্রতি ফরয সালাতের পর তাকবীর বলার আলোচ্য বিধানটি নবী (স) থেকে প্রমাণিত না হলেও, সাহাবীদের (রা) থেকে এর সমর্থনে বর্ণনা পাওয়া যায়।

আমীরুল মু’মিনীন আলী ইবনে আবী তালেব (রা) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে :

أنه كان يكبر بعد صلاة الفجر يوم عرفة إلى صلاة العصر من آخر أيام التشريق ويكبر بعد العصر

“তিনি (রা) আরাফাহর দিন ফজর থেকে আইয়ামে তাশরীকের শেষ দিন আসর পর পর্যন্ত তাকবীর দিতেন।”

[আবী শায়বাহ ২/১/২, হাকিম ১/৩০০, বায়হাক্বী ২/৩১৪। এই আসারটির সনদ সহীহ (ইরওয়াউল গালীল ৩/১২৫, তানবীরুল আয়নাইন পৃ: ৮০)]

ইকরামাহ (রহ) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) সম্পর্কে বর্ণনা করেন :

أنه كان يكبر من صلاة الفجر يوم عرفة إلى آخر أيام التشريق لا يكبر في المغرب ( يقول ) : الله أكبر كبيرا الله أكبر كبيرا الله أكبر وأجل ، الله أكبر ولله الحمد

“নিশ্চয় তিনি (রা) আরাফাহর দিনে ফজরের সালাতের পর থেকে আইয়ামে তাশরীকের শেষ পর্যন্ত তাকবীর বলতেন। তিনি (শেষ দিন আসরের পর) মাগরিবে তাকবীর দিতেন না। (তিনি তাকবীরে বলতেন) : আল্লাহু আকবার কাবীরা, আল্লাহু আকবার কাবীরা, আল্লাহু আকবার ওয়া আজাল, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”

[বায়হাক্বী কুবরা ৩/৩১৪, হাকিম ১/২৯৯ প্রভৃতি। এর সনদ সহীহ (ইরওয়াউল গালীল ৩/১২৫, তানবীরুল আয়নাইন পৃ: ৮৪)]

অনুরূপ আমীরুল মু’মিনীন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা), সালমান ফারসি (রা) প্রমুখ থেকে বর্ণিত হয়েছে।

[বায়হাক্বী ৩/৩১৬, হাকিম ১/২৯৯, ইবনে আবী শায়বাহ ২/৭২/৬১৬, ইরওয়াউল গালীল ৩/১২৫, তানবীরুল আয়নাইন পৃ: ৮০Ñ৮৭]

ইমাম বুখারী (রহ) লিখেছেন :

باب التَّكْبِيرِ أَيَّامَ مِنًى وَإِذَا غَدَا إِلَى عَرَفَةَ وَكَانَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يُكَبِّرُ فِي قُبَّتِهِ بِمِنًى فَيَسْمَعُهُ أَهْلُ الْمَسْجِدِ فَيُكَبِّرُونَ وَيُكَبِّرُ أَهْلُ الأَسْوَاقِ حَتَّى تَرْتَجَّ مِنًى تَكْبِيرًا وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ يُكَبِّرُ بِمِنًى تِلْكَ الأَيَّامَ وَخَلْفَ الصَّلَوَاتِ وَعَلَى فِرَاشِهِ وَفِي فُسْطَاطِهِ وَمَجْلِسِهِ وَمَمْشَاهُ تِلْكَ الأَيَّامَ جَمِيعًا وَكَانَتْ مَيْمُونَةُ تُكَبِّرُ يَوْمَ النَّحْرِ وَكُنَّ النِّسَاءُ يُكَبِّرْنَ خَلْفَ أَبَانَ بْنِ عُثْمَانَ وَعُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ لَيَالِيَ التَّشْرِيقِ مَعَ الرِّجَالِ فِي الْمَسْجِدِ

“অনুচ্ছেদ : মিনা এর দিনগুলোতে এবং সকালে আরাফায় যাওয়ার সময় তাকবীর বলা। উমার (রা) মিনায় নিজের তাবুতে তাকবীর বলতেন। মাসজিদে লোকেরা তা শুনে তারাও তাকবীর বলতেন এবং বাজারের লোকেরাও তাকবীর বলতেন। ফলে সমস্ত মিনা তাকবীরের আওয়াজে গুঞ্জরিত হয়ে উঠতো। ইবনে উমার (রা) সে দিনগুলোতে মিনায় তাকবীর বলতেন এবং সালাতের পরে, বিছানায়, খীমায়, মজলিসে এবং চলার সময় এ দিনগুলোর তাকবীর বলতেন। মাইমুনা (রা) কুরবানীর দিন তাকবীর বলতেন এবং মহিলারা আবান ইবনে উসমান ও উমার ইবনে আব্দুল আযীয (রহ) এর পিছনে তাশরীকের রাতগুলোতে মাসজিদে পুরুষদের সঙ্গে সঙ্গে তাকবীর বলতেন।” [সহীহ বুখারী – দুই ঈদ অধ্যায়, আলোচ্য অনুচ্ছেদ; বিস্তারিত ‘ফতহুলবারী’ দ্র:।]

অতঃপর ইমাম বুখারী (রহ) মহিলাদের তাকবীর বলার সমর্থনে নীচের হাদীসটি উল্লেখ করেছেন :

عَنْ أُمِّ عَطِيَّةَ قَالَتْ “كُنَّا نُؤْمَرُ أَنْ نَخْرُجَ يَوْمَ الْعِيدِ حَتَّى نُخْرِجَ الْبِكْرَ مِنْ خِدْرِهَا حَتَّى نُخْرِجَ الْحُيَّضَ فَيَكُنَّ خَلْفَ النَّاسِ فَيُكَبِّرْنَ بِتَكْبِيرِهِمْ وَيَدْعُونَ بِدُعَائِهِمْ يَرْجُونَ بَرَكَةَ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَطُهْرَتَهُ ”

“উম্মে আতিয়াহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ঈদের দিন আমাদের বের হওয়ার আদেশ দেয়া হতো। এমনকি কুমারী মেয়েদেরকে প্রকোষ্ঠ থেকে বের করা হতো, এবং হায়েযগ্রস্তাদেরও। তারা পুরুষদের পিছনে থাকতো এবং তাদের তাকবীরের সাথে তাকবীর বলতো এবং তাদের দুআর সাথে দুআ করতো সে দিনের বরকত ও পবিত্রতার।” [সহীহ বুখারী পূর্বোক্ত অধ্যায় ও অনুচ্ছেদ দ্র:]

তবে এ সম্পর্কে প্রসিদ্ধ তাকবীর ও তাহলীলটি হল : الله أكبر الله أكبر الله أكبر لا إله إلا الله والله أكبر ولله الحمد (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা’ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ)।

পাকিস্তানের আলবানী খ্যাত শায়েখ যুবায়ের আলী ঝাই (রহ) বলেন : একটি হাদীসে এসেছে নবী (স) ঈদের তাকবীরে উপরোক্ত তাকবীরগুলো বলতেন। (সুনানে দারা কুতনী ২/ ৪৯ পৃ: হা/১৭২১)

এই বর্ণনাটির সনদ মাওযু‘ (জাল)। কেননা, এর সনদে আমর বিন শাহর কাযযাব বর্ণনাকারী আছেন। তা ছাড়া জাবির আল-জুফী অত্যন্ত যঈফ ও রাফেযী (শিয়া)। অপর রাবী নায়ল বিন নাজীহ যঈফ (দ্র: আসমাউর রিজালের গ্রন্থসমূহ)।

অপর একটি বর্ণনাতে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রা) ঈদের তাকবীর ছিল নি¤œরূপ :

الله أكبر كبيرا الله أكبر كبيرا الله أكبر وأجل ، الله أكبر ولله الحمد

“আল্লাহু আকবার কাবীরা, আল্লাহু আকবার কাবীরা, আল্লাহু আকবার ওয়া আজাল, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।” [মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ ২/১৬৭ পৃ:, হা/৫২৪৯ ’ এর সনদ সহীহ]

সাহাবী সালমান (রা)’এর বাক্যগুলো ছিলো :

الله أكبر الله أكبر الله أكبر “ আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।” [মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ১১/২৯৪-৯৫, হা/২০৫৮১. বায়হাক্বী ৩/৩১৬ ’ এর সনদ হাসান]

ইবরাহীম নাখয়ী (রহ) বলতেন :

الله أكبر الله أكبر لا إله إلا الله والله أكبر الله أكبر ولله الحمد

“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লাÑইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।” [মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ ২/১২৭ পৃ:, হা/৫৬৪৯ ’ এর সনদ সহীহ]

উপরোক্ত তাকবীরগুলো সাহাবী (রা) ও তাবেঈদের (রহ) থেকে প্রমাণিত। এ কারণে ঈদের দিন সেগুলো পড়াতে কোন দোষ নেই। বরং সালাফদের ইক্তিদার ভিত্তিতে সওয়াব আশা করা যায়। …[শায়েখ যুবায়ের আলী ঝাই, ফাতাওয়া ইলমিয়্যাহ আলমা‘রুফ তাওযিহুল আহকাম (পাকিস্তান : মাকতাবাহ ইসলামিয়াহ, অক্টোবরÑ২০০৯)  ১ম খ- পৃ: ৪৮১]

৫) সিয়াম পালন :

ক) যিলহজ্জের প্রথম নয় দিনের সিয়াম :

عَنْ هُنَيْدَةَ بْنِ خَالِدٍ ، عَنِ امْرَأَتِهِ ، قَالَتْ : حَدَّثَتْنِي بَعْضُ نِسَاءِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، ” أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ ، وَتِسْعًا مِنْ ذِي الْحِجَّةِ ، وَثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنَ الشَّهْرِ أَوَّلَ اثْنَيْنِ مِنَ الشَّهْرِ وَخَمِيسَيْنِ “

“হুনায়দাহ বিন খালিদ তাঁর স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন : আমাকে নবী (স)Ñএর একজন স্ত্রী হাদীস বর্ণনা করেছেন : রসূলুল্লাহ (স) আশুরার দিন ও যিলহজ্জের প্রথম নয় দিন সিয়াম রাখতেন। আর তিনি প্রতি মাসে তিন দিন, মাসের প্রথম সোম ও বৃহস্পতিবার সিয়াম রাখতেন।” [নাসাঈ Ñ সিয়াম অধ্যায়  صوم ثلاثة أيام من الشهر; শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (তাহ: সুনানে নাসায়ী হা/২৩৭১)]

খ) আরাফাহর দিনের সিয়াম : এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ ، وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ

“ ‘ইয়াওমে আরাফার সিয়ামের বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তিনি এর দ্বারা এর আগের এক বছরের ও পরের এক বছরের গোনাহ মাফ করবেন।” [সহীহ মুসলিম ’ কিতাবুস সিয়াম, হা/১১৬২]

৬) চুল, নখ না কাটা :

যদি কেউ কুরবানী দেয়ার নিয়ত করে, তবে যিলহজ্জের শুরু বা চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানী পর্যন্ত সে তার নখ ও চুল কাটবে না। কেননা  নবী (স) বলেছেন :

إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ ، فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعَرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئًا

“যে ব্যক্তি (যিলহজ্জের) দশ দিনে প্রবেশ করে এবং তোমাদের কেউ কুরবানীর নিয়ত করে, তাহলে সে যেন তার চুল ও নখের কিছুই না কাটে।” [সহীহ মুসলিম কিতাবুল আযহা بَاب نَهْيِ مَنْ دَخَلَ عَلَيْهِ عَشْرُ ذِي الْحِجَّةِ…]

অন্য বর্ণনাতে আছে :

مَنْ كَانَ لَهُ ذِبْحٌ يَذْبَحُهُ ، فَإِذَا أُهِلَّ هِلَالُ ذِي الْحِجَّةِ ، فَلَا يَأْخُذَنَّ مِنْ شَعْرِهِ وَلَا مِنْ أَظْفَارِهِ شَيْئًا حَتَّى يُضَحِّيَ

“যার কাছে কুরবানী করার মতো পশু আছে, সে যেন যিলহজ্জ মাসের নতুন চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত নিজের চুল না ছাটে এবং নখের কিছুই না কাটে।” [সহীহ মুসলিম  ঐ]

৭) যদি কুরবানী করার সামর্থ্য না থাকে :

রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :

أُمِرْتُ بيومِ الأضْحَى عِيدًا جعله اللهُ لهذه الأمةِ، قال له رجلٌ : يا رسولَ اللهِ ! أَرَأَيْتَ إن لم أَجِدْ إلا مَنِيحَةً أُنْثَى، أَفَأُضَحِّي بها  قال : لا، ولكن خُذْ من شَعْرِكَ وأَظْفارِكَ، وتَقُصُّ من شاربِكَ، وتَحْلِقُ عانتَكَ، فذلك تمامُ أُضْحِيَّتِكَ عند اللهِ

“আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আল্লাহ তাআলা কুরবানীর দিনকে এই উম্মাতের জন্য ঈদ হিসেবে পরিগণিত করেছেন।’ এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলো : ইয়া রসূলাল্লাহ! আমি যদি মাদী মানীহাহ ছাড়া অন্য কোন পশু না পাই। তবে কি তা দিয়েই কুরবানী করবো? তিনি (স) বললেন : না; তবে তুমি এ দিন তোমার চুল ও নখ কাটবে, তোমার গোঁফ কাটবে, নাভীর নীচের লোম কাটবে। এটিই আল্লাহর নিকট তোমার পরিপূর্ণ কুরবানী।”

[আবূ দাউদ, নাসায়ী, তাহ: মিশকাত ২/১৪৭৯; শায়েখ যুবায়ের আলী ঝাই (রহ) হাদীসটির সনদকে সহীহ বলেছেন। তিনি লিখেছেন : এটি নাসাঈ (হা/৪৩৭০) বর্ণনা করেছেন। একে সহীহ বলেছেন : ইবনে হিব্বান তাঁর ‘সহীহ’ তে (হা/১০৪৩) ও হাকিম তাঁর ‘মুস্তাদরাকে’ (৪/২২৩), যাহাবী চুপ থেকেছেন। (তাহ: উর্দূ আবূ দাউদ হা/২৭৮৯)। তবে আমি (সঙ্কলক) ইমাম যাহাবী (রহ) এর পক্ষ থেকে হাদীসটির প্রতি ‘সহীহ’ মন্তব্য পেয়েছি (ইমাম যাহাবীর তা‘লিকসহ মুস্তাদরাক হাকিম হা/৭৫২৯)। হাদীসটিকে আরও যারা সহীহ বলেছেন তাঁরা হলেন : আহমাদ মুহাম্মাদ শাকির (তাহ: মুসনাদে আহমাদ ১০/৮১), বদরুদ্দীন আয়নী (নাখবুল আফকার ১৪/৫২০) প্রমুখ। হাদীসটির প্রতি অভিযোগ : ক) সনদের অন্যতম রাবী ঈসা বিন হিলাল আস’সাদাফী  (রহ) এর ‘মাজহুল’ হওয়া। অথচ ইবনে হিব্বান, হাকিম ও যাহাবী (রহ) তাঁর সনদের হাদীসকে সহীহ বলেছেন। ইমাম তিরমিযী (রহ) তাঁর সনদের হাদীসকে ‘হাসান সহীহ’ বলেছেন (সুনানে তিরমিযী হা/২৫৮৮)। ইবনে হাজার (রহ) তাঁকে সত্যবাদী বলেছেন (তাহযীবুত তাহযীব ২/২৭৪)। এ থেকে সুস্পষ্ট হয়, তিনি মুহাদ্দিসগণের (রহ) নিকট মাজহুল বা অজ্ঞাত নন। (খ) অপর একটি অভিযোগ হল, ইমাম আহমাদ (রহ) তাঁকে মুনকার বলেছেন। অথচ ইমাম বুখারী (রহ) এর নিকট কোন মুনকার রাবীর হাদীস বর্ণনা করা হালাল নয়। (মীযানুল ই‘তিদাল ১/১১৯ পৃ:) ইমাম (বুখারী) ‘আদাবুল মুফরাদে’ (২৬১) তাঁর থেকে হাদীস উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ‘তারীখুল কাবীরেও (৬/১১৪ পৃ:/২৭২২ নং) তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু কোন আপত্তি করেন নি। এমনকি তাঁর যঈফ রাবীদের সঙ্কলণেও তাঁর নাম উল্লেখ করেন নি। সুতরাং ঈসা বিন হিলাল আস সাদাফীর (রহ) প্রতি ‘মুনকারুল হাদীস’ অভিযোগটি প্রযোজ্য নয়। (গ) ইবনে হিব্বান (রহ) তাঁকে ‘সিক্বাহ’ হিসেবে উল্লেখ করাতে বলা হয়েছে : তিনি এ ব্যাপারে শিথিলতা অবলম্বনকারী হিসেবে প্রসিদ্ধ। অথচ পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায়, ইমাম ইবনে হিব্বান (রহ) এ ব্যাপারে একক নন। (ঘ) ইমাম যাহাবী (রহ) কর্তৃক তাঁকে ‘সিক্বাহ’ হিসেবে উল্লেখ করাতে (কাশিফ : ৪৪০৫) বলা হয়েছে : ‘তাকে সিক্বাহ বলা হয়’ দ্বারা যাহাবী (রহ) তাঁর দুর্বল হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। অথচ আপত্তিটি কেবলই অনুমান। কেনন আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি, ইমাম যাহাবী ‘মুস্তাদরাকে হাকিমের’ ঈসা বিন হিলালের আলোচ্য বর্ণনাটিকে সহীহ বলেছেন। সুস্পষ্ট হলো, যিনি হাদীসটিকে যঈফ বলেছেন, সেটা তাঁর একক ইজতিহাদ মাত্র। উল্লেখ্য সহীহ মুসলিমে বর্ণিত পূর্বোক্ত হাদীসে চুল ও নখ না কেটে কুরবানীর পর এ দু’টি কাটতে বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে শেষোক্ত হাদীসটিতে ঐ দু’টির সাথে গোঁফ এবং নাভীর নীচের লোম কাটার কথাও বর্ণিত হয়েছে। এ হিসেবে শেষোক্ত হাদীসটি সহীহ মুসলিমের হাদীসটির সমর্থক ও ব্যাখ্যাকারী। ]

বুঝা গেল, যিনি কুরবানী করার নিয়ত করেছেন এবং যিনি এর সামর্থ্য রাখেন না সবাই আলোচ্য দিনগুলো চুল, নখ প্রভৃতি কাটা থেকে বিরত থেকে সওয়াব নিবেন।

সুতরাং আসুন, খাঁটি মনে আল্লাহর কাছে তাওবা করে নিজেদের গুনাহ, ভুল ত্রুটি ও অবহেলার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। সেই সাথে সাথে উপরোক্ত আমলগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে নিজেদের নাজাতের জন্য নেকী পাবার আশা করি। আল্লাহ তাআলা সমস্ত মুসলিমকে উক্ত আমলগুলো করার তাওফিক্ব দিন। আমীন!!

হানাফী আলেম আব্দুল মতিন সাহেব লিখিত ‘দলিলসহ নামাযের মাসায়েল’ (প্রকাশক : মাকতাবাতুল আযহার, ঢাকা-এপ্রিল’২০১১) এর জবাব নিচে দেয়া হল। পর্ব-০২

‘দলিলসহ নামাযের মাসায়েল’-এর জবাব -২

দলিল

হানাফী আলেম আব্দুল মতিন সাহেব লিখিত দলিলসহ নামাযের মাসায়েল (প্রকাশক : মাকতাবাতুল আযহার, ঢাকাএপ্রিল২০১১) এর জবাব নিচে দেয়া হল। তাঁর উপস্থাপিত দলিল ও আলোচনা লেখক শিরোনামে এবং আমাদের জবাব বিশ্লেষণ শিরোনামে উল্লেখ করা হল। আমরা ইতঃপূর্বে প্রথম অধ্যায়ে ইক্বামাতের বাক্য সম্পর্কে লেখকের উপস্থাপিত দলিল ও মন্তব্যগুলো ১ থেকে ২০টি শিরোনামে উল্লেখ করেছি। এখন ২১তম থেকে সালাতে হাত বাঁধার পদ্ধতি নিয়ে লেখকের উপস্থাপনা ও তার বিশ্লেষণ উল্লেখ করব, ইনঁশাআল্লাহ।

দ্বিতীয় অধ্যায় : সালাতে হাত বাঁধার পদ্ধতি (পৃ: ১৩২০)

লেখক ২১ (পৃ: ২১) : নামাযে কব্জির উপর হাত বেঁধে নাভির নীচে রাখা সুন্নত :-
নামাযে বাম কব্জির উপর ডান হাত রেখে দু’আঙ্গুল দ্বারা চেপে ধরা সুন্নাত। একাধিক সহীহ হাদীস দ্বারা এ আমল প্রমাণিত।
বিশ্লেষণ ২১ : প্রকৃতপক্ষে হানাফী মাযহাবে ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠের উপর রাখে ও দুই আঙ্গুল দ্বারা কব্জি চেপে ধরে। কখনই বাম হাতের কব্জির উপর তারা ডান হাতটি রাখে না। লেখক যে শব্দে হাত বাঁধা সুন্নাত বলেছেন ঐ শব্দে বা বাক্যে একটি হাদীসও তিনি উপস্থাপন্ করতে পারেন নি।

লেখক ২২ (পৃ: ২১) : চার মাযহাবের সকল ইমাম ও আলিম এটাকেই সুন্নত পদ্ধতি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বিশ্লেষণ ২২ : এটি সুস্পষ্ট মিথ্যাচার। আসুন হানাফী আলেম তাক্বী উসমানী (রহ) থেকে জেনে নিই চার ইমামের কে কি বলেন :
دوسرا مسئلہ یہ ہی کہ ہاتھوں کو کس جگہ باندھا جائے؟ حنفیہ اور سفیان ثوری [رح] اسحاق ابن راہویہ اور شافعیہ میں سے ابو اسحاق مروزی کے نزدیک ہاتھوں کو ناف کے نیچے باندھنا مسنون ہے ؛ امام شافعی [رح] کے نزدیک ایک روایت میں تحت الصدر اور دوسری روایت میں علی الصدر ہاتھ باندھنا مسنون ہے ؛ امام احمد [رح] سے تین روایتیں منقول ہیں ؛ ایک امام ابو حنیفہ [رح] کے مطابق؛ ایک امام شافعی [رح] کے مطابق؛ اور ایک یہ کہ دونوں طریقوں میں اختیار ہے ؛
“দ্বিতীয় মাসআলা হল, এই হাত কোথায় বাঁধতে হবে? ইমাম আবূ হানিফা ও সুফিয়ান সওরী (রহ), ইসহাক্ব ইবনে রাহওয়াইহ ও শাফেঈদের মধ্যে থেকে আবূ ইসহাক্ব মারুযীর (রহ) কাছে হাত নাভির নীচে বাঁধাটা সুন্নাত। ইমাম শাফেঈর একটি বর্ণনানুযায়ী বুকের নিচে এবং অপর বর্ণনানুযায়ী বুকের উপর হাত বাঁধাটা সুন্নাত। ইমাম আহমাদ (রহ) থেকে তিনটি উক্তি বর্ণিত হয়েছে। এর একটি ইমাম আবূ হানিফার মত, একটি ইমাম শাফেঈর মত এবং অপর একটি মতে উভয়টিকেই গ্রহণ করেছেন।” (দারসে তিরমিযী ২/১৯)

বুঝা গেল ইমাম শাফেঈর মূল মতামত হল, বুকের উপর বা কাছে রাখা সুন্নাত। তাকী উসমানী (হাফি) বুকের ‘নীচে’ বলেছেন। অবশ্য হাদীসে ‘বুকের উপরে’ শব্দটির সাথে সাথে বুকের কাছে (عند الصدر) শব্দটি রয়েছে । ইমাম হাম্বলের (রহ) একাধিক মত রয়েছে। কিন্তু তাঁর পক্ষ থেকে আবূ দাউদে বর্ণিত নাভীর নিচে হাত বাঁধার হাদীসটি যঈফ হিসাবে উল্লিখিত হয়েছে। তাছাড়া ইমামদের ঐ কথাই গ্রহনযোগ্য যা সহীহ হাদীস মোতাবেক। সুতরাং বিভিন্ন মতামত থাকলে আমরা সবচাইতে সহীহ সনদের হাদীসটিকেই (বুকের উপর হাত বাঁধা) তাঁর অনুসরণীয় মতামত হিসাবে গণ্য করব। এ পর্যায়ে সত্য গোপন করার কারণে লেখকের নিজের বক্তব্যটি যঈফ, সহীহ নয় – এটাই প্রমাণিত হল।

লেখক ২৩ (পৃ: ২১) : পক্ষান্তরে কনুই পর্যন্ত হাত রাখার পক্ষে কোন হাদীস নেই। বুখারী শরীফের যে হাদীসকে এর প্রমাণ স্বরূপ পেশ করা হয় সেটির সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা একটু পরে উল্লেখ করছি।
বিশ্লেষণ – ২৩ : আমরাও একটু পরে জানতে পারব স্বয়ং লেখক কিভাবে সহীহ হাদীসের শব্দ ও অর্থ বিকৃত করে হাতকে তালু ও কব্জি শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার অপচেষ্টা করেছেন। অথচ তালু ও কব্জি হাতের অংশবিশেষ। সালাত সম্পর্কিত হাদীসগুলোতে হাতকে যেভাবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাগ করা হয়েছে, একত্রিতভাবে হাতের এত ব্যাখ্যা সম্পর্কিত ভাগ সালাতের বাইরের ক্ষেত্রে দেখা যায় না বললে – বেশী বলা হয় না। যেমন –
ক) আবূ হুমায়েদ সাঈদী (রা) বর্ণনা করেন :
ثم سجد فأمكن أنفه وجبهته الأرض ونحى يديه عن جنبيه ووضع كفيه حذو منكبيه
“রসূলুল্লাহ (স) যখন সাজদা করতেন তখন তার নাক ও কপাল দৃঢ়ভাবে মাটিতে রাখতেন এবং তিনি তাঁর দুই হাতকে দুই পার্শ্ব থেকে দূরে রাখতেন। আর তিনি (হাতের) দুই পাতাকে দুই কাঁধ বরাবর রাখতেন।” [আবূ দাউদ, দারেমী, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মিশকাত ২/৭৪৫, হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী সহীহ বলেছেন]
হাদীসটিতে দেখা যাচ্ছে হাতের পাতাকে হাত থেকে পৃথক ও সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সিজদাবস্থায় হাতের যে অংশটি শরীরের থেকে দূরে রাখার কথা বলা হয়েছে তা কব্জির পরবর্তী অংশ থেকে হাতের কনুই পর্যন্ত অংশ।
পূর্বোক্ত হাদীসটির পরবর্তী অংশে তাশাহহুদের সময় রানের উপর হাতের কোন অংশটি থাকবে সে সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে। নবী (স) বলেছেন :
وَوَضَعَ كَفَّهُ الْيُمْنَى عَلَى رُكْبَتِهِ الْيُمْنَى وَكَفَّهُ الْيُسْرَى عَلَى رُكْبَتِهِ الْيُسْرَى وَأَشَارَ بِأُصْبُعِهِ
“ডান তালুকে বাম জানুর উপর এবং বাম তালুকে বাম জানুর উপরে রাখলেন এবং শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করলেন।”
এখানে বুঝা যাচ্ছে সম্পূর্ণ হাত নয় বরং হাতের তালু রানের উপর থাকবে।
খ) সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মালেক বলেছেন :
إذا سجد فرج بين يديه حتى يبدو بياض إبطيه
“যখন নবী (স) সাজদা করতেন তখন হাতকে (পেট থেকে) পৃথক রাখতেন। এমনকি তার বগলের শুভ্রতা প্রকাশ পেত।”[সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত ২/৮৩১]
এই হাদীসটিতেও হাত বলতে কব্জির পরবর্তী অংশ থেকে কনুই পর্যন্ত অংশকে বুঝান হয়েছে। বুঝা গেল হাত বলতে কনুই পর্যন্ত অংশকে গণ্য করা হয়।
আবার কখনো তালু থেকে শুরু করে কনুই পর্যন্ত সম্পূর্ণ অংশকেও হাত বলা হয়েছে। যেমন রুকু‘ করা সম্পর্কিত বর্ণনাতে এসেছে :
গ) আবূ হুমায়েদ সাঈদী (রা) বলেন :
ثم ركع فوضع يديه على ركبتيه كأنه قابض عليهما ووتر يديه فنحاهما عن جنبيه
“নবী (স) রুকু‘ করলেন এবং দুই হাত দুই জানুর উপর রাখলেন যেন দু’টিকে আঁকড়ে ধরলেন, তিনি দুই হাতকে কিছুটা বাঁকা করে পার্শ্বদেশ থেকে পৃথক রাখলেন।” (আবূ দাউদ, মিশকাত ২/৭৪৫ নং)
হাটুর উপর হাতের তালু ছিল, আর হাতের যে অংশটিকে বাঁকা করা হয়েছে সেখানে তালু ছিল না। কিন্তু কনুই ও বাহুর অন্যান্য অংশ ছিল।

উপরের আলোচনাতে বুঝা গেল, হাতের তালু ও কব্জিকে হাত থেকে ক্ষেত্রবিশেষে পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার হাতের অংশ হিসাবেও বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু কেবল হাতের তালু বা কব্জির নির্দিষ্ট ব্যবহার থাকলে সেখানে ব্যাপক অর্থে হাত শব্দটি অর্থ করার সুযোগ নেই। কেননা সেখানে كف (তালু) শব্দ ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। তাই সেটা يد বা হাত নয় বরং তার অংশবিশেষ।

উল্লেখ্য হাত বলতে চোরের হাত কাটা, মুসাফাহ করার সময় হাত ধরা প্রভৃতি শব্দের ব্যাখ্যাগুলো সালাতের বাইরের অবস্থার সাথে সম্পর্কিত । অথচ পূর্বোক্ত হাদীসগুলো সালাতের সাথে সম্পৃক্ত। যা সালাতের মধ্যে হাত ও তালুর বিভিন্ন অবস্থার খাস বা সুনির্দিষ্ট বর্ণনা। সালাতের সুনির্দিষ্ট বর্ণনার উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য ক্ষেত্রে আম বা সাধারণভাবে ব্যবহৃত হাতের ব্যাখ্যা এখানে প্রযোজ্য নয়। কেননা খাস দলিল মজুদ থাকতে আম দলিল উপস্থাপন অর্থহীন।

লেখক ২৪ (পৃ: ২১) : এমনিভাবে নাভির নীচে হাত রাখা সুন্নাত। ইমাম আবূ হানীফা র. ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল র. দুজনেই এটাকে সুন্নাত বলেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে. ইমাম আহমদ ছিলেন ইমাম শাফেয়ীর র. এর ভক্ত ছাত্র। ইমাম শাফেয়ী বুকের নীচে হাত বাঁধাকে উত্তম বলেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ইমাম আহমদ সেই মতকে পরিহার করে নাভির নীচে হাত বাঁধাকে উত্তম আখ্যা দিয়েছেন। তিনি কি হাদীস ছাড়া এটা করেছেন? তিনি তো হাদীসের হাফেজ ছিলেন।
বিশ্লেষণ ২৪ : একটু পরে আমরা লেখকের উপস্থাপিত নাভীর নিচে হাত বাঁধার হাদীস সম্পর্কে ইমাম আহমাদের (রহ) মন্তব্য জানতে পারব। তিনি উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারীকে মুনকার (প্রত্যাখ্যাত) বলেছেন। তাছাড়া তাক্বী উসমানী হানাফী (হাফি.) থেকে আমরা জেনেছি বুকের উপর হাত বাঁধার পক্ষেও ইমাম আহমাদের রায় আছে। যা লেখক অস্বীকার করে নিজের বক্তব্য অসত্য হওয়াটা নিশ্চিত করেছেন। ইমাম শাফেঈ (রহ) বুকের উপর ও নিকট হাত বাঁধার মতামত পেশ করেছেন। যার মূল দাবী একই। ইমাম নববী (রহ) থেকে বুকের নীচে নাভীর উপরে বলে যে বক্তব্য এসেছে তা ইমাম শাফেঈ বা সমগ্র শাফেঈ মাযহাবের নয়। এটা ইমাম নববী (রহ)এর ব্যক্তিগত ইজতিহাদ। তাছাড়া পরবর্তীতে আমরা জানব ইমাম নববী (রহ) তাঁর উক্ত ইজতিহাদের সমর্থনে বুকের উপর হাত বাঁধার দলিলটি পেশ করেছেন (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৩৭’) । অর্থাৎ মূল ভাবের দিক থেকে ইমাম নববী (রহ)এর কাছেও বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসটিও তাঁর ইজতিহাদী মতটির সমার্থক।

লেখক ২৫ (পৃ: ২১) : যাাহোক বুকের উপর হাত বাঁধাকে চার ইমামের কেউই সুন্নাত বলেননি। এ সম্পর্কে যে হাদীসটি পেশ করা হয় সেটিও সহীহ নয়। এখানে প্রথমত হাত বাঁধার পদ্ধতি সম্পর্কিত সহীহ হাদীসগুরো পেশ করবো। পরে নাভির নীচের রাখা সম্পর্কে সহীহ হাদীসসমূহ উল্লেখ করবো্
বিশ্লেষণ ২৫ : লেখক যে চার ইমামের মধ্যে দুই ইমাম তথা ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদ (রহ) সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন – তা সুস্পষ্ট করেছি। পরবর্তীতে লেখকের উপস্থাপিত দলিল ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও আমরা একই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করব। আমরা দেখব তিনি কিভাবে সহীহ হাদীসকে যঈফ বলেছেন এবং তার বিকৃত অর্থ করেছেন। আবার কিভাবে যঈফ হাদীসকে সহীহ আখ্যা দিয়েছেন।
সালাতে হাত বাঁধা সম্পর্কে আসুন উদারপন্থী হানাফী আলেমদের বিশ্লেষণ জেনে নিই। জাতীয় মাসজিদ বায়তুল মুকাররমের সাবেক খতীব ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক হেড মাওলানা মুফতি আমীমুল ইহসান (রহ) তাঁর ‘ফিক্বহুস সুনানি ওয়াল আসারে’ বলেন :
“আবূ তাইয়িব (রহ) ইমাম তিরমিযীর ব্যাখ্যায় বলেন, যতদূর মনে হয়, আল্লাহই ভাল জানেন, দুই হাত নাভীর নীচে রাখা ও বুকের উপর রাখা সবই সহীহ। অপরদিকে নীমবী বলেন যে, ‘বাম হাতের উপর ডানহাত রাখা’ এতটুকুই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। হাত দুইটি রাখার স্থানের বিষয়ে কিছুই প্রমাণিত নয়। বুকের উপর, নাভির উপর বা নাভির নীচে রাখার সকল বর্ণনা দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য। গ্রন্থকার (আমীমুল ইহসান) বলেন, আমার মতে আবূ তাইয়িবের অভিমতই গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ নাভির নীচে, উপরে বা বুকে হাত রাখা সবই সহীহ। তবে উপরের ব্যাখ্যা অনুসারে পুরুষদের জন্য নীচে ও মহিলাদের জন্য উপরে রাখা উত্তম। আল্লাহই সর্বোত্তম জ্ঞাতা।”
[মুফতী সাইয়েদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান, আসারুস সুনানি ওয়াল আসার, অনুবাদ : ড. খোন্দকার আ.ন.ম. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ১ম খণ্ড (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন) পৃ: ১৭০]

সুস্পষ্ট হল, হানাফী আলেমদের কাছেও বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীস সঠিক। হানাফী আলেম তাক্বী উসমানী (হাফি.) নাভির নীচে ও বুকের উপর হাত রাখা সম্পর্কিত উভয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে লিখেছেন :
شیخ ابن ہمام فتح القدیر میں فرماتے ہے کہ روایات کے تعارض کے وقت ہم نے قیاس کی طرف رجوع کیا تو وہ حنفیہ کی تائید کرتا ہے ؛ کینکہ ناف پر ہاتھ باندھنا تعظیم کے زیادہ لائق ہی ؛ البتہ عورتوں کے لئے سینہ پر ہاتھ باندھنے کو اس لئے ترجیح دی گئی کہ اس میں ستر زیادہ ہے ؛ واللہ اعلام؛
“শায়েখ ইবনুল হুমাম ‘ফতহুল ক্বাদীর’-এ বলেছেন : “বর্ণনাগুলো সংঘর্ষের ক্ষেত্রে আমরা ক্বিয়াসের প্রতি মনোনিবেশ করি। যা হানাফীদের পক্ষালম্বন করে। কেননা নাভীর পরে হাত বাঁধা তা’যিম (সম্মান) প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বেশী পরিপূরক। অবশ্য মহিলাদের বুকের উপর হাত বাঁধা প্রাধান্য পায়। কেননা এতে বেশী সতর (ঢাকা) হয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।”[তাক্বী উসমানী, দারসে তিরমিযী (উর্দূ) ২য় খণ্ড পৃ: ২৪]
সুস্পষ্ট হল, হানাফীদের কাছেও বুকে হাত বাঁধার হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা আছে। তবে সেটা নিজেদের ক্বিয়াস অনুযায়ী। হাদীসের শব্দ ও দাবী অনুযায়ী তারা আমল করেন না। যা তাঁদের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য।

লেখক ২৬ (পৃ: ২১) : হাত বাঁধার নিয়ম সম্পর্কিত হাদীস :-
১. হযরত সাহল ইবনে সা’দ রা. বলেন,
كَانَ النَّاسُ يُؤْمَرُونَ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ الْيَدَ الْيُمْنَى عَلَى ذِرَاعِهِ الْيُسْرَى فِي الصَّلَاةِ.صحيح البخاري (٧٤٠)
অর্থ : মানুষকে এই আদেশ দেওয়া হতো যে, তারা যেন নামাযে ডান হাত বাম হাতের বাহুর উপর রাখে। বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৭৪০।
বিশ্লেষণ ২৬ : হাদীসটিতে ডান হাত ও বাম (হাতের) যেরা শব্দ দু’টি ব্যবহৃত হয়েছে। উল্লেখ্য যেরা‘ কখনই কব্জি নয়। । অবশ্য কব্জি যেরা‘র অংশ।
الذراع (যেরা‘) : প্রত্যেক প্রাণীর হাত। গরু, ছাগলের যেরা‘ পায়ের গোছা থেকে উপরের অংশ পর্যন্ত। মানুষের যেরা‘ হাতের কুনইয়ের মাথা থেকে মধ্য আঙুলের মাথা পর্যন্ত। [কামুসুল ওয়াহিদ]
সহীহ মুসলিমে সালাতে হাত বাঁধা সম্পর্কিত হাদীসটি নিম্নরূপ। সাহাবী ওয়ায়িল ইবনে হুজর (রা) বলেন
اِنَّه‘ رَأَي النَّبِيُّ r رَفَعَ يَدَيْهِ حِيْنَ دَخَلَ فِي الصَّلاَةِ كَبَّرَ ثُمَّ الْتَحَفَ بِثَوْبِه ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْني عَلَي الْيُسْري ـ
“তিনি নবী (স) কে দেখেছেন, তিনি (স) সালাতের শুরুতে দু’টি হাত উঠালেন। এরপর উভয় হাত কাপড়ে ঢাকলেন। অতঃপর ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখলেন।” [সহীহ মুসলিম- কিতাবুস সালাত]
আরবিতে اليد বা হাত অর্থ : من اعضاء الجسد ، وهى من الْمنكب إلى أطراف الأصابع – “শরীরের একটি অংশ, সেটা হল কাঁধ থেকে আঙ্গুল পর্যন্ত । (মু‘জামুল ওয়াসিত্ব)
কিন্তু এভাবে শাব্দিক তরজমা অনুযায়ী কেউ হাত বাঁধেন না। হাতের অর্থ এভাবে করা হলে, একটি হাতকে অপর একটি হাতের উপর পূর্ণাঙ্গভাবে রাখা যায় না। তবে হাতের ঐ সম্পূর্ণ অংশকে জড়িয়ে রাখা যায়।
প্রকৃতপক্ষে সহীহ মুসলিমের হাদীসটিতে যাকে বাম হাত বলা হয়েছে, সহীহ বুখারীর হাদীসে তাকেই বাম যেরা‘ (কনুই হতে আঙুলের মাথা পর্যন্ত অংশ)-কে বুঝানো হয়েছে। এথেকে সুস্পষ্ট হল, হাত বলতে কেবল যেরা‘কেও বুঝায়। হাত বলতে যখন যেরা‘ বুঝায়, তখন হাতের উপর হাত রাখার অর্থ যেরা‘র উপর যেরা‘র রাখা। নিচের হাদীসগুলোতে হাত শব্দটির ব্যবহার কনুই থেকে হাতের পাতা বা আঙুল পর্যন্ত অংশ।
ইবনে উমার (রা) বলেন :
رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم اِذَا قَامَ فِي الصَّلاَةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتّي يَكُوْنَا حَذْوَ مَنْكَبَيْهِ
“আমি রসূলুল্লাহ (স)কে দেখেছি, যখন তিনি সালাতে দাড়াতেন তখন তাঁর হাত দু’টিকে কাঁধ (مَنْكَبَ) পর্যন্ত উঠালেন।” (সহীহ বুখারী- কিতাবুস সালাত)
সাহাবী মালিক ইবনে হুয়াইরিস (রা) বলেন :
كَانَ إِذَا كَبَّرَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِىَ بِهِمَا أُذُنَيْهِ وَإِذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِىَ بِهِمَا أُذُنَيْهِ … وفى رواية : حَتَّى يُحَاذِىَ بِهِمَا فُرُوعَ أُذُنَيْهِ
“রসূলুল্লাহ (স) যখন তাকবীর দিতেন তখন দুই হাত উঠাতেন – এমনকি উভয়কে হাতকে কান বরাবর করতেন। … অন্য বর্ণনায়, এমনকি দুই দুত দুই কানের লতি বরাবর উঠাতেন।” [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ২/৭৩৯ নং]
এই হাদীসটিতে رَفَعَ يَدَيْهِ ‘তাঁর দুই হাত তুলতেন’ বলতে হাতের কনুই থেকে আঙুল পর্যন্ত অংশকে বুঝানো হয়েছে। যা পূর্বে বর্ণিত হাত = যেরা‘র দাবী প্রমাণ করে।
অপর একটি যঈফ হাদীসে কাঁধ ও কান পর্যন্ত উভয় বর্ণনা এসেছে। হাদীসটি নিম্নরূপ :
ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা) থেকে বর্ণিত :
أَنَّهُ أَبْصَرَ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- حِينَ قَامَ إِلَى الصَّلاَةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى كَانَتَا بِحِيَالِ مَنْكِبَيْهِ وَحَاذَى بِإِبْهَامَيْهِ أُذُنَيْهِ ثُمَّ كَبَّرَ
“তিনি নবী (স)কে দেখেছেন যখন তিনি সালাতের জন্য দাঁড়ালেন, দুই হাত উঠালেন যেন উভয় হাত কাঁধ বরাবর হয়ে গেল এবং বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় কান বরাবর করলেন, অতঃপর তাকবীর বললেন।” [আবূ দাউদ, মিশকাত ২/৭৪৬; এর সনদে বিচ্ছিন্নতা আছে। কিন্তু মূল মর্মে পূর্বোক্ত সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের দু’টি বর্ণনা রয়েছে]
হাদীসটি থেকে বুঝা যাচ্ছে, হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কান পর্যন্ত ছিল তথা হাতের পাতা ও আঙ্গুল কাঁধের উপরে কান পর্যন্ত থাকত। আবার বলা হয়েছে, হাত কাঁধ বরাবর হত – অর্থাৎ হাতের পাতা ও আঙ্গুল ছাড়া হাতের বাকী অংশ। সুষ্পষ্ট হল, সহীহ মুসলিমে বর্ণিত ডান হাতটি বাম হাতের উপর রাখা বলতে সহীহ বুখারীর ডান হাতটি বাম যেরা‘র উপর রাখা। তথা ডান হাতের যেরা‘ বাম হাতের যেরা‘র উপর রাখার অর্থ সহীহ।

লেখক ২৭ (পৃ: ২১২২) :
২. হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. বলেন,
قُلْتُ لأَنْظُرَنَّ إِلَى صَلاَةِ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- كَيْفَ يُصَلِّى فنظرت إليه فَقَامَ فَكَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى حَاذَتَا بأُذُنَيْهِ ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى كَفِّهِ الْيُسْرَى وَالرُّسْغِ وَالسَّاعِدِ. أخرجه أبو داود (٧٢٧-٧٢٦) والنسائي (٨٨٩) واللفظ له وأحمد ٤/٣١٨ وابن خزيمة (٤٨٠) بإسناد صحيح. وفي رواية لأبي داود: ثم أخذ شماله بيمينه.
অর্থ: আমি (মনে মনে) বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে নামায পড়েন তা আমি লক্ষ্য করবো। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি দাঁড়িয়ে তাকবীর বললেন এবং উভয় হাত কান বরাবর রাখলেন। অতঃপর তাঁর ডান হাত বাম হাতের পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখলেন।
আবূ দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৭২৬,৭২৭; নাসাঈ শরীফ, হাদীস নং ৮৮৯; মুসনাদে আহমদ ৪খ, ৩১৮পৃ; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস নং ৪৮০।
আবূ দাউদ শরীফের আরেক বর্ণনায় আছে, ثم أخذ شماله بيمينه অর্থাৎ অতঃপর তিনি ডান হাত দ্বারা বাম হাত ধরলেন। এ হাদীসটি সহীহ।
ইবনে খুযায়মা র. উক্ত হাদীসের উপর শিরোনাম দিয়েছেন, باب وضع بطن الكف اليمنى على الكف اليسرى অর্থাৎ ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠ কব্জি ও বাহুর উপর রাখবে।
বিশ্লেষণ ২৭ : উক্ত হাদীসে সম্পূর্ণ ডান হাতটি বাম হাতের সম্পূর্ণ অংশ তথা তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার বর্ণনা এসেছে। যা পূর্ববর্তী সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনার অপর একটি ব্যাখ্যামূলক বর্ণনা। অথচ হানাফীগণ কেবল বাম হাতের পাতার পিঠের উপর ডান হাতের পাতা রাখেন এবং কেবল দু’টি আঙ্গুল দিয়ে কব্জিকে ধরেন। এ কারণে উক্ত হাদীসগুলোর সাথে হানাফীদের আমলের সম্পর্কও নেই।
ইবনে খুযায়মার অনুচ্ছেদে ডান হাতের তালু শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু আবূ দাউদ-নাসঈ-সহীহ হিব্বানের হাদীসে ঐ স্থানে হাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যদি সহীহ হাদীস দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে হাতের তালু শব্দটির প্রয়োগ ভুল। আর যদি যঈফ ও মুনকার হাদীস দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে উক্ত অনুচ্ছেদের লিখিত ‘তালু’ শব্দটি ঐ যঈফ দলিলের কারণেই অগ্রহণযোগ্য হয়। লেখকের আরবি উদ্ধৃতিতে ‘তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর শব্দগুলো বাদ পড়েছে। পূর্ণাঙ্গ অনুচ্ছেদটি লক্ষ্য করুন :
باب وضع بطن الكف اليمنى على كف اليسرى والرسغ والساعد جميعا
“অনুচ্ছেদ : ডান হাতের তালুর পেট বাম হাতের তালু, কব্জি ও বাহুর উপর একত্রিত থাকা।”
উক্ত অনুচ্ছেদটির আলোকে ডান হাতটি সম্পূর্ণ বাম যেরা‘র উপর থাকে। হানাফীদের মত আংশিক বাহু নয়, বরং جميعا শব্দের দ্বারা পূর্ণাঙ্গভাবে হাতের ঐ অংশগুলোকে বুঝায়। সুস্পস্ট হল, অনুচ্ছেদটি হানাফীদের আমলের বিরোধিতা করে। উপরোক্ত বক্তব্যে বাহুর আংশিক ব্যবহারের সুযোগ নেই। তাছাড়া পূর্বোক্ত সহীহ হাদীসে ‘হাত’ শব্দটি থাকায় – সে অনুযায়ী ব্যাখ্যা করলে যেটুকু দ্বন্দ্ব থাকে তা-ও নিরসণ হয়। আর এক্ষেত্রে অনুচ্ছেদের শব্দের চেয়ে হাদীসে ব্যবহৃত শব্দই অগ্রগণ্য ও দলিল।

লেখক ২৮ (পৃ: ২২) :
وعند الدارمي ١/٢٨٣ بإسناد صحيح في حديث وَائِلٍ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ يَضَعُ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى قَرِيباً مِنَ الرُّصْغِ .
অর্থাৎ দারিমী র. এক বর্ণনায় সহীহ সনদে ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান হাত বাম হাতের কব্জির কাছে রাখতে দেখেছি। সুনানে দারিমী, ১খ, ২৮৩পৃ।
বিশ্লেষণ ২৮ : উক্ত হাদীসটি থেকে বুঝা যায়, সম্পূর্ণ ডান হাতটি কব্জির উপর ছিল। হাতের তালু নয়। তাছাড়া পূর্বের হাদীসগুলোতে উল্লিখিত যেরা/বাহু শব্দগুলোকে ব্যাখ্যা হিসাবে নিতে হবে। যদি বলা হত, ডান হাতের আঙ্গুলগুলো বাম হাতের কব্জির কাছে ছিল, তাহলে হানাফীদের পক্ষে হাদীসটি দলিল হত। অর্থাৎ এ হাদীসটিতেও হানাফীদের দাবী ‘সালাতে বাম কব্জির উপর ডান হাতের তালু রেখে দু’আঙ্গুল দ্বারা চেপে ধরা সুন্নাত’ – শব্দ ও মর্ম পাওয়া গেল না। কেননা উক্ত শব্দ ও মর্মে কোন সহীহ হাদীস বর্ণিত হয় নি।

ওয়ায়েল (রা)এর আলোচ্য হাদীসে কেবল কব্জির বর্ণনা এসেছে। কিন্তু লেখকের পূর্ববর্তী বর্ণিত ২ নং হাদীসে উক্ত ওয়াইল (রা) থেকেই হাতের পাতা, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে (দ্র: ‘লেখক-২৭’)। যার সমর্থনে সহীহ বুখারী’র যেরা‘র উপর হাত রাখার বর্ণনাও রয়েছে। সুতরাং এ পর্যায়ে দারেমীর আলোচ্য হাদীসটি সংক্ষিপ্ত ও অন্যান্য সহীহ হাদীসের ব্যাখ্যা সাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য।

লেখক ২৯ (পৃ: ২২) :
৩. হযরত হুলব আততাঈ রা. বলেন,
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يؤمنا فيأخذ شماله بيمينه. أخرجه الترمذي (٢٥٢) وابن ماجه (٨٠٩) وابن أبي شيبة (٣٩٥٥) والدارقطني ١/٢٨٥
অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ইমাম হতেন। তিনি ডান হাত দ্বারা বাম হাত চেপে ধরতেন। তিরমিযী শরীফ,হাদীস নং ২৫২; মুসনাদে আহমদের বর্ণনায় আছে, ডান হাত দ্বারা বাম হাতের ধরার বিবরণ দিতে গিয়ে ইয়াহইয়া র. ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রেখেছেন।
বিশ্লেষণ ২৯ : এই হাদীসটিতেও সম্পূর্ণ ডান হাত দ্বারা সম্পূর্ণ বাম হাতকে চেপে ধরার কথা উল্লিখিত হয়েছে। যা বাম যেরা`র উপর ডান যেরা` রাখার পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতেও বাম কব্জির উপর সম্পূর্ণ ডান হাতটি রাখা যায়। যা লেখকের ২ নং-এ উল্লিখিত নাসাঈর বর্ণনাটিতে বিস্তারিত বিবরণে এসেছে (দ্র: ‘লেখক-২৭’)। অথচ হানাফীদের ব্যবহৃত শব্দ তথা ‘আঙ্গুল’, ‘হাতের পাতা/তালূ’র ব্যবহার আলোচ্য হাদীসে নেই। তাই এই হাদীসটিও হানাফীদের পক্ষের দলিল নয়। যদি ডান হাত না বলে ডান হাতের তালুটি বাম হাতের কব্জির উপর রাখার কথা বলা হত, তাহলে তা হানাফীদের সমর্থন করত। কিন্তু এমন কোন সহীহ বর্ণনা নবী (স) থেকে নেই।
লেখকের উল্লিখিত মুসনাদে আহমাদের বর্ণনাটি নিম্নরূপ :
عَنْ قَبِيصَةَ بْنِ هُلْبٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْصَرِفُ عَنْ يَمِينِهِ وَعَنْ يَسَارِهِ وَرَأَيْتُهُ قَالَ يَضَعُ هَذِهِ عَلَى صَدْرِهِ وَصَفَّ يَحْيَى الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى فَوْقَ الْمِفْصَلِ
“ক্বাবীযাহ বিন হুলব তাঁর পিতাা (হুলব আততাঈ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি (রা) বলেন : আমি নবী (স)কে (সালামে) ডান ও বাম দিকে ফিরতে দেখেছি। আর আমি দেখেছি. (বর্ণনাকারী) বলেন : আমি নবী (স)-কে এটি বুকের উপর রাখতে দেখেছি। ইয়াহইয়া বিবরণ দেন : ডান (হাত) বামের সংযোগ স্থলের উপর থাকবে।”
মুহাদ্দিস আব্দুল হক্ব দেহলভী হানাফী (রহ) লিখেছেন :
وھمچنیں روایت کرد ترمذی از قبیضہ بن ھلب ازپدرش کہ گفت دیدم رسول خدا ﷺ کہ می نھاد دست خود را دابر سینہ خود
“ইমাম তিরমিযী ক্ববীযাহ বিন হুলবের মধ্যস্থতায় সাহাবী হুলব তাঈ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি নবী (স)কে দেখেছেন যে, তিনি (স) নিজের হাত বুকের উপর রেখেছিলেন।” (শরহে সফরুস সাআদাত পৃ: ৪৪)
বুঝা গেল, লেখক মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত বুকের উপর রাখার কথাটি গোপন করেছেন। আর ডান হাতটি যখন বাম হাতের কব্জি বা সংযোগ স্থলে থাকে তখন তা স্বাভাবিক ভাবে বুকের উপর বা নিকটে থাকে। এটাও বুঝা গেল, মুহাদ্দিসগণ তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদের বর্ণনাটি পরস্পরের ব্যাখ্যা হিসাবে গণ্য করেছেন। আবার এটার সম্ভাবনাও রয়েছে যে, তাঁরা তিরমিযীর কোন কোন সংস্করণে ‘বুকের উপর’ কথাটি দেখেছেন। যেভাবে মুহাদ্দিস আব্দুল হক্ব দেহলভী বলেছেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
উল্লেখ্য বর্ণনাকারী কাবীযাহ বিন হুলব কিছু মুহাদ্দিসগণের কাছে অপরিচিত হওয়ায় তাঁরা তাঁকে মাজহুল গণ্য করে হাদীসটিকে যঈফ বলেছেন। অথচ ইমাম ইজলী (রহ) তাঁকে সিক্বাহ বলেছেন। ইমাম হিব্বান তাঁর ‘সিক্বাতে’ উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর হাদীস সহীহ গণ্য করেছেন। (মীযানুল ই‘তিদাল ৫/৪৬৬ পৃ:)

লেখক ৩০ (পৃ: ২৩) :
৪. হযরত শাদ্দাদ ইবনে শুরাহবীল রা. বলেন,
رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم قائما يده اليمنى على يده اليسرى قابضا عليها يعني في الصلاة . رواه البزار والطبراني .ذكره الهيثمي في مجمع الزوائد ٢/٢٢٥ وقال: وفيه عباس بن يونس ولم أجد من ذكره ،
অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দন্ডায়মান দেখলাম। তার ডান হাতটি বাম হাতের উপর, তিনি সেটাকে চেপে ধরে আছেন। বাযযার ও তাবারানী এটি উদ্ধৃত করেছেন। (দ্র, মাজমাউয যাওয়াইদ, ২খ, ২২৫ পৃ)
বিশ্লেষণ ৩০ এই হাদীসটির দাবী পূর্বের ‘বিশ্লেষণ -২৭, ২৮ ও ২৯’ এর মত। এখানে ডান হাতের আঙ্গুল বা পাতাকে বাম হাতের কব্জির উপর রাখতে বলা হয় নি। তাই এই হাদীসটিও হানাফীদের বিরুদ্ধে যায়। কেননা তারা আমল করছেন খাস ভাবে ‘আঙ্গুল’ ও ‘তালু’ শব্দের প্রতি। অথচ দলিলটিতে আছে ‘আমভাবে ব্যবহৃত ‘হাত’ শব্দটি। আমরা সালাতের এই সুনির্দিষ্ট অবস্থা ক্ষেত্রে ‘হাতে’র প্রকৃত ব্যাখ্যা হাদীস থেকে পূর্বে উল্লেখ করেছি।
লেখকের উল্লিখিত ‘চেপে ধরে’ বাক্যটির মূল আরবি শব্দ قابض (আঁকড়ে ধরা)। যার দাবী হল, হাতের সম্পূর্ণ মুঠো দ্বারা ধরা। যেমন – আরবি অভিধানে আছে- القبضة – অর্থ : মুঠো, মুঠোভরা বস্তু, মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা (কামূসুল ওয়াহিদ)। যার দাবী পাঁচটি আঙ্গুলসহ হাতের তালুর ব্যবহার। পক্ষান্তরে হানাফীগণ উক্ত কব্জা বা আঁকড়ে থাকার আমলটি করে থাকে দু’টি আঙ্গুল দ্বারা কব্জিকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে। যা কখনই মজবুতভাবে আঁকড়ে থাকার অর্থে প্রয়োগযোগ্য নয়। বরং শব্দটি সম্পূর্ণ পাঁচ আঙ্গুল দ্বারা আঁকড়ে থাকার দাবী করে।
যখন হাতের অর্থ যেরা‘ বা বাহু। তখন ডান হাত বাম হাতের উপর রাখার অর্থ হবে – ডান হাতের বাহুকে বাম হাতের বাহু দ্বারা আকড়ে থাকা। এমতাবস্থায় উক্ত কব্জা করা তথা হাতকে চেপে ধরার দাবী পূরণ হবে। যেমন রুকু’তে হাত দ্বারা হাটু কব্জা তথা আঁকড়ে থাকার কথা বর্ণিত হয়েছে।
ثم ركع فوضع يديه على ركبتيه كأنه قابض عليهما ووتر يديه فنحاهما عن جنبيه
“নবী (স) রুকু‘ করলেন এবং দুই হাত দুই জানুর উপর রাখলেন যেন দু’টিকে কব্জা করলেন (আঁকড়ে ধরলেন), তিনি দুই হাতকে কিছুটা বাঁকা করে পার্শ্বদেশ থেকে পৃথক রাখলেন।” (আবূ দাউদ, মিশকাত ২/৭৪৫ নং)
এখানে হাত বলতে, হাতের তালু থেকে কনুই পর্যন্ত অংশ। বুঝা গেল কব্জা করে হাত ধরার মধ্যে হানাফীদের পক্ষে কোন দলিল নেই। কেননা তাদের আমল হল দুই আঙ্গুল দিয়ে কব্জি ধরা। অথচ আলোচ্য হাদীসে সম্পূর্ণ বাম হাতকে কব্জা বা আঁকড়ে ধরতে বলা হয়েছে।

লেখক ৩১ (পৃ: ২৩) :
৫. হযরত জারীর আদ্দাব্বী বলেন,
كان علي إذا قام في الصلاة وضع يمينه على رسغه .أخرجه ابن أبي شيبة (٣٩٦١) موصولا والبخاري قبل حديث رقم ١١٩٨ تعليقا. كتاب العمل في الصلاة ، باب إستعانة اليد في الصلاة الخ
অর্থ: হযরত আলী রা. যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন তার ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রাখতেন।
মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৩৯৬১; বুখারী শরীফ, ১১৯৮নং হাদীসের এর পূর্বে। এ হাদীসটির সনদ সহীহ।
বিশ্লেষণ ৩১ : এই হাদীসটির দাবী পূর্বের ‘বিশ্লেষণ -২৭, ২৮ ও ২৯’ এর মত। উল্লেখ্য যে, হাদীসটি থেকে ডান হাত বলতে ডান হাতের তালুকে সুনির্দিষ্ট করার কোন প্রমাণ নেই। তাছাড়া প্রথমে উল্লিখিত সহীহ বুখারী ও আবূদাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে খুযায়মা’র বিস্তারিত বিবরণ তথা ডান হাতটি বাম হাতের যেরা কিংবা হাতের তালুর পিঠ, কব্জি, বাহুর উপর রাখার বর্ণনা সুস্পষ্ট। এ কারণে আলোচ্য বর্ণনাটি সংক্ষিপ্ত তথা কেবল কব্জির বর্ণনা বিশিষ্ট। এ পর্যায়ে হাদীসটি বিস্তারিত হাদীসের ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী এবং বর্ণনাটি হানাফীদের বিরোধী।

লেখক ৩২ (পৃ: ২৩) :
এসব হাদীসের কোন কোনটি থেকে বুঝা যায়, রসূলুল্লাহ (স) বাম হাতের উপর ডান হাত রাখতেন। আর কোন কোনটি থেকে বুঝা যায়, তিনি ডান হাত দ্বারা বাম হাত চেপে ধরতেন। বাম হাতের কোন জায়গা চেপে ধরতেন? অধিকাংশ হাদীসই প্রমাণ করে, বাম হাতের কব্জি চেপে ধরতেন।
বিশ্লেষণ ৩২ : আমরা জেনেছি সহীহ মুসলিমে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখার কথা এসেছে। সহীহ বুখারীতে ডান হাতটি বাম হাতের যেরা‘ তথা কনুই থেকে আঙ্গুল পর্যন্ত অংশের উপর রাখার বর্ণনা এসেছে। তাছাড়া হাদীসে কেবল হাত বলতেও যেরা‘র অংশটিকে গণ্য করা হয়েছে। সহীহ আবূদাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে খুযায়মা’র হাদীসটিতে ডান হাতটি বাম হাতের পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার কথা বর্ণিত হয়েছে। যার প্রতিটিতে হাত রাখার ধরণ সুস্পষ্ট। লেখক ঐ শব্দগুলো বর্ণনা করা সত্ত্বেও তা এখন আলোচনা প্রসঙ্গে উপেক্ষা করলেন।
পক্ষান্তরে কেবল কব্জি’র বর্ণনাগুলো পূর্বোক্ত সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, ও আবূদাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে খুযায়মা’র বর্ণনাগুলো থেকে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত। লেখক কেবল ঐ সংক্ষিপ্ত কব্জি সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোর কথা উল্লেখ করলেন। যা মূলত পূর্বোক্ত বর্ণনাগুলোর ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী।

লেখক ৩৩ (পৃ: ২৩) :
এসব হাদীসের মধ্যে সমন্বয় করে চার মাযহাবের আলিমগণ সেই পদ্ধতিকেই অবলম্বন করেছেন যেভাবে হানাফী মাযহাবের অনুসারীগণ আমল করে থাকেন।
বিশ্লেষণ ৩৩ : অথচ হানাফী মাযহাবে সম্পূর্ণ ডান হাত বা বাহুর (যেরা‘র) ব্যবহার হয় না। বরং ডান হাতের অংশবিশেষ তথা তালু ও আঙ্গুল শব্দগুলোর ব্যবহার ও আমল সর্বাধিক। হানাফীদেরে এই শব্দগুলো পূর্বোক্ত হাদীসগুলোতে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। তাছাড়া পূর্বোক্ত প্রতিটি হাদীসে ডান হাতটিকে আংশিকভাবে উপস্থাপন করা হয় নি। যেমন বলা হয় নি – ডান হাতের তালু, আঙ্গুল প্রভৃতি শব্দ । অথচ লেখকের পরবর্তী মাযহাবী আলেমদের উদ্ধৃতিগুলোর কয়েকটিতে ডান হাতের তালু ও আঙ্গুলের ব্যবহার পাওয়া যাবে। যা সহীহ হাদীসের মধ্যে যঈফ ও মুনকার হাদীসের ব্যাখ্যার মাধ্যমে অতিরিক্ত সংযোজন। তাছাড়া পূর্বোক্ত সহীহ হাদীসগুলোর বিরোধী বিধায় পূর্ণাঙ্গ ডান হাতের ব্যাখ্যার বিকৃতিই বটে। কেননা ডান হাতটি হাদীসে আংশিকভাবে উপস্থাপিত হয় নি। আমরা ইতঃপূর্বে সালাতের মধ্যে হাতের ব্যাখ্যা কি হবে, তা নবী (স)এর হাদীস থেকে প্রমাণ করেছি। সুতরাং নবী (স)এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার মোকাবেলায় অন্যদের ব্যাখ্যা বিকৃত ও মনগড়া হওয়ায় পরিত্যাজ্য। তাছাড়া লেখকের দেয়া পরবর্তী ছয়টি উদ্ধৃতির মধ্যে শেষ তিন’টি (ইমাম নববী, হাফেয ইবনে হাজার ও ইমাম শওকানী রহ.এর ) উদ্ধৃতি হুবহু আমাদের উপস্থাপনাকে সমর্থন করে এবং লেখকের দাবীকে খণ্ডন করে। তাছাড়া আমাদের পক্ষাবলম্বনকারী উদ্ধৃতি তিন’টিতে উক্ত ইমামগণ কর্তৃক নিজের পক্ষ থেকে কোন কিছু সংযোজন করা হয় নি। বরং হুবহু পূর্বোক্ত হাদীসগুলোর শাব্দিক দাবীকেই প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

লেখক ৩৪ (পৃ: ২৩২৪) :
হালবী র. মুনয়াতুল মুসল্লী এর ভাষাগ্রন্থে লিখেছেন,
السنة أن يجمع بين الوضع والقبض جمعا بين ما ورد فى الأحاديث المذكورة إذ في بعضها ذكر الأخذ وفي بعضها ذكر وضع اليد وفي البعض وضع اليد على الذراع فكيفية الْجمع أن يضع الكف اليمينى على الكف اليسرى ويحلق الإبْهام والخنصر على الرسغ ويبسط الأصابع الثلاث على الذراع فيصدق أنه وضع اليد على اليد وعلى الذراغ وأنه أخذ شماله بيمينه اهـــــــ
অর্থাৎ উল্লিখিত হাদীসগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনকল্পে সুন্নত হলো হাত রাখা ও বাঁধা দু’টির উপরই একসঙ্গে আমল করা। কারণ কিছু হাদীসে চেপে ধরার কথা এসেছে। কিছু হাদীসে হাতকে হাতের উপর রাখার কথা এসেছে। এগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের পদ্ধতি হলো, ডান হাতের তালু বাম হাতের পিঠের উপর রাখবে, বৃদ্ধাঙ্গুলি ও কনিষ্ঠা আঙ্গুলি দ্বারা কব্জি চেপে ধরবে, আর বাকি তিন আঙ্গুল বাহুর উপর বিছিয়ে দিবে। তাহলে হাতের উপর হাত রাখা, বাহুর উপর হাত রাখা এবং ডান হাত দ্বারা বাম হাত চেপে ধরা, সবগুলো হাসিল হবে।
বিশ্লেষণ ৩৪ : সম্মানিত পাঠক! লক্ষ্য করুন।
ক) হাদীসে হাতের উপর হাত রাখা ও হাত আঁকড়ে থাকার বর্ণনা এসেছে। অর্থাৎ দু’ভাবেই বৈধ। অথচ উক্ত উদ্ধৃতিটিতে সমন্বয়ের নামে নবী (স) ও সাহাবীদের থেকে প্রাপ্ত উন্মুক্ত শব্দগুলোকে নিজস্ব চিন্তাতে সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
খ) পূর্বোক্ত হাদীসগুলোতে আঙ্গুল শব্দের কোন ব্যবহার নেই। উক্ত উদ্ধৃতিটিতে আঙ্গুল ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নবী (স) ও সাহাবীদের (রা) থেকে আসে নি। সুতরাং তা বিদ‘আত। (দেখুন : শায়েখ আলবানী’র, ‘সিফাতে সালাত’- হাত বাঁধা সম্পর্কিত অনুচ্ছেদ]
গ) দু’টি আঙ্গুল দ্বারা কব্জি চেপে ধরা ও বাকী তিনটি আঙ্গুল হাতের যেরা‘র বা বাহুর উপর রাখার বিষয়টি প্রকারান্তরে খাস বা সুনির্দিষ্ট বিধান। অথচ উসূল হল খাস আমলের জন্য খাস দলিল প্রয়োজন। অথচ লেখকের পূর্বের বা পরের কোন হাদীসেই দু’টি ও তিনটি আঙ্গুলের স্বতন্ত্র কোন ব্যবহার পাওয়া যাবে না। ফলে দলিলহীনতার কারণে উক্ত আমলটি বাতিল।
) হানাফীদের মূল বিধান সম্বলিত আবূ দাউদের হাদীসটি যঈফ। যার দাবী হল وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ তালুর উপরে তালু বিছিয়ে দেয়া। যদি আপনি সঠিক পন্থায় তালুর উপর তালু রাখেন তাহলে বৃদ্ধা ও কনিষ্ঠা আঙ্গুল দ্বারা কব্জি ধরতে পারবেন না। পক্ষান্তরে দুটি আঙ্গুল দ্বারা কব্জি ধরতে গেলে আপনার ডান হাতের তালুটি বাম হাতের তালুর পিঠের অংশটির প্রায় অর্ধেক অগ্রসর হবে । সুতরাং তালুর উপর তালু রাখার সঠিক আমলটিও সম্ভব হয় না।
ঙ) আমরা পূর্বে প্রমাণ করেছি, সালাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘যেরা’ ও ‘হাত’ পরিপূরক শব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ পন্থায় একটি হাত বা হাতের যেরা‘ অপর হাত বা হাতের যেরা‘র উপর রাখলে হাতের পাতা, কব্জি ও যেরা বা বাহুর উপর হাত রাখা এবং পাঁচ আঙ্গুল দিয়ে কব্জা করা বা আঁকড়েও ধরা যায়। হাতকে হাতের উপর রাখার বা ধরার ব্যাপার আঙ্গুল সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকাই যে কয়টি আঙ্গুল মানুষের থাকা স্বাভাবিক সেই কয়টি আঙ্গুল অপর হাতের উপর থাকবে বা অপর হাতকে চেপে ধরবে। কব্জা করে ধরা বা আঁকড়ে ধরার উদাহরণ সালাতের ভিতর অপর একটি স্থানের বর্ণনা থেকে সুস্পষ্ট হয়। বর্ণনাটি নিম্নরূপ :
আবূ হুমায়েদ সাঈদী (রা) বলেন :
ثم ركع فوضع يديه على ركبتيه كأنه قابض عليهما ووتر يديه فنحاهما عن جنبيه
“নবী (স) রুকু‘ করলেন এবং দুই হাত দুই জানুর উপর রাখলেন যেন দু’টিকে আঁকড়ে ধরলেন, তিনি দুই হাতকে কিছুটা বাঁকা করে পার্শ্বদেশ থেকে পৃথক রাখলেন।” (আবূ দাউদ, মিশকাত ২/৭৪৫ নং)
এখন লেখকের উল্লিখিত হাত চেপে ধারা ৪ নং হাদীসটি পুণরায় পড়ুন :
رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم قائما يده اليمنى على يده اليسرى قابضاعليها يعني في الصلاة . رواه البزار والطبراني .ذكره الهيثمي في مجمع الزوائد ٢/٢٢٥ وقال: وفيه عباس بن يونس ولم أجد من ذكره ،
অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দন্ডায়মান দেখলাম। তার ডান হাতটি বাম হাতের উপর, তিনি সেটাকে চেপে ধরে আছেন। বাযযার ও তাবারানী এটি উদ্ধৃত করেছেন। (দ্র, মাজমাউয যাওয়াইদ, ২খ, ২২৫ পৃ)
বুঝা গেল চেপে ধরার বিষয়টি দুই আঙ্গুলে দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যায় না। কেননা এখানে চেপে ধরা বা কব্জা করার প্রক্রিয়াটি উন্মুক্ত। অর্থাৎ ডান হাতটি বাম হাতটিকে চেপে ধরতে সম্পূর্ণ আঙ্গুলগুলোর ব্যবহার উন্মুক্ত। যা যেরা‘ আঁকড়ে ধরার চিত্রকে সামনে রাখলে বাস্তব রূপ লাভ করে।
আসলে হানাফী মাযহাবে হাদীস থেকে হাদীস ব্যাখ্যা না নিয়ে নিজেদের ইচ্ছামত সমন্বয় করা হয়েছে। ফলে নিজেদের তালুর উপর তালু রাখার হাদীসের উপর আমল করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। বরং তালুর পিঠের খানিকটা বাদ দিয়ে তালুর হাদীসের উপর অপসমন্বয় করে আমল করা হয়েছে। কেননা দুই আঙ্গুল দিয়ে কব্জি ধরলে ডান হাতের তালুটি হুবহু বাম হাতের তালুর উপর রাখা হয় না। বরং অনেক খানিক সামনে অগ্রসর হয়।

লেখক ৩৫ (পৃ: ২৪) :
লক্ষ্য করুন, হানাফী আলিমগণ কিভাবে হাদীসগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে সবগুলো অনুসারে আমল করতে বলেছেন? একেই বলে হাদীসের অনুসরণ! এঁরাই প্রকৃত আহলে হাদীস। যারা একটি হাদীস নিয়ে অন্যগুলো উপেক্ষা করে তারা আহলে হাদীস হতে পারেনা।
বিশ্লেষণ ৩৫ পূর্বের বিশ্লেষণে আমরা প্রমাণ করেছি হানাফীগণ হাদীসগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে পারেন নি। বরং যঈফ ও মুনকার হাদীস এবং নিজেদের চিন্তার দ্বারা সমন্বয়ের নামে সহীহ হাদীসের বিকৃতি করেছেন।

লেখক ৩৬ (পৃ: ২৪) :
ইমাম মালিক র. এর প্রসিদ্ধ মত হলো ফরজ নামাযে হাত বাঁধবেনা, ছেড়ে রাখবে। সুন্নাত ও নফল নামাযে হাত বাঁধবে। হাত বাঁধলে কিভাবে বাঁধবে? আল্লামা উব্বী মালেকী র. মুসলিম শরীফের ভাষ্যগ্রন্থে লিখেছেন,
واختار شيوحنا أن يقبض بكف اليمنى على رُسْغ اليسرى ، واختار بعضهم مع ذلك ان بكون السبابة والوسطى ممتدين على الذراع
অর্থাৎ আমাদের শায়েখগন বলেছেন, ডান হাত দ্বারা বাম হাতের কব্জি চেপে ধরবে। কেউ কেউ একথাও যোগ করেছেন, শাহাদত ও মধ্যমা আঙ্গুলি যেন বাহুর উপর থাকে। (২খ, ২৭৮ পৃ:)
বিশ্লেষণ ৩৬ : ইমাম মালেকের ‘মুয়াত্তা’-এ সহীহ বুখারীর যেরা‘ শব্দযুক্ত হাত বাঁধার হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া অধিকাংশ মালেকীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য আমলটি হল হাত বাঁধা। (আল-ফিক্বহুল ইসলামি ও আদিল্লাতাহু ২/৬৩ পৃ:)
লেখকের শেষোক্ত উদ্ধৃতিটি মেনে নিলেও এটাই বলতে হয় – উক্ত শব্দে কোন হাদীস বর্ণিত না হওয়ায় উক্ত মন্তব্যটি সঠিক নয়। যার জবাব পূর্বের বিশ্লেষণটির মত। তাছাড়া সহীহ হাদীসগুলো সুস্পষ্টভাবে ডান হাতটি বাম হাতের যেরা‘ তথা তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার কথা বলা হয়েছে। এখন ডান হাতটি ‘আম শব্দে ব্যবহৃত হওয়ায় যেভাবে সেটি রাখলে বাম হাতের যেরা‘ তথা তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখা হবে –সেটিই হল হাদীসের প্রতি আমল। এখানে অন্যকারো সমন্বয়ের মুখাপেক্ষী হওয়ার মত অস্পষ্টতা নেই। আর যে কোন মানুষের থেকে নবী (স) স্পষ্টভাবে আমাদেরকে কাছে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর (স) কথার মধ্যে কোন সমস্যা বা জটিলতা নেই।

লেখক ৩৭ (পৃ: ২৪২৫) :
শাফেয়ী মাযহাব সম্পর্কে ইমাম নববী র. তার ‘আররাওজাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন,
السنة ووضع اليمنى على اليسرى، فيقبض بكفه اليمنى، كوع اليسرى، وبعض رسغها، وساعدها ۱\۳۳۹
অর্থাৎ সুন্নাত হলো ডান হাত বাম হাতের উপর এভাবে রাখবে যে, ডান হাতের তালু দ্বারা বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির গোড়ার হাড়, কব্জির কিছু অংশ এবং বাহু চেপে ধরবে। (২খ, ৩৩৯ পৃষ্ঠা)
বিশ্লেষণ ৩৭ : লেখক এই উদ্ধৃতিটি কিছুটা সংক্ষিপ্ত করে উল্লেখ করেছেন। এ কারণে السنة শব্দের পরে …. রাখা উচিত ছিল। প্রকৃত বাক্যটি হবে :
السنة بعد التكبير، حط اليدين، ووضع اليمنى على اليسرى، فيقبض بكفه اليمنى، كوع اليسرى، وبعض رسغها، وساعدها
“তাকবীরের পরে সুন্নাত : দুই হাত নামাতে হবে। আর ডান হাত …..(লেখকের উল্লিখিত অংশ)।”
অতঃপর ইমাম নববী (রহ) অপর একজন ইমামের উদ্ধৃতি দ্বারা উক্ত বক্তব্যটি ব্যাখ্যা করার পরে লিখেছেন :
ثم يضع يديه كما ذكرنا تحت صدره، وفوق سرته، على الصحيح. وعلى الشاذ تحت سرته
“অতঃপর হাত দু’টি সেভাবে রাখতে হবে যেভাবে আমার উল্লেখ করেছি বুকের নিচে ও নাভীর উপরে রাখা সহীহ। আর নাভীর নিচে রাখা শায (সহীহর বিরোধী) ।”
পাঠক লক্ষ্য করুন, ইমাম নববী (রহ) ডান হাতের তালু ব্যবহার করেছেন। অথচ সহীহ একটি হাদীসেও ডান হাতের তালু শব্দটি ব্যবহৃত হয় নি। কিন্তু বাম হাতের যে অংশগুলো তিনি (রহ) উল্লেখ করেছেন – তা হুবহু সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এই মর্মে বর্ণিত সহীহ হাদীসটির অপর একটি সাক্ষ্য সহীহ বুখারীর বর্ণনা। যেখারে ডান হাতটি বাম যেরা‘র উপর রাখার কথা বর্ণিত হয়েছে। উভয় হাদীস সামনে রাখলে ইমাম নববী কর্তৃক ডান হাত না বলে ডান হাতের তালু বলাটা হাদীস বহির্ভূত শব্দ বিধায় পরিত্যাজ্য। তাছাড়া নাভীর নিচে হাত বাঁধার হাদীসকে শায বলার মাধ্যমে ইমাম নববী হানাফীদের নিয়মটিকে বাতিল করেছেন।
সুস্পষ্ট হল, ইমাম নববীর বক্তব্যের মধ্যে হানাফীদের পদ্ধতির কোন সমর্থন নেই। তাছাড়া ইমাম নববী (রহ)-এর নিকট বুকের নিচে, নাভীর উপরে এবং বুকের উপরে একই অর্থবোধক। যেমন – তিনি সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যা গ্রন্থে লিখেছেন :
وفي المسألة أحاديث كثيرة ودليل وضعهما فوق السرة حديث وائل بن حجر قال: (صليت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم ووضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره”. رواه ابن خزيمة في صحيحه. وأما حديث علي رضي الله عنه أنه قال: (من السنة في الصلاة وضع الأكف على الأكف تحت السرة” ضعيف متفق على تضعيفه، رواه الدارقطني والبيهقي من رواية أبي شيبة عبد الرحمن بن إسحاق الواسطي وهو ضعيف بالاتفاق
“এই মাসআলাটিতে অসংখ্য হাদীস ও দলিল রয়েছে যে, নাভির উপরে (হাত) বাঁধতে হবে। ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা) বলেন : ‘আমি রসূলুল্লাহ (স)এর সাথে সালাত পড়েছি। তিনি ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর রাখলেন।’ হাদীসটি ইবনে খুযায়মাহ তাঁর ‘সহীহ’তে বর্ণনা করেছেন। পক্ষান্তরে আলী (রা) থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন : ‘সালাতে সুন্নাত হল, তালু রাখবে তালুর উপরে নাভির নিচে।’ হাদীসটি ঐকমত্যে যঈফ হাদীসটির দুর্বলতার কারণে। এটি বর্ণনা করেছেন দারা কুতনী। আর বায়হাক্বী বর্ণনা করেছেন আবী শায়বাহ থেকে (বর্ণনাকারী) আব্দুর রহমান বিন ইসহাক্ব ওয়াসিতী’র মাধ্যমে। আর তিনি ঐকমত্যে যঈফ।” [শরহে মুসলিম নববী –কিতাবুস সালাত باب وضع يده اليمنى على اليسرى بعد تكبيرة الإحرام تحت صدره فوق سرته، ….. (অনুচ্ছেদ : তাকবীরে তাহরীমার পরে ডান হাত বাম হাতের উপর থাকবে বুকের নিচে নাভীর উপরে…..)]

সম্মানিত পাঠক! উপরের প্রতিটি বাক্য ভালভাবে পড়ুন। যা থেকে বুঝা যাচ্ছে – ইমাম নববী (রহ)এর কাছে বুকের উপর হাত রাখার দলিলটিই বুকের নিচে ও নাভীর উপরে হাত রাখা। আরো লক্ষ্য করুন! যখন ডান হাতটি বাম হাতের যেরা‘র উপর সমান্তরালভাবে রাখা হয় তখন দু’টি হাতের কনুই বরাবর তা সমান্তরাল হয়। যা সহীহ বুখারীর হাদীসটির মূলদাবী। আর এভাবে হাত বাঁধা হলে ঐ হাত বাঁধাকে বুকের উপর, বুকের নিচে ও নাভীর উপর সবরকম অর্থ ও ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে। অর্থাৎ ইমাম নববী (রহ)এর দেখানো পদ্ধতিটি হানাফীদেরকে খণ্ডন করে এবং এর সূক্ষ্ম পর্যালোচনা বুকের উপর বা নিকটে হাত বাঁধার অবস্থাকে সমর্থন করে। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক্ব দিন।

লেখক ৩৮ (পৃ: ২৫) :
হাম্বলী মাযহাব সম্পর্কে ইবনে মানসূর আল হাম্বালী র. আররাওযুল মুরবি গ্রন্থে লিখেছেন,
ثم يقبض كوع يسراه ويجعلهما تحت سرته اﻫـــــ ۱\۱٦۵ وكذا في الإنصاف للمرداوى ۲\٤۵ والفروع لابن مفلح ۱\۳۲۱
“অর্থাৎ অতঃপর বাম হাতের কব্জি ডান হাত দ্বারা চেপে ধরবে। এবং নাভির নীচে রাখবে। (১খ, ১৬৫ পৃ:); মারদাবী র. আল ইনসাফ গ্রন্থে (২/৪৫) ও ইবনে মুফলিহ র. আল ফুরু’ গ্রন্থে (১/৩৬১) একই কথা বলেছেন।

বিশ্লেষণ ৩৮ উক্তিটি কেবল কব্জি ব্যবহার সম্পর্কিত সংক্ষেপে বর্ণিত হাদীসের অনুসরণ। উক্ত উদ্ধৃতির মাধ্যমে যেরা‘র বর্ণনাযুক্ত সহীহ বুখারীর বর্ণনার উপর আমল বাদ পড়ছে। আবূদাউদ-নাসাঈ- ইবনে খুযায়মাহতে ব্যবহৃত বাম হাতের পাতার পিঠ-কব্জি-বাহুর উপর ডান হাতটি স্থাপন করার হাদীসটির উপর আমল করাও সম্ভব হচ্ছে না। আলী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে : فِى الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ “সালাতে তালুর উপরে তালু বিছিয়ে দেয়া, নাভীর নীচে।” কিছুক্ষণ আগে ইমাম নববী কর্তৃক বর্ণনাটিকে সর্বসম্মতভাবে যঈফ বলা হয়েছে। সুতরাং আলোচ্য উদ্ধৃতির কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই।

লেখক ৩৯ (পৃ: ২৫) :
লক্ষ্য করুন, পৃথিবীর অধিকাংশ আলিম-ওলামার মত কি, আর লা-মাযহাবী ভাইয়েরা কি করেন?
বিশ্লেষণ ৩৯ : লেখক যেসব উদ্ধৃতি দিয়েছেন তার অধিকাংশই সহীহ হাদীসের বিরোধী। অথচ লেখক তাকে হাদীসের মধ্যে সমন্বয় হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম নববী (রহ)এর উদ্ধৃতিটি লেখকের বিপক্ষে যায়। এটাই আমরা লক্ষ্য করলাম।
লা-মাযহাব অর্থ লা-দ্বীন। অর্থাৎ যার কোন দ্বীন নেই। অথচ আমরা কুরআন ও সহীহ হাদীস মানছি – আর এটাই দ্বীনুল ইসলাম। পক্ষান্তরে মাযহাবী হিসাবে পরিচিতরা কুরআন ও সহীহ হাদীসকে বিকৃত করে নিজেদের মনগড়া সমন্বয়কে দ্বীন হিসাবে মেনে থাকে। মূলত এটাই তাদেরকে দ্বীন ইসলাম থেকে দূরে রাখছে।

লেখক ৪০ (পৃ: ২৫) :
যে হাদীসটির কারণে তারা বাম হাতের কনুই পর্যন্ত ডান হাত বিস্তার করে দেন সেটি বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হয়েছে। এখানে ১নং দলিলে সেটি আমরা উল্লেখ করেছি। ঐ হাদীসটি সম্পর্কে বুখারী শরীফের বিখ্যাত ভাষ্যকার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী র. ফতহুল বারী গ্রন্থে বলেছেন,
أبهم موضعه من الذراع وفي حديث وائل عند أبي داود والنسائي ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد وصححه بن خزيمة وغيره وسيأتي أثر على نحوه في أواخر الصلاة
অর্থাৎ বাহুর কোন জায়গায় রাখতেন সেটা এই হাদীসে অস্পষ্ট। আবূ দাউদ ও নাসাঈ বর্ণিত ওয়াইল রা. এর হাদীসে বলা হয়েছে : অতঃপর তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখলেন। ইবনে খুযায়মা র. প্রমুখ এটিকে সহীহ বলেছেন। সালাত অধ্যায়ের শেষ দিকে হযরত আলী রা. এর অনুরূপ আছার (হাদীস) এর উল্লেখ আসছে। (২খ, ২৭৫ পৃ:)
বিশ্লেষণ ৪০ : লেখকের দেয়া উদ্ধৃতি থেকে বুঝা যাচ্ছে, ইবনে হাজার (রহ) সহীহ বুখারীর যেরা‘র বা বাহুর অর্থটির চাইতে বামে হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখাকে বেশী স্পষ্ট ও ব্যাখ্যা হিসাবে গ্রহণ করেছেন। কেননা কেবল ‘বাহু’ বললে প্রশ্ন থেকে যায় এটা বাহুর পিঠ হবে না পেট হবে!? ফলে যখন ‘বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহু’ কথাটি ব্যাখ্যা হিসাবে আসে তখন বুঝা যায় যেরা‘র পিঠ হবে পেট হবে না।
এখন আমরা জানব কনুই পর্যন্ত অর্থটি গ্রহণযোগ্য কি না? যা আমরা হাদীস থেকে হাদীসের ব্যাখ্যা দ্বারা বুঝতে পারব। নিচের হাদীস থেকে প্রমাণিত হবে, যেরা এবং হাত একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
ক) বারা ইবনে আযেব (রা) বলেন, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :
إِذَا سَجَدْتَ فَضَعْ كَفَّيْكَ وَارْفَعْ مِرْفَقَيْكَ
“যখন তুমি সাজদা করবে তোমার তালু জমিনে রাখবে এবং উভয় কুনই উঠিয়ে রাখবে।” [সহীহ মুসলিম, মিশকাত ২/৮২৯ নং]
খ) আনাস (রা) বলেন : রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :
اعْتَدِلُوا فِي السُّجُودِ وَلَا يَبْسُطْ أَحَدُكُمْ ذِرَاعَيْهِ انْبِسَاطَ الْكَلْبِ
“সাজদা ঠিকভাবে করবে এবং তোমাদের কেউ যেন (সাজদাতে) কুকুরের ন্যায় যেরা‘ (বাহু) বিছিয়ে না দেয়।” [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত ২/৮২৮, অনুরূপ আয়েশা (রাা) থেকে ২/৭৩৫]
বুঝা গেল কনুইয়ের সাথে যেরা‘র সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া পূর্বে প্রমাণ করেছি হাত ও যেরা‘ শব্দটি পরিপূরক হিসাবে সালাতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং হাতের উপর হাত রাখা বলতে যেরা‘র উপর যেরা রাখা অর্থ সহীহ ও গ্রহণযোগ্য। যার মধ্যে হাতের কনুই, তালুর পিঠ ও কব্জিও অন্তর্ভুক্ত। এখন যেরা‘র উপর হাত রাখার পদ্ধতি কেমন হবে – সেটা যদি কারো বুঝে না আসে বা অস্পষ্ট থাকে। তাহলে সেটা তার নিজস্ব অক্ষমতা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
এখন আমরা জানব লেখক ‘ফতহুল বারী’র উদ্ধৃতিটিতে কি কি গোপন করলেন। পূর্ণাঙ্গ উদ্ধৃতিটি নিম্নরূপ :
أبهم موضعه من الذراع وفي حديث وائل عند أبي داود والنسائي ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد وصححه بن خزيمة وغيره وأصله في صحيح مسلم بدون الزيادة والرسغ بضم الراء وسكون السين المهملة بعدها معجمة هو المفصل بين الساعد والكف وسيأتي أثر على نحوه في أواخر الصلاة ولم يذكر أيضا محلهما من الجسد وقد روى بن خزيمة من حديث وائل أنه وضعهما على صدره والبزار عند صدره وعند أحمد في حديث هلب الطائي نحوه وهلب بضم إلها وسكون اللام بعدها موحدة وفي زيادات المسند من حديث على أنه وضعهما تحت السرة وإسناده ضعيف
“বাহুর কোন জায়গায় রাখতেন সেটা এই হাদীসে অস্পষ্ট। আবূ দাউদ ও নাসাঈ বর্ণিত ওয়াইল রা. এর হাদীসে বলা হয়েছে : অতঃপর তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখলেন। ইবনে খুযায়মা র. প্রমুখ এটিকে সহীহ বলেছেন। এর মূল বর্ণনাটি সহীহ মুসলিমে আছে তবে বাহু কথাটি ছাড়া। الرسغ-এর ‘রা’ এ পেশ, সিনে সাকিন, শেষে হরকতবিহীন। এটা বাহু ও হাতের পাতার সযোগস্থল (তথা কব্জি) । সালাত অধ্যায়ের শেষ দিকে হযরত আলী রা. এর অনুরূপ আছার (হাদীস) এর উল্লেখ আসছে। এখানে এটাও উল্লিখিত হয় নি যে, শরীরের কোথায় হাতটি থাকবে। তবে ইবনে খুযায়মাহ ওয়ায়েল (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন বুকের উপর থাকবে। বাযযর বর্ণনা করেছেন বুকের নিকট। আর আহমাদ বর্ণনা করেছেন হুলব তাঈ থেকে, এখানে হুলবের ‘হা’-এ পেশ, ‘লাম’-এ সাকিন ও শেষে তানবীন। মুসনাদে আহমাদে অতিরিক্ত আছে আলী (রা)এর হাদীস। তিনি তাঁর দু’টি হাত নাভীর নিচে রাখতেন। এর সনদ যঈফ।” (ফতহুল বারী)
বুঝা গেল, ইবনে হাজার (রহ) যা সংশয় সৃষ্টি হতে পারে সেটাকে আরো সুস্পষ্ট করতে চেয়েছেন। তিনি বুকের উপর বা বুকের নিকটে হাত রাখার বর্ণনা দ্বারা এবং যেরা’র অধিকতর স্পষ্টতার জন্য এরই বিভিন্ন অংশগুলোকে ভাগ করে দেখানো বর্ণনাগুলোর মাধ্যমে যে কোন সংশয়ের মূলোৎপাটন করেছেন। সাথে সাথে এটাও বলেছেন, নাভীর নিচে হাত বাঁধার হাদীস যঈফ। সুস্পষ্ট হল, ইবনে হাজার (রহ)এর বক্তব্য আমাদেরকে সমর্থন করে এবং লেখকের দাবী ও উদ্দেশ্যকে খণ্ডন করে। অথচ লেখক সংক্ষেপে উদ্ধৃতি দিয়ে পাঠককে বিভ্রান্ত করেছেন।

লেখক ৪১ (পৃ: ২৬) :
আল্লামা শওকানীও (যিনি কোন মাযহাবের অনুসারী ছিলেননা) নায়লুল আওতার গ্রন্থে বলেছেন,
قوله (على ذراعه اليسرى) ابهم هنا موضعه من الذراع وقد بينته رواية احمد وأبى داود فى الحديث الذى قبل هذا. وقال تحت الحديث الذى قبله : والمراد أنه وضع يده اليمنى على كف يده اليسرى ورسغها وساعدها. ولفظ الطبرانى : (وضع يده اليمنى على ظهر اليسرى في الصلاة قريبا من الرسغ) ۲\۱٨۷
অর্থাৎ হাদীস শরীফে যে বলা হয়েছে “বাম বাহুর উপরে’ বাহুর কোন জায়গায় তা এখানে অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। আহমাদ ও আবূ দাউদ শরীফে বর্ণিত পূর্বের হাদীসটিতে তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

আহমাদ ও আবূ দাউদ বর্ণিত পূর্বের হাদীসটি আলোচনা প্রসঙ্গে আল্লামা শওকানী বলেছেন, এর মর্ম হলো তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রেখেছেন। তাবারানী র. এর বর্ণনায় এসেছে: তিনি নামাযে তাঁর ডান হাত বাম হাতের পিঠের উপর কব্জির কাছে রেখেছেন। (২খ, ১৮৭ পৃ)
এসব থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, লা-মাযহাবী ভাইয়েরা হাদীসটির ভুল অর্থ বুঝে কনুই পর্যন্ত হাত বিস্তার করে থাকেন।
বিশ্লেষণ ৪১ : লেখক উদ্ধৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে ইমাম শওকানী (রহ)এর পূর্বের বর্ণনা পরে এবং পরের বর্ণনা পূর্বে উল্লেখ করেছেন। যা বাংলা ভাষায় দু’টি প্যারাতে বিভক্ত। ইমাম শওকানী (রহ) নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীস সম্পর্কে ইমাম আবূ দাউদ, ইমাম আহমাদ, ইমাম বুখারী ও ইমাম নববীর সূত্রে যথাক্রমে যঈফ, আপত্তিযুক্ত ও সবসর্মত যঈফ হিসোবে চিহ্নিত করেছেন। অতঃপর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদটি শেষ করেছেন নিম্নোক্তভাবে :
واحتجت الشافعية ـ لما ذهبت إليه بما أخرجه ابن خزيمة في صحيحه وصححه من حديث وائل بن حجر قال : ( صليت مع رسول اللَّه صلى اللَّه عليه وآله وسلم فوضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره) وهذا الحديث لا يدل على ما ذهبوا إليه لأنهم قالوا إن الوضع يكون تحت الصدر كما تقدم والحديث صريح بأن الوضع على الصدر وكذلك حديث طاوس المتقدم ولا شيء في الباب أصح من حديث وائل المذكور…..
“শাফেঈরা এ ব্যাপারে দলিল হিসেবে যা গ্রহণ করেছেন তা ইবনে খুযায়মাহ (রহ) তাঁর সহীহতে বর্ণনা করেছেন ও তিনি তাকে সহীহ বলেছেন, যার মধ্যে ওয়ায়িল বিন হুজরের হাদীস রয়েছে। তিনি (রা) বলেন : ‘আমি রসূলুল্লাহ (স)এর সাথে সালাত পড়েছিলাম তিনি ডান হাতটি বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর রাখলেন।’ এই হাদীসটি সে দিকে যায় না যেভাবে তারা দলিল নিয়েছেন। কেননা তারা বলেছেন, হাতটি রাখতে হবে বুকের নীচে, যেভাবে পুর্বে (ইমাম নববী’র) বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি স্পষ্ট যে, বুকের উপর রাখতে হবে। অনুরূপ তাউস থেকে পূর্বে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে সবচেয়ে সহীহ হাদীসটি হল ওয়ায়েল (রা)এর বর্ণনা।…..” (নায়লুল আওতার- অনুচেছদ : باب ما جاء في وضع اليمين على الشمال)
সামগ্রিকভাবে ইমাম শওকানী (রহ)এর বক্তব্য হানাফী মাযহাবের বিরোধিতা করে। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে যেরা‘ শব্দের দাবী : ‘কনুই পর্যন্ত হাত’- এ সম্পর্কে কোন বিরোধিতা নেই। তিনিও ইবনে হাজার (রহ)এর মত যিরা‘ শব্দযুক্ত হাদীসের দাবী হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহু’র ব্যাখ্যা সমৃদ্ধ হাদীস দ্বারা গ্রহণ করেছেন। সুতরং আমরা –
ক) সহীহ মুসলিমের বর্ণনা : ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা।
খ) সহীহ বুখারীর বর্ণনা : ডান হাম বাম যেরা‘র উপর রাখা। এবং
গ) আবূ দাউদ, নাসাঈ ও সহীহ ইবনে খুযায়মাহ’র বর্ণনা : ডান হাত বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহু’র উপর রাখার মধ্যে কোন পার্থক্য দেখি নি। বরং সহীহ হাদীসে হাত অর্থ : যেরা‘ প্রমাণিত। একটি হাদীসে সিজদাতে যেরা‘ বিছাতে নিষেধ করা হয়েছে। অপর হাদীসে হাতের কনুই উঠিয়ে রাখতে বলা হয়েছে। সর্বোপরি হাতের এই অংশটির ব্যাখ্যা হাদীস থেকে হাদীসের ব্যাখ্যা হিসেবে নিশ্চিত হয়। ইমাম নববী, হাফেয ইবনে হাজার ও ইমাম শওকানী (রহ) থেকে এ পদ্ধতির কোন বিরোধিতা লেখক উপস্থাপন করেন নি। তাঁরা যেরা‘র হাদীসের ব্যাখ্যা হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহু’র দ্বারা গ্রহণ করেছেন। ডান হাতটি বাম হাতের কনুই পর্যন্ত রাখলে সেই দাবী পরিপূর্ণভাবে পূর্বোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যাসহ পূরণ হয়। পক্ষান্তরে এই তিন ইমামের বক্তব্য ও বিশ্লেষণে হানাফীদের পদ্ধতি খণ্ডন হয়।
উল্লেখ্য ইমাম শওকানী (রহ) কর্তৃক ইমাম নববী’র উপস্থাপনাতে বুকের নীচে হাত বাঁধার আমলটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি কেবল বুকের উপর হাত বাধাকে সবচেয়ে সহীহ বলেছেন।
আমাদের কাছে সবগুলোর মর্মই এক। যেভাবে হাত, যেরা‘ পরিপূরক হিসাবে এবং কেবল কব্জির ব্যবহার একই বিষয়ের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঠিক একই ভাবে বুকের উপর (ইবনে খুযায়মাহ, আহমাদ) , বুকের নিকট (বাযযার) , নাভীর উপর (فَوْقَ السُّرَّةِ -আবূ দাউদ) শব্দগুলো ব্যবহার হওয়ায় কেউ কেউ অনুরূপভাবে সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন। আমাদের কাছে সহীহ সূত্রে ও পরিপূরক সমস্ত বর্ণনা গ্রহণযোগ্য –যখন পরস্পরকে ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করা যায়। কেননা শব্দগুলোর মধ্যে সমন্বিত আমল সম্ভব। আর এ কারণে ডান হাতটি বাম হাতের কনুই-এর উপর রাখলে বা ধরলে সবগুলো সহীহ বা হাসান সনদের হাদীসের উপর আমল হয়। এ পযায়ে উক্ত শব্দগুলোর প্রয়োগ যুক্তিসিদ্ধ হয়। বাতিল কেবল তালুর পিঠের উপর তালু রেখে নাভীর নীচে হাত বাঁধা।

লেখক ৪২ (পৃ: ২৬২৭) :
নাভির নীচে হাত রাখা
১. হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. বলেন,
رأيت النبي صلى الله عليه وسلم وضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة. أخرجه ابن أبي شيبة قال: حدثنا وكيع عن موسى بن عمير عن علقمة بن وائل عن أبيه وإسناده صحيح. قال الحافظ قاسم بن قطلوبغا في تخريج أحاديث الاختيار شرح المختار : هذا سند جيد وقال الشيخ أبو الطيب السندي في شرحه على الترمذي : هذا حديث قوي من حيث السند وقال الشيخ عابد السندي في طوالع الأنوار: رجاله كلهم ثقات أثبات اهـ
অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নীচে রাখতে দেখেছি। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৩৯৫৯। এর সনদ সহীহ।
হাফেজ কাসিম ইবনে কুতলূবুগা র., তিরমিযী শরীফের ভাষ্যকার আবুত্ তায়্যিব সিন্ধী র. ও আল্লামা আবেদ সিন্ধী র. প্রমুখ হাদীসটিকে মজবুত ও শক্তিশালী বলেছেন। এর সনদ এরূপ: ইবনে আবী শায়বা র. ওয়াকী’ থেকে, তিনি মূসা ইবনে উমায়ের থেকে, তিনি আলকামার সূত্রে হযরত ওয়াইল রা. থেকে। এই সনদে কোন দুর্বল রাবী নেই।
বিশ্লেষণ ৪২ : লেখক উক্ত হাদীসটির সনদ নিয়ে আলোচনা করেছেন। মতনে উল্লিখিত শব্দ تحت السرة (নাভীর নীচে) শব্দটি নিয়ে আলোচনা করেন নি। অথচ স্বয়ং হানাফীদের কাছে উক্ত শব্দটির গ্রহণযোগ্যতা সন্দেহযুক্ত।
ক) তাক্বী উসমানী হানাফী (হাফি) লিখেছেন :
لیکن احقر کی نظر میں اس روایت سے استدلال کمزور یے؛ اول تو اس لئے کہ اس روایت میں ” تَحت السرة ” کے الفظ مصنف ابن ابی شیبہ مطبوعہ نسخوں میں نہیں ملے؛ اگرچہ علامہ نمیوی [رح] “آثار السنن” کے متعدد نسخوں کا حوالہ دیا ہے؛ کہ ان میں یہ زیادتی مذکور ہے؛ تب بھی اس زیادتی بعض نسخوں میں ہونا اور بعض میں نہ ہونا اس کو مشکوک ضروت بنا دیتا ہی؛ نیز حضرت وائل بن حجر [رض] کی روایت مضطرب المتن ہے؛ کیونکہ بعض میں ” على صدره ” ۔۔۔۔ بعض میں ” عند صدره ” اور بعض میں ” تَحت السرة “کے الفاظ مروی ہے؛ اور اس شدید اضطرب کی صورت میں اس سے استدلال نہ کرنا چاہئے
“এই অধমের (লেখক তাক্বী উসমানী) নযরে (বিশ্লেষণে ) এই র্বণনাটি দ্বারা দলিল গ্রহণে দুর্বলতা আছে। প্রথমত, এর কারণ হল – تَحت السرة (নাভির নীচে) শব্দগুলো মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা’র প্রকাশিত সংস্করণগুলোতে পাওয়া যায় না। যদিওবা আল্লামা নিমবী (রহ) ‘আসারুস সূনান’-এ ‘মুসান্নাফ’-এর কয়েকটি সংস্করণের উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে, সেগুলোতে এই অতিরিক্ত অংশ আছে। এরপরেও এই অতিরিক্ত অংশ কিছু সংস্করণে থাকা এবং কিছু সংস্করণে না থাকাটা অবশ্যই সন্দেহের উদ্রেক করে। তাছাড়া ওয়ায়েল (রা)এর কোন বর্ণনাতে على صدره (বুকের উপর) …. কোন বর্ণনাতে عند صدره (বুকের নিকট) আবার কোন বর্ণনাতে تَحت السرة (নাভির নীচে) শব্দে বর্ণিত হয়েছে। এত অধিক ইযতারাবের (স্ববিরোধী বর্ণনার) কারণে কারো জন্যে এটা দ্বারা দলিল গ্রহণকরা উচিত নয় ।” (দারসে তিরমিযী ২/২৩ পষ্ঠা)
পাঠক লক্ষ্য করুন! على صدره (বুকের উপর) কোন বর্ণনাতে عند صدره (বুকের নিকট) পরস্পরের ব্যাখ্যা হিসাবে গণ্য করা যায়। কিন্তু تَحت السرة (নাভির নীচে)-কে على صدره (বুকের উপর) ও عند صدره (বুকের নিকট) এর ব্যাখ্যা হিসাবে গ্রহণ করা যায় না। এ কারণে على صدره (বুকের উপর) কোন বর্ণনাতে عند صدره (বুকের নিকট) শব্দগুলো পরস্পরের সাক্ষ্য হিসেবে মাহফুয (সংরক্ষিত) হওয়ায় কমপক্ষে হাসান হাসীসের মর্যাদা পায়। পক্ষান্তরে تَحت السرة (নাভির নীচে) শব্দটি বিরোধী (ইযতারাব) বিধায় শায ও বাতিল।

খ) শায়েখ হায়াত সিন্ধী ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’র বর্ণনা সম্পর্কে বলেন :
“تَحت السرة (নাভির নীচে) এই অতিরিক্ত অংশটুকুর অস্তিত্ব সম্পর্কে আপত্তি রয়েছে; বরং এটা ভুল, যার উৎস হলো অনিচ্ছাকৃত ভ্রম। কারণ আমি গ্রন্থকারের কৃত বিশুদ্ধ নোসখা খুঁজে দেখেছি এবং তাতে এই সনদে এবং লফযে এ হাদীস পেয়েছি; কিন্তু তাতে تَحت السرة (নাভির নীচে) কথাটি নেই। তাতে শেষ (ইবরাহীম নাখয়ীর বর্ণনার) অংশে فِي الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ (সালাতে নাভীর নীচে) রয়েছে। ফলে হয়ত কাতিবের নযর একস্থান হতে অন্যস্থানে সরে গিয়েছে। আর তিনি মাওকুফের শব্দটি মারফু‘-এর অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছেন।” [ইলা‘উস সূনান (ইফা) ৩/২৩৮]
গ) ‘ইলা‘উস সুনানের’ লেখক যাফার আহমাদ উসমানী (রহ) উক্ত বক্তব্য খণ্ডনে ইমাম নিমবী হানাফী (রহ)এর সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছেন। যার জবাব অপর হানাফী মুহাদ্দিস আনওয়ারশাহ কাশ্মিরী (রহ)’র বর্ণনাতে আছে। তিনি (রহ) শায়েখ হায়াত সিন্ধির (রহ) সমর্থনে বলেন :
ولا عجبَ أن يكون كذلك، فإِني راجعت ثلاث نَسُخ «للمصنف»، فما وجدته في واحدةٍ منها
“এটা হওয়া কোন আজব বিষয় নয় যেভাবে হায়াত সিন্ধি বলেছেন। আমি নিজে ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’র তিনটি সংস্করণ দেখেছি, তার কোন একটিতেই সেটি [تَحْتَ السُّرَّةِ (নাভির নীচে)] নেই।।” [ফয়যুলবারী শরহে সহীহ বুখারী ২/২৬৭পৃ:]
তাছাড়া ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’র প্রসিদ্ধ সংস্করণে ঐক্যসমৃদ্ধ বর্ণনাটুকু হলো : وَضَعَ يَمِينَهُ عَلَى شِمَالِهِ فِي الصَّلاَةِ
“তাঁর ডানকে বামের উপর রাখতেন সালাতে।”
বঝা গেল হাদীসটিতে উল্লিখিত تَحْتَ السُّرَّةِ (নাভির নীচে)-শব্দটি বিতর্কিত। বরং নির্ভরযোগ্য সংস্করণগুলোতে শব্দটি অস্তিত্বহীন। কমপক্ষে তাক্বী উসমানী’র (হাফি) কথা গ্রহণ করলেও, এই হাদীসটি দ্বারা দলিল গ্রহণ করা উচিত নয়। নীচে ইবনে আবী শায়বাহ’র বিভিন্ন সংস্করণের ছবি প্রমাণ হিসাবে তুলে ধরা হল :

P1 P2 P3 P4 P5

ঘ) এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, আলকামাহ বিন ওয়ায়েল বিন হুজর থেকে। কিন্তু এখানে يد বা হাত শব্দটির ব্যবহার নেই। পক্ষান্তরে সহীহ মুসলিমে উক্ত আলকামাহ বিন ওয়ায়েল ও তার মাওলা (দাস) একত্রে সাহাবী ওয়ায়েল বিন হুজর (রা) থেকে নিম্নোক্ত শব্দে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন : : وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْني عَلَي الْيُسْري “নবী (স) তাঁর ডান হাতকে বামের উপর রাখতেন।” হাদীসটিতে يد বা হাত শব্দটির ব্যবহার আছে এবং নাভির নীচে বাক্যটি নেই। এখন সহীহ বুখারীতে বর্ণিত ডান হাত বাম যেরা‘র হাদীসটি দ্বারা ব্যাখ্যা নিলে উভয় হাতকে কখনই নাভীর নীচে রাখা সম্ভব নয়। সুতরাং আবী শায়বাহ’তে উল্লিখিত বাক্য وضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة ‘ডানটি বামটির উপর নাভির নীচে রাখতেন’ বাক্যটির অগ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হয়। পক্ষান্তরে যদি ডান তালু বাম তালুর উপরে রাখার যঈফ হাদীসটিকে ব্যাখ্যা হিসাবে গ্রহণ করি তাহলে সেটা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শব্দের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় বাতিল হয়।

লেখক ৪৩ (পৃ: ২৭) :
২. হযরত আলী রা. বলেন,
السُّنَّةُ وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ فِى الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ. أخرجه أبو داود (في رواية ابن الأعرابي وابن داسة) ٧٥٦ وأحمد ١/١١٠ (٨٧٥) وابن أبي شيبة (٣٩٦٦) والدارقطني ١/٢٨٦ والضياء في المختارة ٢/٧٧٢ وفيه عبد الرحمن بن إسحاق الواسطي وهو ضعيف. ولكن يشهد له الحديث السابق.
অর্থ: সুন্নত হলো তালু তালুর উপর রেখে নাভির নীচে রাখা । আবূ দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৭৫৬; মুসনাদে আহমদ ১খ, ১১০ পৃ, হাদীস নং ৮৭৫; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৩৯৬৬; দারাকুতনী, ১খ, ২৮৬পৃ; যিয়া ফিল মুখতারা, ২খ, ৭৭২পৃ। এর সনদে আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক রয়েছেন। তিনি দুর্বল। তবে প্রথম হাদীসটি এর সমর্থন করছে।
বিশ্লেষণ ৪৩ : লেখক হাদীসটির দুর্বলতা খুব হালকাভাবে দেখেছেন। ফলে পূর্বে উল্লিখিত মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’র হাদীসটির সাক্ষ্য হিসাবে শেষোক্ত যঈফ হাদীসটিকে উল্লেখ করেছেন। অথচ শেষোক্ত হাদীসটির বর্ণনাকারী আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাকের প্রতি মুহাদ্দিসগণের আপত্তি অত্যন্ত কঠোর। কেননা ইমাম আহমাদ (রহ) তাকে যঈফ ও মুনকারুল হাদীস বলেছেন। ইমাম আবূ যারআ (রহ) তাকে ‘মুনকারুল হাদীস’ বলেছেন। ইমাম ইবনে খুযায়মাহ (রহ) তার হাদীসকে দলিল হিসাবে গ্রহণ করেন নি। ইমাম যাহাবী (রহ) ও ইবনে হাজার (রহ) তাকে যঈফ গণ্য করেছেন। [তাহযীবুত তাহযীব ৬/১৩৭, মীযানুল ইতিদাল ২/৪৮, তারীখে কাবীর ৩/২৫৯, তাক্বরীব পৃ: ১৯৮]
হাদীসটির সনদের অপর বর্ণনাকারী ‘যিয়াদ বিন যায়েদ’ মাজহুল (অজ্ঞাত) রাবী। [মুফতি আমীমুল ইহসান, ফিক্বহুস সুনানি ওয়াল আসার (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ১/১৭১ পৃ:]
শেষোক্ত ও পূর্বোক্ত হাদীস দু’টির অপর একটি দুর্বলতা হল, উভয় হাদীসে সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও আবূ দাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে হিব্বানের হাত ও বাহু শব্দের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যাসহ হাদীসগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক ও অসম্পূর্ণ বাক্যযুক্ত। যার তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:

43p1

লেখক ৪৪ (পৃ: ২৭) :
৩. হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেছেন,
أَخْذُ الأَكُفِّ عَلَى الأَكُفِّ فِى الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ. أخرجه أبو داود (٧٥٨) وفيه عبد الرحمن المذكور.
অর্থ: হাতের তালু অপর তালুর উপর রেখে নাভির নীচে রাখতে হবে। আবূ দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৭৫৮। এতেও পূর্বোক্ত আব্দুর রহমান রয়েছেন।
বিশ্লেষণ ৪৪ ‘আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক-কে ইমাম আহমাদ ও ইমাম বুখারী (রহ) ‘মুনকারুল হাদীস’ বলেছেন। (ইমাম বুখারীর ‘আযযুয়াফা ২০৩, তারিখুল কাবীর, ৫/২৫৯)
সুতরাং হাদীসটি বাতিল।

লেখক ৪৫ (পৃ: ২৭) :
৪. হযরত আনাস রা. বলেছেন,
ثلاث من أخلاق النبوة تعجيل الإفطار وتأخير السحور ووضع البد اليمنى على اليسرى في الصلاة تحت السرة. أخرجه ابن حزم في المحلى تعليقا ٣/٣٠
অর্থ: তিনটি বিষয় নবীস্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। ইফতারে বিলম্ব না করা, সাহরী শেষ সময়ে খাওয়া, এবং নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নীচে রাখা। ইবনে হাযম, আল মুহাল্লা, ৩খ, ৩০পৃ। তিনি এর সনদ উল্লেখ করেননি।
বিশ্লেষণ ৪৫ : লেখক হাদীসটিকে সনদহীন হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। সুতরাং দলিল হিসাবে এর কোন গ্রহণযোগ্যতাই নেই।

লেখক ৪৬ (পৃ: ২৮) :
৫. হাজ্জাজ ইবনে হাসসান র. বলেন,
سمعت أبا مجلز أو سألته قال : قلت كيف يصنع قال : يضع باطن كف يمينه على ظاهر كف شماله ويجعلها أسفل من السرة . أخرجه ابن أبي شيبة في مصنفه).٣٩٦٣(
অর্থ: আমি আবূ মিজলায র. (বিশিষ্ট তাবেয়ী)কে বলতে শুনেছি, অথবা হাজ্জাজ বলেছেন, আমি আবূ মিজলায র.কে জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে হাত বাঁধবো? তিনি বললেন, ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠে রেখে নাভির নীচে বাঁধবে। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৩৯৬৩। এর সনদ সহীহ।
বিশ্লেষণ – ৪৬ : ক) এটি তাবেঈর ফাৎওয়া, যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উল্লিখিত নবী (স)এর সহীহ হাদীসের বিরোধী। সুতরাং শরী‘আতের দলিল হিসাবে উক্ত ফাৎওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
খ) হানাফীগণ ডান হাতের বৃদ্ধা ও অনামিকা আঙ্গুল দ্বারা বাম হাতের কব্জি ধরেন। অথচ ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠ বরাবর হুবহু রাখলে এই দু’টি আঙ্গুল দ্বারা কব্জিকে ধরে নাভীর নিচে হাতে ঝুলিয়ে রাখা যায় না। সুতরাং দলিলটি অনুযায়ী হানাফীদের হুবহু আমল নেই।
গ) বর্ণনাটিতে নারী ও পুরুষের পার্থক্য নেই। অথচ হানাফীগণ নারীদেরকে বুকের উপর হাত বাঁধার বিধান দিয়ে থাকেন। সুতরাং বর্ণনাটি হানাফীদের নারীদের বিধানের বিরোধী। অথচ বুকের হাত বাঁধার বিধানটি নবী (স)এর আমল হিসেবে প্রমাণিত।

লেখক ৪৭ (পৃ: ২৮) : 
৬. ইবরাহীম নাখায়ী র. (যিনি তাবেয়ী ছিলেন) বলেন,
يضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة . أخرجه ابن أبي شيبة ٣٩٦٠
অর্থ: নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নীচে বাঁধবে। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৩৯৬০ । এর সনদ হাসান।
বিশ্লেষণ ৪৭ : এটি তাবেঈর ফাৎওয়া, যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উল্লিখিত নবী (স)এর সহীহ হাদীসের বিরোধী। সুতরাং শরী‘আতের দলিল হিসাবে উক্ত ফাৎওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
খ) এর সনদে রাবী‘ (বিন সুবীহ) আছেন। তিনি ত্রুটিযুক্ত হাফেয (তাক্বরীব পৃ: ১০১)। ইমাম নাসাঈ ও ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন তাকে যঈফ বলেছেন। (তাহযীবুল কামাল, নং: ১৮৬৫)

লেখক ৪৮(পৃ: ২৮) :
আল্লামা ইবনুল মুনযির র. তার আল আওসাত গ্রন্থে লিখেছেন, -وقال إسحاق: تحت السرة أقوى في الحديث وأقرب إلى التواضع.
অর্থাৎ ইসহাক (যিনি বুখারী র. এর উস্তাদ ছিলেন) বলেছেন, নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীস অধিক শক্তিশালী এবং বিনয়ের নিকটতর। ( ৩খ,২৪৩পৃ)
বিশ্লেষণ ৪৮ : ক) নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীসটি দুর্বল হওয়ার বিষয়টি লেখক নিজেই পূর্বে উল্লেখ করেছেন (দ্র: ‘লেখক-৪৩ ,৪৪’)। অর্থাৎ লেখকের উপস্থাপনাই স্ববিরোধী। তাছাড়া উক্ত বক্তব্যটি কেবলই দাবী, কোন দলিল বা প্রমাণ নয়। আবার নাভির নীচের হাত বাঁধলে হাত ঝুলানো অবস্থায় ধরা হয়। হাতের উপর হাত রাখার মৌলিক দাবী পূরণ হয় না। এ কারণেও নাভির নীচে হাত বাঁধাটা অধিকাংশ সহীহ হাদীসে বর্ণিত বক্তব্যের বিরোধী।
আমরা যখন সালাতে দাঁড়িয়ে থাকি তখন আল্লাহর কাছে আন্তরিকতার সাথে চাইতে থাকি। আর রুকু‘ ও সাজদাহ’র মাধ্যমে নত হয়ে বিনয়ের চরম অবস্থা প্রকাশ করে সেখানেও চাইতে থাকি। কিন্তু তখন আমাদের হাতটি বাঁধা থাকে না। কেউ কারো কাছে ক্ষমা চাইলেও নিজের হাত দু’টি বুকে বাঁধে না। বরং হাত দু’টি একত্রিত করে ক্ষমার ভঙ্গি প্রকাশ করে, অন্যের হাত-পা ধরে। পক্ষান্তরে আমরা যখন আন্তরিকতা প্রকাশ করি তখন বুকের দিকে ইঙ্গিত করি, বুকে বুক মিলায় বা কোলাকুলি করি। এমনকি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে চাওয়ার বিষয়টিও বুকের সাথে সম্পর্কিত। এটি নাভীর সাথে সম্পর্ক রাখে না। এ কারণে সূরা ফাতিহা পাঠের সময় চাওয়াটা ক্বলবের সাথে হওয়ায় বাঞ্ছনীয় –যা একটি পবিত্রস্থান। কিন্তু নাভির নীচের অংশটি পবিত্র নয়, বরং লজ্জাস্থান। সুতরাং সালাতে খুশু-খুযু‘ ও আন্তরিকতার প্রকাশ বুকে হাত বাঁধার সাথেই বেশী সামঞ্জস্যশীল, কখনই নাভীর নীচে হাত বাঁধাটা ইবাদাতে আন্তরিকতা প্রমাণ করে না।

লেখক ৪৯(পৃ: ২৮২৯) :
একটি খারাপ অভ্যাস :
লা-মাযহাবী আলেমদের একটি খারাপ অভ্যাস হলো – অন্যদের দলিল-প্রমাণের খুব খবর নেন। নিজেদের দলিল-প্রমাণ সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকেন। অনেক সময় সাধারণ মানুষ এতে ধোঁকায় পড়ে যান। আরেকটি কাজ তারা করেন। একটি হাদীস যদি পাঁচটি কিতাবে এসে থাকে- যদিও তার সনদ একটিই হয়ে থাকে – তারা এটিকে পাঁচটি হাদীস হিসেবে দেখিয়ে থাকেন। বুখারী শরীফের বাংলা অনুবাদের টীকায় তারা বুকে হাত বাঁধার হাদীসকে পাঁচটি নম্বরে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষণ ৪৯ : কোন প্রকাশনীর প্রকাশনা কোন গোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ চিন্তা প্রকাশ করে না। সুতরাং লেখকের অভিযোগটি এক তরফা। তাছাড়া তিনি কোন প্রকাশনী সম্পর্কে অভিযোগটি করলেন সেটাও আমাদেরকে জানান নি। জানালে তদন্ত করে বিষয়টি সম্পর্কে আলোচনা করা যেত। তবে আমরা পরবর্তীতে দেখব লেখক মোট পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন বুকের উপর হাত বাঁধার বর্ণনা এনেছেন এবং সেগুলো বাতিল করার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ স্বয়ং লেখকের উপস্থাপনা থেকে পাঁচটি বুকে হাত বাঁধার ভিন্ন ভিন্ন হাদীস উল্লিখিত হয়েছে।

লেখক – ৫০ (পৃ: – ২৯) :
আবার মুরসাল হাদীসকে তারা প্রামাণ্য মনে করেননা। কিন্তু প্রয়োজনে মুরসালকেও প্রমাণ-স্বরূপ পেশ করেন।
বিশ্লেষণ – ৫০ : বুকের উপর হাত বাঁধার মুরসাল হাদীসটি উপস্থাপনের কারণ হল, হানাফীদের নিকট মুরসাল হাদীস গ্রহণযোগ্য। তাছাড়া আলোচনার শুরুতে হানাফী আলেম তাক্বী উসমানী (হাফি) ও ইবনুল হুমাম (রহ) থেকে জেনেছি – তাঁরা বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসকে মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য করেছেন। এসব কারণেই যা দলিল হিসাবে হানাফীদের কাছে গ্রহণযোগ্য সেটা হানাফীদের সামনে উপস্থাপন করাটা খুবই সঙ্গত। তাছাড়া হানাফীদের মুহাক্বেক্বগণ বিষয়টি লেখকের ন্যায় বিরোধী পক্ষের কোন দোষ হিসেবে দেখেন নি। বরং যেহেতু হানাফীদের কাছে মুরসাল হাদীস গ্রহণযোগ্য এজন্যে তারা সেটার ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। হানাফী আলেম জাফার আহমাদ উসমানী (রহ) ‘ই‘লাউস সুনানে’ লিখেছেন :
“… হাদীসটি মুরসাল, যা আমাদের নিকট হুজ্জাত ও প্রমাণ। কিন্তু সাধারণ মুহাদ্দিসগণের নিকট এবং শাফেঈ (রহ)-এর নিকট তা হুজ্জাত নয়। সুতরাং এ হাদীস দ্বারা তাদের প্রমাণ গ্রহণ সঠিক হবে না। তদুপরি এটা তাদের মাযহাবের অনুরূপ নয়, যেমন ইতঃপূর্বে বলা হয়েছে। তবে এই মুরসালকে যদি ওয়াইল-এর উল্লিখিত (বুকে হাত বাঁধার) হাদীসের সাথে ‍যুক্ত করা হয় তাহলে সম্মিলিত হাদীস থেকে আলাদা শক্তি অর্জিত হবে।” [ই‘লাউস সুনান (ইফা) ২/২৩৬ পৃ:]
মন্তব্য : প্রকৃতপক্ষে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর মুরসাল বর্ণনার সমর্থনে সহীহ বা হাসান হাদীস থাকলে মুহাদ্দিসগণ ও শাফেঈ মাযহাবে সাক্ষ্য হিসাবে বর্ণনাটি উল্লেখ করা হয়। তাছাড়া হানাফীদের কাছে মুরসাল গ্রহণযোগ্য হওয়ায় তাদের সমর্থন আদায়ে এই সাক্ষ্যমূলক হাদীসকে উপস্থাপন করা হয়। কেননা তাদের মহিলাদের এই হাদীসের উপর আমলের বিষয়টিতো রয়েছেই। সুতরাং উক্ত মুরসাল বর্ণনাটির উপস্থাপনা সম্পূর্ণ সঠিক।
অতঃপর জাফার আহমাদ উসমানী (রহ) লিখেছেন :
“তবে আমাদের নিকট মুরসাল হাদীস যেহেতু প্রমাণযোগ্য, সেহেতু আমাদেরকে এর জবাব পেশ করতে হবে কিংবা এর উপর আমল করতে হবে। তাই আমরা বলি আমাদের মতে ‘আলী (রা) এর হাদীস এটির তুলনায় অগ্রাধিকার যোগ্য। কেননা তাতে স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে যে, নাভীর নীচে হাত রাখা সুন্নাত-এর অন্তর্ভুক্ত। …. সুতরাং নাভীর নীচে হাত বাঁধার হাদীসের উপর ‘আমল অধিক উত্তম। আর অপর (বুকের উপর হাত বাঁধার) হাদীসটি আমাদের মতে বৈধতা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে প্রযুক্ত।” [ই‘লাউস সুনান (ইফা) ৩/২৩৬-৩৭ পৃ:, আরো দ্র: ‘বিশ্লেষণ – ৫২’]
সুস্পষ্ট হল, হানাফীদের কাছে বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীস জায়েয। সুতরাং লেখকের আপত্তিগুলো অহেতুক।
জা‘ফার আহমাদ উসমানী (রহ)এর নিকট আবূ দাউদে বর্ণিত ‘বুকে হাত বাঁধার’ মুরসাল হাদীসটির থেকে ‘নাভির নীচে’ বাঁধার যঈফ ও মুনকার হাদীসটি প্রাধান্যপ্রাপ্ত। অবশ্য এর একটু পূর্বে তিনিই বুকে হাত বাঁধার মুরসাল হাদীসটি ‘সহীহ ইবনে খুযায়মাহ’-তে ওয়ায়েল (রা)এর হাদীসটির সমর্থনে শক্তিশালী হয় বলে উল্লেখ করেছেন (দ্র: ‘বিশ্লেষণ – ৫০’)। এ পর্যায়ে আমরা আবূ দাউদের ‘নাভির নীচে’ ও সহীহ ইবনে খুযায়মাহ’র বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করব। এই দু’টি হাদীসের সমালোচিত দুই রাবী আব্দুর রহমান বিন ইসহাক ও মুয়াম্মাল বিন ইসমাঈলের পর্যালোচনা দ্বারা বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে :

উক্ত বিশ্লেষণ থেকে প্রমাণিত হয়, বুকে হাত বাঁধার মুরসাল হাদীসের সমার্থক আলোচ্য বুকে হাত বাঁধার হাদীসটি অনেক বেশী শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য। তাছাড়া বুকের হাত বাঁধার সমর্থিত আরো বর্ণনা সামনে আসছে। এ পর্যায়ে মুরসাল হাদীসটিও গ্রহণযোগ্যতা পায়।

লেখক ৫১ (পৃ: ২৯) :
যাহোক, এখানে তাদের দলিলগুলোর অবস্থা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করছি। এক কথায় আমরা মনে রাখতে পারি, বুকের উপর হাত বাঁধা সম্পর্কে কোন সহীহ হাদীস নেই।।
বিশ্লেষণ ৫১ : পূর্বে গ্রহণযোগ্য হানাফী আলেমদের থেকে বুকে হাত বাঁধার বিষয়টি বৈধতা বরং মহিলাদের ক্ষেত্রে বিধান হিসাবে স্বীকৃতির বক্তব্য আমরা উল্লেখ করেছি। তাদের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়, তাঁরা বুকের হাত বাঁধার হাদীসকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এমনকি এ সম্পর্কিত মুরসাল হাদীসটিকেও তারা বৈধতার দলিল হিসাবে গণ্য করেছেন। (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-২৫, ৫০’)
লক্ষণীয় : নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীসে يد বা হাত শব্দটির ব্যবহার নেই। সেখানে হাতের তালু বা পাতার (الْكَفِّ) কথা বর্ণিত হয়েছে। যা সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাত ও সহীহ বুখারী বর্ণিত যেরা‘ শব্দ বিশিষ্ট হাদীসের বিরোধী। তাছাড়া সিজদা সম্পর্কিত হাদীসে হাত ও এর তালুকে পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেভাবে পূর্বে প্রমাণ করেছি। সেখানে হাত বলতে যেরাকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ পর্যায়ে হাতের উপর হাত বা যেরা উপর হাত রাখা সম্পর্কে যে বর্ণনাটিই গ্রহণ করি না কেন – সেটা কখনই নাভির নীচের বর্ণনা ও হাতের তালুর উপর তালু রাখার বর্ণনাকে সমর্থন করে না। অথচ বুকের নিকট বা বুকের উপর রাখার বর্ণনাগুলোতে কোন বিরোধিতা হয় না। কেননা সেখানে يد বা হাত শব্দটিও রয়েছে। একারণে বুকের নিকট বা বুকের উপর বর্ণনাগুলো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনাগুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা হওয়ায় সেগুলো গ্রহণযোগ্য। পক্ষান্তরে নাভীর নীচে তালুর উপর তালু রাখার বর্ণনা শায হওয়ার দোষে দুষ্ট। এছাড়াও সনদগত বিশ্লেষণে নাভীর নীচে হাত বাঁধার হাদীসের থেকে বুকের উপরে হাত বাঁধার হাদীসগুলোর সমালোচনা করার সুযোগ কম। কেননা যাদের প্রতি আপত্তি করা হয়েছে, তাদের কেউ সহীহ বুখারী, কেউ সহীহ মুসলিমের বর্ণনাকরী। এজন্যে আপত্তিগুলো অগ্রহণযোগ্য।

লেখক ৫২ (পৃ: ২৯) :
হযরত ওয়াইল রা. এর হাদীস (সহীহ ইবনে খুযায়মা, ১/১৪৩), এটি সহীহ নয়। এর সনদে মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈল আছেন। তিনি সুফইয়ান ছাওরী থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। মুয়াম্মালকে ইমাম বুখারী মুনকারুল হাদীস বলেছেন। তিনি একথাও বলেছেন, আমি যাকে মুনকারুল হাদীস বলবো, তার সূত্রে বর্ণনা করা বৈধ হবে না।
বিশ্লেষণ ৫২ : হাদীসটির ব্যাপারে মূল অভিযোগ মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈল বর্ণনাকারীর উপর। এর জবাব নিম্নরূপ :
১) ইমাম বুখারী (রহ)এর কিতাব থেকে মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈল বর্ণনাকারীর ‘মুনকার’ হওয়া প্রমাণিত নয়। যাকে ইমাম বুখারী ‘মুনকার’ বলেছেন তিনি হলেন : মুয়াম্মাল ইবনে সাঈদ। (দ্র: তারিখুল কাবীর ৮/৪৯)
২) রিজালশাস্ত্রবীদদের মধ্যে হাফিয মিযী ও ইবনে হাজার (রহ) সূত্রবিহীনভাবে ইমাম বুখারীর (রহ) থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে, তিনি মুয়াম্মাল বিন ইসমাঈলকে ‘মুনকারুল হাদীস’ বলেছেন। অথচ ইমাম বুখারী (রহ) –এর কোন কিতাবেই তাঁর প্রতি আপত্তি করা হয় নি। এমনকি ইমাম বুখারীর (রহ) ‘আয-যুআফা’-তেও তাঁর কথা উল্লেখ করা হয় নি। তিনি ‘তারিখুল কাবীরে’ তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন অথচ কোন আপত্তি করেন নি। শায়েখ আলবানী (রহ) ও অন্যান্যরা যাচায়-বাছায় ছাড়াই উক্ত রিজালশাস্ত্রবীদদের থেকে উদ্ধৃতি দেয়াতে মুয়াম্মাল সম্পর্কে ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের আহলেহাদীসদের মধ্যে শায়েখ আলবানী (রহ) তাক্বলীদের কারণে একই ভুল উদ্ধৃতি দেয়া হচ্ছে (দ্র: জাল হাদীসের কবলে রসূলুল্লাহ (স)এর সালাত, পৃ: 223)।
৩. ইমাম বুখারী (রহ)এর কাছে মুনকারুল হাদীসের থেকে হাদীস গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। যেমন : ইমাম যাহাবী (রহ) একজন ‘মুনকারুল হাদীস’ আবান ইবনে জুবলাহ সম্পর্কে লিখেছেন : أن البخاري قال : كل من قلت فيه منكر الحديث فلا تحل الرواية عنه
“নিশ্চয় ইমাম বুখারী বলেছেন : আমি যাদেরকে মুনকারুল হাদীস বলি, তাদের থেকে বর্ণনা উল্লেখ করা হালাল নয়।” (মীযানুল ই‘তিদাল ১/১১৯ পৃ:)
হাফেয ইবনে হাজার (রহ) এই বিষয়টি ‘আল-লিসানে’ (৩/১ পৃ:) নিম্নোক্তভাবে ব্যক্ত করেছেন :
وهذا القول مروي بإسناد صحيح عن عبد السلام بن أحمد الخفاف عن البخاري
“এই উক্তিটি আব্দুস সালাম বিন আহমাদ আলখফফাফ (রহ) ইমাম বুখারী (রহ) থেকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন।”
অথচ ইমাম বুখারী (রহ) ‘সহীহ বুখারী’র ‘সন্ধি অধ্যায়ের’ তরজমাতুল বাবে (بَاب الصُّلْحِ مَعَ الْمُشْرِكِينَ –অনুচ্ছেদ : মুশরিকদের রিকদের সাথে সন্ধি …) পূর্ণাঙ্গ সনদসহ একটি হাদীস উল্লেখ করার পর, মুয়াম্মাল থেকে ঐ হাদীসের অপর একটি বর্ণনার মতনগত পার্থক্য উল্লেখ করেছেন। ইবনে হাজার ফতহুল বারীতে (৫ম খণ্ড) ২৭০০ নং হাদীস হিসাবে এটি উল্লেখ করেছেন। যা নিম্নরূপ :
۲۷۰۰ – وَقَالَ مُوسَى بْنُ مَسْعُودٍ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ سَعِيدٍ عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ عَنْ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ صَالَحَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُشْرِكِينَ يَوْمَ الْحُدَيْبِيَةِ عَلَى ثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ عَلَى أَنَّ مَنْ أَتَاهُ مِنْ الْمُشْرِكِينَ رَدَّهُ إِلَيْهِمْ وَمَنْ أَتَاهُمْ مِنْ الْمُسْلِمِينَ لَمْ يَرُدُّوهُ وَعَلَى أَنْ يَدْخُلَهَا مِنْ قَابِلٍ وَيُقِيمَ بِهَا ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَلَا يَدْخُلَهَا إِلَّا بِجُلُبَّانِ السِّلَاحِ السَّيْفِ وَالْقَوْسِ وَنَحْوِهِ فَجَاءَ أَبُو جَنْدَلٍ يَحْجُلُ فِي قُيُودِهِ فَرَدَّهُ إِلَيْهِمْ قَالَ أَبُو عَبْد اللَّهِ لَمْ يَذْكُرْ مُؤَمَّلٌ عَنْ سُفْيَانَ أَبَا جَنْدَلٍ وَقَالَ إِلَّا بِجُلُبِّ السِّلَاحِ
“(হা/২৭০০) : মূসা ইবন মাসউদ (রহ) বলেছেন, আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করেছেন সুফিয়ান বিন সাঈদ, তিনি আবী ইসহাক্ব থেকে, তিনি সাহাবী বারা বিন আযিব (রা) থেকে। তিনি বলেন : নবী (স) হুদায়বিয়ার দিন মুশরিকদের সাথে তিনটি বিষয়ে সন্ধি করেছিলেন। তা হল– মুশরিকরা কেউ (মুসলিম) হয়ে তাঁর কাছে এলে তিনি তাকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন। মুসলিমদের কেউ (মুরতাদ হয়ে) তাদের কাছে গেলে তারা তাকে ফিরিয়ে দেবে না। আর তিনি আগামী বছর মক্কায় প্রবেশ করবেন এবং সেখানে তিন দিন অবস্থান করবেন। কোষবদ্ধ অস্ত্র, তরবারী ও ধনুক ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে প্রবেশ করবেন না। ইত্যবসরে আবূ জান্দাল (রা) শৃঙ্ঙলিত অবস্থায় লাফিয়ে লাফিয়ে তাঁর কাছে এল। তাকে তিনি তাদের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। আবূ আব্দুল্লাহ (ইমাম বুখারী রহ.) বলেন : মুয়াম্মাল (রহ) সুফিয়ান (রহ) থেকে বর্ণিত হাদীসে আবূ জান্দালের কথা উল্লেখ করেন নি। তিনি “কেবল কোষবদ্ধ তরবারীসহ” এটুকু উল্লেখ করেছেন।” [সহীহ বুখারী-সন্ধি অধ্যায় بَاب الصُّلْحِ مَعَ الْمُشْرِكِينَ (মুশরিকদের সাথে সন্ধি), ফতহুল বারী ৫/২৭০০ নং হাদীস]
ইবনে হাজার (রহ) হাদীসটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন :
يعني أن مؤملا وهو بن إسماعيل تابع أبا حذيفة في رواية هذا الحديث عن سفيان وهو الثوري
“এখানে মুয়াম্মাল হলেন ইবনে ইসমাঈল, তিনি সুফিয়ান (যিনি) সওরী থেকে আবূ হুযায়ফাহর অনুসরণে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন।” [ফতহুল বারী – আলোচ্য অনুচ্ছেদ দ্র:]
‘উমদাতুল ক্বারী’তে বদরুদ্দীন আইনী হানাফী (রহ) আলোচ্য অংশটি সম্পর্কে লিখেছেন :
أبو عبد الله هو البخاري نفسه أراد أن مؤمل بن إسماعيل تابع موسى بن مسعود في رواية هذا الحديث عن سفيان الثوري
“এখানে আবূ আব্দুল্লাহ বলতে ইমাম বুখারী (রহ) স্বয়ং উদ্দেশ্য। নিশ্চয় মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈল মূসা বিন মাসউদের অনুসরণে এই হাদীসটি সুফিয়ান সওরী (রহ) থেকে বর্ণনা করেছেন।” [‘উমদাতুল ক্বারী – আলোচ্য অনুচ্ছেদ দ্র:]
সুস্পষ্ট হল, মূসা বিন মাসউদের হাদীসটির ন্যায় মুয়াম্মাল বিন ইসমাঈল (রহ) অপর একটি সনদের সুফিয়ান সওরী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য কোন একটি পূর্ণাঙ্গ সহীহ হাদীস বর্ণনার পর অপর একটি সংক্ষিপ্ত সনদের সহীহ হাদীসের প্রতি ইঙ্গিতের উদাহরণ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে।
মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈল থেকে ইমাম বুখারী (রহ) অপর একটি স্থানে পূর্ণাঙ্গ সনদসহ বর্ণনা করেছেন। দেখুন : ‘সহীহ বুখারী – কিতাবুল ফিতান بَاب إِذَا الْتَقَى الْمُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا (অনুচ্ছেদ : দু’জন মুসলিম তরবারী নিয়ে পরস্পরের মারমূখী হলে) হা/৭০৮৩।
উক্ত অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যাতে ‘মুয়াম্মাল’ সম্পর্কে ইবনে হাজার (রহ) লিখেছেন : وهو بن إسماعيل أبو عبد الرحمن البصري “তিনি ইবনে ইসমাঈল আবূ আব্দুর রহমান বসরী (রহ)।” [ফতহুল বারী ১৩ খণ্ড, আলোচ্য হাদীসের আলোচনা দ্র:]
সহীহ বুখারীর আলোচ্য বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, মুয়াম্মাল বিন ইসমাঈল (রহ) ইমাম বুখারীর (রহ)এর কাছে ‘মুনকারুল হাদীস’ হলে তিনি সহীহ বুখারীতে তাঁর বর্ণনা উল্লেখ করতেন না। তাছাড়া ইমাম বুখারীর কিতাবগুলোতে তাঁর প্রতি কোন আপত্তি পাওয়া যায় না। এজন্যে যারা তাঁকে ইমাম বুখারী থেকে ‘মুনকার’ সাব্যস্ত করেছেন, তারা মূলত মুহাম্মাদ বিন সাঈদের প্রতি ইমাম বুখারীর ‘মুনকারুল হাদীস’ সম্বোধনকে ভুলভাবে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈলের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। তাছাড়া রিজালশাস্ত্রে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈলের প্রতি ইমাম বুখারীর আপত্তি সনদহীন হিসাবে বর্ণিত হয়েছে। যা সরাসরি তাঁর থেকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

লেখক ৫৩ (পৃ: ২৯) :
তাছাড়া ইবনে সা’দ, আবূ যুরআ রাযী, আবূ হাতেম রাযী ও দারাকতুনী প্রমুখ তাকে ‘অত্যধিক ভুলের শিকার’ আখ্যা দিয়েছেন। ইবনে মাঈন এক বর্ণনায় বলেছেন, সুফয়ানের ক্ষেত্রে তিনি প্রমাণযোগ্য হওয়ার উপযুক্ত নন। মুহাম্মাদ ইবনে নসর বলেছেন, তিনি কোন বর্ণনার ক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ হলে ভেবে চিন্তে দেখতে হবে, কেননা তিনি প্রচুর ভুলের শিকার ছিলেন। ইবনে হাজার আসকালানীও ফাতহুল বারী গ্রন্থে বলেছেন, সুফইয়ান হতে মুয়াম্মালের বর্ণনাতে দুর্বলতা আছে। (দ্র: ৯খ, ২৮৮ পৃ, ৫১৭২ হাদীসের অধীনে)
বিশ্লেষণ ৫৩ : উক্ত বর্ণনাগুলো থেকে বুঝা যায়, মুয়াম্মাল বাতিল বা প্রত্যাখ্যাত নন। বরং তাঁর ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ কারণে তাঁর একক বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে অন্যদের সাক্ষ্য থাকলে তাঁর বর্ণনা ভেবে-চিন্তে নেয়ার সুযোগ আছে।
লেখক তাঁর প্রতি আপত্তিকারীদের মন্তব্যগুলো তুলে ধরেছেন। আসুন আমরা জেনে নিই মুহাদ্দিসগণের মধ্যে কারা তাঁকে মেনে নিয়েছেন। ক) ইয়াহইয়া ইবনে মু‘য়ীন তাঁকে সিক্বাহ বলেছেন (জারাহ ওয়াত তা’দিল ৮/৩৭৪)। খ) ইমাম বুখারী তাঁর থেকে সুফিয়ানের বর্ণনা ‘সহীহ বুখারী’তে উল্লেখ করেছেন (সূত্র : গত হয়েছে)। সুতরাং ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন কর্তৃক সুফিয়ানের বর্ণনার প্রতি আপত্তি শক্তিশালী হল না। গ) ইবনে হিব্বান নিজের ‘সিক্বাতে’ বর্ণনা করেছন, বলেছেন ত্রুটিযুক্ত। অর্থাৎ সিক্বাহ বর্ণনাকারী, কিন্তু ভুল হত। গ) দারা কুতনী তাকে তাঁর সূনানে (২/১৮৬ হা/২২৬১) সহীহ বলেছেন। অর্থাৎ তাঁর থেকে দু’ রকম বর্ণনা আছে। ঘ) হাকিম তাঁর মুস্তাদরাকে (১/৩৮৪) সহীহ বলেছেন। ঙ) যাহাবী তাঁকে বসরাবাসী সিক্বাহদের অর্ন্তভুক্ত করেছেন (العبر ١/٣٥٠)। চ) তিরমিযী তাঁর সূনানে (হা/৬৭২) সহীহ বলেছেন। ছ) ইবনে কাসির তাঁর তাফসীরে (৪/৪২৩) শক্তিশালী বলেছেন।
ইবনে হাজার (রহ) আবূ হাতিম থেকে সংক্ষেপে লিখেছেন : وهو صدوق كثيْر الخطأ قاله أبو حاتم الرازي
“তিনি সত্যবাদী, ব্যাপক ত্রুটি করতেন – যেভাবে আবূ হাতিম রাযী বলেছেন।” [ফতহুল বারী, ঐ]
ইবনে আবূ হাতিমের বিস্তারিত বর্ণনাটি প্রকৃতপক্ষে নিম্নরূপ : صدوق ، شديد فى السنة كثيْر الْخطأ ، يكتب حديثه
“তিনি সত্যবাদী, সুন্নাতের প্রতি দৃঢ়, অনেক ত্রুটি করতেন, তাঁর হাদীস লেখা হয়।” [কিতাবুল জারাহ ওয়াত তা’দিল ৮/৩৭৪]
মূলত এই উদ্ধৃতিটিতে মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈলে প্রতি আপত্তির সাথে সাথে গ্রহণযোগ্যতার দিকে ইঙ্গিত মেলে। কেননা এটা উসূলের হাদীসে সুস্পষ্ট যে, সিক্বাহ রাবী যখন ভুল করেন – তখন এমন রাবীর অধিকাংশের কাছে সিক্বাহ হলে, তার প্রমাণিত ত্রুটি বর্জন করে বাকী বর্ণনাগুলো হাসানুল হাদীস, সহীহুল হাদীস হয়ে থাকে। [বিস্তারিত ক্বওয়ায়িদ ফী উলূমুল হাদীস (পৃ: ২৭৫]
এরকম সিক্বাহ বর্ণনাকারী যাদের ভুলের কারণে শর্ত সাপেক্ষে গ্রহণ করা হয়, তাদের মধ্যে ইবনে লিহইয়াহ অন্যতম। অথচ তাঁর বর্ণনা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর বর্ণনার ক্ষেত্রে একাধিক সাক্ষ্য প্রমাণ মজুদ থাকার কারণেই তাঁরা তার থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন, অন্যথায় নয়। সহীহ বুখারীতে বাম হাতের যেরা‘র উপর রাখার বর্ণনা এবং সহীহ মুসলিমে বাম হাতের উপর বর্ণনাকে ব্যাখ্যা ধরলে উভয় হাত বা যেরা‘ একটি অপরটির উপর রাখা হয়। তখন মুয়াম্মাল (রহ) থেকে সহীহ ইবনে খুযায়মাহ’র على صدره (বুকের উপর) এবং বাযযারে উল্লিখিত عند صدره (বুকের নিকট) শব্দগুলো পরস্পরের পরিপূরক হয়। ফলে মুয়াম্মালের বর্ণনাকে কমপক্ষে হাসান হাদীসের মর্যাদা দেয়াটা ইনসাফের ও যুক্তিযুক্ত। কেননা সুফিয়ানে থেকে মুয়াম্মালের বর্ণনা স্বয়ং ইমাম বুখারী (রহ) ‘সহীহ বুখারী’-তে এনেছেন। তাছাড়া পরবর্তীতে লেখক কর্তৃক কয়েকটি সহীহ হাদীসও বর্ণনাটির সাক্ষ্য ও সমর্থক, যদিওবা লেখক সেগুলোর বাতিল করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।

লেখক ৫৪ (পৃ: ২৯) :
২. তাউসের বর্ণনাটি আবূ দাউদ (৭৫৯) শরীফে আছে, এটি মুরসাল। আর মুরসাল (সূত্র বিচ্ছিন্ন)কে তারা প্রামাণ্য মনে করেননা। তদুপরি এতে সুলায়মান ইবনে মূসা নামের একজন বর্ণনাকারী আছেন। তার সম্পর্কে ইমাম বুখারী র. বলেছেন, عند مناكير তার বর্ণনায় অনেক আপত্তিকর বিষয় আছে। ইমাম নাসাঈ বলেছেন, ليس بالقوى তিনি মজবুত রাবী নন। (দ্র: যাহাবীর আল কাশিফ)
বিশ্লেষণ ৫৪ ইতঃপূর্বে ৫০ নং বিশ্লেষণে আমরা জেনেছি, জাফার আহমাদ উসমানী (রহ) তাঁর বিখ্যাত হানাফী হাদীস কোষ ‘ই‘লাউস সুনানে’ হাদীসটি মুরসাল হওয়া সত্ত্বেও দলিল হিসাবে ব্যবহার বৈধ করেছেন। কেননা হানাফীগণ মহিলাদের সালাতে বুকে হাত বাঁধার বিধান হিসাবে দলিলটি গ্রহণ করেন। তাছাড়া ইমাম আবূ দাউদ বলেছেন :
وأما المراسيل فقد كان يحتج بها العلماء فيما مضى مثل سفيان الثوري ومالك بن أنس والأوزاعي حتى جاء الشافعي فتكلم فيها وتابعه على ذلك أحمد بن حنبل وغيره رضوان الله عليهم فإذا لم يكن مسند غير المراسيل ولم يوجد المسند فالمرسل يحتج به ….
“পূর্ববতী আলেম যেমন – সুফিয়ান সওরী, মালিক বিন আনাস ও আওযাঈ (রহ) মুরসাল হাদীসকে দলিল গণ্য করতেন। কিন্তু যখন ইমাম শাফেঈ (রহ) আসলেন তখন তিনি এতে আপত্তি করলেন। এ ব্যাপারে তাঁর অনুসরণ করলেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও অন্যান্যরা(রহ) । তবে যদি মুরসাল ছাড়া মুসনাদ (সূত্রযুক্ত) হাদীস না পাওয়া যায়, তাহলে মুরসালকে দলিল গণ্য করা হয়।” (রিসালাহ আবী দাউদ ইলা আহলে মাক্কাহ পৃ:২৫]
এ পর্যায়ে পূর্ববর্তী সাহাবী ওয়ায়েল (রা) ও সামনে আগত সাহাবী হুলব (রা)’এর মুসনাদ হাদীসগুলো উক্ত মুরসাল হাদীসের সাক্ষ্য। তাছাড়া সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসের সাথেও কোন সংঘর্ষ হয় না, বরং ব্যাখ্যা করে। সুতরাং এরূপ মুরসাল হাদীস গ্রহণ করাতে কোনই আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীস ঠিক এর বিপরীত।
ইমাম বুখারী (রহ)-এর কাছে সুলায়মান বিন মূসা মুনকার। এর জবাব হল, তিনি সহীহ মুসলিমের রাবী। সুতরাং তিনি সিক্বাহ। সুতরাং তাঁর থেকে প্রমাণিত ভুলটিই কেবল মুনকার। অথচ তাঁর আলোচ্য বর্ণনার সমর্থনে আরো সাক্ষ্যমূলক বর্ণনা রয়েছে। সুতরাং এক্ষেত্রে তাঁর বর্ণনাটি মুনকার বলার সুযোগ থাকছে না। তাছাড়া তাঁকে ব্যাপক সংখ্যক মুহাদ্দিস সিক্বাহ গণ্য করেছেন। যেমন –
قال ابن عدى : ثبت صدوق قال يحيى بن معين : سليمان بن موسى ثقة وحديثه صحيح عندنا قال دحيم : ثقه
“ইবনে আদী (রহ) বলেছেন : সে প্রমাণিত সত্যবাদী। ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন বলেছেন : সুলায়মান বিন মূসা সিক্বাহ, তাঁর হাদীস আমাদের কাছে সহীহ। দাহীম বলেছেন : সে সিক্বাহ।” (তাহযীবুত তাহযীব ৪/১৯৮ পৃ:]
قال ابة حاتم : سليمان بن موسى محله صدوق وفى حديثه بعض الاضطراب
“আবূ হাতিম বলেছেন : সে সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত, তাঁর হাদীসে কিছু ইযতিরাব থাকে।” (জারাহ ওয়াত তা’দিল ৩/৪২ পৃ:)
ذكره ابن حبان فى الثقاة
“ইবনে হিব্বান তাঁকে সিক্বাতে এনেছেন।” (মীযানুল ই‘তিদান ৩/৩১৯)
সস্পষ্ট হল, সুলায়মান বিন মূসা সিক্বাহ বর্ণনাকারী হওয়ায় তাঁর ঐ বর্ণনাই বাতিল হবে যে ভুলটি প্রমাণিত। কিন্তু এক্ষেত্রে তাঁর বর্ণনাটির পক্ষে আরো সাক্ষ্য প্রমাণ আছে। সুতরাং বর্ণনাটি মুনকার হওয়ার কোন সম্ভবনাই নেই। বরং অন্যান্য সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কমপক্ষে হাসানুল হাদীস। তাঁর মৃত্যুর পূর্বে স্মরণ শক্তি লোপের কারণে ভুল হওয়ার সম্ভাবনার ব্যাপারে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু অন্যান্য বর্ণনাতে তার ব্যবহৃত শব্দ থাকায় উক্ত আপত্তিও বাতিল হল।
ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন ও ইমাম নাসাঈকে হাদীস সমালোচক হিসাবে কঠোর গণ্য করা হয়। কিন্তু ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন তাঁকে সিক্বাহ গণ্য করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম নাসায়ী সুলায়মান ইবনে মূসার প্রতি আপত্তি করেছেন। এমতাবস্থায় তিনি হাসানুল হাদীস। উল্লেখ্য তিনি সহীহ মুসলিমেরও রাবী। এ পর্যায়ে মুরসাল হাদীস হওয়ায় এটি অন্যান্য সহীহ হাদীসের সাক্ষ্যমূলক হাদীস হিসাবে গ্রহণযোগ্য। মূল হিসাবে নয়।

লেখক ৫৫ (পৃ: ২৯) :
৩. হযরত ইবনে আব্বাস রা. এর হাদীসটি বায়হাকীতে আছে। এটির সনদে রাওহ্ ইবনুল মুসায়্যাব আছে, তিনি চরম দুর্বল রাবী। ইবনে হিব্বান তার সম্পর্কে বলেছেন, তিনি বিশ্বস্ত লোকদের সূত্রে জাল হাদীস বর্ণনা করতেন, তার থেকে হাদীস নেওয়া বৈধ হবেনা। ইবনে আদী বলেছেন, احاديث غير محفوظ তার হাদীস সঠিক নয়। (তাহযীবুত তাহযীব)
বিশ্লেষণ ৫৫ লেখক কেবল আপত্তিগুলো উল্লেখ করেছেন। তবে তার উল্লিখিত সূত্রে পেলাম না। কথাগুলো আমরা পেয়েছে ‘লিসানুল মীযানে (১৮৮৬)’। সেখানে আরো আছে : ইবনে মুঈন বলেছেন : সে صويلح …. আবূ হাতিম বলেছেন : সালেহ কিন্তু শক্তিশালী নয়। … বাযযার তাঁর মুসনাদে বলেছেন : … রাওহ বিন মুসায়্যাব আলকালবী সিক্বাহ ….।
আলোচ্য হাদীসটির পূর্ণাঙ্গ বর্ণনাটি হল :
قَوْلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ( فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ) قَالَ : وَضْعُ الْيَمِينِ عَلَى الشِّمَالِ فِى الصَّلاَةِ عِنْدَ النَّحْرِ
“আল্লাহ তা‘আলার বাণী : فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ “সুতরাং আপনার রবের জন্য সালাত পড়ুন ও নহর করুন” (সূরা কাওসার : ৩)। ইবনে আব্বাস (রা) এর ব্যাখ্যায় বলেন : সালাতে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা নহরের কাছে।” (সুনানে বায়হাক্বী হা/২৪৩৩)
হাদীসটির দুর্বলতা মেনে নিলেও নহর শব্দটির সাথে বুকের সম্পর্ক রয়েছে। ইমাম রাযী (রহ) লিখেছেন :
قال الواحدى واصل هذه الاقوال كلها من النحر الذى هو الصدر
“ওয়াহিদী বলেছেন : এই সমস্ত (ইবনে আব্বাস, আনাস ও আলী রা.-এর) উক্তিগুলোর প্রত্যেকটির মধ্যে নহর আছে। যা মূলে সদর বা বুক।” (তাফসীরে কাবীর ২/১৩৫)
আরবি ভাষার বিখ্যাত অভিধান ‘আল-মুনজিদে’ النحر والنحور এর অর্থ على الصدر – বুকের উপর। অপর একটি আরবি অভিধান ‘ফিক্বহুল লিসানে’ النحر الصدر والنحور الصدور (পৃ: ৩৪)। মুজামুল ওয়াসিতে’ আছে : اعلى الصدر النحر অর্থাৎ নহর হল – বুক বা বুকের উপরের অংশ।

এ থেকে সুস্পষ্ট হয়, আরবি ভাষার সাধারণ দাবী অনুযায়ী উক্ত তাফসীর সহীহ।

লেখক ৫৬ (পৃ: ২৯৩০) :
৪. হযরত আলী রা. এর হাদীসটি বুখারী র. এর তারীখে কাবীরে আছে। এই হাদীসটির ব্যাপারে তিনটি আপত্তি আছে:
এক, হযরত আলী রা, থেকে যিনি এটি বর্ণনা করেছেন, তার নাম নিয়ে বর্ণনাকারীগণ বিভিন্ন কথা বলেছেন। ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদ ইবনে আবুল জা’দ তার নাম বলেছেন উকবা ইবনে যুহায়র (عقبة بن ظهير). হাম্মাদ ইবনে সালামা তার নাম বলেছেন উকবা ইবনে যাবয়ান (عقبة بن ظبيان), আর আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী র. বলেছেন উকবা ইবনে সাহবান (عقبة بن صهبان)। আবার উকবা থেকে এটি কে বর্ণনা করেছেন তা নিয়েও দ্বিমত আছে। ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদ বলেছেন আসিম আল জাহদারীর নাম। কিন্তু হাম্মাদ ইবনে সালামা বলেছেন আসিমের পিতার নাম। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় এটাকে সনদের এযতেরাব বলা হয়, যা একটি হাদীস দুর্বল প্রমাণিত হওয়ার অন্যতম কারণ। দ্র: ইলালে দারাকুতনী, ৪ক, ৯৯ পৃ; আল জারহু ওয়াত তা’দীর লি ইবনি আবী হাতিম, ৬খ, ৩১৩ পৃ।
বিশ্লেষণ ৫৬ লেখক মুযতারাবের কারণে হাদীসটিকে যঈফ বলতে চেয়েছেন। আসুন প্রথমে জেনে নিই মুযতারাব হাদীস কী? ইমাম ইবনে সিলাহ মুযতারাব হাদীস সম্পর্কে বলেছেন :
المضطرب من الحديث : هو الذي تختلف الرواية فيه فيرويه بعضهم على وجه وبعضهم على وجه آخر مخالف له وإنما نسميه مضطربا إذا تساوت الروايتان أما إذا ترجحت إحداهما بحيث لا تقاومها الأخرى : بأن يكون راويها أحفظ أو أكثر صحبة للمروي عنه أو غير ذلك من وجوه الترجيحات المعتمدة فالحكم للراجحة ولا يطلق عليه حينئذ وصف المضطرب
“মুযতারাব হাদীস হল, বর্ণনাতে পার্থক্য থাকা, এতে বর্ণনাকারীদের কেউ একভাবে বর্ণনা করে আর কেউ তার বিরোধী বর্ণনা করে। একে তখনই মুযতারাব নাম দেয়া হয়, যখন বর্ণনা দু’টি সমস্তরের হয়। তাদের মধ্যে একটিকে অপরটির চেয়ে প্রাধান্য দেয়া সম্ভব হয় না। পক্ষান্তরে কোন বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি বেশী হওয়া, বা বর্ণনাকারীর সঙ্গ তার সাথে বেশী হওয়ার মর্যাদা অর্জিত হওয়া। কিংবা প্রাধান্য দান পদ্ধতির কোন একটি অর্জিত হওয়া। সেক্ষেত্রে হুকুম হল, প্রাধান্য দান করা এবং এ ধরনের অবস্থার জন্য (বর্ণনাকে) মুযতারাব গণ্য করা যাবে না।” (মুক্বাদ্দামাহ ইবনে সিলাহ)
ইমাম ইবনে সিলাহ’র আলোচ্য উল্লিখিত সঙ্গার আলোকে আলী (রা)এর তাফসীরটির মুযতারাবের অবস্থা আমরা জানতে পারব।
আসিম ইবনুল আজ্জাজ আলজাহদারী নিজের শায়েখের নাম কখনো নসবহীন উক্ববাহ, কখনো উক্ববাহ বিন সাহবান, কখনো উক্ববাহ বিন যাবয়ান, আবার কখনো উক্ববাহ বিন যুহায়র উল্লেখ করেছেন। ইমাম বুখারী ও ইমাম আবূ হাতিম (রহ)এর নিকট আসিমের শায়েখের নাম উক্ববাহ বিন যাবয়ান। অথচ তাঁরাই তাঁকে উক্ববাহ বিন যুহায়র হিসাবেও চিহ্নিত করেছেন। কোন ব্যক্তিকে একাধিকভাবে সম্বোধন বিবেক ও দলিল কোন দিক থেকেই অবাস্তব নয়। ঈসা (আ)-কে নসবহীনভাবেও ডাকা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন : إِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَىٰ إِنِّي مُتَوَفِّيكَ “আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বলবেন, হে ঈসা! আমি তোমাকে নিয়ে নেবো” (সূরা আলে ইমরান : ৫৫)। আবার তাঁর মা মারইয়ামের সাথে নসব উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন : وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ “আর যখন আল্লাহ বললেন, ইয়া ঈসা ইবনে মারইয়াম!” (সূরা মায়িদা : ১১৬)। আবার তাঁকে মাসীহ উপাধিসহও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন : لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ “তারা কাফের, যারা বলে যে, মরিময়-তনয় মসীহ-ই আল্লাহ” (সূরা মায়িদা : ৭২) ।
সুস্পষ্ট হল, বিভিন্নভাবে একই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করাটা কোন ভুল বা স্ববিরোধী বিষয় নয়। এ কারণে এই বিষয়টিতে ইযতিরাবের দোষটি প্রযোজ্য হয় না।
অতঃপর লেখক উক্ববা’র পরবর্তী বর্ণনাকারীদের নাম নিয়ে বিতর্কের কথা বলেছেন। নিচের দু’টি সনদ লক্ষ্য করুন :
ক) সুনানে বায়হাক্বী (২/৪০৬/২৪২৫) :
وَرَوَاهُ الْبُخَارِىُّ فِى التَّارِيخِ فِى تَرْجَمَةِ عُقْبَةَ بْنِ ظَبْيَانَ عَنْ مُوسَى بْنِ إِسْمَاعِيلَ عَنْ حَمَّادِ بْنِ سَلَمَةَ سَمِعَ عَاصِمً الْجَحْدَرِىَّ عَنْ أَبِيهِ عَنْ عُقْبَةَ بْنِ ظَبْيَانَ عَنْ عَلِىٍّ (فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ) وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى وَسْطِ سَاعِدِهِ عَلَى صَدْرِهِ. أَخْبَرَنَاهُ أَبُو بَكْرٍ الْفَارِسِىُّ أَخْبَرَنَا أَبُو إِسْحَاقَ الأَصْبَهَانِىُّ أَخْبَرَنَا أَبُو أَحْمَدَ بْنُ فَارِسٍ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ الْبُخَارِىُّ رَحِمَهُ اللَّهُ قَالَ أَخْبَرَنَا مُوسَى حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ فَذَكَرَهُ.
খ) সুনানে বায়হাক্বী (২/৪১৩/২৪৩১) :
أَخْبَرَنَا أَبُو بَكْرٍ : أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدُ بْنِ الْحَارِثِ الْفَقِيهُ أَخْبَرَنَا أَبُو مُحَمَّدِ بْنُ حَيَّانَ أَبُو الشَّيْخِ حَدَّثَنَا أَبُو الْحَرِيشِ الْكِلاَبِىُّ حَدَّثَنَا شَيْبَانُ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ حَدَّثَنَا عَاصِمٌ الْجَحْدَرِىُّ عَنْ أَبِيهِ عَنْ عُقْبَةَ بْنِ صُهْبَانَ كَذَا قَالَ إِنَّ عَلِيًّا رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ فِى هَذِهِ الآيَةِ (فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ) قَالَ : وَضْعُ يَدِهِ الْيُمْنَى عَلَى وَسْطِ يَدَهِ الْيُسْرَى ، ثُمَّ وَضْعُهُمَا عَلَى صَدْرِهِ.
‘খ’ নং সনদের বর্ণনাটি থেকে প্রমাণিত হয়, ‘ক’ নং সনদটির মূসা বিন ইসামঈলের (রহ) বর্ণনা মাহফুয। পক্ষান্তরে ইয়াযীদের বর্ণনাটি শায ও মারদুদ। কেননা মূসা বিন ইসমাঈলের মুতাবিয়াত (সমর্থক) শেষোক্ত শায়বান (বিন ফারুখ) রয়েছে। উল্লেখ্য শায়বান বিন ফারুখ সহীহ মুসলিমের রাবী। তাছাড়া হাম্মাদ বিন সালামাহ থেকে মূসা বিন ইসমাঈলের শোনাটাও প্রমাণিত। যেভাবে যাহাবী (রহ) বলেছেন : وسمع من حماد بن سلمة تصانفه (তাযকিরাতুল হুফফায ১/৩৯৪)। তাছাড়া মূসা বিন ইসমাঈলও সহীহ মুসলিমের রাবী। এ পর্যায়ে আলী (রা)এর বর্ণনাটি মাহফুয হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা পেল। তাছাড়া বুকে হাত বাঁধার বর্ণনাগুলো পরস্পরকে সমর্থন করে বিধায় এগুলো গ্রহণযোগ্য। শায়েখ আলবানী (রহ) লিখেছেন :
وهذا إسناد مرسل جيد ، رجاله كلهم موثقون ، وينبغي أن يكون حجة عند الجميع ؛ لأنه – وإن كان مرسلا ؛ فإنه – قد جاء موصولا من أوجه أخرى
“হাদীসটি মুরসাল জাইয়েদ। এর সমস্ত বর্ণনাকারী সিক্বাহ। সবারই উচিত এটিকে দলিল হিসাবে গ্রহণ করা। কেননা যদিও এটি মুরসাল কিন্তু এর অন্যান্য মাওসুল (অবিচ্ছিন্ন সূত্রের) বর্ণনাও আছে।” [আসলি সিফাতুস সালাত পৃ: ২১৪]
অতঃপর তিনি ইবনে আব্বাস (রা) ও আলী (রা) থেকে দু’টি হাসান মাওসূল সূত্রের বর্ণনাকে পূর্বোক্ত হাদীস দু’টির সা্ক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

লেখক ৫৭ (পৃ: ৩০) :
দুই, হযরত আলী রা, থেকে এহাদীসটি একই সনদে ইবনে আবী হাতেম আল জারহু ওয়াত তা’দীল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সেখানে নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখার কথা আছে, ‘বুকের উপর’ (على الصدر) কথাটি নেই। একইভাবে ইবনে আবী শায়বা র, ও মুসান্নাফে এটি উল্লেখ করেছেন সেখানেও বুকের উপর কথাটি নেই। দ্র: হাদীস নয় ৩৯৬২।
বিশ্লেষণ ৫৭ পূর্বের বিশ্লেষণে একাধিক সনদে ‘বুকের উপর’ হাত রাখার বর্ণনা মাহফুয বা সুরক্ষিত হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ পর্যায়ে ইবনে আবী হাতিমের বর্ণনাটি সংক্ষিপ্ত। তাছাড়া তাতে নাভির নীচে হাত রাখার কথাও বর্ণিত হয় নি। অথচ নাভির নীচে হাত রাখার বর্ণনাগুলো সহীহ বুখারী’র যেরা (বাহু)এর বর্ণনা, আবূ দাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে হিব্বানের বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার বর্ণনাগুলোর বিরোধী বিধায় শায হওয়ার কারণে যঈফ। যেমন মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’র বর্ণনাটির বিশ্লেষণ পূর্বে গত হয়েছে (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৪২’)। আর আবূ দাউদের বর্ণনাটি সনদগত দিক থেকে যঈফ ও মুনকার। সুতরাংইবনে আবী হাতেমের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে হানাফীদের খুশী হওয়ার কিছু নেই।

লেখক ৫৮ (পৃ: ৩০) :
তিন, ইমাম বুখারী র, তার আততারীখুল কাবীর গ্রন্থে উক্ত হাদীসকে সমর্থন করেননি, বরং সেটি উল্লেখ করার পর বলেছেন,
وقال قتيبة عن حميد بن عبج الرحمن عن يزيد بن أبى الجعد عن عاصم الجحدري عن عقبة من أصحاب على عن على رضـ وضعها على الكرسوع. ٦ظ٤٣٧
অর্থাৎ কুতায়বা র. হুমায়দ ইবনে আব্দুর রহমানের সূত্রে ইয়াযীদ ইবনে আবুল জা’দ থেকে, তিনি আসিম জাহদারীর সূত্রে হযরত আলী রা, এর ছাত্র উকবা থেকে, তিনি হযরত আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তনি তার হাত কব্জির উপর রাখলেন।
বিশ্লেষণ ৫৮ : ইমাম বুখারী (রহ)এর পূর্ণাঙ্গ বর্ণনাটি নিম্নরূপ :
قال موسى حدثنا حماد بن سلمة سمع عاصم الجحدري عن أبيه عن عقبة بن ظبيان عن علي رضى الله تعالى عنه فصل لربك وانحر وضع يده اليمني على وسط ساعده على صدره وقال قتيبة عن حميد بن عبد الرحمن عن يزيد بن أبي الجعد عن عاصم الجحدري عن عقبة من أصحاب علي عن علي رضى الله تعالى عنه وضعها على الكرسوع
“মূসা বলেন : আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ বিন সালামহ, তিনি (হাদীস) শুনেছেন আসিম আলজাহদারী থেকে তিনি তার পিতা থেকে তিনি উক্ববাহ বিন যাবয়ান থেকে তিনি আলী (রা) থেকে ‘ফাসল্লিলি রব্বিকা ওয়ানহার’ – (অর্থ) ডান হাতটি বাম বাহুর মধ্যে রেখে বুকের উপর রাখতেন। আর কুতায়বাহ বলেছেন : তিনি হুমায়দ বিন আব্দুর রহমান থেকে, তিনি ইয়াযীদ আবুল জা’দ থেকে, তিনি আসিম আলজাহদারী থেকে, তিনি আলী (রা)এর সাথীদের মধ্যে উক্ববাহ থেকে, তিনি আলী (রা) থেকে, তিনি তাঁর হাত কব্জির উপর রাখলেন।” (তারীকুল কাবীর ৬/৪৩৭ পৃ: ‘আসিম বিন উক্ববা’র আলোচনা দ্র:)
লক্ষণীয়, একটি বর্ণনাতের وسط ساعده (বাহুর মাঝে) অপর বর্ণনাটিতে على الكرسوع (কব্জির উপর)। উভয় বর্ণনাটিতে একত্রে এভাবে আমল করা যায় যে, ডান হাতটি বাম হাতের উপর এমনভাবে থাকবে যেন ডান হাতটি বামহাতটির কব্জি ও বাহুর মাঝামাঝি অবস্থাতে থাকবে। সহীহ বুখারী’র যেরা (বাহু)এর বর্ণনা, আবূ দাউদ-নাসাঈ-সহীহ ইবনে হিব্বানের বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার বর্ণনাগুলো একত্রে ব্যাখ্যা নিলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়। আমরা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে হাদীসে ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছি। অথচ হানাফীরা নিজের পক্ষ থেকে শব্দ যুক্ত করে মনগড়া সমন্বয় করেছে।
লেখক বলতে চেয়েছেন ইমাম বুখারী (রহ) ‘বুকের উপর’ কথাটিকে সমর্থন করেন নি। অথচ ইমাম বুখারী (রহ)এর পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যটি পাঠ করে এমন কোন অসমর্থন আমরা দেখছি না। বরং বলা যায়, ইমাম বুখারী (রহ) একটি বিস্তারিত বর্ণনা এনেছেন যেখানে বাহুর উপর ও বুকের উপর উভয় শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। পরের বর্ণনাটিতে কব্জির উপর বর্ণনা করা হয়েছে। আমাদের কাছে এখানে একটি অপরটির ব্যাখ্যা। তাছাড়া বিস্তারিত বর্ণনাটির প্রমাণে সাক্ষ্য প্রমাণ বেশী বিধায় সেটা মাহফুয। পক্ষান্তরে প্রথমটিকে পরেরটিকে বিরোধী গণ্য করলে প্রকারান্তরে পরেরটিই বাতিল হয়। কেননা তা সংক্ষিপ্ত। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক্ব দিন।
লেখকের উপস্থাপনাতে কুরআনের আয়াতের তাফসীর হিসাবে ‘সালাতে হাত বাঁধার’ বক্তব্যকে গ্রহণ করার ব্যাপারে কোন আপত্তি করা হয় নি। আপত্তি করা হয়েছে, ‘বুকের উপর’ শব্দটি নিয়ে। অর্থাৎ লেখক প্রকারান্তরে হাদীসটির আংশিক তাফসীর মেনে নিয়েছেন। আমরা কিছু পূর্বে দেখিয়েছি ‘নহর’-এর শাব্দিক বিশ্লেষণে উক্ত তাফসীরের প্রয়োগটিও গ্রহণযোগ্য। উল্লেখ্য ‘নহর’ বলতে ‘কুরবানী’ এর অর্থ করা এর সাথে কোন বিরোধ নয়। বরং সেটিও আয়াতটির অপর একটি দাবী।

লেখক ৫৯ (পৃ: ৩০) : এসব কারণে আল্লামা ইবনে কাছীর র. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে সূরা কাওছারের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ হাদীসটি সহীহ নয়।
বিশ্লেষণ ৫৯ : ইমাম ইবনে কাসিরের উক্তিটি আলী (রা)এর হাদীসটির ব্যাপারে। উক্ত হাদীসটির সমর্থনে একাধিক সাক্ষ্য প্রমাণ থাকাই হাদীসটি গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করা যায়। যেভাবে শায়েখ আলবানী (রহ)এর বিশ্লেষণ উল্লেখ করেছি। তেমনি ইমাম হাকিম (রহ) লিখেছেন : إنه أحسن ما روي في تأويل الآية “নিশ্চয় আয়াতের ব্যাখ্যা হিসাবে এটি একটি উত্তম বর্ণনা।” [নায়লুল আওতার, অনুচ্ছেদ : সালাতে হাত বাঁধা]

লেখক ৬০ (পৃ: ৩১) : 
৫. হযরত হুলব রা, এর হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে (৬/২২৬) আছে। সুফইয়ান হতে শুধ ইয়াহয়াই বুকের উপর হাত বাঁধার কথাটি উল্লেখ করেছেন। মুসনাদের আহমদে ওয়াকী র., দারাকুতনীতে ওয়াকী ও আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী র. দুজন সুফইয়ান থেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তাদের বর্ণনায় বুকের উপর হাত বাঁধার কথা নেই। তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও মুসনাদের আহমদের সুফয়ানের সঙ্গী আবুল আহওয়াস একই উস্তাদ ‘সিমাক’ থেকে এটি র্বণনা করেছেন। তাদের কারো বর্ণনাতেই বুকের উপর হাত বাঁধার কথা নেই্। সুতরাং এটি শায হাদীস, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্লেষণ ৬০ : কেবল মুসনাদে আহমাদে নয় বরং ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ) নিজস্ব সনদে সুফিয়ান সওরী (রহ) থেকে ‘বুকের উপর’ শব্দসহ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সনদসহ বর্ণনাটি নিম্নরূপ :
أَخْبَرَنَا ابْنُ الْحُصَيْنِ، قَالَ: أَنْبَأَنَا ابْنُ الْمُذْهِبِ، قَالَ: أَنْبَأَنَا أَحْمَدُ بْنُ جَعْفَرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَحْمَدَ، قَالَ: حَدَّثَنِي أَبِي، قَالَ: حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ: حَدَّثَنِي سِمَاكٌ، عَنْ قَبِيصَةَ بْنِ هُلْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: ” رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ $ يَضَعُ هَذِهِ عَلَى هَذِهِ عَلَى صَدْرِهِ “، وَوَضَعَ يَحْيَى الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى فَوْقَ الْمِفْصَلِ [التحقيق لابن جوزى ج۱ صـ ۳۳٨]
তাছাড়া সহীহ ইবনে খুযায়মাতেও মুআম্মাল (রহ) সুফিয়ান সওরী থেকেই বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীস বর্ণনা করেছেন। এছাড়া পূর্ববর্তী সাক্ষ্যমূলক বর্ণনাগুলোতো রয়েছেই।
হাদীসটিতে নাভির নীচে হাত বাঁধার কথাও নেই। যদি হাতের উপর হাত রাখার বর্ণনার কারণে বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীস শায হয়, তবে নাভির নীচে বর্ণনাটি কেন শায নয়? এখানে সে আলোচনা কেন করা হল না?! অথচ বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসের সাক্ষ্য প্রমাণ অনেক বেশী। তাছাড়া সহীহ মুসলিমের ডান হাতটি বাম হাতের উপর বর্ণনাটিকে সহীহ বুখারী’র যেরার বর্ণনা এবং আবূ দাউদ- নাসাঈ-ইবনে হিব্বানের হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার বর্ণনাগুলো পরস্পরের ব্যাখ্যা গণ্য করা যায়। আলোচ্য বর্ণনাটির অবস্থাও একই। কিন্তু হানাফীদের মূল বর্ণনা কব্জির উপর কব্জি রেখে নাভির নীচে রাখার বর্ণনার সাথে ঐ বর্ণনাগুলোর সমন্বয় অকল্পনীয়। অথচ হাতের হাত রাখার বর্ণনাগুলো বুকের উপর হাত বাঁধার বিরোধিতা করে না। সুতরাং বর্ণনাটি শায নয়।
ইমাম তিরমিযী (রহ)-ও বর্ণনাটি আলোচ্য সনদে বর্ণনা করেছেন। যা তিরমিযী কোন কোন সংস্করণে আহমাদে বর্ণিত বুকের উপর রাখার বক্তব্য রয়েছে। যেমন মুহাদ্দিস আব্দুর হক্ব হানাফী (রহ) লিখেছেন :
وھمچنیں روایت کرد ترمذی از قبضہ بن ھلب ازپدرش کہ گفت دیدم رسول خدا $ کہ می نھاد دست خود را دابر سینہ خود
“ইমাম তিরমিযী (রহ) ক্ববীযাহ বিন হুলবের মধ্যস্থতায় হুলব তাঈ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি নবী (স)-ক ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকে বাঁধতে দেখেছেন।” (শরহে সফরুস সাআদাত পৃ: ৪৪)
এই হাদীসটির অপর বর্ণনাকারী সিমাক ইবনে হরব। তিনি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের রাবী। সুতরাং তার প্রতি আপত্তিও প্রত্যাখ্যাত।

লেখক ৬১ (পৃ: ৩১) : 
আল্লামা নিমাবী র. আছারুস সুনান গ্রন্থে লিখেছেন,
ويقع فى قلبى ان هذا تصحيف من ااتب واالصحيح يضع هذه على هذه فينا سبه قوله وصف يحيى اليمنى على اليسرى قرق المفصل صـ ٨٧ ويوافقه سائر الروايات
অর্থাৎ আমার মনে হয়, অনুলেখকের ভুলের কারণে এমনটি হয়েছে। সঠিক হবে على الصدره (বুকের উপর) এর স্থলে هذه على هذه (এই হাতের উপর)।[এ হিসেবে হাদীসটি অর্থ দাঁড়ায় – এই হাতটি ‍এই হাতের উপর রেখেছেন-অনুবাদক]। এতে এটি পরের কথার সঙ্গেও মিলে যায়। কারণ পরে বলা হয়েছে, ইয়াহইয়া ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রেখে দেখিয়েছেন, আর এটি তখন অন্যান্য বর্ণনাকারীদের বর্ণনার সাত্রে সংগতিপূর্ণ হয়। (দ্র. পৃ ৮৭)
বিশ্লেষণ ৬১ : আল্লামা নিমবী’র উক্তি থেকেই প্রমাণিত হয়, বক্তব্যটি তাঁর ধারণা। অর্থাৎ তিনি এটিকে প্রমাণ হিসাবে উল্লেখ করেন নি। মুসনাদে আহমাদ ছাড়া ইবনে জাওযী (রহ) থেকেও তাঁর নিজস্ব সনদে ‘বুকের উপর’ শব্দসহ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৬০’)। এছাড়া সহীহ হাদীসসমূহে হাত বাঁধার অধিকাংশ বিবরণ থেকে বুকের উপর বা নিকট শব্দগুলোর পরিপূরক বর্ণনা এসেছে। সুতরাং বিভিন্ন সাক্ষ্যে প্রমাণিত বুকের উপর হাত রাখার বিষয়টি কারো মাযহাবী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাতিল করার মনোভাব নিতান্তই মানসিক বিকৃতি। আর কব্জির উপর হাত রাখার দ্বারা ‘বুকের উপর’ হাত রাখার কোন বিরোধিতা হয় না। কেননা এখানে কব্জির উপর হাতের তালুকে রাখতে বলা হয় নি। এ পর্যায়ে নাসাঈ-আবূ দাউদ-সহীহ ইবনে হিব্বানে বর্ণিত বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর বর্ণনার সাথে সহীহ বুখারী বাম যেরা‘র বর্ণনাটি ব্যাখ্যা হিসাবে গণ্য হয়। এমতাবস্থায় হাতটি বুকের উপর বা কাছে উভয় অবস্থায় রাখা যায়। সুতরাং সংক্ষিপ্ত বর্ণনাগুলো বিস্তারিত বর্ণণা দ্বারা ব্যাখ্যা নিলে কোন দ্বন্দ্ব থাকে না। তাছাড়া হানাফীদের মহিলারা কব্জির উপর থেকে বুকের উপর হাত বেঁধে থাকে। যা উক্ত হাদীসটির মাধ্যমে বুকের উপর হাত রেখে আমল করার ব্যাখ্যা স্বয়ং হানাফীদের পক্ষ থেকেই রয়েছে।

লেখক ৬২ (পৃ: ৩১) :
এ হিসেবে এই হাদীসটি হানাফীদের দলিল হয়ে যায়। এখানে লক্ষ্য করুন, একটি দলিলও তাদের সহীহ নেই। পক্ষান্তরে আমাদের ১ ও ৫ নং হাদীস দুটি সহীহ। ৬ নং হাদীসটি হাসান।
বিশ্লেষণ ৬২ বরং হানাফীদের পুরুষদের আমলের বিরোধী হয়। কেননা হানাফীদের আমলের সাথে মৌলিকভাবে যে দলিলটি সাদৃশ্যপূর্ণ হয় সেটি হল, সাহাবী আলী ও আবূ হুরায়রা (রা)এর বর্ণিত আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক্বের যঈফ ও মুনকার হাদীস। সেখানে বলা হয়েছে তালুর উপর তালু নাভির নীচে রাখা। অথচ আমরা পূর্বে প্রমাণ করেছি সালাতের হাদীসগুলোতে হাত ও তালুকে বিশেষভাবে পৃথক করে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-২৩, ২৬’)
উক্ত ১ নং বর্ণনাটির উপর স্বয়ং হানাফীদের আপত্তির বিবরণ পূর্বে উল্লেখ করেছি (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৪২’)। ৫ নংটি তাবেঈর উক্তি। যা নবী (স) ও সাহাবীদের ব্যাপক সংখ্যক বর্ণনার বিরোধী বিধায় পরিত্যাজ্য।

লেখক ৬৩ (পৃ: ৩১৩২) : 
তিরিমযিী র. এর যুগে ও তাঁর পূর্বে বুকে হাত বাঁধার প্রচলন ছিলনা
ইমাম তিরমিযী র. হযরত হুলব রা. এর হাদীস উল্লেখ করে বলেছেন,
والعمل على هذا عند أهل العلم من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم والتابعين ومن بعدهم، يرون أن يضع الرجل يمينه على شماله في الصلاة، ورأى بعضهم أن يضعهما فوق السرة، ورأى بعضهم أن يضعهما تحت السرة، وكل ذلك واسع عندهم.
অর্থাৎ সাহাবী, তাবেয়ী ও পরবর্তী যুগের আলেমগণের আমল ছিল এ হাদীসের উপর। তাঁরা মনে করতেন, নাভির উপরে রাখবে, আর কেউ কেউ মনে করতেন নাভির নীচে রাখবে। তাঁদের দৃষ্টিতে প্রত্যেকটিরই অবকাশ আছে।
বিশ্লেষণ ৬৩ : ইমাম তিরমিযী (রহ)’র পূর্বে ইমাম শাফেঈ (রহ) বুকের উপর হাত বাঁধার উপর হাদীস বর্ণনা ও আমল করেছেন। অনুরূপ বর্ণনা ইমাম আহমাদ (রহ) থেকেও বুকের উপর হাত বাঁধা প্রমাণিত।
আমরা ইমাম নববী (রহ)এর উদ্ধৃতি থেকে দেখেছি তিনি বলেছেন ‘হাত বাঁধতে হবে নাভির উপরে বুকের নিচে’। অথচ দলিল উপস্থাপন করেছেন সহীহ ইবনে খুযায়মাহ থেকে ‘বুকের উপর হাত রাখার’ হাদীসটিকে (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৩৭’)। অর্থাৎ পূর্ববর্তী মুহাদ্দিসগণ ক্ষেত্র বিশেষে সমস্ত হাদীসের মধ্যে সমন্বয়ের প্রেক্ষিতে বুকের উপর, বুকের নিকট ও নাভির উপর বর্ণনাগুলোকে পরিপূরক ও ব্যাখ্যা গণ্য করেছেন। আর হাতের উপর হাত রাখার মৌলিক সহীহ বর্ণনার সাথে সালাতের মধ্যে ‘হাত’ শব্দের বিভিন্ন ব্যবহার থেকে এই উপস্থাপনাকে গ্রহণ করা যায়। পক্ষান্তরে নাভির নীচের বর্ণনা সর্বসম্মত যঈফ এবং অগ্রহণযোগ্য। এ পর্যায়ে ইমাম তিরমিযী’র উপস্থাপনার সত্যতা অন্যান্য ইমামদের ব্যাখ্যা ও সাক্ষ্যের মুখাপেক্ষী। অর্থাৎ তাঁর থেকে উপস্থাপিত আলেমদের মতামত ‘নাভীর উপরে’র বর্ণনাটি ‘বুকের উপর বা নিকট’ বর্ণনাগুলোর পরিপূরক বিধায় সহীহ ও গ্রহণযোগ্য। এই সহীহ হাদীসের উপর আমল হানাফীদের মহিলাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত আছে। পক্ষান্তরে ঐ আলেমদের মতামত প্রত্যাখ্যাত যারা যঈফ ও মুনকার হাদীস দ্বারা নাভির নীচে হাত বাঁধার মতামত ব্যক্ত করেছেন।
উক্ত বিশ্লেষণ থেকে লেখকের উক্তি ‘তিরিমযিী র. এর যুগে ও তাঁর পূর্বে বুকে হাত বাঁধার প্রচলন ছিলনা’ বাতিল প্রমাণিত হল। তাছাড়া লেখক বুকের উপর হাত বাঁধার ব্যাপারে যতটা বিদ্বেষ পোষণ করেছেন, পূর্ববর্তী হানাফী আলেমদের মধ্যে আমরা সেটা দেখি নি। বরং এ যামানার হানাফী দেওবন্দীদের নিকট শায়খুল ইসলাম খ্যাত তাক্বী উসমানীর সূত্রে ইমাম ইবনুল হুমাম হানাফী থেকে জানতে পেরেছি। তারা বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসকে ক্বিয়াসের দ্বারা মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য করেছেন। যদিওবা হাদীসের উপস্থাপনাতে যাদের সালাতের বিবরণ রয়েছে তারা সবাই পুরুষ। আমরা লেখকের বুকের উপর হাত বাঁধার বিদ্বেষ নিরসণের জন্য এ সম্পর্কে উদারপন্থী হানাফী আলেমদের সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছি (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-২৫’)।
আরো দেখুন, ইমাম বদরুদ্দীন আয়নী (রহ) তাঁর সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘উমদাতুল ক্বারী’ (৫/২৭৯ পৃ:)-তে বলেন :
واحتج الشافعي بحديث وائل بن حجر أخرجه ابن خزيمة في صحيحه قال صليت مع رسول الله فوضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره ولم يذكر النووي غيره في الخلاصة وكذلك الشيخ تقي الدين في الإمام واحتج صاحب الهداية لأصحابنا في ذلك بقوله إن من السنة وضع اليمنى على الشمال تحت السرة ( قلت ) هذا قول علي بن أبي طالب وإسناده إلى النبي غير صحيح …. فيه مقال لأن في سنده عبد الرحمن بن اسحق الكوفي قال أحمد ليس بشيء منكر الحديث ….
“শাফেঈদের দলিল হল ওয়ায়েল ইবনে হুজরের (রা) হাদীস। যা ইবনে খুযায়মাহ তাঁর ‘সহীহ’-তে বর্ণনা করেছেন। সাহাবী ওয়ায়েল (রা) বলেন : আমি রসূলুল্লাহ (স)এর সাথে সালাত পড়েছিলাম। তিনি ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর রাখলেন। নববী তাঁর ‘খুলাসাতে’ এছাড়া অন্যকিছু বর্ণনা করেন নি। অনুরূপ তাক্বী উদ্দীন তাঁর ‘الإمام’-এ উল্লেখ করেছেন। আমাদের (হানাফীদের) সাথীদের মধ্যে ‘হিদায়ার’ লেখক যা দলিল হিসাবে উল্লেখ করেছেন তা হল : সুন্নাত হল, ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নীচে বাঁধা। (আমি বলছি) এটা আলী ইবনে আবী তালেবের উক্তি এবং নবী (স) পর্যন্ত এর সনদ সহীহ নয়। …. এতে আপত্তি আছে। কেননা এর সনদে আব্দুর রহমান বিন ইসহাক্ব কুফী আছে। ইমাম আহমাদ বলেছেন : সে কিছুই নয়, মনুকারুল হাদীস….।”
বুঝা গেল, বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসটির উপর বদরুদ্দীন আয়নী হানাফী (রহ)এর আপত্তি ছিল না। তাঁর আপত্তি ছিল নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীস সম্পর্কে। যদিও তিনি আলোচনা শেষ করেছেন আমাদের আলোচ্য লেখক কর্তৃক উল্লিখিত ইমাম তিরমিযী (রহ)এর উদ্ধৃতির মাধ্যমে। অর্থাৎ সহীহ হাদীস ত্যাগ করে উলামাদের উক্তি দ্বারা মাযহাব রক্ষার শেষ অস্ত্রটি তিনিও ব্যবহার করেছেন। আমারা ‘বিশ্লেষণ-২৫ ও ৫০’-এ উদারপন্থী হানাফী আলেমদের ‘বুকের উপর হাত বাঁধার’ হাদীসকে গ্রহণের মতামত উল্লেখ করেছি।

লেখক ৬৪ (পৃ: ৩২) : 
লক্ষ্য করুন, সাহাবী, তাবেয়ী ও তিরমিযী র.এর যুগ পযন্ত আলেমগণকে তিনি দুভাগ করেছেন। এক ভাগের মত ছিল নাভির নীচে হাত বাঁধা, আরেক ভাগের মত ছিল নাভির উপরে হাত বাঁধা। বুকের উপর হাত বাঁধার আমল কোথায়? তিরমিযী র.ও কি আহলে হাদীস ছিলেন না? একইভাবে ইবনুল মুনযির র.ও তাঁর আল আওসাত গ্রন্থে উপরোক্ত দুধরণের আমল ও মতের কথাই উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষণ ৬৪ লক্ষণীয়, যেখানে সহীহ সনদসহ নবী (স) ও সাহাবীদের (রা) থেকে বুকের উপর হাত বাঁধার বর্ণনা রয়েছে। যেখানে ইমাম তিরমিযী ও ইবনুল মুনযির (রহ)এর কেবল ব্যক্তিগত বিশ্লেষণকে হাদীসের সিদ্ধান্ত হিসাবে গণ্য করাটা সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করার নামান্তর। তাছাড়া আমরা প্রমাণ করেছি আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত থাকলেও ঐ আলেমদের কাছেই নাভীর উপর এবং বুকের উপর বা নিকটে রাখা একই অর্থবোধক। যদি এই ব্যাখ্যা গ্রহণ না করা হয়, তবে উক্ত ইমামদ্বয়ের পূর্বে আগত ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদের ‘বুকের উপর’ হাত বাঁধার সত্যতাকে অস্বীকার করা হয়। অথচ তা প্রমাণিত সত্য। এ পর্যায়ে ইমাম তিরমিযী ও ইবনুল মুনযির (রহ)এর বক্তব্য অসম্পূর্ণ তথ্য সমৃদ্ধ হিসাবে গণ্য হবে। কিংবা নাভির উপরে হাত বাঁধা বলতে আমাদের পূর্বোক্ত ব্যাখ্যা তথা –বুকের উপর, বুকের নিকট ও নাভীর উপর একই অর্থবোধক বিবেচনা করতে হবে। যেভাবে ইমাম নববী (রহ) থেকে প্রমাণিত আছে। আর এই ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করলে ইমাম তিরমিযী ও ইবনে মুনযিরকে অসম্পূর্ণ তথ্য প্রদানের অপবাদ থেকে রক্ষা করা যায়। পক্ষান্তরে নাভির নীচে হাত বাঁধা সর্বসম্মত যঈফ। যেভাবে ইমাম নববী (রহ)’র উদ্ধৃতি পূর্বে গত হয়েছে।

লেখক ৬৫ (পৃ: ৩২) :
উল্লেখ্য, হাত বাঁধার যে সহীহ নিয়ম পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি, সে নিয়মে হাত বাঁধলে বুকের উপর রাখা প্রায় অসম্ভব।
বিশ্লেষণ ৬৬ বরং নাভির নীচেই অসম্ভব এবং বুকের উপরই সম্ভব। লেখক মোট ছয় জন ইমামের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে তিনজন সমস্ত হাদীসগুলোর উপর সমন্বয়ের পরিবর্তে নিজেদের চিন্তার সমন্বয় করেছেন। পক্ষান্তরে অপর তিনজনের ইমামের উপস্থাপনা আমাদের উপস্থাপিত পদ্ধতিকে সমর্থন করেন। ঐ তিনজন ইমাম হলেন, ইমাম নববী, হাফেয ইবনে হাজার ও ইমাম শওকানী (রহ)। (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৩৪-৩৯’)
হাতের উপর হাত বলতে যেরা বা বাহুর উপর যেরা বা বাহু রাখার অর্থ সহীহ। এভাবে হাতটি বাঁধলে তাকে বুকের উপর, বুকের নিকট ও নাভীর উপর সব কয়টি অর্থেই আমল করা যায়। পক্ষান্তরে এভাবে কখনই নাভির নীচে হাত বাঁধা সম্ভব নয়।

লেখক – ৬৬ (পৃ: – ৩২) :
আরেকটি কথা, লা-মাযহাবী ভাইয়েরা যেভাবে হাত বাঁধেন, তাতে বুকের উপর বাঁধা হয়না, হয় বুকের নীচে। আমি তাদের একজনকে বিষয়টি বলেছিলাম। তিনি আমার সামনে হাত বেঁধে বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। শেষে বললেন, এটাতো কখনোই চিন্তা করিনি। আমি বললাম, এবার চিন্তা করুন। হাদীস বলবেন বুকের উপর হাত বাঁধার, আর আমল করবেন বুকের নীচে হাত বাঁধার, তা হয়না।
বিশ্লেষণ -৬৬ : আসলে লেখক এবং কথিত ব্যক্তি সহীহ বর্ণনাগুলোর শব্দ সম্পর্কে ধারণা না রাখার কারণে উক্ত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। কেননা সহীহ সনদে ‘বুকের উপর’, ‘বুকের নিকট’ ও ‘নাভীর উপর’ শব্দগুলো ব্যবহার হয়েছে। যেরা’র উপর যেরা‘ বরাবর রাখলে ও অন্যান্য সহীহ হাদীসগুলো দাবী পূরণ করলে সবগুলো বর্ণনার উপর আমল করা সম্ভব হয়। যদি কারো শব্দগুলো জানা না থাকে তাহলে কিভাবে সেটার সমাধান তার চিন্তাতে আসবে? আমাদের কাছে সহীহ হিসাবে বর্ণিত সবগুলোর বর্ণনা ও পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য। পক্ষান্তরে নাভির নীচে হাত বাঁধাটা সহীহ হাদীসগুলোর সম্পূর্ণ বিরোধী। এ সম্পর্কে পূর্বে তুলনামূলক বিশ্লেষণ উল্লেখ করেছি। এখন স্মরণার্থে আবার পড়ুন :

সুস্পষ্ট হল, হাতের উপর হাত রাখার প্রকৃত দাবী – যেরার উপর যেরা রাখা। এ পদ্ধতিতে বুকের উপর, বুকের নিকট ও নাভীর উপর – প্রতিটি হাদীসের উপর সমন্বিত আমল করা যায়। পক্ষান্তরে নাভীর নীচে হাত বাঁধাটা সহীহ হাদীসের উল্লিখিত ব্যাখ্যানুসারে অসম্ভব। (দ্র: ‘বিশ্লেষণ-৩৪’)
উল্লেখ্য হানাফী মাযহাবেও বুকের উপর এবং বুকের নীচে শব্দ দুটি পরিপূরক হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। যেমন যাফার আহমাদ উসমানী (রহ) তাঁর বিখ্যাত লাউস সুনানে বলেছেন :
আর দুররুল মুখতার কিতাবে (: ১ পৃ: ৫০৮) রয়েছে। স্ত্রীলোক এবং হিজড়া তাদের বুকের নীচে হাত রাখবে। আর রাদ্দুল মুহতার কিতাবে রয়েছে, এর কতিপয় নোসখায় এমনই রয়েছে; আর কতিপয় নোসখায় রয়েছে বুকের উপর..[লাউস সুনান (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, জুন ২০০৮/১৪২৯) /২৩৯ পৃ:]
সুস্পষ্ট হল, হানাফীদের কাছেও বুকের উপর ও বুকের নীচে উভয়টি পরিপূরক আমলযোগ্য বিষয়। এ পর্যায়ে আশা করি লেখক ও কথিত ব্যক্তির ভুল বুঝের অবসান হবে এবং তারা সহীহ হাদীস অনুযায়ী বুকের উপর, বুকের কাছে/নীচে, নাভীর উপর প্রভৃতির মর্ম উদ্ধার করতে পারবেন। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক্ব দিন। আমীন!!

হানাফী আলেম আব্দুল মতিন সাহেব লিখিত ‘দলিলসহ নামাযের মাসায়েল’ (প্রকাশক : মাকতাবাতুল আযহার, ঢাকা-এপ্রিল’২০১১) এর জবাব নিচে দেয়া হল। পর্ব-০১

দলিলসহ নামাযের মাসায়েলএর জবাব

 দলিল

হানাফী আলেম আব্দুল মতিন সাহেব লিখিত দলিলসহ নামাযের মাসায়েল (প্রকাশক : মাকতাবাতুল আযহার, ঢাকাএপ্রিল২০১১) এর জবাব নিচে দেয়া হল। তাঁর উপস্থাপিত দলিল ও আলোচনা লেখক শিরোনামে এবং আমাদের জবাব বিশ্লেষণ শিরোনামে উল্লেখ করা হল। বইটির আলোচ্য বিষয়গুলো এর সূচীপত্র থেকে জেনে নেয়া যাক।

সূচীপত্র
ইকামতের বাক্য গুলো দু’বার করে বলা সুন্নত ৪
নামাযে কব্জির উপর হাত বেঁধে নাভির নীচে রাখা সুন্নত ২১
প্রসঙ্গ: ছানা পড়া ৩৩
মুকতাদী সূরা ফাতেহা পড়বেনা ৩৭
নামাযে নিম্নস্বরে আমীন বলা সুন্নত ৫৫
শুধু তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত তোলা সুন্নত ৭১
সেজদায় যাওয়ার সময় আগে হাঁটু, পরে হাত, তারপর চেহারা রাখা সুন্নত ৮৩
প্রথম রাকাত শেষ করে সোজা উঠে দাঁড়ানো সুন্নত ৪৪
নামাযে ১ম ও শেষ বৈঠকে বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসা ও ডান পা খাড়া রাখা সুন্নত ৪৫
বিতর নামায পড়ার তরীকা ৫৫
জুমআর আগের ও পরের সুন্নত ৬০
ঈদের নামাযে অতিরিক্ত ছয় তাকবীর সুন্নত ৭০
জানাযার নামায পড়ার পদ্ধতি ৭৫
তারাবী বিশ রাকাত পড়া সুন্নত ৮০
মহিলাদের নামায-পদ্ধতি পুরুষের নামাযের মত নয় ৯৩

উপরোক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে যেগুলো কুরআন ও সহীহ হাদীসের বিরোধী বরং জাল, যঈফ ও মাওযু‘ হাদীস ও মানুষের মতের ভিত্তিতে রচিত হয়েছে – আমরা কেবল সেগুলোর বিশ্লেষণমূলক জবাব উল্লেখ করছি।

প্রথম অধ্যায় : ইকামাতের বাক্য (পৃ: ১৩২০)

এ অধ্যায়ে লেখকের শেষের মন্তব্যগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, তিনি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের উল্লিখিতে ইক্বামত বেজোড় বাক্যে বলার হাদীসকে তিনি সহীহ হিসাবে মেনে নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন : (পৃ: ২০)
পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই। ইকামাতের বাক্যগুলো একবার করে বলা হবে না দুবার করে, এ নিয়ে ফকীহ ইমামগণের মধ্যেও দ্বিমত ছিল। কিন্তু ঝগড়া ছিল না। বরং ইমাম ইবনু আব্দিল বার র. উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আহমাদ, ইসহাক, দাউদ যাহেরী ও ইবনে জারীর তাবারী র. প্রমুখ এ দ্বিমতকে বৈধ মতানৈক্য আখ্যা দিয়েছেন, এবং বলেছেন যেভাবেই করুক জায়েয হবে। এমনকি লামাযহাবী আলেম তিরমিযী শরীফের ভাষ্যকার মুবারকপুরী সাহেবও লিখেছেন, একবার করে বলা বা দুবার করে বলা উভয়টাই আমার দৃষ্টিতে বৈধ। তাহলে এতে ঝগড়ার কি আছে। কেন বলা হচ্ছে দুবার করে বলার কথা কোন হাদীসে নেই। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করেন।

উক্ত উদ্ধৃতি থেকে প্রমাণিত হল, যারা ইক্বামত বেজোড় বাক্যে বলছেন তাদের আমলটিও লেখকের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং এ ব্যাপারে ঝগড়া করা তাঁর কাছে ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে হাদীস অনুসরণের দাবী হল, সর্বাপেক্ষা সন্দেহমুক্ত ও সর্বাধিক সনদে বর্ণিত হাদীসের প্রতি আমল করা। এখন আমরা লেখকের শেষ বাক্যের অংশবিশেষ “কেন বলা হচ্ছে দুবার বলার কথা কোন হাদীসে নেই” বিশ্লেষণ করব। কেননা তিনি নিজের বাক্যের মধ্যে একটি ফাঁক রেখেছেন। আর তা হল : “কেন বলা হচ্ছে … হাদীসে নেই” কিন্তু বলেন নি “কেন বলা হচ্ছে … সহীহ হাদীসে নেই।” আসলে এখানেই লেখক নীরব!! লেখক এ সম্পর্কে হাদীস উল্লেখ করলেও সেগুলো সহীহ না যঈফ তার বিশ্লেষণ উল্লেখ করেন নি। অথচ সাধারণভাবে এটা বলাই যথেষ্ট সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের সন্দেহমুক্ত হাদীস ছেড়ে যঈফ হাদীস গ্রহণ করাটা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য। আসুন আমরা প্রথমে সহীহ হাদীসগুলো জেনে নিই।

) সহীহ বুখারী থেকে :
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا خَالِدٌ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ أُمِرَ بِلاَلٌ أَنْ يَشْفَعَ، الأَذَانَ، وَأَنْ يُوتِرَ الإِقَامَةَ‏.‏ قَالَ إِسْمَاعِيلُ فَذَكَرْتُ لأَيُّوبَ فَقَالَ إِلاَّ الإِقَامَةَ
আলী ইবনু আবদুল্লাহ‌ (রহঃ) ……আনাস (রা) থকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিলাল (রা)-কে আযানের বাক্যগুলো দু’ দু’বার এবং ইকামতের শব্দগুলো বেজোড় বলার নির্দেশ দেওয়া হল। ইসমাঈল (রহ) বলেন, আমি এ হাদীস আইয়্যূবের নিকট বর্ণনা করলে তিনি বলেন, তবে ‘কাদ্‌কামাতিস্‌ সালাত ’ ব্যতীত। [সহীহ বুখারী – কিতাবুল আযান, অনুচ্ছেদ : ক্বাদ কামাতিস্-সলাতুল ছাড়া ইক্বামাতের শব্দগুলো একবার করে বলা]

) সহীহ মুসলিম থেকে :
حَدَّثَنَا خَلَفُ بْنُ هِشَامٍ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ ح وَحَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى أَخْبَرَنَا إِسْمَاعِيلُ ابْنُ عُلَيَّةَ جَمِيعًا عَنْ خَالِدٍ الْحَذَّاءِ عَنْ أَبِى قِلاَبَةَ عَنْ أَنَسٍ قَالَ أُمِرَ بِلاَلٌ أَنْ يَشْفَعَ الأَذَانَ وَيُوتِرَ الإِقَامَةَ. زَادَ يَحْيَى فِى حَدِيثِهِ عَنِ ابْنِ عُلَيَّةَ فَحَدَّثْتُ بِهِ أَيُّوبَ فَقَالَ إِلاَّ الإِقَامَةَ.
খলাফু ইবনু হিশাম …. আনাস (রা) থেকে । তিনি বলেন : বিলালকে আযানের শব্দ জোড় সংখ্যায় এবং ইক্বামতের শব্দ বেজোড় সংখ্যায় বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইয়াহইয়া তার বর্ণনায় ইবনে উলাইয়ার সূত্রে বলেছেন, তিনি আইউবের কাছে এ হাদীস বর্ণনা করলে তিনি বললেন কিন্তু ‘ক্বদ কামাতিস সলাত’ দু’বার বলতে হবে।” [সহীহ মুসলিম – কিতাবুস সালাত, باب الأَمْرِ بِشَفْعِ الأَذَانِ وَإِيتَارِ الإِقَامَةِ ]

) আবূ দাউদ থেকে :
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ سَمِعْتُ أَبَا جَعْفَرٍ يُحَدِّثُ عَنْ مُسْلِمٍ أَبِى الْمُثَنَّى عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ إِنَّمَا كَانَ الأَذَانُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- مَرَّتَيْنِ مَرَّتَيْنِ وَالإِقَامَةُ مَرَّةً مَرَّةً غَيْرَ أَنَّهُ يَقُولُ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ فَإِذَا سَمِعْنَا الإِقَامَةَ تَوَضَّأْنَا ثُمَّ خَرَجْنَا إِلَى الصَّلاَةِ
মুহাম্মাদ ইবনে বাশশার ….. ইবনে উমার (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (স)এর সময়ে আযানের শব্দ দু’বার করে এবং ইক্বামতের শব্দ একবার করে বলা হত। কিন্তু ইক্বামতের মধ্যে ‘ক্বদ কামাতিস সালাহ’ শব্দটি দু’বার বলা হত। আমরা মুআযযিনের ইক্বামত শুনে অযু করতে যেতাম অতঃপর সালাত আদায় করতে যেতাম।” [আবূ দাউদ – কিতাবুস সালাত, باب فِى الإِقَامَةِ ; ইবনে খুযায়মাহ(হা/৩৭৪), ইবনে হিব্বান (হা/২৯০,২৯১), হাকিম (১/১৯৭, ১৯৮) প্রমুখ সহীহ বলেছেন; যাহাবী চুপ থেকেছেন। এর সনদ হাসান। কেননা এর আরো সাক্ষ্য সহীহ আবূ আওয়ানাহ ১/৩২৯ ও দারা কুতনীতে (১/২৩৯) আছে।]

) ইবনে মাজাহ থেকে :
حدثنا هشام بن عمار . حدثنا عبد الرحمن بن سعد . حدثنا عمار بن سعد مؤذن رسول الله صلى الله عليه و سلم . حدثني أبي عن أبيه عن جده – أن أذان بلال كان مثنى مثنى . وإقامته مفردة
“হিশাম ইবনে আম্মার (রহ) … রসূলুল্লাহ (স)এর মুয়াযযিন আম্মার ইবনে সা‘দ (রা)-এর পিতামহ থেকে বর্ণিত যে, বিলাল (রা)এর আযান ছিল দুই দুই (বাক্যে) এবং ইক্বামত ছিল এক এক (বাক্যে)।” [ইবনে মাজাহ – কিতাবুস সালাত باب إفراد الإقامة, এই হাদীসটি যঈফ। কিন্তু পূর্বের সহীহ হাদীসগুলোর সাক্ষ্যমূলক হিসাবে হাদীসটি হাসান]
حدثنا أبو بدر عباد بن الوليد . حدثني معمر بن عبيد الله بن أبي رافع مولى النبي صلى الله عليه و سلم . حدثني أبي محمد بن عبيد الله عن أبيه عبيد الله عن أبي رافع قال – رأيت بلالا يؤذن بين يدي رسول الله صلى الله عليه و سلم مثنى مثنى ويقيم واحدة
“আবূ বদর ‘আব্বাদ ইবনে ওয়ালীদ (র) …. আবূ রাফে‘ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : আমি বিলাল (রা)-কে রসূলুল্লাহ (স)এর সামনে আযানে প্রতিটি কলেমা দুইবার করে এবং ইক্বামাতে প্রতিটি কলেমা একবার করে বলতে দেখিছি।” [ইবনে মাজাহ – কিতাবুস সালাত باب إفراد الإقامة, এই হাদীসটি যঈফ। কিন্তু পূর্বের সহীহ হাদীসগুলোর সাক্ষ্যমূলক হিসাবে হাদীসটি হাসান]

) নাসাঈ থেকে :
أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ تَمِيمٍ قَالَ حَدَّثَنَا حَجَّاجٌ عَنْ شُعْبَةَ قَالَ سَمِعْتُ أَبَا جَعْفَرٍ مُؤَذِّنَ مَسْجِدِ الْعُرْيَانِ عَنْ أَبِي الْمُثَنَّى مُؤَذِّنِ مَسْجِدِ الْجَامِعِ قَالَ سَأَلْتُ ابْنَ عُمَرَ عَنْ الْأَذَانِ فَقَالَ كَانَ الْأَذَانُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَثْنَى مَثْنَى وَالْإِقَامَةُ مَرَّةً مَرَّةً إِلَّا أَنَّكَ إِذَا قُلْتَ قَدْ قَامَتْ الصَّلَاةُ قَالَهَا مَرَّتَيْنِ فَإِذَا سَمِعْنَا قَدْ قَامَتْ الصَّلَاةُ تَوَضَّأْنَا ثُمَّ خَرَجْنَا إِلَى الصَّلَاةِ
“আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ (র) … জামে মাসজিদের মুয়াযযিন আবুল মুসান্না (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : আমি আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা)-কে আযান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বলেন : রসূলুল্লাহ (স)এর যুগে আযানের শব্দগুলো দু’ দু’বার এবং ইক্বামতের শব্দগুলো এক-একবার বলা হত। কিন্তু তুমি যখন ‘ক্বদ কামাতুস সালাহ’ বলবে (তখন দু’বার বলবে)। কারণ আমি [নবী (স)এর মুয়াযযিনকে] ‘ক্বদ কামাতুস সালাহ’ দু’বার বলতে শুনেছি। আমরা যখন ‘ক্বদ কামাতুস সালাহ’ বলার আওয়াজ শুনতাম, তখন অযু করতাম এবং সালাতের জন্য যেতাম।”[নাসাঈ – কিতাবুস সালাত كَيْفَ الْإِقَامَةُ ; ইবনে খুযায়মাহ(হা/৩৭৪), ইবনে হিব্বান (হা/২৯০,২৯১), হাকিম (১/১৯৭, ১৯৮) প্রমুখ সহীহ বলেছেন; যাহাবী চুপ থেকেছেন। এর সনদ হাসান। কেননা এর আরো সাক্ষ্য সহীহ আবূ আওয়ানাহ ১/৩২৯ ও দারা কুতনীতে (১/২৩৯) আছে।]
সুস্পষ্ট হল, নবী (স)এর যামানাতে এবং বিলাল (রা)-কে যে ইক্বামাত শেখানো হয়েছিল, তার সবচাইতে সহীহ মতন হল, বেজোড় ভাবে ইক্বামত বলা। যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমসহ অন্যান্য হাদীসের কিতাবে সহীহ ও হাসান সনদে বর্ণিত হয়েছে।
তাছাড়া হাদীসের নীতিমালা সম্পর্কে হানাফী আলেম শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ) লিখেছেন :
وبالجملة ما اتفق عليه الشيخان مقدم على غيره ثم ما تقردبه البخارى ثم ما تفرد به مسلم ثم ما كان على شرط البخارى ومسلم ثم ما هو على شرط البخارى ثم ما هو على شرط مسلم ثم ما رواه من غيرهم
“যে বাক্যের ব্যাপারে শায়খাইন (তথা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে) ঐকমত্য হয়েছেন তা অন্যদের তুলনায় অগ্রগণ্য হবে। এরপর যে হাদীসটি একাকী সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, অতঃপর যে হাদীসটি একাকী সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। এরপর যে হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তে (অন্য কিতাবে) বর্ণিত হয়েছে। এরপর যা কেবল সহীহ বুখারীর শর্তে (অন্য কিতাবে) বর্ণিত হয়েছে। এরপর যা কেবল সহীহ মুসলিমের শর্তে (অন্য কিতাবে) বর্ণিত হয়েছে। এরপর যা অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন (সেগুলো বিবেচ্য হবে)।”[মুক্বাদ্দিমাতুল মিশকাত (ঢাকা : আল-আকসা লাইব্রেরী) পৃ: ৭১]
শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী হানাফী (রহ) লিখেছেন :
اما الصحيحان فقد اتفق المحدثون على ان جميع ما فيهما من الْمتصل الْمرفوع صحيح بالقطع وانّهما متواتران الَى مصنفيهما وانه كل يهون امرهُما فهو مبتدع غير سبيل المؤمنين وان شئت الْخق الصراح فقسهما بكتاب ابن ابِى شيبة وكتاب الطحاوى ومسند الْخوارزمى وغيْرهما تِجد بينها وبينهما بعد الْمشرقين
“অবশ্য সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ব্যাপারে সমস্ত মুহাদ্দিস একমত যে, এই দুই গ্রন্থে যে সব মুত্তাসিল, মারফু‘ বর্ণনা অকাট্যরূপে সহীহ। যা গ্রন্থাকারদ্বয়ের কাছে মুতওয়াতির হিসাবে বর্ণিত হয়েছে। এ গুলোর ব্যাপারে যে অবহেলা করবে সে বিদ‘আতী। সে ঈমানদারদের পথ ছেড়ে ভিন্ন পথে পা বাড়িয়েছে। যদি এ সত্যটি সুস্পষ্ট ভাবে বুঝতে চান, তাহলে ঐ গ্রন্থদ্বয়ের সাথে ইবনে আবী শায়বাহর কিতাব, তাহাবীর কিতাব ও মুসনাদে খাওয়ারিযমীর তুলনা করুন। তাহলে সেক্ষেত্রে বিরাট পার্থক্য দেখতে পাবেন।” [হুজ্জাতল্লাহিল বালিগাহ (ঢাকা : রশীদ বুক হাউস) ২/১২৬ পৃ:]
আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখবো আমাদের লেখক সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ঐকমত্যের বিরোধিতায় কিভাবে ইবনে আবী শায়বাহ, তাহাবী, অন্যান্য সুনান ও মুসনাদের গ্রন্থকে ব্যবহার করেছেন। যা সুস্পষ্ট বিদ‘আত ও মু’মিনদের বিরোধী পথ (সুরা নিসা : ১১৫)। উল্লেখ্য, কুরআনের দাবী অনুযায়ী যা আল্লাহ নাযিল করেছেন তা পরস্পর বিরোধী হবে না (সূরা নিসা : ৮২)। নবী (স)এর হাদীস অনুযায়ী কিতাবের একাংশকে অপরাংশ দ্বারা দলিল উপস্থাপন করে বিতর্ক স্থায় রাখা যাবে না (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। পক্ষান্তরে নাসারা ও ইয়াহুদীরা নিজেদের ইঞ্জিল ও তাওরাতের বাক্যগুলো পরস্পরের বিরোধী হিসাবে উপস্থাপন করে নিজেদের পান্ডিত্য জাহির করত। যা কুরআন ও সহীহ হাদীসে তাদের ধ্বংসের অন্যতম কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই উম্মাতের ধ্বংসের অন্যতম কারণ হিসাবেও হাদীসে একই বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায়, হাদীস যাচাই-বাছাই পদ্ধতি এজন্যে বের করা হয়েছে, যেন হাদীসের মধ্যে মানবীয় বিকৃতি ও চিন্তা থেকে যেগুলো প্রবেশ করেছে সেগুলোকে চিহ্নিত করা যায়। আসুন এখন আমরা দেখি কিভাবে সহীহ হাদীসের মোকাবেলায় এই উম্মাতের ধ্বংসপ্রাপ্তরা যঈফ ও জাল হাদীস উপস্থাপন করে।

লেখক (পৃ: ১৩) : ইকামতের বাক্য গুলো দু’বার করে বলা সুন্নত
১. হযরত আব্দুর রাহমান ইবনে আবী লায়লা র. বলেন
حَدَّثَنَا أَصْحَابُ مُحَمَد صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؛ أَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ زَيْدٍ الأَنْصَارِيَّ جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللهِ ، رَأَيْتُ فِي الْمَنَامِ كَأَنَّ رَجُلاً قَامَ وَعَلَيْهِ بُرْدَانِ أَخْضَرَانِ عَلَى جِذْمَةِ حَائِطٍ ، فَأَذَّنَ مَثْنَى ، وَأَقَامَ مَثْنَى ، وَقَعَدَ قَعْدَةً ، قَالَ : فَسَمِعَ ذَلِكَ بِلاَلٌ ، فَقَامَ فَأَذَّنَ مَثْنَى ، وَأَقَامَ مَثْنَى ، وَقَعَدَ قَعْدَةً. رواه ابن ابى شيبة فى المصنف (۲۱۳۱)
واخرجه الطحاوى ۱\۱۰۰-۱۰۲ وابن خزيمة فى صحيحه ۳٨۰ والبيهقى ۱\٤۲۰ من طريق ابن ابى شيبة. قال ابن حزم الظاهرى : هذا اسناد فى غاية الصحة. وقال الماردينى فى الجوهر النقى : رجاله على شرط الصحيح
অর্থ: হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একাধিক সাহাবী আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে যায়দ আল আনসারী রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলেন এবং বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি স্বপ্নে দেখলাম, এক ব্যক্তি যার পরনে ছিল সবুজ রং এর একজোড়া কাপড়- যেন দেয়ালের একাংশে দাঁড়িয়ে জোড়া জোড়া শব্দে আযান দিলেন এবং ইকামাতও দিলেন জোড়া জোড়া শব্দে। আর কিছু‏ক্ষণ (মাঝখানে) বসে রইলেন, তিনি বলেন, পরে বিলাল রা. তা শুনলেন এবং তিনিও জোড়া জোড়া শব্দে আযান দিলেন, জোড়া জোড়া শব্দে ইকামাত দিলেন। আর (আযান ও ইকামাতের মাঝখানে) একটু বসলেন। ইবনে আবী শায়বা রা. আল মুসান্নাফ, হাদীস নং (২১৩১) তাহাবী. ১ম খৃ: ৪২০ পৃ. সহীহ ইবনে খুযাইমা হা.৩৮০ সুনানে কুবরা, বাইহাকী ১/৪২০
ইবনে হায্ম বলেছেন, এ হাদীসটির সনদ অত্যন্ত সহীহ। আলাউদ্দীন মারদীনী রহ. বলেছেন – এটি সহীহ হাদীসের মানোত্তীর্ণ।
বিশ্লেষণ : এই হাদীসটি তাবেঈ আব্দুর রহমান বিন আবী লায়লা থেকে নানা রকম সন্দেহযুক্ত সনদে বর্ণিত হয়েছে। যেমন –
ক) কখনো বর্ণনা করেছেন নামহীন সাহাবীদের মধ্যস্থতায় সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে যায়দ আল আনসারী (রা) থেকে। (লেখকের উল্লিখিত ১ নং)
[এই সনদটিতে আ‘মাশ আছেন। তিনি মুদাল্লিস এবং তিনি ‘আন দ্বারা বর্ণনা করেছেন। সুতরাং হাদীসটি যঈফ।]
খ) কখনো সরাসরি আব্দুল্লাহ ইবনে যায়দ আল আনসারী (রা) থেকে। (লেখকের পরবর্তী ২ নং) আবার
গ) কখনো সাহাবী মু‘আয বিন জাবাল (রা)এর মধ্যস্থতায় সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে যায়দ আল আনসারী (রা) থেকে। (লখকের পরবর্তী ৫ নং)
অর্থাৎ আব্দুর রহমান বিন আবী লায়লা নিজেই সনদটিকে বিতর্কীত করেছেন। তাছাড়া তিনি শেষোক্ত দু’জন সাহাবীর (রা) কাছ থেকে হাদীস শোনেন নি। ইমাম যায়লাঈ হানাফী (রহ) বলেছেন :
قَالَ الْبَيْهَقِيُّ فِي كِتَابِ الْمَعْرِفَةِ: حَدِيثُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلَى قَدْ اُخْتُلِفَ عَلَيْهِ فِيهِ، فَرُوِيَ عَنْهُ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زيد وروى عنه عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، وَرُوِيَ عَنْهُ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ، قَالَ ابْنُ خُزَيْمَةَ: عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ أَبِي لَيْلَى لَمْ يَسْمَعْ مِنْ مُعَاذٍ، وَلَا مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدٍ، وَقَالَ مُحَمَّدُ بْنُ إسْحَاقَ: لَمْ يَسْمَعْ مِنْهُمَا وَلَا مِنْ بِلَالٍ، فَإِنَّ مُعَاذًا تُوُفِّيَ فِي طَاعُونِ عَمَوَاسَ سَنَةَ ثَمَانَ عَشْرَةَ، وَبِلَالٌ تُوُفِّيَ بِدِمَشْقَ سَنَة عِشْرِينَ، وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ أَبِي لَيْلَى وُلِدَ لِسِتٍّ بَقَيْنَ مِنْ خِلَافَةِ عُمَرَ، وَكَذَلِكَ قَالَهُ الْوَاقِدِيُّ. وَمُصْعَبٌ الزُّبَيْرِيُّ، فَثَبَتَ انْقِطَاعُ حَدِيثِهِ، انْتَهَى كَلَامُهُ
“ইমাম বায়হাক্বী তাঁর ‘মা‘রেফাতে’ বলেছেন : আব্দুর রহমান বিন আবী লায়লা হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে বিতর্কীত হয়েছেন। তাঁর থেকে আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ (রা), মু‘আয বিন জাবাল (রা) ও মুহাম্মাদ (স)এর সাহাবীদের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনে খুযায়মাহ (রহ) বলেন : আব্দুর রহমন বিন আবী লায়লা মু‘আয (রা) ও আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ (রা) থেকে শোনেন নি। মুহাম্মাদ বিন ইসহাক্ব (রহ) বলেন : তিনি তাঁদের দু’জন থেকে শোনেন নি, এমনকি বিলাল (রা) থেকেও শোনেন নি। কেননা মু‘আয (রা) ১৮ হিজরিতে মহামারীতে মারা যান। বিলাল (রা) দামেস্কে ২০ হিজরীতে মারা যান। পক্ষান্তরে আব্দুর রহমান বিন আবী লায়লা (রহ) উমার (রা)-এর খেলাফত শেষ হওয়ার ছয় বছর পূর্বে জন্ম গ্রহণ করেন – যেভাবে ওয়াক্বিদী ও মুস‘আব যুবায়রী বলেছেন। সুতরাং প্রমাণিত হল, হাদীসটির সনদে বিচ্ছিন্নতা আছে।” [নাসবুর রায়াহ ১/২৬৭ পৃ:]
এক্ষণে অন্যান্য সাহাবীদের থেকে আব্দুর রহমান বিন আবী লায়লা’র হাদীসটি
ক) মুদাল্লিস ‘আমাশের মু‘আন‘আন বর্ণনার কারণে যঈফ।
খ) এছাড়া আবূ দাউদ বর্ণিত আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ (রা)এর আযানের ইতিহাস সম্পর্কিত অপর একটি সহীহ হাদীসের বিরোধী। সেখানে সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ (রা) থেকে ইক্বামত বেজোড় সংখ্যায় বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি নিম্নরূপ :
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مَنْصُورٍ الطُّوسِىُّ حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ حَدَّثَنَا أَبِى عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ حَدَّثَنِى مُحَمَّدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ بْنِ الْحَارِثِ التَّيْمِىُّ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدِ بْنِ عَبْدِ رَبِّهِ قَالَ حَدَّثَنِى أَبِى عَبْدُ اللَّهِ بْنُ زَيْدٍ قَالَ لَمَّا أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- بِالنَّاقُوسِ يُعْمَلُ لِيُضْرَبَ بِهِ لِلنَّاسِ لِجَمْعِ الصَّلاَةِ طَافَ بِى وَأَنَا نَائِمٌ رَجُلٌ يَحْمِلُ نَاقُوسًا فِى يَدِهِ فَقُلْتُ يَا عَبْدَ اللَّهِ أَتَبِيعُ النَّاقُوسَ قَالَ وَمَا تَصْنَعُ بِهِ فَقُلْتُ نَدْعُو بِهِ إِلَى الصَّلاَةِ. قَالَ أَفَلاَ أَدُلُّكَ عَلَى مَا هُوَ خَيْرٌ مِنْ ذَلِكَ فَقُلْتُ لَهُ بَلَى. قَالَ فَقَالَ تَقُولُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ قَالَ ثُمَّ اسْتَأْخَرَ عَنِّى غَيْرَ بَعِيدٍ ثُمَّ قَالَ وَتَقُولُ إِذَا أَقَمْتَ الصَّلاَةَ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ فَلَمَّا أَصْبَحْتُ أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- فَأَخْبَرْتُهُ بِمَا رَأَيْتُ فَقَالَ « إِنَّهَا لَرُؤْيَا حَقٌّ إِنْ شَاءَ اللَّهُ فَقُمْ مَعَ بِلاَلٍ فَأَلْقِ عَلَيْهِ مَا رَأَيْتَ فَلْيُؤَذِّنْ بِهِ فَإِنَّهُ أَنْدَى صَوْتًا مِنْكَ ». فَقُمْتُ مَعَ بِلاَلٍ فَجَعَلْتُ أُلْقِيهِ عَلَيْهِ وَيُؤَذِّنُ بِهِ – قَالَ – فَسَمِعَ ذَلِكَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ وَهُوَ فِى بَيْتِهِ فَخَرَجَ يَجُرُّ رِدَاءَهُ وَيَقُولُ وَالَّذِى بَعَثَكَ بِالْحَقِّ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَقَدْ رَأَيْتُ مِثْلَ مَا رَأَى. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- « فَلِلَّهِ الْحَمْدُ ». قَالَ أَبُو دَاوُدَ هَكَذَا رِوَايَةُ الزُّهْرِىِّ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدٍ وَقَالَ فِيهِ ابْنُ إِسْحَاقَ عَنِ الزُّهْرِىِّ « اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ ». وَقَالَ مَعْمَرٌ وَيُونُسُ عَنِ الزُّهْرِىِّ فِيهِ « اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ ». لَمْ يُثَنِّيَا.

মুহাম্মাদ ইবনু মানসূর ……আবদুল্লাহ্ ইবনু যায়েদ (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ্ (স) শিংগা ধ্বনি করে লোকদের নামাযের জন্য একত্র করার নির্দেশ প্রদান করেন তখন একদা আমি স্বপ্নে দেখি যে, এক ব্যক্তি শিংগা হাতে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তাকে বলি, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি কি শিংগা বিক্রয় বরবে? সে বলে, তুমি শিংগা দিয়ে কি করবে? আমি বলি, আমি তার সাহায্যে সালাতের জামাআতে লোকদের ডাকব। সে বলল, আমি কি এর উত্তম কোন সন্ধান তোমাকে দেব না? আমি বলি, হাঁ। রাবী বলেন, তখন সে বলল, তুমি এইরূপ শব্দ উচ্চারণ করবে : “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; আশ্হাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্, আশ্হাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্; আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্, আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্; হাইয়া আলাস্-সালাহ্, হাইয়া আলাস্-সালাহ্, হাইয়া আলাল-ফালাহ্, হাইয়া আলাল-ফালাহ্, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্।” রাবী রলেন! অতঃপর ঐ স্হান হতে ঐ ব্যক্তি একটু দুরে সরে গিয়ে দাঁড়ায় এবং বলে- তুমি যখন সালাত পড়তে দাঁড়াবে তখন বলবে : “আল্লাহু আকরার, আলাহু আকবার; আশ্হাদুআল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্; আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্; হাইয়া আলাস্-সালাহ্; হাইয়া আলাল-ফালাহ্; কাদ কামাতিস্ সালাহ্; কাদ কামাতিস্-সালাহ্, আলাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্”। অতঃপর ভোর বেলা আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাযির হয়ে তাঁর নিকট আমার স্বপ্নের বর্ণনা করি। নাবী ﷺ বলেন এটা অবশ্যই সত্য স্বপ্ন। অতঃপর তিনি বলেনঃ তুমি বিলালকে ডেকে তোমার সাথে নাও এবং তুমি যেরূপ স্বপ্ন দেখেছ- তদ্রুপ তাকে শিক্ষা দাও যাতে সে (বিলাল) ঐরূপে-আযান দিতে পারে। কেননা তাঁর কন্ঠস্বর তোমার স্বরের চাইতে অধিক উচ্চ। অতঃপর আমি বিলাল (রাঃ) -কে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়াই এবং তাকে আযানের শব্দগুলি শিক্ষা দিতে থাকি এবং তিনি উচ্চারণ পূর্বক আযান দিতে থাকেন। বিলালের এই আযান ধ্বনি উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) নিজ আবাসে বসে শুনতে পান। তা শুনে উমার (রাঃ) এত দ্রুত পদে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে আগমন করেন যে, তাঁর গায়ের চাঁদর মাটিতে হেচঁড়িয়ে যাচ্ছিলো। তিনি নাবী ﷺ-এর দরবারে উপস্হিত হয়ে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর শপথ! যে মহান সত্তা আপনাকে সত্য নাবী হিসাবে প্রেরণ করেছেন, আমিও ঐরূপ স্বপ্ন দেখেছি যেরূপ অন্যরা দেখেছে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন : সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য- (ইবনু মাজাহ, তিরমিযী, মুসলিম)। ইমাম আবূ দাউদ (রহ) বলেন, সাইদ ইব্নুল মূসাইয়্যাব ও আবদুল্লাহ ইবনু যায়েদের সূত্রে ইমাম যুহুরী (রহ) হতেও এইরূপ হাদীছ বর্ণিত আছ। যুহরী থেকে ইবনু ইসহাকের সূত্রে “আল্লাহু আকবার, চারবার উল্লেখ আছ। যুহরী থেকে মামার ও ইউনুসের সূত্রে “আল্লাহু আকবার” দুই বার উল্লেখ আছে, তাঁরা চারবার উল্লেখ করেননি।
[আবূ দাউদ –কিতাবুস সালাত ; মুহাক্কিক্ব শু‘আয়েব আরনাউত বলেন : হাদীসটি হাসান (তাহক্বীক্বকৃত আবূ দাউদ হা/৪৯৯)। ইমাম মুনযিরী (রহ)ও অনুরূপ বলেছেন (‘আওনুল মা‘বুদ – আলোচ্য হাদীসের ব্যাখ্যা দ্র:)
গ) আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদের (রা) শেষোক্ত হাদীসটির সমর্থনে সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিমসহ অন্যান্য সুনানগ্রন্থে একাধিক সাহাবী থেকে বেজোড় ইক্কামতের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যা থেকে বুঝা যায়, ইবনে আবী লায়লার আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা) এর জোড় ইক্বামতের হাদীসটি অধিকাংশ সহীহ বর্ণনার বিরোধী বিধায় শায হাদীস হওয়ায় বর্জনীয়। অর্থাৎ ইবনে আবী লায়লা (রহ) থেকে সনদ ও মতন উভয় দিক থেকেই হাদীসটির যঈফ ও অগ্রহণযোগ্য হওয়াটা সুস্পষ্ট।
ঘ) তাছাড়া লেখক ইবনে হাযম (রহ) থেকে হাদীসটি সম্পর্কে আংশিক মন্তব্য উল্লেখ করেছেন। ইবনে আবী লায়লা (রহ)এর উক্ত হাদীসটি সম্পর্কে ইবনে হাযম (রহ)এর বক্তব্য নিম্নরূপ :
وَهَذَا إسْنَادٌ فِي غَايَةِ الصِّحَّةِ مِنْ إسْنَادِ الْكُوفِيِّينَ فَصَحَّ أَنَّ تَثْنِيَةَ الإِقَامَةِ قَدْ نُسِخَتْ؛ وَأَنَّهُ هُوَ كَانَ أَوَّلَ الأَمْرِ؛ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ أَبِي لَيْلَى أَخَذَ عَنْ مِائَةٍ وَعِشْرِينَ مِنْ الصَّحَابَةِ؛ وَأَدْرَكَ بِلالا وَعُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا؛ فَلاحَ بُطْلانُ قَوْلِهِمْ بِيَقِينٍ -، وَلِلَّهِ تَعَالَى الْحَمْدُ
“এই সনদটি কুফীদের সনদের থেকে বেশী সহীহ। এ পর্যায়ে সহীহর দাবী হল, দুই বার করে ইক্বামত বলাটা মানসুখ হয়েছে। আর সেটা প্রথম দিককার হুকুম ছিল। আর আবী লায়লা একশত বিশ জন সাহাবী থেকে বর্ণনা এবং বিলাল ও উমার (রা) দু’জনের সাথে সাক্ষাৎ – এগুলো তাঁর উক্তি হিসাবে নিশ্চিত বাতিল। এই জন্য আল্লাহ তা‘আলার হামদ করছি।” (মুহাল্লা ২/২৫৪)
বুঝা গেল, ইমাম ইবনে হাযমের কাছে দুই বার করে ইক্বামত বলার অন্যান্য কুফাবাসী বর্ণনার থেকে আবী লায়লা আলোচ্য বর্ণনাটি তুলনামূলক বেশী সহীহ। কিন্তু এক্ষেত্রে ইবনে হাযম হাদীসটি মানসুখ হিসাবে গণ্য করেছেন।
এছাড়া আমরা উপরে প্রমাণ করেছি আব্দুর রহমান ইবনে আবী লায়লার সনদ ও মতন উভয়ক্ষেত্রে ত্রুটি থেকেই উক্ত বর্ণনা এসেছে। তাছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ ও বিলাল (রা)এর সাথে সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো আযানের শুরুর ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত। এ কারণে নাসিখ মানসুখের ভিত্তিতে সমন্বয়ের চেয়ে সনদ ও মতনগত বিশ্লেষণই এখানে বেশী সুস্পষ্ট।
ঙ) ইমাম ইবনে খুযায়মাহ (ও নাসিরুদ্দীন আলবানী রহ.) সাহাবী আবূ মাহযুরাহ (রা)এর তারজীযুক্ত আযান ও ইক্বামতের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আব্দুল্লাহ বিন যায়দ (রা)এর হাদীসটিকে গ্রহণ করার কথা বলেছেন। অথচ ১) সহীহ সূত্রে আব্দুল্লাহ বিন যায়দ (রা) থেকে আলোচ্য ঘটনা সম্বলিত হাদীসটিতে বেজোড় সংখ্যার একামত বর্ণিত হয়েছে। ২) আবূ মাহযুরাহ (রা)এর আযানটি তারজীযুক্ত পক্ষান্তরে আব্দুল্লাহ বিন যায়দ (রা)এর হাদীসটি তারজী বিহীন। সুতরাং সাক্ষ্য হিসাবে আলোচ্য হাদীসটিকে গ্রহণ করা যায় না।
চ) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মোকাবেলায় তাহাবী বা ইবনে আবী শায়বাহ’র বিরোধী বর্ণনা সম্পর্কে শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ)এর মন্তব্য কিছু পূর্বে উল্লেখ করেছি। যা হাদীসটির অগ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে।

লেখক :
২. আব্দুল্লাহ ইবনে যায়দ রা. থেকে বর্ণিত-
قال كان أذان رسول الله صلى الله عليه و سلم شفعا شفعا في الأذان والإقامة. رواه الترمذى-۱۹٤.
অর্থ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আযান ও ইকামাত ছিল জোড়া জোড়া শব্দে। তিরমিযী, হা[.১৯৪
বিশ্লেষণ : এই হাদীসটির সনদেও ইবনে আবী লায়লা আছেন। এখানে দেখা যাচ্ছে তিনি আব্দুল্লাহ বিন যায়দ (রা) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি উল্লেখ করার পর ইমাম তিরমিযী (রহ) লিখেছেন :
عبد الرحمن بن أبي ليلى لم يسمع من عبد الله بن زيد
“‘আব্দুর রহমান বিন আবী লায়লা (রহ) সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ বিন যায়দ (রা) থেকে হাদীস শোনেন নি।” (তিরমিযী হা/১৯৪)
সম্মানিত লেখক এই কথাটি গোপন করে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মোকাবেলায় কোন স্বার্থে উক্ত হাদীসটি পেশ করলেন?!
আসলে তিনি চাচ্ছেন, ইয়াহুদী ও নাসারাদের মত মুসলিম জনগণও যেন কিতাবের গোলক ধাঁধায় পড়ে দ্বীনের মতবিরোধকে স্থায়ী ভাবে মেনে নেয়।

লেখক (পৃ:১৪) :
৩. আব্দুর রাহমান ইবনে আবী লায়লা র. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
كَانَ عَبْدُ اللهِ بْنُ زَيْدٍ الأَنْصَارِيُّ مُؤَذِّنُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَشْفَعُ الأَذَانَ وَالإِقَامَةَ. رواه ابن ابى شيبة فى المصنف رقم ۲۱۵۱
অর্থ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুয়ায্যিন আব্দুল্লাহ ইবনে যায়দ আল আনসারী রা. আযান ও ইকামাত জোড়া জোড়া শব্দে দিতেন। মুসান্নাফে ইবনে আবীশায়বা, হাদীস নং (২১৫১)
বিশ্লেষণ : এই সনদটির অবস্থাও পূর্বেরটির অনুরূপ। কেননা এখানেও আব্দুর রহমান বিন আবী লায়লা সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ বিন যায়দ থেকে বর্ণনা করেছেন। অথচ তিনি তাঁর কাছ থেকে কিছু শুনেন নি, যেভাবে মুহাদ্দিসগণের থেকে পূর্বে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ এই সনদটিও পূর্বেরটির মত যঈফ এবং সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসের বিরোধী।

লেখক (পৃ:১৪) :
৪. ইবনে আবী লায়লা র. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
حَدَّثَنَا أَصْحَابُنَا ؛ أَنَّ رَجُلاً مِنَ الأَنْصَارِ جَاءَ فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللهِ ، إِنِّي لَمَّا رَجَعْتُ الْبَارِحَةَ وَرَأَيْتُ مِنَ اهْتِمَامِكَ ، رَأَيْتُ كَأَنَّ رَجُلاً قَائِمًا عَلَى الْمَسْجِدِ عَلَيْهِ ثَوْبَانِ أَخْضَرَانِ فَأَذَّنَ ، ثُمَّ قَعَدَ قَعْدَةً ، ثُمَّ قَامَ فَقَالَ مِثْلَهَا ، غَيْرَ أَنَّهُ قَالَ : قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ ، رواه ابن ابى شيبة فى المصنف رقم-۲۱۳۷ وابو داود رقم ۵۰٦ كلاهما من طريق شعبة عن عمرو بن مرة به.
অর্থ: সাহাবীগণ আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, আনসার গোত্রের জনৈক ব্যক্তি এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! গতকাল যখন আমি ফিরে গেলাম এবং আপনার পেরেশানী দেখলাম, তখন আমি দেখলাম একটি লোক যেন মসজিদে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরিধানে ছিল সবুজ রং এর দুটি কাপড়। তিনি আযান দিলেন। পরে একটু বসলেন। অতঃপর আবার দাঁড়ালেন এবং আগের মতোই বললেন। শুধু এবার قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ ، বাড়িয়ে বললেন। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ২১৩৭; আবূ দাউদ, হাদীস নং ৫০৬।
বিশ্লেষণ : এর সনদটি হল :
حدثنا أبو بكر قال نا غندر عن شعبة عن عمرو بن مرة عن ابن أبي ليلى قال حدثنا أصحابنا …..
মুহাক্কেক্ব আহমাদ মুহাম্মাদ শাকির (রহ) বলেছেন :
ما رواه الثورى وشعبة عن عمرو بن مرة و حسين بن عبد الرحمن عن ابن أبي ليلى مرسلا
“যা সওরী ও শু‘বাহ বর্ণনা করেছেন ‘আমর বিন মুররাহ ও হুসাইন বিন আব্দুর রহমান থেকে, তারা বর্ণনা করেছেন আব্দুর রহমান ইবনে আবী লায়লা থেকে – হাদীসটি মুরসাল।” (তাহক্বীক্ব তিরমিযী ১/৩২৭)
তাছাড়া সনদটিতে তাদলীসের ত্রুটি রয়েছে। হানাফী ছাড়া সমস্ত মুহাদ্দিসগণের কাছে মুরসাল ও তাদলীসের ত্রুটিযুক্ত হাদীসকে যঈফ গণ্য করা হয়। তাছাড়া হাদীসটি সংক্ষিপ্ত ও সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত শব্দের বিরোধী বিধায় শায হওয়ায় প্রত্যাখ্যাত।
সহীহ মুত্তাসিল হাদীস থাকলে মুরসাল ও তাদলীসের দোষযুক্ত সন্দেহপূর্ণ হাদীস মানার কোন গ্রহণযোগ্য উসূল হতে পারে না। তাছাড়া আব্দুর রহমান বিন আবী লায়লা থেকে সনদ ও মতনগত ত্রুটি হওয়ার প্রমাণ ১নং বিশ্লেষণে গত হয়েছে।

লেখক (পৃ:১৪১৫) :
৫.হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা. বলেন-
قَالَ فَجَاءَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ زَيْدٍ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ وَقَالَ فِيهِ فَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ قَالَ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ مَرَّتَيْنِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ مَرَّتَيْنِ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ ثُمَّ أَمْهَلَ هُنَيَّةً ثُمَّ قَامَ فَقَالَ مِثْلَهَا إِلاَّ أَنَّهُ قَالَ زَادَ بَعْدَ مَا قَالَ >> حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ <<قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ. قَالَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم >>- لَقِّنْهَا بِلاَلاً . << فَأَذَّنَ بِهَا بِلاَلٌ.اخرجه ابوداود رقم- ۵۰۷
অর্থ: আনসার গোত্রের লোক আব্দুল্লাহ ইবনে যায়দ রা. আসলেন। তিনি এও বললেন, ( ঐ ব্যক্তি যাকে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন) কিবলামূখী হলেন, এবং বললেন, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ। হায়্যা আলাস সালাহ, দু‘বার, হায়্যা আলাল ফালাহ, দু‘বার। আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তবে ‘হায়্যা আলাল ফালাহ’ বলার পর ‘কাদ্ কামাতিস্ সালাহ, কাদ্ কামাতিস্ সালাহ’ বৃদ্ধি করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বিলালকে এগুলি শিখিয়ে দাও। এর পর থেকে বিলাল রা. এগুলি দিয়েই আযান ইকামাত দিতেন। আবু দাউদ,হাদীস নং ৫০৭
বিশ্লেষণ : এই হাদীসটি ইবনে আবী লায়লা সাহাবী মু‘আয বিন জাবাল (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। অথচ তিনি মু‘আয বিন জাবাল (রা) থেকে হাদীস শোনেন নি। (জামেউস তাহসীল, শামেলা সংস্করণ; আরো দ্র: বিশ্লেষণ-১)
তাছাড়া হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত বিলাল (রা)-কে শেখানোর নির্দেশ সম্বলিত হাদীসটির বিরোধী। ফলে হাদীসটি শায হওয়ার কারণেও যঈফ তথা অগ্রহণযোগ্য।


লেখক (পৃ:১৫) :
أن النبي صلى الله عليه و سلم علمه الأذان تسع عشرة كلمة والإقامة سبع عشرة كلمة قال أبو عيسى هذا حديث حسن صحيح. اخرجه الترمذى رقم- ۱۹۲والطيالسى رقم ۱۳۵٤ والدارمى ۱۱۹٦، ۱۱۹۷ والنسائى ٦۳۰ وقال الترمذى حسن صحيح.

অর্থ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আযানের কালিমা ১৯ টি ও ইকামাতের কালিমা ১৭ টি শিখিয়েছেন। তিরমিযী, হাদীস নং ১৯২; আবূ দাউদ তায়ালিসী, হাদীস নং ১৩৫৪; দারিমী, হাদীস নং ১১৯৬, ১৯৯৭; নাসাঈ, হাদীস নং ৬৩০। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
বিশ্লেষণ :
ক)এই হাদীসটি হানাফীদের পক্ষ সমর্থন করে না। বরং আযানের বাক্য ইকামাতের বাক্যের থেকে কম প্রমাণ করে। অথচ হানাফীদের আযানের বাক্য হলো ১৭টি এবং ইক্বামতের বাক্য দু’টি বেশী তথা ১৯টি। অর্থাৎ হাদীসটি হানাফীদের খণ্ডন করে, সমর্থন করে না।
খ) আবূ মাহযুরার আযান ও ইক্বামতের বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নরূপ :
حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَلِىٍّ حَدَّثَنَا عَفَّانُ وَسَعِيدُ بْنُ عَامِرٍ وَحَجَّاجٌ – وَالْمَعْنَى وَاحِدٌ – قَالُوا حَدَّثَنَا هَمَّامٌ حَدَّثَنَا عَامِرٌ الأَحْوَلُ حَدَّثَنِى مَكْحُولٌ أَنَّ ابْنَ مُحَيْرِيزٍ حَدَّثَهُ أَنَّ أَبَا مَحْذُورَةَ حَدَّثَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَلَّمَهُ الأَذَانَ تِسْعَ عَشْرَةَ كَلِمَةً وَالإِقَامَةَ سَبْعَ عَشْرَةَ كَلِمَةً الأَذَانُ « اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَالإِقَامَةُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ ». كَذَا فِى كِتَابِهِ فِى حَدِيثِ أَبِى مَحْذُورَةَ.
“আল্-হাসান ইবনু আলী ইবনু মুহায়রিয (রহঃ) হযরত আবূ মাহযূরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে উনিশ শব্দে আযান এবং সতের শব্দে ইকামত শিক্ষা দিয়েছেন। আযানের শব্দগুলি নিম্নরূপঃ “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; আশহাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্, আশহাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্; আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্; আশহাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্, আশহাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্; আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্; হাইয়া আলাস্-সালাহ্, হাইয়া আলাস্-সালাহ্, হাইয়া আলাল-ফালাহ্, হাইয়া আলাল-ফালাহ্, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্।” আর ইকামতের শব্দগুলি হলঃ “আল্লাহু আকবার, আলাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আলাহু আকবার, আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্, আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্, হাইয়া আলাস্-সালাহ্; হাইয়া আলাস্-সালাহ্; হাইয়া আলাল-ফালাহ্; হাইয়া আলাল-ফালাহ্; কাদ কামাতিস্ সালাহ্; কাদ কামাতিস্-সালাহ্, আলাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্” হযরত আবূ মাহযূরা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। হাদীছটি তাঁর নিকট রক্ষিত কিতাবে এভাবে উল্লেখ আছে। [আবূ দাউদ – কিতাবুস সালাত হা/৫০২]
ক) উক্ত হাদীসে দুই আশহাদু দুইবার করে বলার পর পুণরায় দুই বার বলা হয়েছে। একে বলা হয়, তারজীহ আযান। ফলে আযানের মোট বাক্য হয় ১৯টি। কিন্তু হানাফীদের কাছে এই তারজী আযান গ্রহণযোগ্য নয়। আবার তারাই তারজীযুক্ত আযানের সাথে সম্পৃক্ত ইক্বামতটি মেনে থাকেন। যা তাদের স্ববিরোধী নীতি। অর্থাৎ মনমত হলে তারা হাদীস গ্রহণ করেন, অন্যথায় বর্জন করেন।
খ) যখন আযান তারজী হবে তখন ইক্বামত জোড়া হবে। অর্থাৎ যে মুয়াযযিন তারজী তথা ১৯ বাক্যের আযান দিবেন তিনি জোড়া তথা ১৭ বাক্যের ইক্বামত দিবেন। বুঝা গেল, সর্বাবস্থায় আযানের বাক্যের থেকে ইক্বামাতের বাক্য সংখ্যা কম হবে।
গ) যেহেতু হানাফীগণ তারজী আযান অস্বীকার করে থাকেন এবং বলেন : এটা সাহাবী আবূ মাহযুরাহ (রা)এর শেখানোর জন্য ছিল। সেহেতু উক্ত ইক্বামতের পদ্ধতির ক্ষেত্রেও সেই ব্যাখ্যাই তাদের পক্ষ থেকে আসা উচিত।
ঘ) যেহেতু আযানের ক্ষেত্রে হানাফীরা সহীহ মুসলিমের সাহাবী বিলাল (রা) থেকে তারজীহীন আযানের অনুসরণ করেন, সেহেতু ইক্বামাতের ক্ষেত্রে ঐ হাদীসের বেজোড় বাক্যকে গ্রহণ করবেন। অন্যথায় তাদের আমল ও দলিল তাদের বিপক্ষে যায়।

লেখক (পৃ:১৬) :
৭. আবূ মাহযূরা রা. বর্ণনা করেন –
عَلَّمَنِي النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الأَذَانَ تِسْعَ عَشْرَةَ كَلِمَةً وَالإِقَامَةَ سَبْعَ عَشْرَةَ كَلِمَةً ، الأَذَانُ : . . . . وَالإِقَامَةُ : اللَّهُ أَكْبَرُ ، اللَّهُ أَكْبَرُ ، اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ ، أَشْهَدُ أَنْ لاَ إلَهَ إِلاَّ اللَّهُ ، أَشْهَدُ أَنْ لاَ إلَهَ إِلاَّ اللَّهُ ، أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ ، أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ ، حَيَّ عَلَى الصَّلاَةِ ، حَيَّ عَلَى الصَّلاَةِ ، حَيَّ عَلَى الْفَلاَحِ ، حَيَّ عَلَى الْفَلاَحِ ، قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ ، قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ ، اللَّهُ أَكْبَرُ ، اللَّهُ أَكْبَرُ ، لاَ إلَهَ إِلاَّ اللَّهُ.اخرجه ابن ابى شيبة رقم- ۲۱۳۲ وابو داود رقم ۵۰۲ كلاهما من طريق همام عن عامر الاحول. وفى طريق لابى داود وعلمنى الاقامة مرتين.رقم ۵۰۱
অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আযানের কালিমা শিখিয়েছেন ১৯ টি, আর ইকামাতের কালিমা শিখিয়েছেন ১৭ টি। আযানের কালিমাগুলি বলার পর তিনি বলেন, আর ইকামাতের কালিমাগুলি হলো- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ। হায়্যা আলাস্ সালাহ, হায়্যা আলাস্ সালাহ, হায়্যা আলাল্ ফালাহ, হয়্যা আলাল্ ফালাহ, কাদ্ কামাতিস্ সালাহ, কাদ্ কামাতিস্ সালাহ। আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লালাøহ। মুসান্নাফে ইবনে আবীশায়বা, হাদীস নং ২১৩২; আবূদাউদ, হাদীস নং ৫০২। আবূ দাউদ শরীফের আরেকটি বর্ণনায় আছে- আমাকে ইকামাতের কালিমা দু‘বার করে বলা শিখিয়েছেন। (হাদীস নং ৫০১)
বিশ্লেষণ : এর জবাব ‘বিশ্লেষণ – ৬’ এর অনুরূপ।

লেখক (পৃ:১৬) :
৮. আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ র. থেকে বর্ণিত আছে যে,
أن بلالا كان يثني الأذان ويثني الإقامة.اخرجه عبد الرزاق ۱\٤٦۲ والطحاوى ۱\۱۰۲ والدارقطنى ۱\۲٤۲ كلهم عن معمر عن حماد عن إبراهيم عنه.واخرجه عبد الرزاق ايضارقم- ۱۷۹۱ أخبرنا عبد الرزاق عن الثوري عن بي معشر عن إبراهيم عن الأسود عن بلال قال كان أذانه وإقامته مرتين مرتين. قال الماردينى فى الجوهر النقى:هذا سند جيد.
অর্থ: বিলাল রা. আযান (এর কালিমাগুলি) দু‘বার করে বলতেন, ইকামাতও দু‘বার করে বলতেন। মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক, ১ খৃ, ৪৬২পৃ; তাহাবী, ১ খৃ, ১০২ পৃ;। অন্য একটি সনদে আব্দুর রায্যাক রা. আসওয়াদ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, বিলাল রা. আযান ও ইকামাত দুবার দুবার করে বলতেন।(দ্র. ১/ ৪৬৩) আল্লামা মারদীনী র. বলেছেন-এর সনদ উত্তম।
বিশ্লেষণ : ক) আসওয়াদ বিন ইয়াযীদ তাবেঈ ছিলেন। তিনি নবী (স)এর যামানা পান নি। আর বিলাল (রা) নবী (স)এর যামানার পরে আযান দেন নি। এ কারণে ইমাম ইবনে হাযম (রহ) হাদীসটি সম্পর্কে লিখেছেন :
لا يَخْتَلِفُ فِيهِ اثْنَانِ مِنْ أَهْلِ النَّقْلِ: أَنَّ بِلالا – رضي الله عنه – لَمْ يُؤَذِّنْ قَطُّ لأَحَدٍ بَعْدَ مَوْتِ رَسُولِ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم – إلا مَرَّةً وَاحِدَةً بِالشَّامِ، وَلَمْ يُتِمَّ أَذَانَهُ فِيهَا
“দু’জন (হাদীস) সঙ্কলকেরও এ ব্যাপারে মতপার্থক্য নেই যে, নবী (স)এর মৃত্যুর পর বিলাল (রা) কারো জন্য আযান দেন নি। অবশ্য শামে (সিরিয়াতে)। সেটাও পরিপূর্ণ ছিল না।” (মুহাল্লা ২/১৮৮)
অর্থাৎ আসওয়াদের পক্ষে বিলালের আযান শোনার সুযোগ ঘটেনি। অথচ বর্ণনাটি থেকে মনে হয় তিনি আযান শুনেছেন। তাছাড়া সহীহ মুসলিমে সহীহ সনদে এর বিপরীত হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং বিতর্কীত এই হাদীসটি সহীহ হাদীসের মোকাবেলায় গ্রহণযোগ্য নয়।
খ) এর সনদে ইবরাহীম (নাখয়ী) মুদাল্লিস। যেভাবে ইমাম হাকিম সুস্পষ্ট করেছেন (তাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন পৃ: ২৮)। তাঁর থেকে বর্ণিত সনদটিতে আনআনাহ আছে। সুতরাং হাদীসটি যঈফ।
গ) হাম্মাদ (বিন আবী সুলায়মান ) মুতাকাল্লাম ফীহ (বিতর্কীত) রাবী ও ইখতিলাতকারী (বর্ণনাতে হেরফেরকারী)। ইমাম হায়সামী (রহ) বলেছেন : এটা সুস্পষ্ট যে, হাম্মাদ থেকে ইমাম সুফিয়ান সওরী, ইমাম শু‘বাহ ও দাস্তাওয়ায়ির বর্ণনা স্মৃতিশক্তি নষ্ট হওয়ার পূর্বে শোনা। অন্যান্যদের শোনাটা ইখতিলাতের পরবর্তীতে ঘটেছে। (মুজমাউয যাওয়ায়েদ ১/১২৪ পৃ:) অথচ এই বর্ণনাটি উক্ত তিনজনের কেউ নেই।
সুস্পষ্ট হল, সনদটি মুরসাল, তাদলীসের ত্রুটিযুক্ত ও হাম্মাদের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। যার অপর একটি প্রমাণ হল, বর্ণনাটি সহীহ মুসলিমের বিরোধী।

লেখক (পৃ:১৭) :
৯. সুওয়ায়দ ইবনে গাফালা রা. থেকে বর্ণিত-
سمعت بلالا يؤذن مثنى ويقيم مثنى اخرجه الطحاوى۱\۱۰۱
অর্থঃ তিনি বলেছেন, আমি বিলাল রা. কে আযান ও ইকামাত দুবার দুবার করে বলতে শুনেছি। তাহাবী, ১/১০১
বিশ্লেষণ : ক) সুওয়ায়দ (রহ)ও তাবেঈ এবং তাঁর পক্ষেও বিলাল (রা) আযান শোনাটা পূর্বের বর্ণনাটির ন্যায় সম্ভব নয়।
খ) এর সনদে শরীক (বিন আব্দুল্লাহ কাযী) আছে। তিনি মুদাল্লিস এবং বর্ণনাটিতে ‘আনআনাহ আছে। সুতরাং হাদীসটি যঈফ।
তাছাড়া শরীকও হাদীসের ক্ষেত্রে ইখতিলাতকারী। …
গ) সর্বোপরি হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত বিলাল (রা) বর্ণনাটির বিরোধী বিধায় প্রত্যাখ্যাত।

লেখক ১০ (পৃ:১৭) :
১০. হযরত আবূ জুহায়ফা রা. থেকে বর্ণিত আছে যে,
ان بلالا كان يؤذن للنبى صلى الله عليه وسلم مثنى مثنى ويقيم مثنى مثنى. اخرجه الطبرانى فى الكبير ৯/১৯২ والدارقطنى ১/২৪২ وفى اسناده زياد بن عبد الله البكائى مختلف فيه واحتج به مسلم.
অর্থ: বিলাল রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য আযানও দিতেন জোড় শব্দে, ইকামাতও দিতেন জোড় শব্দে। তাবারানী, ৯/১৯২ দারাকুতনী, ১/২৪২
বিশ্লেষণ ১০ : ক) বর্ণনাটির সনদে যিয়াদ বিন আব্দুল্লাহ আল-বাকাঈ আছেন। তিনি মুতাকাল্লাফীহ (বিতর্কীত) রাবী। তিনি মাগাযী বা যুদ্ধ বর্ণনার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য (তাক্বরী্ব)। ইবনে ইসহাকের মধ্যস্ততা ছাড়া তার হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। (তাক্বরীবুত তাক্বরীব ও তাহযীবুত তাহযীব)
খ) ইমাম আলী ইবনুল মাদানী (রহ) তাকে যঈফ বলেছেন। আবূ হাতিম (রহ) বলেছেন : দলিল গ্রহণযোগ্য নয়, ইমাম নাসাঈ ও ইবনে সা‘দ তাকে যঈফদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন (মীযান ২/৯১, তাহযীব ৩.৩৭৬)। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মুঈনও তাকে যঈফ বলেছেন (আয-যু‘আফাউল কাবীর ২/৮০)
গ) সর্বোপরি হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত বিলাল (রা) বর্ণনাটির বিরোধী বিধায় প্রত্যাখ্যাত।

লেখক ১১ (পৃ:১৭) :
১১. হাজান্না ইবনে কায়স থেকে বর্ণিত আছে যে,

أَنَّ عَلِيًّا كَانَ يَقُولُ : الأَذَانُ مَثْنَى وَالإِقَامَةُ ، وَأَتَى عَلَى مُؤَذِّنٍ يُقِيمُ مَرَّةً مَرَّةً ، فَقَالَ : أَلاَ جَعَلْتَهَا مَثْنَى ؟ لاَ أُمَّ لِلْآخَرِ. اخرجه ابن ابى شيبة رقم-۲۱٤۹
অর্থ: আলী রা. বলতেন, আযান ও ইকামাতের বাক্যগুলো দুবার করে বলতে হবে। তিনি একজন মুয়ায্যিনকে একবার একবার করে ইকামাত বলতে শুনলেন। তাকে তিনি বললেন, দুবার করে বললেনা কেন? হতভাগ্যের মা না থাক্। মুসান্নাফে ইবনে আবীশায়বা, হাদীস নং ২১৪৯।
বিশ্লেষণ ১১ : ক) হাজান্না বিন ক্বায়েস একজন অপরিচিত ব্যক্তি। যেভাবে ইমাম আবূ হাতিম বলেছেন। (তাহক্বীক্বকৃত ইবনে আবী শায়বাহ ২/১১ পৃ: টীকা নং-৫) তাছাড়া কেউ কেউ তাকে মুতাকাল্লাম ফীহ (বিতর্কিত) রাবী বলেছেন।
খ) তাছাড়া হাশীম বিন আব্দুর রহমান মুদাল্লিস এবং হাদীসটিতে আনআনাহ আছে। সুতরাং তা অগ্রহণযোগ্য। (তাহযীব ১১/৬৩, তাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন পৃ: ৪৭)
গ) সর্বোপরি হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত বিলাল (রা) বর্ণনাটির বিরোধী বিধায় প্রত্যাখ্যাত।

লেখক ১২ (পৃ:১৮) :
১২. উবায়দ রা. থেকে বর্ণিত,
قال ان سلمة كان يثنى الاقامة . اخرجه الطحاوى ۱\۱۰۲
অর্থ: সালামা ইবনেুল আক্ওয়া রা. ইকামাতের শব্দগুলো দুবার করে বলতেন। তাহাবী, ১/১০২
বিশ্লেষণ ১২ :এর সনদে আব্দুর রহমান বিন ইসমাঈল আছেন। তার প্রতি আপত্তি আছে (আয়নী, নুখবুল আফকার ৩/৫২)। ইমাম আবূ দাউদ (রহ) তাকে যঈফ ও মাতরুকুল হাদীস বলেছেন। (তাহযীবুত তাহযীব ১/১০৫)

লেখক ১৩ (পৃ:১৮) :
১৩. আবূ ইসহাক রা. থেকে বর্ণিত,
قَالَ : كَانَ أَصْحَابُ عَلِيٍّ ، وَأَصْحَابُ عَبْدِ اللهِ يَشْفَعُونَ الأَذَانَ وَالإِقَامَةَ. اخرجه ابن ابى شيبة رقم-۲۱۵٤
অর্থ: তিনি বলেন-হযরত আলী রা. ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাস্উদ রা. এর শিষ্যগণ আযান ও ইকামাতের বাক্যগুলি দুবার দুবার করে বলতেন। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ২১৫৪।
বিশ্লেষণ ১৩ : এর সনদে হাজ্জাজ বিন আরতাত বর্ণনাকারী আছে। তিনি যদিও সত্যবাদী কিন্তু ব্যাপক ভুল করতেন, তিনি মুদাল্লিস। (তাক্বরীব পৃ: ৬৪) তাছাড়া তার শিক্ষক ইসহাক্ব বর্ণনাতে ইখতিলাত (কমবেশী) করতেন। (তাক্বরীব ২৬১)
সর্বোপরি হাদীসটি যঈফ। যারা সনদটিকে সহীহ দাবী করছেন, তাদেরকে প্রমাণ করতে হবে – হাজ্জাজ তার উস্তাদ থেকে ইখতিলাতের পূর্বে বর্ণনাটি শুনেছেন। তর্কের খাতিরে সনদটিকে সহীহ ধরে নিলেও বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত নবী (স)এর সাথে সম্পৃক্ত মাারফু‘ হাদীসের বিরোধী বিধায় পরিত্যাজ্য।

লেখক ১৪ (পৃ:১৮) :
১৪. মুজাহিদ র. থেকে বর্ণিত,
قال ذكر له الإقامة مرة مرة فقال هذا شيء قد استخفته الأمراء الإقامة مرتين مرتين.رواه عبد الرزاق فى المصنف رقم-۱۷۹۳
অর্থ: তিনি বলেন- তার নিকট ইকামাতের বাক্যগুলো একবার করে বলার প্রসঙ্গ তুলে ধরা হলে তিনি বললেন, শাসকরা (বনী উমায়্যার) এটা হাল্কা করেছে। ইকামাতের শব্দগুলো হবে দুবার করে। মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক, ১/৪৬৩; তাহাবী, ১/১০১
বিশ্লেষণ ১৪ : মুজাহিদ (রহ) তাবেঈ ছিলেন। সহীহ মারফু‘ ও মওকুফ হাদীসের মোকাবেলায় তাবেঈর উক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি উমাইয়া শাসকদের যে দোষটির কথা উল্লেখ করতে চেয়েছেন তা সহীহ সনদে নবী (স) ও সাহাবীদের থেকে প্রমাণিত। এ পর্যাযে সুস্পষ্ট হয়, তাঁর যামানাতে শাসকদের মাধ্যমে সহীহ আমলটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। যা পূর্ববর্তী সহীহ বর্ণনাগুলোকে সমর্থন করে।
যদি মুজাহিদ (রহ)এর বক্তব্যকে গ্রহণ করি , সেক্ষেত্রে একবার ইক্বামত বলাটা বিদ‘আত গণ্য করতে হয়। কেননা তাহাবীতে বর্ণিত হয়েছে :
فاخبر مجاهد ان ذلك محدث وان الاصل التثنية
“মুজাহিদ খবর দিয়েছেন এটি (একবার ইক্বামত) বিদ‘আত, আর আসলটি হবে দুই বার।” (তাহাবী ১/১৯০)
অথচ ব্যাপক সংখ্যক তাবেঈ থেকে একবার ইক্বামত বলার বর্ণণা রয়েছে। যা সহীহ মারফু‘ ও মওকুফ হাদীসে পরিপূরক। এ পর্যায়ে মুজাহিদের উপস্থাপনা ভুল প্রমাণিত হয়।

লেখক ১৫ (পৃ:১৮) :
১৫. ইবরাহীম নাখায়ী রা. বলেন,
لاَ تَدَعُ أَنْ تُثَنِّيَ الإِقَامَةَ. اخرجه ابن ابى شيبة رقم- ۲۱۵۳ ومحمد فى كتاب الحجة على اهل المدينة ص.۲۲
অর্থ: আযান ও ইকামাতের শব্দগুলো দুবার দুবার বলতে ছাড়বে না। মুসান্নাফে ইবনে আবীশায়বা, হাদীস নং ২১৫৩; ইমাম মুহাম্মাদ, কিতাবুলহুজ্জাহ আলা আহলিল মাদীনা, পৃ. ২২।
বিশ্লেষণ ১৫ : এর সনদে ইবনে আবী লায়লা আছেন। ইবনে হাজার (রহ) বলেন : তিনি সত্যবাদী কিন্তু খুব ভুল করতেন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেছেন : আহমাদ (রহ) বলেছেন : তিনি ত্রুটিপূর্ণ হাফেয। (তাহযীব ৬০৮১)
তাছাড়া এটি তাবেঈর উক্তি। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও চারটি সুনানে বর্ণিত নবী (স) ও সাহাবীদের অধিকাংশ বর্ণনার বিরোধী হওয়াই বর্ণনাটি বাতিল।
লেখক ১৬ (পৃ:১৮) :
প্রাসঙ্গিক আলোচনা : ইকামাতের বাক্যগুলো একবার করে পড়ার ব্যাপারে একটি মাত্র সহীহ হাদীস আছে বুখারী, মুসলিম সহ অনেক হাদীসের কিতাবে। হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আনাস (রা)। তিনি বলেছেন :
أُمِرَ بِلَالٌ أَنْ يَشْفَعَ الْأَذَانَ وَأَنْ يُوتِرَ الْإِقَامَةَ
অর্থাৎ বিলালকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল আযানের বাক্যগুলো জোড় পড়তে, আর ইকামাতের বাক্যগুলো বেজোড় পড়তে। হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ থেকে বুঝা যায় – ইকামাতের বাক্যগুলো একবার করে পড়তে হবে।
বিশ্লেষণ ১৬ : আমরা আলোচনার শুরুতেই কুতুবে সিত্তাহর থেকে আনাস (রা), ইবনে উমার (রা), আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ (রা), আবূ রাফে (রা), আম্মার ইবনে সা‘দ (রা) ও আবুল মুসান্না (রা) প্রমুখের হাদীস বর্ণনা করেছি। এ পর্যাযে লেখকের উক্তি ইকামাতের বাক্যগুলো একবার করে পড়ার ব্যাপারে ‘একটি মাত্র সহীহ হাদীস আছে’ সুস্পষ্ট মিথ্যাচার। বরং বেজোড় ইক্বামাতের বর্ণনাকারীদের সংখ্যাই বেশী ও সহীহ।

লেখক ১৭ (পৃ:১৮) : আলিমগণ পূর্বের হাদীসগুলির কারণে এ হাদীসটির দুটি ব্যাখ্যা করেছেন :
এক. যারা এ হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ অনুসারে আমল করেন তারা সকলে শুরু ও শেষে আল্লাহু আকবার দুবার করেই বলেন। অথচ এতে জোড় সংখ্যা হয়ে যায়। ইমাম নববী র. মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে এই সমস্যার সমাধানে বলেছেন, যেহেতু আল্লাহু আকবার দুবার বললেও এক নিঃশ্বাসে বলা হয় তাই এটাকে একবারের অর্থেই ধরা হবে। হানাফী আলেমগণ বলেন, বুঝা গেল অন্যান্য বাক্যগুলোও যদি এক নিঃশ্বাসে পড়া হয় তবে দুবার করে পড়লেও একবারই ধরা হবে, জোড় ধরা হবে না। তাই তাঁরা বলেছেন, সুন্নাত হলো প্রথম চার বার আল্লাহু আকবার এক নিঃশ্বাসে পড়বে। যাতে বিলালা রা. এর এ হাদীস অনুসারেও আমল হয়ে যায়।
বিশ্লেষণ ১৭ : ইমাম নববীর (রহ) উক্তিতে কেবল ইক্বামাতে শেষের আল্লাহু আকবারের ক্ষেত্রে দুবার বলাকে একবার গণ্য করা হয়েছে। তাহলে আযান জোড়া জোড়া অর্থ করার ক্ষেত্রে শেষের আল্লাহু আকবার দু’টিকে বেজোড় ধরতে হয়। অথচ আযান হল জোড়া জোড়া। যেভাবেই ধরা হোক আযান বা ইক্বামাতের শেষের আল্লাহু আকবার জোড় বা বেজোড় গণনার ক্ষেত্রে এখানে ব্যতিক্রম হচ্ছে। আমাদেরকে আযান বা ইক্বামাতে শেষের আল্লাহু আকবারের ক্ষেত্রে ঐ ব্যতিক্রম হিসেব ধরেই আমল করতে হবে। এ পর্যায়ে ‘আল্লাহু আকবার ও ক্বদকামাতিস সালাহ’ ছাড়া ইক্বামাতের অন্যান্য বাক্যগুলো বেজোড়। অর্থাৎ ইক্বামাতের অন্যান্য বাক্যগুলোর বেশী সংখ্যক বেজোড় হওয়াতে ক্বদকামাতিস সালাহ ছাড়া বলা হয়েছে ইক্বামাতের বাক্যগুলো হবে বেজোড় সংখ্যাতে। আর শেষের আল্লাহু আকবার এখানে ব্যতিক্রম।

সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ (রা) থেকে বর্ণিত বেজোড় সংখ্যার ব্যাখ্যাকৃত ব্যবহারিক ইক্বামাতের পদ্ধতিটিতে সবগুলো বাক্য একবার এবং আল্লাহু আকবার ও ক্বদকামাতিস সালাহ দুই বার এসেছে। হাদীসটির সনদ হাসান। এ পর্যায়ে গাণিতিকভাবে শেষের ‘আল্লাহু আকবারের’ জোড় বা বেজোড় হওয়ার ব্যতিক্রম হিসাবটিসহ হাদীসটির ব্যাখ্যা নিতে হবে।

সমস্ত হাদীসগুলো সামনে রাখলে সারাংশ হল – তারজী আযানের সাথে সংশ্লিষ্ট ইক্বামাত ছাড়া জোড়া ইক্বামাত নেই। তারজীহীন আযানের ইক্বামাত বেজেড় সংখ্যা বিশিষ্ট। আর এটাই হল, এ সম্পর্কিত হাদীসগুলোর দাবীর প্রতি সমন্বিত আমল।

লেখক ১৮ (পৃ:১৮) :
দুই. এ হাদীসে যে একবার করে বলতে বলা হয়েছে, এটি পূর্বে ছিল। পরবর্তীকালে এ আদেশটি রহিত হয়ে গেছে। যার প্রমাণ পূর্ববর্তী হাদীসগুলো। ইমাম তাহাবী র. বলেছেন :
ثم ثبت هو من بعد على التثنية في الإقامة بتواتر الآثار في ذلك فعلم أن ذلك هو ما أمر به
অর্থাৎ পরবর্তীতে বিলাল রা. ইকামাতের বাক্যগুলো দুবার করেই বলতেন; যা বহু সংখ্যক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। বুঝা গেল তিনি এই নিয়ম অনুসরণেও আদিষ্ট হয়েছিলেন।
বিশ্লেষণ ১৮ : অথচ ইমাম ইবনে হাযম (রহ) ঠিক এর বিপরীত কথা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি (দ্র: বিশ্লেষণ-১ এর ‘ঘ’)। তাছাড়া বিলাল (রা) থেকে দু’বার ইক্বামাতের বাক্য বলার হাদীসগুলো যঈফ। সহীহ ও সংখ্যাধিক্য সাহাবীদের বর্ণনা হল একবার ইক্বামাতের বাক্য বলা। আর এ কারণে ইবনে হাযম (রহ) দুইবার ইক্বামাত বলার বাক্যগুলোকে মানসুখ বলেছেন।

লেখক ১৯ (পৃ:১৯২০) :
খোদ আল্লামা শাওকানীর র. – যিনি নিজেও লা-মাযহাবী ছিলেন – আবূ মাহযূরা রা. এর হাদীসের ভিত্তিতে বিলাল রা. এর একবার বলার আমলকে মানসূখ বা রহিত বলে মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ নায়লুল আওতারে তিনি লিখেছেন –
وهو متأخر عن حديث بلال الذي فيه الأمر بإيتار الإقامة لأنه بعد فتح مكة لأن أبا محذورة من مسلمة الفتح وبلال أمر بإفراد الإقامة أول ما شرع الأذان فيكون ناسخًا . وقد روى أبو الشيخ ( أن بلالًا أذن بمنى ورسول اللَّه صلى اللَّه عليه وآله وسلم ثم مرتين مرتين وأقام مثل ذلك ) إذا عرفت هذا تبين لك أن أحاديث تثنية الإقامة صالحة للاحتجاج بها لما أسلفناه وأحاديث إفراد الإقامة وإن كانت أصح منها لكثرة طرقها وكونها في الصحيحين لكن أحاديث التثنية مشتملة على الزيادة فالمصير إليها لازم لا سيما مع تأخر تاريخ بعضها كما عرفناك
অর্থাৎ একবার বলার আদেশ সম্বলিত বিলাল রা. এর হাদীসটির পরে হলো আবূ মাহহযূরা রা. এর এ হাদীস। কারণ এটি মক্কা বিজয়ের পরের ঘটনা। আবূ মাহযূরা রা. তো মক্কা বিজয় কালে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবুশ শায়খ র. বর্ণনা করেছেন যে, বিলাল রা. মিনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপস্থিতিতে আযান ও ইকামাতের বাক্যগুলো দুবার করে বলেছেন।
এ আলোচনা থেকে নিশ্চয়ই পাঠকের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ইকামাতের বাক্যগুলো দুবার করে বলার হাদীসগুলো প্রমাণ স্বরূপ পেশ করার উপযুক্ত। আর একবার করে বলা হাদীসগুলো যদিও অধিক সনদে ও বুখারী মুসলিমে বর্ণিত হওয়ার কারণে অধিক সহীহ, কিন্তু দুবার বলার হাদীসগুলোতে বাড়তি বিষয় রয়েছে, আর এগুলো পরবর্তী কালের বিধান সম্বলিত। এসব কারণে এগুলি অনুসারে আমল করা বাঞ্ছনীয়। নাইলুল আওতার ২/২২
বিশ্লেষণ ১৯ : প্রকৃতপক্ষে উক্ত উপস্থাপনাটি ইমাম শওকানীর (রহ) নিজস্ব কথা নয়। বরং আলেমদের মধ্যকার বিতর্কগুলো তুলে ধরার ধারাবাহিকতায় উক্ত আলোচনাটি এসেছে। কেননা তিনি (রহ) উক্ত উদ্ধৃতির কিছু পরে আবূ মাহযূরার (রা)এর ইক্বামাতের ব্যাপারে অন্যান্য আলেমগণ বিশ্লেষণ করে বলেছেন : তারা আবূ মাহযূরার হাদীসটিকে মানসুখ বলেছেন। কেননা মক্কা বিজয়ের পর মদীনাতে ফিরেও বিলাল (রা) আযান ও ইক্বামত দিয়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে আবূ মাহযুরাহ (রা)এর হাদীসটি তারজীহযুক্ত আযান ও ইক্বামত এবং বিলাল (রা)এর হাদীসটি তারজীহ বিহীন। এখানে উভয়টি ভিন্ন ভিন্নভাবে আমলের সুযোগ আছে। একটির সাথে অপরটির কোন সংঘর্ষ নেই। বরং দু’টি বর্ণনা আযানের দু’টি পদ্ধতির প্রমাণ। সমস্যা হল হানাফীগণ আবূ মাহযুরাহ (রা)এর ইক্বামতের হাদীসটি গ্রহণ করেন, আর আযানের হাদীসটি বর্জন করেন। যা তাদের স্ববিরোধী আমল ও দলিল উপস্থাপনে এক ধরনের ধোঁকাবাজী। উক্ত নীতিমালাটি তখন প্রযোজ্য হত, যখন হাদীসে সংঘর্ষ থাকত। কিন্তু এখানে দুই ধরনের আমল এসেছে একই ক্ষেত্রে তথা আযানের ব্যাপারে। সুতরাং সংঘর্ষ থাকল না। তাছাড়া বিলাল (রা)এর সমর্থনে অন্যান্য সাহাবীর সমর্থিত বর্ণনা রয়েছে। নবী (স)এর যামানার কথাটিও সাহাবীদের (রা) মুখে সুস্পস্ট হয়েছে। তাই এখানে ব্যাপক সংখ্যক সাহাবীর (রা) বর্ণনার মোকাবেলায় আবূ মাহযুরাহ (রা)-এর হাদীসটি কেবল তাঁর নিজস্ব আমলের সাথে সম্পৃক্ত। সাহাবীদের (রা) মধ্যে তাঁর আমলটি প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বিলাল (রা)এর মত আযান ও ইক্বামতের হাদীস বর্ণনা করেছেন : সাহাবী আনাস (রা), ইবনে উমার (রা), আম্মার বিন সা‘দ (রা), আবূ রাফে‘ (রা) প্রমুখ (দ্র: ইবনে মাজাহ- কিতাবুস সালাত)।

লেখক ২০ (পৃ:২০) :
“পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই। ইকামাতের বাক্যগুলো একবার করে বলা হবে না দুবার করে, এ নিয়ে ফকীহ ইমামগণের মধ্যেও দ্বিমত ছিল। কিন্তু ঝগড়া ছিল না। বরং ইমাম ইবনু আব্দিল বার র. উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আহমাদ, ইসহাক, দাউদ যাহেরী ও ইবনে জারীর তাবারী র. প্রমুখ এ দ্বিমতকে বৈধ মতানৈক্য আখ্যা দিয়েছেন, এবং বলেছেন যেভাবেই করুক জায়েয হবে। এমনকি লা-মাযহাবী আলেম তিরমিযী শরীফের ভাষ্যকার মুবারকপুরী সাহেবও লিখেছেন, একবার করে বলা বা দুবার করে বলা উভয়টাই আমার দৃষ্টিতে বৈধ। তাহলে এতে ঝগড়ার কি আছে। কেন বলা হচ্ছে দুবার করে বলার কথা কোন হাদীসে নেই। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করেন।”
বিশ্লেষণ – ২০ : লেখকের এই অংশটুকু নিয়ে আমরা আলোচনার শুরুতেই পর্যালোচনা করেছি। তবে সম্মানিত লেখক এখানে উদারতা দেখালেও পূর্ববর্তী উপস্থাপনাতে তিনি মূলত যঈফ হাদীস দ্বারা সহীহ হাদীসকে মানসুখ ও বাতিল করতে চেয়েছেন। সর্বোপরি তিনি শেষোক্ত মন্তব্য দ্বারা উদারতা প্রদর্শনে আড়ালে ষড়যন্ত্রের নীল-নকশা উপস্থাপন করেছেন। তার পরবর্তী অধ্যায়গুলোর বিশ্লেষণে যা আরো সুস্পষ্ট হবে।